যখন সাফাই নিজের অবস্থান আরো দুর্বল করে

যখন সাফাই নিজের অবস্থান আরো দুর্বল করে
গৌতম দাস
১৩ ডিসেম্বর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1Zu

চলতি ডিসেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা হাঙ্গেরি সফর করে দেশে ফিরেছেন। সেখান থেকে ফিরে আসার পর জনগণকে সেই সফর প্রসঙ্গে অবহিত করতে এক সংবাদ সম্মেলনে ডেকেছিলেন। সেখানে বাড়তি প্রসঙ্গ হিসেবে অনেক কিছুই হাজির হয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে আগামী নির্বাচন কমিশন গঠন কিভাবে করা হবে সে প্রসঙ্গও ছিল। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন কিভাবে হবে তা নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে কিছু প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির অফিসে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। সাংবাদিকেরা মূলত সেই প্রস্তাবের বিষয়েই প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া বা অবস্থান জানতে চাইছিলেন। কিন্তু এতে তিনি যেভাবে এবং যে জবাবে এই প্রশ্নকে মোকাবেলা করেছেন তা জোরালো তো ছিলই না এবং প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সাফাই না হয়ে এটা তাঁর বিপক্ষে গেছে বলে মনে করা যেতে পারে। আর সবচেয়ে কম করে বললেও তা কোন প্রধানমন্ত্রীর জন্য মানানসই হয়নি। আর একভাবে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তার জবাব কনস্টিটিউশনাল আইনের চোখে সিদ্ধ হচ্ছে কি না সে দিকটা একেবারেই বিবেচনায় নেননি, বরং তা আইনসিদ্ধ হোক আর না হোক ডোন্ট কেয়ার হয়ে কেবল রাজনীতির বাকচাতুর্য দিয়ে কথা সাজিয়েছেন। এক ধরণের সাফাই খাঁড়া করতে গিয়েছেন। পার হয়ে যেতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই সাফাই যথেষ্ট হয় নাই ও উপযুক্ত না হওয়ার কারণে তার অবস্থানের বিরাট এই দুর্বল দিকটাই প্রকটভাবে প্রকাশ পেয়েছে।

এখানে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বক্তব্যগুলো প্রথম আলোয় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে নিয়েছি। তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে বক্তব্য দিয়েছিলেন ৩ ডিসেম্বর। প্রথম আলো অনলাইনে ৩ ও ৪ ডিসেম্বর এ বিষয়ে পরপর দুই দিন দুটা রিপোর্ট ছেপেছিল। এর মধ্যে ৪ ডিসেম্বরের রিপোর্টটাই সবিস্তারে। এখানকার সব কোটেশন প্রথম আলো ৪ ডিসেম্বরের রিপোর্ট থেকে নেয়া।

১. নির্বাচন কমিশন গঠন বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে প্রথম প্রতিক্রিয়ায় বলছেন, “ওনার (মানে খালেদা জিয়ার) প্রস্তাব উনি দিয়েছেন। রাষ্ট্রপতিকে বলুক। এটা রাষ্ট্রপতি ভালো বুঝবেন উনি কী পদক্ষেপ নেবেন। রাষ্ট্রপতি যে পদক্ষেপ নেবেন; সেটাই হবে। এখানে আমাদের বলার কিছু নেই”। প্রথমত মনে রাখা দরকার নির্বাচন কমিশন কনষ্টিটিউশনে একটা স্টাটুটারী (statutory) প্রতিষ্ঠান। ধারণা হিসাবে ষ্টাটুটারী প্রতিষ্ঠান মানে যার নিয়ন্ত্রণকারী এবং রিপোর্টিং (জবাবদিহি) অফিস রাষ্ট্রপতির অফিস, নির্বাহী সরকার নয়। ফলে আমাদের নির্বাচন কমিশনও আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাহী বিভাগের মানে নির্বাহী সরকারের অধীনে নয়, বরং সরাসরি রাষ্ট্রপতির অফিসের অধীনে। অর্থাৎ সার কথা হল, নির্বাচন কমিশন অফিসের কমিশনারদের নিয়োগকর্তা হলেন রাষ্ট্রপতি এবং তাদের জবাবদিহি করার বা রিপোর্টিং অফিস হল রাষ্ট্রপতির অফিস। প্রধানমন্ত্রীর অফিস নয়। কিন্তু আমাদের কনস্টিটিউশনে আবার অন্য এক আর্টিকেল আছে যেখানে বলা হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগদান বাদে বাকি সব বিষয়ে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শেই পরিচালিত হবেন। এই বলে রাষ্ট্রপতির উপর বাধ্যবাধকতা আরোপ করে রাখা আছে। এই কারণে কার্যত প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগদান বাদে  রাষ্ট্রপতির তৎপরতার সবকিছু বিষয়ে রাষ্ট্রপতি নিজের বিবেচনা প্রয়োগ করে কিছুই নির্ধারণ করতে অপারগ। ফলে সবকিছুই সরকার বা সরকারপ্রধান দ্বারাই নির্ধারিত হয়ে থাকে। ব্যবহারিক দিক থেকে বললে, প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে পাঠানো পরামর্শ মোতাবেক রাষ্ট্রপতি একমাত্র সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন। অতএব প্রধানমন্ত্রীর এই জবাবের কার্যত কোনো অর্থ নেই। ‘রাষ্ট্রপতি ভালো বুঝবেন, উনি কী পদক্ষেপ নেবেন’, এটা নিছক কথার কথা। কারণ এই ইস্যুতে রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রী যা পরামর্শ দেবেন রাষ্ট্রপতি সেই সিদ্ধান্তই নিতে কনষ্টিটিউশন আইনে বাধ্য। সোজা কথা আমাদের কনস্টিটিউশন অনুসারে প্রধানমন্ত্রীর ভাবনার বাইরে ভিন্নভাবে ভেবে দেখার কোনো সুযোগ রাষ্ট্রপতির নেই।

২. নির্বাচন কমিশন প্রসঙ্গে বিএনপির দেয়া প্রস্তাব সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “বিএনপি যে প্রস্তাব দিয়েছে আপনারা এর মাথা বা লেজের হদিস পেয়েছেন কি না, আমি জানি না। তিনি নির্বাচন করেননি, একটা দল হিসেবে বা দলের প্রধান হিসেবে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে নির্বাচন থেকে বিরত থেকেছিলেন। এখন এত দিন পর ওনার টনক নড়ল। এরপর উনি মানুষ খুন করে আওয়ামী লীগ সরকার উৎখাত করার আন্দোলন করলেন। যেকোনো প্রস্তাব দেয়ার আগে তার তো জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিল”।
প্রথম আলো আরো লিখছে, ‘হত্যাকাণ্ড থেকে কোনো সম্প্রদায়ই রেহাই পাননি জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, সাধারণ মানুষ, বাসের চালক, হেলপার, রেল, লঞ্চ, কোথায় না আঘাত করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্র পুড়িয়েছে, ইঞ্জিনিয়ারকে মেরেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার ২০ জন সদস্যকে হত্যা করেছে। আগে সেই জবাবটা জাতির কাছে দিক। তারপর প্রস্তাব নিয়ে কথা হবে। তারপর তার প্রস্তাব নিয়ে কথা বলব।’

প্রথমত বিএনপি আগের নির্বাচন অংশ নেয় নাই। কিন্তু সেজন্য এবার নির্বাচন কমিশন গঠন কী করে হওয়া উচিত তা নিয়ে প্রস্তাব রাখতে পারবে না কিছু বলার সুযোগ, আইনী অধিকার নাই এমন ধারণার ভিত্তি নাই। একথা প্রধানমন্ত্রীর অজানা নয়। ফলে একথা তুলে প্রধানমন্ত্রী বিএনপির উপর যে কালি লেপে দিতে চেষ্টা করেছেন সেটা ভুল। তাই তিনি তা করতে পারেন না। একইভাবে, প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের আইনগত ভুল বা সমস্যার দিক হল, ২০১৪ সালের নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ব্যাপারে বিএনপির সিদ্ধান্ত ভুল কি না আইনগত দিক থেকে নির্বাহী সরকার বা প্রধানমন্ত্রীর সেটা বিবেচনায় নেয়ার কিছু নেই। এক্তিয়ার নাই। দ্বিতীয়ত, যদি এটা ভুল সিদ্ধান্ত বলে বিবেচনা করা হয়ও, তবু সে কারণে নির্বাহী সরকারের এ নিয়ে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের এখতিয়ার আছে বলে জানা যায় না। এমনকি সে জন্য বিএনপির ‘জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত’ কি না তা নিয়ে আইনগত দিক থেকে সরকারের বলারও কিছু নেই। ফলে এটা প্রধানমন্ত্রীর প্রপাগান্ডা ছাড়া আর কিছু নয়। এ ছাড়া নির্বাচন বর্জন এবং তা করতে গিয়ে কোনো দল যদি কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স করে ফেলে, সে ক্ষেত্রে সরকার বড়জোর সুনির্দিষ্ট অপরাধকারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে এবং আদালত (নির্বাহী সরকার নয়) এ ব্যাপারে আইনগত প্রক্রিয়ায় ওই অভিযোগের ইস্যু নিষ্পত্তি করবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী প্রসঙ্গটা ব্যাখ্যা করছেন এভাবে বলে যে, আগে বিএনপি “জবাবটা জাতির কাছে দিক। তারপর তার প্রস্তাব নিয়ে কথা বলব”। প্রধানমন্ত্রী অন্য একটা দলের কাছে জবাব চাইবার কেউ নন। চাইতে পারেন না তিনি। কেউ তাকে জবাব চাইতে দায়িত্ব দেয় নাই। সেটা তিনি জানেন। তাই বলছেন, (তার কাছে না) তবে “জাতির কাছে জবাব দিক”।  প্রধানমন্ত্রী এভাবে বিষয়টা শর্তযুক্ত করলেন বটে- যে এটা দিলে সেটা দেয়া হবে- এ ধরনের করে; কিন্তু এমন করার এখতিয়ার তার আছে কি? আসলে কোনো নাগরিক কোনো ক্রিমিনাল অপরাধ করেছে কি না সেটা বিচারের কোনো এখতিয়ার নির্বাহী সরকারের নেই। সরকার বড়জোর মামলা করতে পারে। আর আদালতে সে অভিযোগ পেশ করে সরকার প্রমাণের চেষ্টা করে যেতে পারে। কিন্তু সেটা কোনো অপরাধ হয়েছে কি না সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর এক্তিয়ার একমাত্র আদালতের। এমনকি কোনো আদালতে যদি প্রমাণিত হয়ও যে, বিএনপি নির্বাচন বর্জন করতে গিয়ে দলের কোন মেম্বার কেউ অপরাধ ঘটিয়েছে, কিন্তু তবুও সে জন্য দল হিসাবে বিএনপির নির্বাচন কমিশন সংস্কার করার বিষয়ে প্রস্তাব করার অধিকার খর্ব হয় না। অথবা জনগণের কাছে ‘ক্ষমা চাওয়া’র শর্ত পূরণ না হলে সরকার ওই প্রস্তাব বিবেচনা করবে না এটাই বলার এক্তিয়ার সরকারের নাই। আইনগত দিক থেকে এটা বলাও সরকারপ্রধানের এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না। বরং উল্টাটা, একটা সুষ্ঠু নির্বাচন করা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব। অথচ সরকারবিরোধী কোনো রাজনৈতিক দল জনগণের কাছে মাফ চাইলে তবেই সুষ্ঠু নির্বাচনের পদক্ষেপ নেয়া হবে- সরকারের অবস্থান যেন এমনটাই হয়ে গেছে। প্রধানমন্ত্রী যেন বলতে চাইছেন, বিএনপি জনগণের কাছে মাফ না চাইলে তিনি আগামি নির্বাচন সুষ্ঠ করার লক্ষে পদক্ষেপ নিবেন না – এমন হয়ে গেছে। আর তার চেয়েও বড় কথা এখানে ধরে নেয়া হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী যেন ইচ্ছাধারী এবং দাতা। যিনি শাস্তিও দিতে পারেন, আনুকুল্যের সুবিধাও দিতে পারেন। আর বিপরীতে বিরোধী সব দল তার দেয়া আনুকুল্য অথবা শাস্তি গ্রহীতা।
কথা হল, প্রধানমন্ত্রী এভাবে জবাব দিতে গেলেন কেন? এটা করা হল এ জন্য যে, এভাবে যুক্তি তুললে জনগণের চোখে বিএনপিকে ডিসক্রেডিট করা দেয়া যায়, হয়ত সেজন্য। সেটা ভেবে এমন বক্তব্য দেয়া হল। কিন্তু তাতে আসলে ঘটে গেছে ঠিক উল্টোটা। কারণ, আইনগত দিক থেকে প্রত্যেকটা কথা এখতিয়ারের বাইরে চলে গেছে। আর সরকারের দিক থেকে একটা সুষ্ঠু নির্বাচন হতে না দেয়ার পক্ষে তো মূলত কোনো যুক্তি চলে না। এরফলে ভাষ্যগুলো শুধু যে দুর্বল বলে হাজির হয়েছে তা-ই নয়; বরং উপযুক্ত সাফাই যে সরকারের হাতে নেই, এটাই প্রকট হয়ে গেছে।
এই বিষয়টা আরো এক নতুন সমস্যা সৃষ্টি করছে, তা হল – সরকারের স্ববিরোধিতা। যেমন সাধারণভাবে সরকার নিজেই নিজের ইমেজ বাড়ানোর লক্ষ্যে কিছু পদক্ষেপ অন্তত লোক দেখানোর জন্য হলেও নিচ্ছে বলে দেখাতে শুরু করে দিয়েছে। বিশেষত আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলনের সময় থেকে এপর্যন্ত। যেমন আইনমন্ত্রী বলছেন, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বড় প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে, আইনবহির্ভূত হত্যা’। কিন্তু এটা নতুন স্ববিরোধিতা সৃষ্টি করছে। কারণ, এত দিন সরকার কোনো ‘আইনবহির্ভূত হত্যা’ দেশে ঘটছে না বা সরকার করছে না বলে পুরোপুরি অস্বীকারের মুডে ছিল। কিন্তু এখন ইমেজ বাড়বে মনে করে এই নতুন ভাষায় কথা বলাতে আসলে প্রকারান্তরে স্বীকার করে নেয়া হয়ে গেছে যে, “আইনবহির্ভূত হত্যা” হচ্ছে, ঘটছে। তাই এটা একটা বড় সমস্যা। ফলে, বিষয়টি যতটা স্বীকার করে নিচ্ছে ঠিক ততটাই সরকারের ইমেজ বাড়া দূরে থাক, উল্টো ইমেজ হারানো বা বদনাম হিসেবে হাজির হচ্ছে। অর্থাৎ স্বীকারোক্তিতে ইমেজ আরো কমছে।

রোহিঙ্গা ইস্যু
সবশেষে এখন আরেকটি বিষয় আনব- রোহিঙ্গা ইস্যু। এটা অবশ্য ‘নির্বাচন কমিশন’ বা ‘সুষ্ঠু নির্বাচন’ ধরনের ইস্যু নয়। তবে এখানে মূলকথা হল, রোহিঙ্গাদের হত্যা-নির্যাতন বিরাট মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি করেছে। এটা বাংলাদেশের কমবেশি সব মানুষকে এক অসহায়বোধের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ফলে বার্মা বা মিয়ানমার সরকারের করা কাজের পক্ষে কোনো সাফাই আর কাজ করছে না। শুধু তা-ই নয়, আমাদের সরকারেরও রোহিঙ্গাদের আশ্রয় না দেয়ার পক্ষের যুক্তিতে কোনো কাজ হচ্ছে না। ঐ একই সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে একটা কথা বলে ফেলেছেন।
জানে মারা যাওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য, অন্তত একটু নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য  রোহিঙ্গারা এখন পলায়নপর এবং মরিয়া হয়ে আশ্রয়প্রার্থী। এ অবস্থায় কোনো মানবিক আচরণ করা দূরে থাক, প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য মানবিক আচরণ না করার পক্ষে সাফাই দেয়া হয়ে গেছে। যেমন, প্রথম আলো লিখছে, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, “এটি মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। সে দেশের রাষ্ট্রদূতকে ডেকেছে। বিজিবি সতর্ক আছে। কিছু মানুষ এলে মানবিক দিক বিবেচনা করে আশ্রয় না দিয়ে উপায় থাকে না। কিন্তু যারা এর জন্য দায়ী, ৯ জনকে হত্যা করল, তারা কোথায় আছে? কী অবস্থায় আছে, ধরে দেয়া উচিত। তাদের জন্য হাজার হাজার মানুষ কষ্ট পাচ্ছে”। প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, “তারা যদি আমাদের এদিকে এসে থাকে আমি ইন্টেলিজেন্সকে খবর দিয়েছি তাদের খুঁজে বের করার জন্য। কেউ যদি শেল্টার নিতে আসে দেবো না, তাদের মিয়ানমারের হাতে তুলে দেবো”।

অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যে প্রতীয়মান হয়, তিনি বার্মা সরকারের সাফাই বয়ানটাই নিজের বয়ান মনে করছেন। যেমন, বার্মা সরকারের দাবি হল, বার্মা সরকারের হত্যা ও আক্রমণের মুখে মরিয়া হয়ে কথিত কিছু রোহিঙ্গা প্রতিরোধ করতে গিয়ে ৯ জন পুলিশ বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর লোককে হত্যা করে ফেলেছে। কাজেই বার্মা সরকারের এখন যে গণহারে রোহিঙ্গা গণহত্যা করছেন, এর জন্য বার্মা সরকার দায়ী নয়। বরং ওই প্রতিরোধকারীরাই দায়ী। সব দোষ তাদের। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মনে হবে। বার্মিজ সরকার গণহত্যা করছে কথাটা ঠিক। কিন্তু তারা সে জন্য দায়ী নয়। দায়ী ওই রোহিঙ্গা প্রতিরোধকারীরা, যারা ৯ জন পুলিশ বা প্রতিরক্ষা বাহিনীর লোককে হত্যা করেছে। এই বক্তব্য বয়ান খুবই খুবই বিপদজনক। এর মানে হবে, পাকিস্তানের গণহত্যার প্রতিবাদে প্রতিরোধ যুদ্ধ করতে আমরা গিয়েছিলাম। ফলে এভাবেই কী আমরা আমাদের নিজেদের এক কোটি লোক উদ্বাস্তু হওয়ার, নিজেদের মানুষ রেপ আর আর হত্যা হওয়ার জন্য দায়ী? এই বয়ান কী আমরা গ্রহণ করতে রাজী হব!

আসলে এসব বক্তব্য আর অবস্থান নিতে গিয়ে সরকার নিজের কাজ ও আচরণের পক্ষে কোনো সাফাই সৃষ্টি করতে পারছে না, বরং যতই ভাল ইমেজ সৃষ্টি করতে চেষ্টা করছে ততই আর বেশি করে ইমেজ হারিয়ে ফেলছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে ১২ ডিসেম্বর ২০১৬ (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এখানে সে লেখা আরও ঘষামাজা আর এডিট করে আবার ছাপা হল।]

Advertisements

সাবধান, ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

সাবধান,  ট্রাম্পের দেখানোর দাঁত আর খাওয়ার দাঁত আলাদা

গৌতম দাস
১৬ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-26g

গত সপ্তাহে আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ডোনাল্ড জন ট্রাম্প । প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনকে ভোটে হারিয়ে তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। এর চেয়েও বড় কথা, আমেরিকার ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান- এই দুই দলেরই (বাইপার্টিজান) এলিটরা মিলিতভাবে নিজ নিজ দলের কথা চিন্তা বাদ দিয়ে ‘ট্রাম্প ঠেকাও’-এর কাজে নেমে পড়েছিলেন। নির্বাচন অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে ০২ নভেম্বর  সিএনএন রিপোর্ট করেছিল ৩৭০ জন অর্থনীতিবিদ (যাদের মধ্যে কয়েকজন নোবেল প্রাইজ পাওয়া অর্থনীতিবিদও আছেন), তারা সবাই এক বিবৃতিতে কেন ট্রাম্পকে ভোট দেয়া ঠিক হবে না, তা জানিয়েছিলেন। ফলে নির্বাচনের আগেই একটা আবহাওয়া তৈরি হয়েছিল যে  ট্রাম্পের বোধ হয় আর কোনো সম্ভাবনা নেই; তাকে হারিয়ে হিলারিই জিতে যাইতেছেন। রয়টার্সের মতো মিডিয়া বলা শুরু করেছিল, হিলারি জিততেছেন এটা নাকি প্রায় ৯০ শতাংশ নিশ্চিত হয়ে গেছে। ফলে ট্রাম্পের জেতার আর যেন কোনো সম্ভাবনা নেই, চার দিকে সে কথাই কেবল প্রচার হচ্ছিল। কিন্তু ফলাফল এখন সবাই জানেন, মিডিয়ার সবার সব অনুমান সেখানে উল্টে গেছে।  তাহলে এই অবস্থা তৈরি হয়েছিল কেন, আর প্রপাগান্ডার সব কিছু আসলে এক মিথ্যা ফানুস ছিল – এমনইবা শেষে প্রমাণ হলো কেন?

এটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে এটা সেই আমেরিকা যে এখনো গ্লোবাল অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র, নির্ধারক রাষ্ট্র – যদিও এটা শেষযুগে যৌবন ঢলে পড়ার কালে। সেই রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী, অর্থাৎ প্রেসিডেন্ট, তারই নির্বাচন এটি। ফলে এই নির্বাচনকে ঘিরে একে প্রভাবিত করতে সরব মুখ খোলার কথা সমগ্র দুনিয়ার নানান স্বার্থের গোষ্ঠী-মানুষের। তবে মনে রাখতে হবে, সামগ্রিক দিক বিচারে বললে এই নির্বাচনে আসলে মোটা দাগে তিনটি পক্ষ ছিল। এক পক্ষ হল আমেরিকার বাইরের গ্লোবাল স্বার্থ-সুত্রে সম্পর্কিত মানুষ। অন্য দিকে যারা আমেরিকার ভেতরের, এদের মধ্যে আবার আরও দুই পক্ষ। এভাবে মোট তিনটা পক্ষ। মুল প্রসঙ্গটা আমেরিকান ভোটারের, ফলে এখানে ভেতরের মানে আমেরিকান নাগরিক যে ভোটার আর, বাইরের অ-নাগরিক মানে না-ভোটারের। ভেতরের মধ্যে মোটা দুই পক্ষের এক পক্ষ – এই দলে পড়বেন যারা আমেরিকাকে চালায় এমন বড়লোক, এলিট, নীতিনির্ধারক, ইন্টেলেক্ট, ওয়াল স্ট্রিটসহ ব্যবসায়ী জগৎ প্রভৃতি, যাদেরকে এখানে বলার সুবিধার্থে এখন থেকে একসাথে অভ্যন্তরীণ ‘এলিট’ বলে ডাকব। এলিট অর্থাৎ আমেরিকার ভেতরের ‘আম-ভোটার’দের থেকে যারা আলাদা। এই এলিটরাই সবচেয়ে বেশি কথা বলার সুযোগ রাখেন। সাধারণ সময়ে আমেরিকার বাইরের অ-নাগরিক আর ভেতরের এই এলিট অংশ এরাই মূলত মিডিয়া দখল করে রাখেন, কেবল এদের বয়ানই মিডিয়ায় আসে। কিন্তু এর ব্যতিক্রমও আছে। সেটা একমাত্র নির্বাচনের সময়। এই সময় এই দুই কুতুবের বাইরে নিরব কুতুব যারা সবকিছুর নির্ধারক হয়ে উঠতে পারে।  মিডিয়ার বয়ান ও দৃষ্টিভঙ্গির বাইরেরও ঘটনা ঘটতে পারে। কারণ ওদের বাইরেও তৃতীয় (অভ্যন্তরীণভাবে দেখলে দ্বিতীয়) পক্ষ, এঅংশটি হল ‘আম-ভোটার’। ভোটে এরাই নির্ধারক, প্রবল সংখ্যাধিক্যের কারণে। আর সবচেয়ে বড় এই অংশটাই  মিডিয়ার অগোচরেই থেকে যায়, বিশেষত আন্তর্জাতিক মিডিয়ায়। অতএব ভোটের সময় এরা স্থানীয় মিডিয়ায় যদি থেকে যায় সেকথা বাইরে থেকে আমরা জানতে পারি না। এই ‘আম-ভোটার’ অংশটি সবচেয়ে বড় বলে ভোট দেয়া ও গণনায় সময় তাদের ভূমিকা নির্ধারক। অন্য যেকোনো গ্রুপের চেয়ে এরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা। আর ভোটের সময়ের ঠিক এর উলটা দশা হল প্রথম দুই পক্ষের (বাইরের অনাগরিক আর ভেতরের এলিট)। কারণ এদের মধ্যে কেবল ভেতরের এলিটদের কিছু ভোট দেয়ার ক্ষমতা আছে, অন্যটার ভোট নেই। তাহলে দাঁড়াল, আমেরিকান নির্বাচনে একমাত্র নির্বাচনের সময়ই সবচেয়ে নির্ধারক হল – আম-ভোটার। অথচ আম-ভোটারদের চেয়ে যাদের ভোটই নেই অথবা ন্যূনতম কিছু ভোট আছে  এরাই নির্বাচনে পুরো মিডিয়া দখল করে রাখে এবং সেখানে কেবল তাদের স্বার্থের বা গ্লোবাল স্বার্থের কথা বয়ানগুলোকে মুখ্য করে রাখে। অতএব এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আম-ভোটারকে অ্যাড্রেস করতে প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা কী ভাষায়, কী চাতুরীতে বা কী কৌশলে কথা বলবে, প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে এই আম-ভোটারের কাছে পৌঁছবে, প্রভাবিত করবে, এটা খুবই নির্ধারক। জিততে চাইলে প্রভাবিত করার সেই ভাষ্য অবশ্যই মিডিয়ার আমেরিকার বাইরের ও ভেতরের এলিটদের ভাষ্য থেকে ভিন্ন করাই হবে সহজ কৌশল। ট্রাম্প সম্ভবত তাই করেছেন। তিনি ব্যাপক আম-ভোটারের ভাষারপ্ত করে তাদের তাতিয়ে কথা বলেছেন। তার সেসব কথা মিডিয়া বা আন্তর্জাতিক মূল্যবোধের চোখে হয়তো অচল। তবুও তা পরোয়া না করে এই ভোটারদের জীবনধারায় দেখা দৃষ্টিভঙ্গি, চাওয়া-পাওয়ার অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই ট্রাম্প ভোট চেয়ে কথা বলেছেন। কারণ মনে রাখতে হবে, আম-ভোটারদের কাছে তাদের নেতারা বিষয়ে তাদের মুখ্য বিবেচ্য একটাই – তা হল, সরকার তাদের জন্য অনেক কাজ আর ভাল বেতনের ব্যবস্থা করতে পারছেন কিনা, অর্থনীতি চাঙ্গা রাখতে পেরেছেন কিনা ইত্যাদি। যদি পারেন আর তা পারতে গিয়ে অন্য দেশের তেল লুট করে নাকি মানুষ খুন করে সব সাফা করে এনেছেন এসব তাদের বিবেচনার কোন বিষয় হয় না। কারণ তারা জানে এলিটরা হার-হারামজাদা। এলিটরা একমাত্র নিজের সংকীর্ণ স্বার্থের ধান্ধায় পরিচালিত। আর এটাই আম-ভোটারদেরকেও বিপরীত এক সংকীর্ণ স্বার্থের ভিতর দিয়ে নিজেদের দেখতে বাধ্য করে থাকে। ফলে ভিন দেশে গিয়ে আমেরিকান নেতা বা সরকার খারাপ বা অনৈতিক কী করছেন সে বিচারে বসার অবস্থায় তাঁরা থাকেন না। অন্তত নেতাদের আকামের বিচারে বসার চেয়ে বরং তাদের নিজের জন্য অনেক কাজ ও ভাল বেতনের বিষয় – এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। যেমন ট্রাম্প কেন মুসলমানদের বিরুদ্ধে বললেন; মেক্সিকো বা চীনের বিরুদ্ধে ট্রেড বেরিয়ার (আমদানি বাণিজ্যে বাধার নীতি) ইত্যাদিতে কথা বলেছেন। সে বিষয়গুলো আম-ভোটাররা নিজের স্বার্থের দিক থেকে দেখবেন, গ্লোবাল মিডিয়ার দিক থেকে নয়। এ ছাড়া আরেকটা বিরাট দিক আছে – মাইগ্রেন্ট বা প্রবাসী শ্রমিক। অথবা রিফিউজি নামে প্রবাসী বা বিদেশী শ্রমিক। এটা এমন এক জিনিস, যখন অর্থনীতি ভাল চলে তখন সরকার অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশী শ্রমিকও কাজের প্রাচুর্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনুভব করে না। কোন সমস্যা দেখে না। বরং সুবিধার দিকটা দেখতে পায়। ফলে কে দেশের বাইরে থেকে এল, বিদেশী কিনা  তা তার কাছে বিবেচ্য হয় না। অর্থনীতি ভালো চললে, বাইরের শ্রম মানেই তুলনায় সস্তায় পাওয়া শ্রম, যে শ্রম তখন সবার দরকারও। তাই তা আদরণীয়। অথচ অর্থনীতি শ্লথ হয়ে গেলে ঠিক এর উল্টো। তখন মনে হয়, কালো বা বাদামি, বিদেশী বা মুসলমান সব খেদাও, এরাই নিয়ে গেল সব। জাতীয়তাবাদের জিগির উঠবে। এসব ক্রাইসিসের দিক খেয়াল রেখে নির্বাচনে ভোট পাওয়ার জন্য ট্রাম্প জেতার উপযুক্ত ভাষ্যটি সঠিক বানিয়েছিলেন। সেই ভাষায় কথা তুলে যিনি ভোট চাইবেন, স্বভাবতই তিনি সফল হবেন। নির্বাচনে ট্রাম্পের মূল শ্লোগান “মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন” (make America Great again) – ’। আম-ভোটারদের আকৃষ্ট করার ভাষ্য হিসাবে, এটাই সঠিক শ্লোগান। শেষের ঐ ‘এগেইন’ শব্দটা গুরুত্বপুর্ণ। হৃত-গৌরব মনে করিয়ে দিয়ে সুরসুরি দেয়া। আন্তর্জাতিক দিক নয়, জাতীয়তাবাদ।

কিন্তু সমস্যা হয়েছে অন্যখানে। আমরা ট্রাম্পের যত রকম কথা শুনেছি, সেগুলো আমরা আসলে ট্রাম্পের আম-ভোটারের চোখ দিয়ে না দেখে বরং ওর বাইরের অন্য দুই পক্ষের দিক থেকে দেখেছি। সমগ্র দুনিয়ার আমরা প্রথমত, আমাদের নিজ নিজ স্থানীয় প্রেক্ষিত থেকে অথবা গ্লোবাল প্রেক্ষিতে। আমরা ভুলে গেছি, আমেরিকার বাইরের যারা, তারা যত ক্ষমতাবানই হোন না কেন, তারা তো ভোটার নন। আর এটা তো আসলে কেবল ভোটেরই লড়াই। ফলে যারা বাইরের লোক বা সংখ্যায় ক্ষুদ্র দেশি-এলিট এদের নিন্দা-মন্দ কথা আমল করার কী আছে? কিছু নেই। নিন্দা-মন্দ আমল করলে তাতে ভোট সংখ্যা বাড়বে না।  ট্রাম্প এটা ঠিকই ধরেছেন। আর তাঁর জয়লাভের মূল কারণ সম্ভবত এখানে। তিনি বুঝে গিয়েছিলেন, আমেরিকার বাইরের অনাগরিক বা ভেতরের এলিট এসব স্বার্থ সন্তুষ্ট করে ভাষ্য তৈরি করে কোনো লাভ নেই। ভোটের বাক্সে এর কোনো প্রভাব নেই। তাই এ’দুই পক্ষের দিকে তাকিয়ে তিনি কথা বলেননি। দ্বিতীয়ত, একটা বহুল প্রচলিত প্রবাদ হল, হাতির দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবায়ও না, খায়ও না। চিবানোর দাঁত আলাদা। অথচ আমরা দেখানোর দাঁত দিয়ে চিবানো দেখতে চাচ্ছি। ট্রাম্প ভোটে জিতে যাবার পর আমরা এখন চাচ্ছি ট্রাম্প যেন ভোট চাইবার ভাষাতেই তার হবু সরকারের নীতি সাজাক। আর তাতে আমরা যেন আরামে ট্রাম্পের গুষ্ঠি উদ্ধাস্র করতে পারি। আমরা ভোট পাওয়ার জন্য দেয়া পপুলার শ্লোগান (বা বয়ান) আর জিতে যাবার পর তা ‘হুবহু’ সরকারের নীতি-পলিসি করা যেন বাধ্যবাধকতা! অথচ দেখানো আর চিবানোর দাঁত তো আলাদা, তা আলাদাও হতে পারে, হয়। এটা খেয়াল করে দেখি নাই।
আমেরিকা রাষ্ট্রের বাইরের মানুষ, ভিনদেশী আর সাথে ভিতরের কেউ কেউ এমন অনেকেই মনে করে যে ট্রাম্প খুবই খারাপ মানুষ – রেসিস্ট, রেপিস্ট ইত্যাদি ধরনের সব কিছু অভিযোগ যার বিরুদ্ধে আনা যায়, নির্বাচনে ট্রাম্পের হেরে যাওয়া উচিত। অর্থাৎ তারা এখানে এথিকস এবং স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক আইন-কনভেনশন ভঙ্গের কথা তুলছেন, তুলবেন। এ কথাও ঠিক যে ট্রাম্পের অনেক কথায় এথিকস ও আইনের ফিল্টার পার হবে না, আটকে যাবে এবং তা আসলে খুবই অগ্রহণযোগ্য। তাহলে?

ট্রাম্পের বয়ান-অবস্থানের কী সমালোচনা করা যাবে না? সমালোচনা করা কি ভুল হবে? এক কথায় এর জবাব, অবশ্যই যাবে। তবে থিতু হতে একটু অপেক্ষা করেন। ইতোমধ্যে তিনি কী কী বলেছেন, সেগুলোর বিস্তারিত নোট নেন। কিন্তু কোনোভাবে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন না। নেয়া ঠিক হবে না। আগামী বছর ২০ জানুয়ারি ট্রাম্প প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা নেবেন। এর আগেই ও পরে কিছু কিছু করে কয়েক মাসের মধ্যেই ট্রাম্পের ‘আসল’ (অর্থাৎ খাবার দাঁত) নীতি-পলিসি পরিষ্কার হয়ে যাবে। নির্বাচনে দেয়া তার বিভিন্ন বক্তব্যে কোথায় কোথায় এখন তিনি ফিল্টার দেবেন, ফাইন টিউন করে এরপর তা তার সরকারের নীতি-পলিসি হিসেবে ঘোষণা করবেন, তা বোঝা যাবে। এর আগে ট্রাম্প প্রসঙ্গে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া ভুল হবে। এ পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

যেমন, ইতোমধ্যে ট্রাম্প তাঁর মুসলিমবিরোধী বক্তব্য সেটা তিনি নির্বাচনী ওয়েবসাইট থেকে নামিয়ে ফেলেছেন। ওদিকে সর্বশেষ আর এক খবর হল – ওবামার স্বাস্থ্য বীমা পলিসি (অনেকে যেটা তামসা করে ওবামা-কেয়ার বলে), সেটা তিনি নির্বাচনী প্রচারের সময় ‘রিপিল’ করবেন বলেছিলেন। ইংরেজি রিপিল মানে ফিরিয়ে নেয়া, প্রত্যাহার করা বা উল্টো আইন করে বাতিল করে দেয়া। এখন তিনি জানাচ্ছেন, “আমি সম্ভবত রিপিল করছি না। তবে কিছু সংস্কার করব”। এই গুমোর খুলেছেন তিনি ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে দেয়া ট্রাম্পের প্রথম ইন্টারভিউয়ে। এর কিছু পরে ১২ নভেম্বর বৃটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্ট ঐ ইন্টারভিউয়ের উপর একটা রিপোর্ট করে বিস্তারিত। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাষায় এটা ট্রাম্পের ইউটার্ণ; খবরের শিরোনাম হল, “Donald Trump: I may not repeal Obamacare, President-elect says in major U-turn”।

একটা অবজারভেশন হিসাবে বলা যায়, নির্বাচনের সময় সমগ্র দুনিয়ায় প্রার্থীরা অনেক প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা চাঁছা-ছোলা খোলা কথা বলে থাকে। কিন্তু জিতলে পরে যেটার ওপর কম অথবা বেশি ফিল্টার চড়ানো হয়, টোপর পরানো হয় বা ফাইন টিউনে একে বিচার-বিবেচনা করে বদলে নেবার পরেই কেবল তা  সরকারের নীতি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। দেখা গেছে, সময়ে কোন রাষ্ট্রের ক্রাইসিস যত তীব্র থাকে নির্বাচনে প্রতিশ্রুতি বা নীতির কথা তখন চাঁছা-ছোলা আনফিল্টার করে বলা হতে থাকে। আবার মনে রাখতে হবে নির্বাচনী কথার প্রতিশ্রুতির সাথে এরপর জিতে তা সরকারের নীতি হুবহু না হওয়াতে তা নিয়ে সমালোচনা করে নির্বাচনের ফল হবার পরে তা নিয়ে খুব বেশি আগানো যায় না বা কাজে লাগে না। আর একটা প্রশ্ন থেকেই যাই। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি যাই তাই পরে সেটা তখনও কল্পনা তা সবাই মনে রাখে। তুলনায় পরে কংক্রিট ভাষায় সরকারের নীতিতে কী থাকছে সেটাই আসল, বাস্তব। ফলে নির্বাচন উত্তর পরিস্থিতিতে মানুষ কল্পনার চেয়ে বাস্তব নিয়েই কথা বলা অর্থপুর্ণ মনে করে। তবে হ্যা নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে  কোনো প্রার্থীর সমালোচনা একমাত্র তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কাজে লাগে। এবং সেটা কেবলমাত্র নির্বাচনী প্রচারণা চলাকালীন সময়ে , পরে আর নয়।  তাই আমাদের উচিত, চোখ-কান খুলে অপেক্ষা করা।

তাহলে ট্রাম্পই কি প্রথম ব্যক্তি যিনি নির্বাচনে দেয়া ‘হুবহু’ প্রতিশ্রুতিতে চলেন না? বরখেলাপ করেন? না, তা একেবারেই নয়। লিবারেল সুশীলদের প্রতিভূ শ্রী ওবামার কথাই ধরা যাক। তিনি তাঁর নির্বাচন চলাকালীন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন জিতলে তিনি রেনডিশন প্রথা (আমাদের মতো দেশে তাদের আসামি পাঠিয়ে টর্চার করিয়ে আনা, কারণ ওমন টর্চার নির্যাতন করা আমেরিকান আইনে নিষিদ্ধ ) বন্ধ করে দেবেন, গুয়ানতানামো বে কুখ্যাত কারাগার উঠিয়ে দেবেন, আফগানিস্তান থেকে সব সৈন্য প্রত্যাহার করবেন ইত্যাদি। যার একটিও তিনি করেননি এবং পরবর্তিতে তিনি নিজে সরাসরি অপারগতা জানিয়েছেন। তবে আফগানিস্তানে ১০ হাজার আমেরিকান সৈন্য রেখে হলেও বাকিটা প্রত্যাহার করেছেন। আর এক উদাহরণঃ গত ২০১৪ সালে ভারতের নির্বাচন চলাকালীন সময়ে মোদি হুঙ্কার ও ভয় পাইয়ে দিয়ে বলেছিলেন, তিনি জিতলে জেতার পরের দিন থেকে ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীদের’ বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেবেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত মোদির সে কথার পরবর্তী কথা কাজ বা তৎপরতা নেই। যেন এমন কথা তিনি কখনও বলেননি অথবা নিজেই ভুলে গেছেন।

তাহলে আমি কি বলতে চাইছি ট্রাম্পের ওবামা বা মোদীর মতই সব কথা ভুয়া, তাল ঠিক নেই? না, তাও একেবারেই সত্যি নয়। বরং ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, ট্রাম্প দিচ্ছেন যে খুব সম্ভবত আমেরিকান রাষ্ট্রনীতিতে কিছু উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসন্ন। আজকের যে আমেরিকাকে আমরা দেখে অভ্যস্ত, চিনি এই আমেরিকার গড়ন আকার লাভ করে থিতু হয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে; আমেরিকার নেতৃত্বের দুনিয়া নতুন অর্ডারে সাজিয়ে হাজির হয়ে আছে তখন থেকে। সে অবস্থাকে বলা হয় আমেরিকা দুনিয়ার এক এম্পায়ারের (সাম্রাজ্যবাদ নয়) ভূমিকা নিয়ে হাজির হয়েছিল। এরপর থেকে তা সরাসরি আমেরিকার  নিজের প্রত্যক্ষ ভোগে বা কাজে লাগুক আর  নাই লাগুক – এমন বহু বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেম এরপর থেকে তা চলে এখনও টিকে আছে। আর এর পরিচালন চালিয়ে টিকিয়ে রাখার পুরা দায়ভার আমেরিকাকেই বইতে হয়ে আসছে। মুখস্ত বা অভ্যাসের মত, সেই থেকে কোন রিভিউ ছাড়াই এগুলো চলে আসছে। এমন সব প্রতিষ্ঠান বা সিস্টেমের দায়দায়িত্ব এই প্রথম রিভিউ করে কাটছাঁট ও পুনর্গঠন করা হতে যাচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে যেমন, ন্যাটো। এর ৭৩ শতাংশ খরচ আমেরিকা একা বহন করে। ট্রাম্প এটা রিভিউ করার পর ঠিক করতে চান, এটা নিয়ে কী করা হবে। পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটো কোল্ড ওয়ার লড়াইয়ের যুগ শুরুর শুরুতেই ১৯৪৯ সালে গঠন করা হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নকে সামরিক মোকাবোলায় ন্যাটোর সদস্য সকল রাষ্ট্রের একসাথে এক্ট করতে একটা বাধ্যবাধকতা চালু করা, যাতে তা বড় এক রক্ষাকবজ নয়। ট্রাম্প যাকে আমাদের পাগল বেতাল লোক বলে প্রমাণ করতে চাইছি, বা যা মনে চায় তা বলে নির্বাচনে জিতার লোক মনে হচ্ছে – এমন প্রপাগান্ডা হয়েছে হচ্ছে যার নামে  – সেই ট্রাম্প প্রশ্ন তুলছেন সোভিয়েত ইউনিয়ন সেই কবে ভেঙ্গে গেছে, দুনিয়াতে এখন সব রাষ্ট্রই এখন একই গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের মধ্যে সম্পর্কিত হয়ে আছে – অর্থাৎ সেই শত্রুতাও আর তেমন নাই। উলটা এখনকার একমাত্র জলন্ত হুমকি হল “টেররিজম”। তাহলে ন্যাটোকে একইভাবে রেখে দেওয়ার মানে কী? ন্যায্যতা কোথায়? অন্তত এবিষয়ে একটা  রিভিউ  করে এটা ভেঙ্গে দেয়া যায় কী না তা দেখা উচিত। আর দরকার হলে “টেররিজমের” মোকাবোলায় উপযোগী কিছু প্রতিষ্ঠান জন্ম দেয়া হক।  ব্যাপারটা নিয়ে ইতোমধ্যেই ইউরোপের অনেকের সাথে বাকবিতন্ডা শুরু হয়ে গেছে। ট্রাম্পের কথা ফেলনা নয়, যুক্তি আছে।

একইভাবে তিনি প্রশ্ন তুলে বলছেন – ট্রেড ব্যারিয়ার বা অবাধ পণ্য চলাচলে বাধা প্রসঙ্গে। চীনের সাথে বাণিজ্যে তিনি সস্তা জাতীয়তাবাদী হয়ে বাধা দেবেন না। তবে চীনের সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক পুনরায় নেগোশিয়েট করে একটা তুলনামূলক ভালো ডিল (আমেরিকানদের জন্য চাকরি বা আউটসোর্সিং) তিনি পেতে চাইবেন। স্বভাবতঅই এটাই নির্বাচন উত্তর থিতু ভাষ্য। নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ভোটের লোভে এই বিষয়টাকেই তিনি চীনের বিরুদ্ধে হুঙ্কারের মত শোনায় একন ভাষাতেই বলেছিলেন।

আবার সিরিয়া প্রসঙ্গে এক নতুন অবস্থান নিতে যাচ্ছেন। তাতে আসাদ থাকল না গেল, সেখান থেকে সরে আসবেন। রাশিয়ার ওপর আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রের অবরোধ উঠানো নিয়ে কথা আগাবেন। আইএস মোকাবেলা ও দমনে রাশিয়ার সাথে দায় শেয়ার করবেন সম্ভবত। এগুলো সবই বিশ্বাযোগ্য কথা ও পদক্ষেপ তিনি নিতে যাচ্ছেন।  কেবল একটা জায়গায় ফাঁকি দিক ছিল। খুব সম্ভবত তিনি হিলারির বিরুদ্ধে পুতিনের দেয়া ইন্টেরলিজেন্স ব্যবহার করতে পুতিনের সাথে অপ্রমাণিত ডিল করেছিলেন। ট্রাম্প বলতে পারেন যে হিলারিও তো ওবামার প্রভাব ব্যবহার করে “সরকারী মেল ব্যক্তিগত সার্ভারে রেখে” তিনি ঠিক করেন নাই তবে নিরাপত্তা ভঙ্গ হয় এমন কিছু ঘটান নাই বলে ছাড়পত্র এনেছিলেন। অর্থাৎ ওবামা-হিলারি এসব তথাকথিত লিবারেলরা কোন ধোয়া তুলসিপাতা নয় এটা মনে রাখতে হবে।  ওবামা-হিলারিরা কোন স্টান্ডার্ড বা আদর্শ নয়।

সৌদি, জাপান, কোরিয়া, জার্মানি প্রভৃতি দেশে যেখানে যেখানে আমেরিকান ঘাঁটি আছে সে ঘাঁটি রাখার খরচ কে বইবে – এই প্রশ্নটা  ট্রাম্প সামনে আনতে চান।  অথবা রাখা আদৌ আমেরিকার জন্য কোনো লাভ হচ্ছে কি না এটা পুনর্মূল্যায়ন করে নতুন সিদ্ধান্ত নিতে চান। এটা খুবই জেনুইন প্রশ্ন। এককালে আমেরিকার অর্থভান্ডারের অবস্থা ভাল ছিল পরে নিজ খরচে ভিন দেশে ঘাঁটি পোষা হয়ত গায়ে লাগত না। এখন লাভ-ক্ষতি হিসাব করা, বাস্তববাদী হওয়া অবশ্যই জায়েজ।

আমরা যদি মনে রাখি, ট্রাম্প একজন ব্যবসায়ী, তাহলে ট্রাম্পকে বুঝতে আমাদের তা কাজে লাগতে পারে।  উপরের সবগুলো প্রসঙ্গের একটা কমন দিক আছে। সেই বিচারে সবগুলো ইস্যু সম্পর্কিত। আমেরিকার এম্পায়ার ভুমিকা খাটো হয়েও গেছে, শুকিয়েছে। ফলে সে বাস্তব পরিস্থিতি মোতাবেক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে আবার নতুন করে সাজানোর সময় পার হয়ে গেছে।  সারকথায় আমেরিকার এখনকার মানে শুকানো ভুমিকা মোতাবেক বড় খরুচে প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্তত ঢেলে সাজানো যায়। এককথায় যেটাকে দক্ষ সরকার – ম্যানেজমেন্ট এবং খরচের দিক থেকে স্মার্ট চটপটে সরকার কায়েম করার উদ্যোগ – নিঃসন্দেহে অনেক সুদুর প্রসারি ও বাস্তব চিন্তা।

আর একটা প্রসঙ্গ বলে শেষ করব। ট্রাম্পের এক উপদেষ্টা ইতোমধ্যে ট্রাম্প জিতে যাওয়ার পর এক মজার মন্তব্য করেছেন। তিনি চীনা নেতৃত্বের বিশ্বব্যাংক সমতুল্য ব্যাংক এআইআইবি (AIIB), এই ব্যাংক জন্মের সময় ওর গঠন উদ্যোগের বিরোধিতা করা আমেরিকার দিক থেকে  ‘স্ট্র্যাটেজিক মিসটেক’ বলে মন্তব্য করেছেন। এমন মন্তব্য খুবই উলটা বাওয়া মন্তব্য হলেও কথা মিছা না। বাস্তবতা হল এক আমেরিকা আর তাঁর পার্টনারস ইন ক্রাইম জাপান – এই দুই দেশ ছাড়া এখন AIIB সদস্য হতে কোন অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপুর্ণ দেশ বাকী নাই। সর্বশেষ আমেরিকার পিছনে পিছনে চলা কানাডাও ঐ ব্যাঙ্কে যোগ দিয়েছে। আর সেই বিগত ১৯৪৫ সাল থেকে আমেরিকার নেতৃত্ব মেনে পিছেপিছে চলা শুরু করেছিল ইউরোপ। এই প্রথম নিজের স্বার্থ আমেরিকার চেয়ে আলাদা বলে অনুভব ও দাবি করে এরাও (মানে ইউরোপের প্রধান তিন প্রভাবশালী – জর্মন, বৃটিশ ও ফরাসী) চীনের নেতৃত্বে AIIB উদ্যোগে পতাকা তুলতে দেরি করে নাই।  যদিও এই প্রসঙ্গে খোস ট্রাম্প কী অবস্থান নিবেন এখনও কিছুই জানা যায় নাই।

ওবামার এক আদরের নীতি হল বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি বা চুক্তি জোট গড়া। ওসব উদ্যোগে ওবামা মুখ্য বিশেষ্যত্ব হল ঐ চুক্তি বা বাণিজ্য জোট গুলোতে চীনকে বাদ রাখতে হবে।  চীনকে বাদ দিয়ে এরপর বাকিদের নিয়ে আমেরিকাসহ নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য চুক্তি (টিপিপি অথবা নাফটা) – এগুলো পুনর্গঠনের পক্ষে ট্রাম্প কথা বলছেন।খুব সম্ভবত চীনকে বাদ রাখা এটা খুব কাজের মানে কার্যকর সুবিধা আমেরিকাকে দিবে না অসুবিধা ডেকে আনবে – এটাই সম্ভবত ট্রাম্পের কাছে ইস্যু।

এক কথায় বললে চীনের উত্থানে গ্লোবাল অর্থনৈতিক নতুন বিন্যাস ও অবস্থানের দিক থেকে আমেরিকার ভূমিকা কী? আর যাই হোক এতা নিশ্চয় আর আগের মত জায়গায় নাই। ফলে যে সব কোর বিশ্বাস বুঝাবুঝির উপরত আমেরিকার গত সত্তর বছর ধরে দাড়িয়ে ছিল তা বদলবার স্ময় হয়েছে।  ট্রাম্প সম্ভবত এ বিষয়গুলো এই প্রথম ঢেলে ভিন্ন দিক থেকে দেখে নতুন কিছু করতে চাইছেন। স্বভাবতই ট্রাম্পের প্রসঙ্গগুলো যত বিশাল, সে তুলনায় আমাদের কাছে তথ্য যেন আপাতত ততই কম। ফলে কোথায় তা কত দূর যেতে পারবে, আদৌ সম্ভব কি না তা দেখা-বোঝার জন্য আমাদের অনেক অপেক্ষা করতে হবে। তবে কোনোভাবেই বিষয়গুলোকে ট্রাম্পের নির্বাচনপূর্ব রেঠরিক মাত্র এই সংকীর্ণতা দিয়ে বুঝতে চাওয়া অর্থহীন হবে। একবাক্যে বললে, ট্রাম্প সম্ভবত চীন-আমেরিকার সম্পর্ক কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইছেন যেদিক থেকে আগে কখনই দেখা হয় নাই। যদিও বিষয়গুলো যথেষ্ট প্রকাধ্য হয় নাই এখনও।

এ প্রসঙ্গের লেজ ধরে আরেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাহলে সামনে উদয় হয়। চীন-আমেরিকার সম্পর্ককে এখন থেকে কোন নতুন মাত্রার দিক থেকে দেখতে চাইলে স্বভাবতই ট্রাম্পের আমেরিকার সাথে ভারতের অথবা বাংলাদেশ নীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে। কারণ চীন দাবড়াতে হবে – এই অনুমানের উপরেই বর্তমান বহুপাক্ষিক ও বহুমাত্রিক সম্পর্কগুলো সাজানো। অতএব ট্রাম্পের নতুন দৃষ্টভঙ্গীতে এর ভেতর কোনো বিশেষ এবং নতুন দিক থাকবে কি না সে বিষয় এশিয়ার ভারত বা বাংলাদেশ এই দুই দেশেই আপাতত ক্লুহীন। হাসিনার দ্বিধা মনে ট্রাম্পকে স্বাগত জানানোটা সে আলোকে দেখা যেতে পারে। তবে চীনের সাথে ট্রাম্পের নতুন সম্পর্ক সাজানোর দিকটি মাথায় রাখলে তাতে ভারত ও বাংলাদেশের সাথে সম্পর্কের ওপর তার কিছু কিছু ছাপ, নতুন বৈশিষ্ট্য দেখতে পাওয়ার কথা। সম্ভবত ওবামার ‘চীন ঠেকানো’ টাইপের অবস্থান – – এটাকেই  ট্রাম্প ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখবেন। ট্রাম্প এ রকম বহু প্রসঙ্গ তুলেছেন তা চূড়ান্ত নয়, বরং এগুলো ডেভেলপিং বলাই ভাল। তাই এক কথায় সব কিছুই  – ওয়েট অ্যান্ড সি, ডোন্ট কনক্লুড।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ১৪ নভেম্বর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল।  আজ ১৬ নভেম্বর ঐ লেখা আরো সংযোজন ও এডিট করে আবার এখানে ছাপা হল। ]

 

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -২

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -২

গৌতম দাস
০৪ নভেম্বর ২০১৬, বৃহস্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1Zw

দ্বিতীয় ও শেষ পর্বঃ
গত পর্বে ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তের প্রসঙ্গে বলেছিলাম, গত ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬, তিনি প্রেসিডেন্ট ওবামাকে “বেশ্যার ছেলে” ( ‘son of a whore’) বলে প্রকাশ্যে গালি দিয়ে ছিলেন। এমন শব্দের ব্যবহার খুব ভালো কথা নয় নিশ্চয়ই। ফলে তা প্রশংসার বিষয় নয়। কিন্তু এসবের পেছনে অর্থাৎ আমেরিকার বিরুদ্ধে দুতের্তের ক্ষোভের কারণ ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়াগুলো বোঝার দরকার আছে। সাধারণভাবে বললে, গালি দেয়ার কারণ – প্রেসিডেন্ট দুতের্তে নিজ দেশে অবৈধ ড্রাগের বাড়াবাড়ি বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করতে ড্রাগ ডিলার ও সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিচারবহির্ভূতভাবে শুধু গুলি করেই মারছে না। দুতের্তে প্রকাশ্যেই দাবি করে বলছেন, “ড্রাগ ডিলাররা তার বৈধ টার্গেট। এরা আরো মরবে”। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় চার্চ, মানবাধিকার সংগঠন, জাতিসঙ্ঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন আর সবশেষে ওবামা মানবাধিকার লঙ্ঘনের আপত্তি তোলায় সবাইকে অশ্লীল ভাষায়, প্রেসিডেন্টের পদমর্যাদার সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ভাষায় তিনি পাল্টা গালাগালি করেছেন। দুতের্তে বলতে চান, বিচারবহির্র্ভূতভাবে হত্যাকাণ্ডগুলোকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার দিক থেকে দেখে অথবা দেখার সুযোগ নিয়ে অন্য কারো আপত্তি বা সমালোচনা তিনি শুনতে চান না। “তিনি বা তার দেশ যেহেতু এখনো স্বাধীন সার্বভৌম এবং অন্য কোনো রাষ্ট্রের উপনিবেশ নয়, তাই তাদের ডিকটেশন বা সমালোচনা তিনি শুনবেন না”। এ কথা ঠিক যে, যে কোন রাষ্ট্রের যে কোন উছিলায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের সুযোগ নাই, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু এ ধরনের ঘটনাকে ইস্যু করে আমেরিকার কাছে এমন মানবাধিকার ইস্যু ভিনদেশে হস্তক্ষেপ করার হাতিয়ার বানানোর চেষ্টা করা হয় সময়ে – এটাও গ্রহণযোগ্য নয়। ফিলিপাইনে ড্রাগের সমস্যা সঙ্কট মারাত্মক অবস্থায় পৌঁছেছে, তা সমাধানের পদক্ষেপ নেয়া জরুরি, সে কথাও ঠিক। কিন্তু এসব কিছু ছাপিয়ে বড় কথা হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে, তাঁর যে কোন সমালোচককে অভদ্র ভাষায় বাপ-মা তুলে গালি দিয়ে বেড়াচ্ছেন। সবার মূল কথা তাই হয়ে দাঁড়িয়েছে এই যে, অন্তত ভদ্রতার খাতিরে ভদ্র ভাষা ব্যবহার করেও তো দুতের্তে তার পয়েন্ট, তার সমস্যা ও বক্তব্য  তুলে ধরতে পারতেন। এমন না করার দোষে তিনি দুষ্ট।
যা হোক, গালাগালি করার এমন পরিস্থিতির ফলে স্বভাবতই ওবামা এরপরে দুতের্তের সাথে তাদের নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করে দেন। যদিও এর পরের দিন দুতের্তে সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে ‘স্যরি’বলে ক্ষমা চেয়েছিলেন। কিন্তু তা কোন কিছুকেই আগের মত স্বাভাবিক করেনি; বরং তা ন্যূনতম একটি কাজ চালানোর মতো কার্যকর সম্পর্কের স্তরেও আর ফিরে আসেনি। এটা সেই থেকে আমেরিকা-ফিলিপাইন সম্পর্ককে পুরান গভীর ঘনিষ্টতার বিপরীতে বিরাট অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

ওবামা-দুতের্তে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, আঞ্চলিক জোট ‘আসিয়ান’-এর সভা, যা এবার আয়োজিত হয়েছিল লাওসে, সেখানেই সাইড লাইনে। মানে মূল অনুষ্ঠান সূচির ফাঁকে। ফলে দুতের্তে-ওবামা দ্বিপক্ষীয় সভা বাতিল হলেও পরোক্ষে তাদের দেখা হয়েছিল ওই আসিয়ান সম্মেলনে, সভার সদস্য হিসেবে। কিন্তু সরি বলার পরও কেন সম্পুরক-পরিস্থতিতে কোন উন্নতি হয় নাই এ বিষয়ে আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ম্যাগাজিন এক এক্সক্লুসিভ বিশেষ রিপোর্ট ছেপেছিল। কিছু ব্যক্তিগত রেফারেন্স থেকে পাওয়া এটা এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন। ঐ রিপোর্ট বলছে, দুতের্তে  সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে ‘স্যরি’ বলার পর দুতের্তে-ওবামা দ্বিপক্ষীয় সভা আবার আয়োজনের চেষ্টা হচ্ছিল। কিন্তু সম্মেলনেই এক ডিনারের টেবিলে এক ফাঁকে দুতের্তে ওবামার সাথে কথা বলতে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেষ্টা করেছিলান। কিন্তু ওবামা দুতের্তের সাথে ঠিকমত কোনো মুখের কথাও বলেনি শুধু তাই নয় ওবামা উল্টো নিজের জুনিয়র স্তরের আমলা প্রতিনিধির সাথে দুতের্তেকে বৈঠকে বসতে প্রস্তাব করেছিলেন। (Mr. Obama said a follow-up would come from White House staff, not himself) এতেই দুতের্তে প্রচণ্ড অপমানিত বোধ করেন এবং আমেরিকা-ফিলিপাইন গভীর সম্পর্ক এরপর একেবারে আরো খাদের কিনারায় গিয়ে দাঁড়ায়।

বলা হইয়ে থাকে, আমেরিকা-ফিলিপাইন এদুই দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বিগত প্রায় সত্তর বছরের পুরনো এবং সেকালের আসন্ন কমিউনিস্ট বিপ্লব ঠেকাতে গিয়ে বন্ধুত্বের ঘনিষ্ঠতা, আর সেই থেকে আমেরিকান সেনাঘাঁটি স্থাপন হয়ে আছে ফিলিপাইনে। সেই সম্পর্ককে একেবারেই ছিন্ন করে উল্টো পথে হাঁটতে চাইছেন দুতের্তে। অন্তত রাগের মাথায় তাই বলছেন তিনি। সে দিকে বিস্তারে যাওয়ার আগে কোন পশ্চাৎ পটভূমিতে এসব ঘটনাবলি ঘটছে, সেগুলোর একটু স্মরণ ও ঝালাই করে নেব।

একালে আমেরিকাকে ছাড়িয়ে চীনের অর্থনৈতিক আসন্ন ও চলতি  উত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকার ওবামা প্রশাসন বিগত ২০১১ সালে এক ‘এশিয়া নীতি’ ঘোষণা করেছিল। চীনের অর্থনৈতিক উত্থান ঠেকাও, এই লক্ষ্যে সাজানো ওই নীতিতে আমেরিকা নিজের ভূমিকাকে কেন্দ্রীয় ত্রাতার (পিভোটাল রোল) জায়গায় দেখিয়ে প্রকাশ করেছিল। ভৌগোলিক দিক থেকে আমেরিকার এই এশিয়া নীতির কেন্দ্রীয় প্রসঙ্গ সমুদ্রপথে চীনা ভূখণ্ডে প্রবেশদ্বার- চীন সাগর; বিশেষত দক্ষিণ চীন সাগরের কথা মনে রেখে।।
চীনা মূল ভূখণ্ড থেকে সমুদ্রে অথবা সমুদ্র থেকে মূল ভূখণ্ডে প্রবেশের প্রবেশদ্বার একটাই- চীনের পূর্ব দিকে। এই সাগর আসলে একই চীন সাগরের দুই দিক, দুই নামে তা দক্ষিণ চীন সাগর আর পূর্ব চীন সাগর নামে পরিচিত। এর মধ্যে দক্ষিণ চীন সাগরাঞ্চল আরো এগিয়ে তা মহাসাগরে মিশে যাওয়ার আগে চীনের প্রবেশদ্বারের চার দিকে ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ব্রুনাই, ভিয়েতনাম ও তাইওয়ান- এসব দেশের সমুদ্রসীমান্ত। ফলে এসব দেশের সবার সাথে সমুদ্রসীমান্ত বিষয়ে চীনের অমীমাংসিত বিরোধ বিতর্ক আছে। বাইরে থেকে বলা হচ্ছে, দক্ষিণ চীন সাগরের পানির নিচ, সেটা পুরোটাই তেলসহ নানান সমুদ্র সম্পদে সমৃদ্ধ। সে জন্যই এই বিরোধে সবাই সিরিয়াস। কিন্তু এসব সম্পদের হিসাবের কথাগুলো সত্যি না হলেও চীনের কাছে এর গুরুত্ব আলাদা ও বিশেষ ভাবে থাকে, আছে। কারণ, দক্ষিণ চীন সাগর চীনের কাছে নিজের একমাত্র সমুদ্রপথে চলাচল অবাধ রাখা, এবং তা নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখা – খুবই জরুরি ও নির্ধারক। কারণ নিজের মরা-বাঁচার মত ইস্যু এটা। এদিক তাক করেই আমেরিকা চীনকে বিরক্ত করার এশিয়া নীতি সাজিয়েছে। যার মধ্যে আমেরিকার ভান করার দিক হল, চীনের পড়শিদের স্বার্থ রক্ষা করতেই যেন আমেরিকার এই সুদূর এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতিতে আসার উদ্দেশ্য। নিজেকে পিভোটাল (pivotal বা ক্ষমতা কেন্দ্র) ত্রাতার ভূমিকায় দেখিয়ে হাজির করা। আমেরিকার তৎপরতার ভেতর এসব দিকের কথা চীনের পড়শি সব রাষ্ট্র জানতে পেরেছে সেই ২০১১ সাল থেকে। কিন্তু তারা কেউ সেসময়ই আমেরিকার কথায় মাতেনি। কেন? সারকথায় বললে, তারা আমেরিকার পক্ষে চীন-বিরোধী কোনো যুদ্ধপক্ষের জোট বা ঘোটের মধ্যে ঢুকে নিজেদের জড়াতে বা দেখতে চান না। যুদ্ধ রিস্কি জিনিষ -পুঁজিপাট্টা গায়েব হয়ে যায়। তবে নিজ নিজ ভুখন্ড সীমান্ত-সার্বভৌমত্ব রক্ষার করতে কোন আপোষ করতে তারা যায় না। তাই আশা করে কোনো নীতির ভিত্তিতে সব বিতর্ক সমাধান হয়ে যাক, এটা তারা চায়। এব্যাপারে শুরুতে সবচেয়ে ভোকাল ছিল ফিলিপাইন, যদিও ইতোমধ্যে আমেরিকার প্ররোচনায় সেই ফিলিপাইনই একমাত্র রাষ্ট্র, যে সমুদ্রসীমা বিরোধ মীমাংসার জাতিসঙ্ঘের ট্রাইব্যুনাল ‘আনক্লস’ ( UNCLOS, United Nations Convention on the Law of the Sea)-এ মামলা করেছিল। এই মামলায় আমেরিকার প্রভাবে ফিলিপাইন সম্প্রতি চীনের বিরুদ্ধে নিজের পক্ষে একটা রায় পেয়েছে। যদিও ওই আদালত গঠন নিয়ে আগেই চীনের আপত্তি ছিল আর তা উপেক্ষা করার কারণে চীন মামলা চলার সময়ে সক্রিয়ভাবে কনটেস্ট করেনি। তাই রায় প্রকাশের পরে চীন এই রায় গ্রহণ করেনি বলে জানিয়েছে। তবে রায় প্রকাশের পরে কোনো পক্ষ থেকেই তা সামরিক পদক্ষেপের দিকে যায়নি। তবে রায় প্রকাশের অনেক আগে থেকেই (২০১২ সালে) বাস্তব মাঠে, মাছ ধরার দিক থেকে ফিলিপাইনকে মাছ ধরা থেকে বিরত রেখে আসছিল চীন, সেটাও এখনও তেমনই আছে। এক কথায় বললে, রায় প্রকাশের পর ফিলিপাইনের দিক থেকে তারাও কোনো সামরিক দখল উদ্যোগের দিকে যায়নি বা যাওয়ার কোনো নীতি গ্রহণ করেনি। ইতোমধ্যে ২০১৬ সালের ৩০ জুন দুতের্তে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের শপথ নেন। এরপর থেকে সমুদ্রসীমা বিতর্কে ফিলিপাইনের সার্বভৌমত্ব রক্ষার পক্ষে নিজ অবস্থানের কথা তিনি জানান। কিন্তু এ নিয়ে কোনো যুদ্ধে জড়ানোর আশঙ্কা তিনি নাকচ করে দেন। ইতোমধ্যে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে খোলা ভাষায় পরিষ্কার করে বলছিলেন, চীনের সাথে কোনো যুদ্ধের ব্যাপারে তিনি আগ্রহী নন; বরং দুতের্তে ক্ষমতা নেয়ার পর মাছ ধরার ইস্যু নিয়ে চীনের সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিল। এগুলো সবই ‘ওবামাসহ সবাইকে গালাগালির প্রসঙ্গ’ হাজির হওয়ার আগেকার ঘটনা। তাই গালাগালির প্রসঙ্গ এবার চীন-ফিলিপাইন সম্পর্ক, আমেরিকার এশিয়া নীতি, আমেরিকা-ফিলিপাইন সামরিক সম্পর্ক ইত্যাদি সব কিছুকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আসিয়ানের লাওস সম্মেলন ছিল গত ৬ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। ওখান থেকে দেশে ফিরে দুতের্তে খুব দ্রুত আমেরিকার সাথে পুরনো সম্পর্ক প্রায় ছিঁড়ে ফেলা আর বিপরীতে চীনের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক করার উদ্যোগ নিতে থাকেন।

আমেরিকা বা ওবামার সাথে শুধু সম্পর্ক ছিন্ন নয়, বরং আমেরিকার সাথে নতুন বিরোধে জড়াতে গত ১৯ অক্টোবর ফিলিপিনো প্রেসিডেন্ট দুতের্তে নিজেই চীন সফরে যান। শুধু তাই নয়, ২০ অক্টোবর রয়টার্স জানাচ্ছে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তাকে আমরা ‘দুই ভাই’ বলে বরণ করে নিয়েছেন। রয়টার্সের রিপোর্টের শিরোনামই হল, ‘Brothers’ Xi and Duterte cement new-found friendship।  দুতের্তে সেখানে ঘোষণা করেছেন, পুরনো বন্ধু আমেরিকা বাই বাই, দক্ষিণ চীন সাগরে আমেরিকার সাথে যৌথ টহল বাতিল, আর এখন থেকে রাশিয়া ও চীন থেকে অস্ত্র কিনবেন তিনি ইত্যাদি। তিনি আরো পরিষ্কার করে বলেছেন, ফিলিপাইন নিজেকে ঢেলে সাজিয়েছে। ফলে এখন ফিলিপাইন, চীন আর রাশিয়া এই হলো তাদের নতুন কৌশলগত অ্যালাইনমেন্ট ইত্যাদি। অর্থাৎ পুরো উল্টো দিকে বেয়ে চলছেন তিনি। তবে এটা সত্যি যে, দুতের্তের ভাষ্যে অনেক রেঠরিক বা বাকচাতুরির প্রপাগান্ডা শব্দ মেশানো আছে। তাই আমরা দুতের্তের নীতিকে ঠাণ্ডা মাথায় বুঝতে তার বদলে তাঁর অর্থনৈতিক উপদেষ্টার মন্তব্য শুনব। চীন সফর শুরু হওয়ার পর তিনি এক বিবৃতি দিয়ে ব্যাখ্যা করে বলছেন, ‘এশিয়ান অর্থনৈতিক সমন্বয়ের বিষয়টি অনেক দিন ধরেই ছিল, আপডেট করা হয়নি আমরা সেগুলোতে মনোযোগ দিয়েছি; এর মানে আমরা পশ্চিম থেকে পিঠ ফিরিয়ে নিচ্ছে ঠিক তা নয়।’ …(his top economic policymakers released a statement saying that, while Asian economic integration was “long overdue”, that did not mean the Philippines was turning its back on the West.)

অপর দিকে ফিলিপিনো অর্থসচিব কার্লোস ডোমিঙ্গোজ এবং অর্থপরিকল্পনা সচিব আর্নেস্তো পারনিয়া এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আমরা পশ্চিমের সাথে সম্পর্ক আগের মতোই বজায় রাখব। কিন্তু আমরা প্রতিবেশীর সাথে গভীর সম্পর্কের সমন্বয় কামনা করছি। আমরা আমাদের অঞ্চলের প্রতিবেশীদের সাথে একই কালচার শেয়ার করি আর তাদের ভালো বুঝতে পারি।’ (“We will maintain relations with the West but we desire stronger integration with our neighbors,” said Finance Secretary Carlos Dominguez and Economic Planning Secretary Ernesto Pernia in a joint statement. “We share the culture and a better understanding with our region.”)

উপরে তিন সচিবের দুই বিবৃতি প্রথমত, এটা প্রেসিডেন্ট দুতের্তের গরম ভাষ্যগুলোর থিতু ভার্সন। তবে এটা আমেরিকার সাথে একেবারে সম্পর্ক ছিন্ন নয় অবশ্যই। কিন্তু এটা ফিলিপাইনের সত্যি সত্যিই, আমেরিকার কৌশলগত বলয় থেকে দূরে চলে যাওয়া নির্দেশ করে। ওদিকে এ বিষয়ে আমেরিকান স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভাষ্য ছিল, ফিলিপাইন আমাদের এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি। তবে আগামী সপ্তাহে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে আমেরিকার সেক্রেটারি ডেনিয়েল রাসেল ফিলিপাইন সফর করে নতুন ব্যাপারগুলোর ব্যাখ্যা চাইবেন।

এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে, আমেরিকা-ফিলিপাইনের সম্পর্কের শুরু সেই ষাটের দশকে সশস্ত্র কমিউনিস্ট গেরিলা বিপ্লব ঠেকাতে সরাসরি সামরিক উপস্থিতি দিয়ে সহযোগিতা করা থেকে এখনো ফিলিপাইনে আমেরিকান সামরিক উপস্থিতি আছে। সামরিক বাজেট খরচের অনেক কিছুই এখনো আমেরিকা শেয়ার করে। ফলে আমেরিকাকে ছাড়তে গেলে বহু কিছু এখন ঢেলে সাজাতে হবে। যদিও দুতের্তে প্রকাশ্য ঘোষণায় বলা শুরু করেছেন, তিনি দীর্ঘ সময় প্রেসিডেন্ট থাকলে ফিলিপাইনের সাথে আমেরিকার সামরিক ‘ডিফেন্স ডিল’-এর কথা আমেরিকাকে ভুলে যেতে হবে।

তাহলে মূল বিষয় চীন-ফিলিপাইন সমুদ্রসীমা বিতর্ক বা দক্ষিণ চীন সাগর বিতর্ক- নতুন পরিস্থিতিতে এখন কী হবে? দুতের্তে জানাচ্ছেন, সমুদ্রসীমা বিতর্ককে আপাতত তিনি পেছনের বেঞ্চে ফেলে রাখতে চান। বিশেষত যত দিন চীনের সাথে বর্তমানে শুরু করা আলোচনা একটা নির্দিষ্ট আকার না নেয়। অথবা এরপর চীনারা নিজে এ বিষয়ে কথা বলতে আগ্রহী না হওয়া পর্যন্ত। (Duterte on Wednesday said the South China Sea arbitration case would “take the back seat” during talks, and that he would wait for the Chinese to bring up the issue rather than doing so himself.)

আর চীনা বিদেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট শি-এর বরাতে তারা বলেছেন, যেসব বিতর্ক তাৎক্ষণিক সমাধান করা যাচ্ছে না, সেগুলো আপাতত সরিয়ে রাখা হবে। দুতের্তে জানাচ্ছেন এসবের অর্থ, তিনি “জাতিসঙ্ঘের হেগ ট্রাইব্যুনালে ফিলিপাইনের পক্ষে পাওয়া রায়কে ত্যাগ করছেন বা ছুড়ে ফেলে দিচ্ছেন না, অথবা ফিলিপাইনের সার্বভৌমত্ব কোথাও চীনের কাছে বন্ধকও রাখছেন না।’ আর চীন এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় বলছে, ‘তারা দুতের্তের এই সেন্টিমেন্টকে সমর্থন করেন”। (China has welcomed the Philippines approaches, even as Duterte has vowed not to surrender any sovereignty to Beijing, which views the South China Sea Hague ruling as null and void.)
তাহলে মাছ ধরার ব্যাপারটা কী হবে? গত ২০১২ সালে ‘স্কারবোর্গ শোল’ নামে দ্বীপ থেকে ফিলিপিনো জেলেদেরকে চীন বের করে দিয়ে দখল নিয়েছিল। চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী লি এই শোল দ্বীপের বিষয়ে বা জেলেদের মাছ ধরার অধিকার বিষয়ে কিছু উল্লেখ না করে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন- আমরা উভয় দেশ কোস্টগার্ড ও জেলেদের বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতা করতে একমত হয়েছি। আর আমেরিকান সিএনএন দাবি করছে দুতের্তে বলেছেন, ‘মাছ ধরার বিষয়টি আমি চীনাদের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।’

হেগ ট্রাইব্যুনালের রায় নিয়ে আমার আলাদা বিস্তারে লেখার পরিকল্পনা আছে। তবে আপাতত একটা সারসংক্ষেপ করে বলা যায়, দক্ষিণ চীন সাগর সীমানা বিতর্ককে উসকে দিয়ে আমেরিকা তার এশিয়া পলিসি সাজিয়েছিল, যেখানে আমেরিকা নিজের ভূমিকা কেন্দ্রীয় বা পিভটাল বলে মনে করে। কিন্তু এটা এখন পরিষ্কার যে, আমেরিকার এশিয়া নীতি এই প্রথম মারাত্মক ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে গেল। ফিলিপাইনের আমেরিকাকে ত্যাগ করা এটা আমেরিকার জন্য মারাত্মক থাপ্পড় খাওয়া। বিশেষ করে ফিলিপাইনের পথ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাকি সব রাষ্ট্রের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে – সেদিক থেকে দেখলে। কারণ আমেরিকান এশিয়া নীতি ঘোষণা করার আগে এদের সবার অবস্থান ছিল তারা কেউ কোনো সামরিক বিবাদে জড়াতে চায় না; বরং সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে চীনের সাথে যুক্ত থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও উৎপাদনে উন্নতি করতে চায়।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই দ্বিতীয় পর্ব আগে দৈনিক নয়াদিগন্তে ৩০ অক্টোবর ২০১৬ (প্রিন্টের পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। আজ এখন সেটা আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল। ]

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -১

ফিলিপিনো চ্যালেঞ্জের মুখে আমেরিকার এশিয়া নীতি -১

গৌতম দাস
০২ নভেম্বর ২০১৬, বুধবার

http://wp.me/p1sCvy-1Vh

কোল্ড ওয়ারের শুরুর দিকের পটভুমিতে একাত্তর বছর আগে জন্ম নেয়া এক সম্পর্ক হল ফিলিপাইন-আমেরিকার সম্পর্ক। সম্পর্কের এমন ঘনিষ্ঠতার পিছনে একটা বড় কারণ ছিল সেকালের ফিলিপাইনে সশস্ত্র কমিউনিস্ট আন্দোলনকে মোকাবিলা। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত সেই থেকে ফিলিপাইনে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি স্থাপনা পর্যন্ত গড়ায়। সেই থেকে একাল পর্যন্ত আমেরিকা ফিলিপাইনের এক নম্বর বন্ধু হিসাবেই ছিল। ছিল বলছি এজন্য যে এই সম্পর্কে ভাল রকমের চির ধরেছে। ফিলিপিনো সদ্য নির্বাচিত বর্তমান প্রেসিডেন্ট হলেন রডরিগো দুতের্তে। সর্বশেষ গত ২০ অক্টোবর ২০১৬, তিনি চীন সফরে গিয়ে আমেরিকাকে প্রকাশ্যে “বাই বাই” বলেছেন। না এটা ভাবা ভুল হবে যে তিনি নিজ ভাষায় না ইংরাজিতে বলেছেন ফলে কোন ভাষান্তর সমস্যা হয়েছে কিনা। কারণ তিনি জানিয়েছেন তিনি নিজ মাতৃভাষার চেয়ে ইংরাজিতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। সেকথার সাথে নিচের ইংরাজি উদ্ধৃতি দেখুন।

Duterte did not hesitate to say that America, which is part of the New World Order, “has lost now. I’ve realigned myself in your ideological flow [China], and maybe I will also go to Russia to talk to Putin and tell him that there are three of us against the world—China, the Philippines, and Russia. It’s the only way.”

Keep in mind that Duterte is not against the West’s achievement in science, medicine, and even in language. Duterte admitted to a reporter that “I am more articulate in English than in my own dialect.”

তো দীর্ঘ এত পুরানা বন্ধু হঠাত উলটা বইতেছেন কেন তা এখানে জানব। ফিলিপাইন সম্পর্কে বিশেষ করে ওর আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক গঠন ইত্যাদি সম্পর্কে আমাদের দেশে খুব বেশী জানাশুনা নাই। তাই প্রেসিডেন্ট দুতের্তের চিন্তা বা কর্মসুচীর মুল ফিচারগুলো কী তা বলবার উছিলায় আগে ফিলিপিনো রাজনীতি জনগণ সম্পর্কে পটভুমির দিক থেকে কিছু বলে নিব। তাই লেখাটার দুই অংশ। দ্বিতীয় অংশ আলাদা পোষ্ট হিসাবে আসবে। সেখানে আমেরিকার সঙ্গে ফিলিপাইনের সম্পর্কের অবনতির বিস্তারিত দিকটা জানা যাবে।

প্রথম ভাগঃ ক্রসফায়ার : বাংলাদেশ ও ফিলিপাইন
ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট রডরিগো দুতের্তে। নির্বাচনে জিতে চলতি বছর, ২০১৬ সালের জুন থেকে প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আর এর আগে ছিলেন দক্ষিণ ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের সবচেয়ে অগ্রসর শহর ডাভাও এর মেয়র। দুতের্তের নিজ ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি রাজনৈতিক ফ্যামিলির সন্তান। বাবা ভিনসেন্ট গনজালেস দুতের্তে ছিলেন ফিলিপাইনের ডাভাও প্রদেশের গভর্নর এবং সিনেটর।  নিজে আইনে গ্র্যাজুয়েট, আইনজীবী ও প্রাক্তন সরকারি প্রসিকিউটর। প্রেসিডেন্ট হয়ে ক্ষমতায় আসার পর তিনি এক কঠিন কর্মসূচি নিয়েছেন। ফিলিপাইনে ড্রাগ ব্যবসার দাপট আর ড্রাগ এডিক্টেট মানুষ ও পরিবারের সংখ্যা দুইই  সামাজিক রাজনৈতিক সমস্যার এক বিরাট ইস্যু। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে প্রেসিডেন্ট দুতের্তে বলছিলেন, পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠাতে হবে এমন ড্রাগগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। এও সংখ্যা তার আমলসহ ধরে।  ড্রাগের সাথে সম্পর্কিত সমস্যা ও অপরাধের ব্যাপকতা বা সংখ্যা – এটাই দুতের্তের বিচার-বহির্ভুত হত্যা করে অপরাধীদের মেরে ফেলার পক্ষে একমাত্র যুক্তি। (যারা আরও ডিটেল চান তাদের জন্য। এমন পাঠকেরা এবিষয়ে তাঁর পয়েন্টগুলো ডিটেইল শুনতে আগ্রহী হলে গত ১৫ অক্টোবর আলজাজিরা টিভির নেয়া দুপর্বের সাক্ষাতকার ইউটিউবে দেখুন।) দুতের্তের আমলের মাত্র প্রায় তিন মাস – এর মধ্যেই প্রায় সাড়ে তিন হাজার লোক বিচার বহির্ভুতভাবে নহত হয়েছেন।  তবে অন্য যে কোন কারও চেয়ে দুতের্তে স্পষ্ট করে বলেন, “আমি যদি এখন সবল হস্তক্ষেপ না করি আমাদের পরবর্তি প্রজন্মের ভবিষ্যত শুন্য হয়ে যাবে। অতএব এই ক্রিমিনাল এরা আমার বৈধ টার্গেট  আমি তাদের হত্যা করব”।  বুঝা যাচ্ছে আইনী দিক থেকে ব্যাপারটা অ-অনুমোদনের সন্দেহ নাই। কিন্তু এধরণের মরিয়া কথা থেকে  ফিলিপিনো সমাজে ড্রাগের ভয়াবহতার রূপ প্রকাশ পায় হয়ত। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট দুতের্তের পক্ষে জনমতের সমর্থন নিয়ে এক জরিপে দেখা গেছে তাঁর রেটিং ৭৬ ভাগ। অর্থাৎ সেই পুরানা কথা যা পপুলার তা আইন সম্মত বা সমর্থিত নাও হতে পারে।

আমাদের দেশে ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল ওয়্যার অন টেরর কর্মসূচিতে প্রেসিডেন্ট বুশের আমেরিকার দেয়া ফর্দ ও টার্গেটের বাধ্যবাধকতা পূরণ ও পালন। যদিও স্থানীয়ভাবে সে কথা মানুষকে বলার নয় বলে সেকথা আড়ালেই থেকে গেছে। অপর দিকে ফেলে যাওয়া এর আগের মানে হাসিনার প্রথম আওয়ামী সরকারের (১৯৯৬) আমলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মানুষজন অতিষ্ঠ ছিল। ফলে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে র‌্যাবের হাতেই বিচার বহির্ভুত হত্যার সংস্কৃতি বা ‘ক্রসফায়ার’ ফেনোমেনা শুরু হয়েছিল। এতে র‌্যাব বিশাল জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যেন ত্রাতা। যেন ক্রসফায়ার করার জন্যই র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল, এমন আড়ালও এসে যায় এতে। ক্ষমতায় আসার পর দুতের্তেও এমন জনপ্রিয় একটি কর্মসূচি নেন, যে ড্রাগ ডিলার বা ব্যবসায়ী অথবা ড্রাগ সংশ্লিষ্ট অপরাধে জড়িত যে কেউ, এদের দেখামাত্র গ্রেফতার ও গুলি। যার আনুষ্ঠানিক আর আইনি আড়াল দেয়ার নাম ক্রসফায়ার, তা চালু করেন। তবে একটু সংশোধন দরকার। এর আগে থেকেই দুতের্তে আসলে বিখ্যাত হয়ে এসেছেন ড্রাগ অপরাধীদের ক্রসফায়ার করেই। ফলে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর নতুন না, বরং মেয়র থাকার সময় এটাই ছিল প্রথম  তাঁর মুখ্য কাজ ও পরিচিতি। দুতের্তে ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন এ বছর, ২০১৬ সালের ৩০ জুন। এরপর প্রথম দুই মাসেই এমন মৃত্যুর সংখ্যা হয় ২৪০০-এর বেশি, এটা সরকার-ঘোষিত সংখ্যা। অর্থাৎ গড়ে বিরতিহীনভাবে প্রতিদিন নিয়মিত ৪০ জন করে হত্যা করা হয়েছে। (উপরে বলা আলজাজিরাকে দেয়া ঐ সাক্ষাতকারে আপডেটেড সংখ্যা সাড়ে তিন হাজার বলে প্রথম স্বীকৃত হয়)
ক্রসফায়ার, সোজা কথায় এটা হল খুন করে মেরে ফেলার পর যে শব্দ দিয়ে খুনটা আড়াল করা হয়। মানবাধিকার ও আইনের চোখে এ ধরনের ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে। সমাজে কোনো অপরাধের বিচারের দায়িত্ব দুনিয়ার কোনো রাষ্ট্র পুলিশকে দেয় না। অপরাধের বিচারের দায়দায়িত্ব বিচার বিভাগের, মানে একমাত্র আদালতের। আর সেখানে ঐ আদালতে পুলিশের কাজ হল যাকে পুলিশের অপরাধী মনে হবে, সন্দেহ হবে, তাকে আদালতের সামনে হাজির করে, অভিযোগ এনে তা প্রমাণের চেষ্টা করতে পারে তাঁরা। এতটুকুই। সে অপরাধী কি না সে সিদ্ধান্ত দেয়ার এখতিয়ার পুলিশের নেই। এই এখতিয়ার একমাত্র আদালতের এবং আদালতও সে রায় দিতে পারেন একমাত্র বিচার-আচার মূল্যায়ন পরীক্ষার সবশেষে। কিন্তু এসবের পাল্টা ক্রসফায়ারকারী পুলিশ বা সরকারের পাল্টা বক্তব্য হল – এমন বিচার-আচারের পথ, এটা অনেক লম্বা সময়ের ব্যাপার, আসামি জামিন নিয়ে বের হয়ে যায় ইত্যাদি। তবে একথাও তো সত্য যে আবার অনেক সময় জেনুইন অপরাধ আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে, উপযুক্ত প্রমাণ ও আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য প্রমাণের অভাবে। এ দিকে সমাজে অপরাধী বেড়েই চলে। অতএব আমরা নিজেরাই কাউকে অপরাধী বলে শনাক্ত করি ও সিদ্ধান্ত নেই। তাকে শাস্তি হিসেবে মেরে ফেলি। আর আইনের চোখে বিষয়টিকে ন্যায্যতা দিতে ক্রসফায়ারের গল্প বানিয়ে এভাবে বলি যে, আমার হেফাজতের আসামিই আমাকে আক্রমণ করাতে আত্মরক্ষার্থে তাকে গুলি করে মেরেছি।ীসব পালটা যুক্তির পরও দেশি বা আন্তর্জাতিক আইন এমন হত্যার পক্ষে কোনভাবেই সমর্থন দেয় না।  আর সবচেয়ে বড় কথা হল, ক্রসফায়ারের বিচারবহির্ভূত দিক ছাড়াও আরো বড় এক অপরাধ হল, সরকার যাকে তাকে এই পদ্ধতিতে মেরে ফেলতে পারে। তাকে ‘জঙ্গি’ বা ‘ড্রাগ ডিলার’ অথবা যেকোন কিছু বলে সাজিয়ে। সরকারের অপছন্দ, রাজনৈতিক বিরোধী, প্রতিদ্বন্দ্বী যে কাউকে মেরে সরিয়ে দেয়া সহজ হয়ে যায়। মূল ত্রুটি বা সমালোচনার কথা হল, নিহত ব্যক্তি  যে কথিত অপরাধেই অপরাধী ছিল তা তো কোন আদালতের মত প্রক্রিয়া পদ্ধতিতে ইন্ডিপেন্ডেন্ট ভাবে পরীক্ষা করা হয় নাই। এটাই সরকারের হাতে যাকে তাকে খুন করার লাইসেন্স হিসাবে হাজির হয়।

ফলে স্বভাবতই এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ও অপরাধকে মানবাধিকার ও আইনের চোখে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলা হয়। অর্থাৎ পুলিশের দায়িত্ব হল যেখানে অপরাধীকে কেবল বিচারের আওতায় আনা, বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করা, সেখানে পুলিশই তাকে কোন বিচার ছাড়াই মেরে ফেলেছে। ফলে এখানে বিচার বা শাস্তি প্রক্রিয়া সেটা ব্যাহত হয়েছে বলে এটা বিচারবহির্ভূত এবং তা সাদা এক হত্যাকাণ্ড। যদিও সারা দুনিয়ায় বিভিন্ন দেশে যত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হয়ে থাকে, এর গল্প কিন্তু একই- ক্রসফায়ার। যেমন ভারতে একই অর্থে তবে অন্য প্রচলিত শব্দ হল – এনকাউন্টার। যা হোক শব্দে কিছু যায় আসে না, ঘটনাটা সারমর্মে একই।

বিগত অক্টোবর মাসের ১ তারিখে এক মার্কিন উপসহকারী মন্ত্রী (ডেমোক্র্যাসি, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড লেবার শাখা) রবার্ট বারশিনস্কি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে আলাপকালে ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের অভিজ্ঞতা ও অবস্থান ব্যক্ত করছিলেন। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে ‘ক্রসফায়ার’ বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা উল্টো ফল দিতে পারে।’ এ প্রসঙ্গে তার বক্তব্যের বিস্তার গত ০৪ অক্টোবর প্রথম আলোতে ছাপা হয়েছিল। আমি সেখান থেকে একটু লম্বা অংশ টুকে আনছি। রবার্ট বারশিনস্কি বলেন, “৯/১১-এর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পুলিশ, মানবাধিকার সংস্থা ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কার্যক্রম নিয়ে নানা বিতর্ক হয়ে আসছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজ খুবই বিপজ্জনক। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও দায়িত্বরত অবস্থায় পুলিশ নিহত হয়। কিন্তু তার পরও দোষী ব্যক্তির ক্ষতি করা বা তাকে আঘাত করার বিষয়টি কখনোই মেনে নেয়া হয় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখনই সম্ভব, তখনই দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেফতার বা আটক করা হয়। কারণ, তাহলেই ওই নেটওয়ার্কের সবাইকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়। যেকোনো পরিস্থিতিতে আমাদের অবস্থান হলো, প্রতিটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পুঙ্খানুপুঙ্খ ও স্বচ্ছ তদন্ত হতে হবে”।
তিনি আরও বলেন, “ক্রসফায়ার’ বা ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ কারণ হিসেবে প্রায়ই বিচারব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাকে দায়ী করা হয়। এতে সুবিচার নিশ্চিত করা যায় না, আসামি জামিনে বের হয়ে যান বলে বিভিন্ন যুক্তি দেয়া হয়। এ সম্পর্কে রবার্ট বারশিনস্কির মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। এ দেশের সাক্ষ্য আইন ঔপনিবেশিক আমলের। শুধু স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীর ওপর নির্ভর করায় বিচারপ্রক্রিয়ায় তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। এতে আসামির ওপর নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। তিনি জানান, আইনগুলোর আধুনিকায়নে যুক্তরাষ্ট্র সহযোগিতা দিচ্ছে”। আশা করি পাঠক যা বোঝার বুঝেছেন। আমেরিকান মন্ত্রীর বক্তব্য মিথ্যা নয়। তবে তাঁর বক্তব্য তুলে আনায় তাঁকে ও আমেরিকাকে কোন ‘ন্যায়ের আদর্শ প্রতীক’ বলে ধারণা করা ভুল হবে। আর নেপথ্যে বলে রাখি, আমেরিকার এত সাধু সাজার সুযোগ নেই। কারণ র‌্যাব তাদের সরাসরি পরামর্শে আর তাদের আসামিকে বাংলাদেশে এনে টর্চার করে স্বীকারোক্তি বের করার জন্যই গঠন করা হয়েছিল। কারণ তাদের দেশে রেখে টর্চার করলে তা সংশ্লিষ্ট ওই অফিসারের জন্য বেআইনি ও ব্যক্তিগত অপরাধ বলে গণ্য হবে। আমেরিকান পরিভাষায় এটাকে রেনডিশন বলে। ওবামা রেনডিশন করার প্রশাসনিক অভ্যাস তুলে দেয়ার প্রতিজ্ঞা করে ক্ষমতায় এসেছিলেন, কিন্তু রাখতে পারেননি।
তবে আরেক বাস্তবতা হল, উপরে বাংলাদেশের ক্রসফায়ার প্রসঙ্গে আমেরিকান বক্তব্য সঠিক। আবার সরকারের মানবাধিকারের লঙ্ঘনের কথা তুলে এমন বক্তব্যের ভেতর দিয়ে আমেরিকা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর একটা যেন অথরিটি হিসেবে হাজির হওয়ার সুযোগ নেয়। এটাও আরেক সত্যি। আর তা নেয়ার সুযোগ থাকে এ জন্য যে, জাতিসঙ্ঘের হিউম্যান রাইটস তদারকির প্রতিষ্ঠানকে আমেরিকা প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।
ফলে হিউম্যান রাইটস ইস্যুটি দু’ধারী তলোয়ারের মতো আমেরিকার হাতে অস্ত্র হিসেবে হাজিরও হয়। এক দিকে আমাদের সরকারগুলো ক্রসফায়ার করার দোষে দোষী। ফলে আমেরিকা সে অভিযোগ সঠিকভাবে তুলে আনে ঠিকই। আবার সেটা তুলে বাংলাদেশের ওপর নিজের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ নিতে একে ব্যবহার করে এ কথাও সত্যি।

প্রেসিডেন্ট দুতের্তের ক্ষেত্রে তার ড্রাগ-ডিলারের হত্যার বেলায় একই ঘটনা ঘটেছিল। প্রেসিডেন্ট ওবামা এ প্রসঙ্গে তার সাথে দেখা করে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও তার উদ্বিগ্নতা ইত্যাদি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। এর আগে দীর্ঘ দিন ধরেই ম্যানিলার ক্যাথলিক চার্চ, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সংগঠন ও অন্যান্য দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো আপত্তি তুলেছিল। কিন্তু সেগুলোকে দুতের্তে সবলে উড়িয়ে দিতে আর উপেক্ষা করতে পেরেছিলেন। দুতের্তের সাথে প্রেসিডেন্ট ওবামার সাক্ষাতের কথা ছিল গত ৫ সেপ্টেম্বর, লাওসের ভিয়েনতিয়েনে আসিয়ান জোটের সভায় দুই প্রেসিডেন্টের সম্ভাব্য অংশগ্রহণের সময়ে, সাইডলাইনে বসে। কিন্তু ওবামার সাথে কথিত সেই সাক্ষাতের আগেই দুতের্তে এক কাণ্ড করে বসেন। লাওস রওনা দেয়ার আগেই তিনি সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে সেই কান্ড করেন। এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন যে, “ওবামা কি তাঁকে বিচারবহির্ভূত ড্রাগ-ডিলার হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলবেন না”- এ প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তিনি রাগে ফেটে পড়েন। সম্ভবত দুতের্তে ওবামার সাথের ওই সাক্ষাৎ এড়াতে চেয়েছিলেন তাই ওই রকম জবাব। তিনি অকথ্য ও অশ্লীল ভাষায় ওবামার মাকে বেশ্যা বলে গালি দিয়ে কথা বলেছিলেন; যেটা স্বভাবতই কোনো প্রেসিডেন্টের পদমর্যাদার সাথে মানানসই নয়। তবে কোন প্রেসিডেন্ট অবশ্যই ক্ষুব্ধ হতে পারেন। এমনকি সে ক্ষেত্রে যদি “তিনি ক্ষুব্ধ” একথাটাই মুখে বা আচরণে এতটুকুই প্রকাশ করেন- এটাই তার উদ্দেশ্য পূরণের জন্য যথেষ্ট হত। কিন্তু তিনি বলেন, “তার (ওবামার) সম্মান বজায় রেখে কথা বলা উচিত। আমার ওপর যেন যা মনে চায় প্রশ্ন আর স্টেটমেন্ট ছুড়ে না দেয়। এমন হলে, বেশ্যার ছেলে, ওই ফোরামে আমি তাকে ছিঁড়ে ফেলব। উনি যদি তা করেন তবে আমরা তাকে শুয়োরকে যেমন করে কাদায় পুঁতে তেমন করে পুঁতে ফেলব”।

আচ্ছা, দুতের্তে কি হঠাৎ এমন কথা বলছেন; নাকি তিনি এমনই? তা বুঝতে পেছনের কিছু তথ্য দেখা যাক। এর আগে তিনি ফিলিপাইনের মিন্দানাও দ্বীপের দাভাও শহরের মেয়র ছিলেন। ড্রাগের সমস্যা আর খুনোখুনি সেখানে লাগাতার ছিল। সেখানেও তিনি ড্রাগ ডিলারদের সম্পর্কে বলতেন তারা “আরো মরবে। অনেকে মরবে। যতক্ষণ না শেষ মাদকপাচারকারীকে বের করা সম্ভব হবে, ততক্ষণ আমরা কাজ চালিয়ে যাবো”। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের সেকালের রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, তিনি বলছিলেন, ‘যদি আমার সিটিতে আপনি অবৈধ কাজ করেন, যদি আপনি ক্রিমিনাল হন, কোনো সিন্ডিকেটের অংশ হন, যারা শহরের নিরীহ লোকদের শিকার বানায়, তবে যতক্ষণ আমি মেয়র আছি ততক্ষণ আপনি আমার হত্যার বৈধ টার্গেট।’ এটা ২০০৯ সালে মেয়র হিসেবে তার বয়ান। শেষ বাক্যটি মারাত্মক আপত্তিকর। এখানে আইনি লুকোছাপা তিনি রাখেননি। একেবারে প্রকাশ্যে স্পষ্ট ভাষায় সরাসরি হত্যা করার কথা বলছেন। এই বাক্যটাই তার অভিযুক্ত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। ওদিকে প্রায় একই ভাষায়, একই কারণে ইইউকে এবং জাতিসঙ্ঘকেও তিনি গালাগালি করেন।
স্বভাবতই দুতের্তের খারাপ গালাগালির পরে ওবামা সেই সাক্ষাৎ বাতিল করেন। কিন্তু পরের দিন পরিস্থিতি রিভিউ করার পর (খুব সম্ভবত তার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও পরামর্শকদের কারণে) দুতের্তে সাংবাদিকদের মাধ্যমে ওবামাকে স্যরি বলে ক্ষমা চেয়ে নেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হল, প্রায় ৭০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফিলিপাইনের সাথে নিরবচ্ছিন্ন কৌশলগত মিত্র ছিল আমেরিকা। ফিলিপাইন-আমেরিকান সেই সম্পর্ক এখন খারাপ থেকে চরম খারাপ হয়ে এখন প্রায় পুরো বিচ্ছিন্ন হওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা দুই আলাদা দিনে দুই অংশ ছাপা হয়েছিল দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় – ২৩ অক্টোবর ২০১৬ প্রথম বা চলতি পর্ব অনলাইনে (প্রিন্টে ২৪ অক্টোবর)। এখানে সেই লেখা পর পর দুই পোষ্ট আকারে আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে ছাপা হল। এটা প্রথম পর্ব।] পরের পর্ব আগামিকাল পরশুর মধ্যে।

নির্বাচনী সুবিধা নিবার স্বার্থে মোদীর কথিত অপারেশন

 নির্বাচনী সুবিধা নিবার স্বার্থে মোদীর কথিত অপারেশন

গৌতম দাস
০৪ অক্টোবর ২০১৬, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-1RL

গত সপ্তাহে লিখেছিলাম মোদি যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে গত ২৪ সেপ্টেম্বর কেরালার কোঝিকোড়ে শহরে জনসভায় জানিয়েছেন যে তিনি সামরিক যুদ্ধ বা যুদ্ধের কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা প্রতিযোগিতা করতে চান না। বরং কোন দেশ কত বেশি উন্নয়ন করতে পারে, এর প্রতিযোগিতা করতে চান। ফলে সেই প্রতিযোগিতার আহ্বান জানাতে জনসভা থেকে তিনি পাকিস্তানের জনগণের উদ্দেশ্য করে নাম ধরে বক্তব্য রেখেছিলেন। অর্থাৎ যুদ্ধ বিষয়ে যেন তা লেগেই যাচ্ছে এইভাবে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে গরম কথা বলে মোদি নিজ জনগণকে আগে তাতিয়েছিলেন, শেষে কোঝিকোড়ে শহরের বক্তৃতায় সব উত্তেজনায় নিজেই ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়েছিলেন। স্পষ্ট করে বলেছিলেন যুদ্ধ নয়, তিনি উন্নয়ন চান। আর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ ছাড়া অন্য কোনো কিছুর দিকে তিনি যাবেন না। ‘কূটনৈতিক ব্যবস্থা’ কথার অর্থ কী, সেটাও তিনি স্পষ্ট করেছিলেন। বলেছিলেন, পাকিস্তানকে তিনি ‘টেরোরিজমের’ অভিযোগে বড় প্রভাবশালী বা ছোট রাষ্ট্রগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন এবং আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে প্রচার চালিয়ে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন করবেন। এখন আমরা দেখছি “সার্জিক্যাল অপারেশনএর” নামে আবার এক বুঝরুকি। মোদীর প্রপাগান্ডার লড়াই, যা এখন উভয় পক্ষের দিক থেকেই প্রপাগান্ডার লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়েছে।  অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, তাহলে মোদী সবশেষে কোন সিরিয়াস যুদ্ধের দিকে যদি না-ই যাবেন, তিনি তা হলে গরম কথায় যুদ্ধের মত হুমকি দিয়েছিলেন কেন?
আমাদের ভুললে চলবে না, মূল ইস্যু ছিল ভারত অধিকৃত কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন। যেটা এখন প্রায় ৮০ দিনের বেশি টানা কারফিউ এর সত্ত্বেও চলছে। ওদিকে কাশ্মিরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। ইসলামি ঐক্য সংস্থা গত মাসে ২১ আগষ্ট ২০১৬ শক্ত ভাষায় ভারতের সমালোচনা করেছিলেন । (OIC Secretary General Iyad Ameen Madani Monday expressed concern over the situation in Kashmir and called for an immediate cessation of atrocities by India, urging the Indian government for peaceful settlement of the dispute ‘in accordance with wishes of Kashmiri people and the UNSC resolutions’.।) বিগত ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের নেয়া এক প্রস্তাব হল কাশ্মীরবাসী ভারতে থাকতে চায় কি না তা জানতে গণভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। ওআইসি সেই প্রস্তাব বাস্তবায়নের দাবি জানায়েছিল।  ওআইসি কাশ্মীরের প্রতিরোধ লড়াইকে তাদের “আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের জন্য লড়াই” মনে করে, তাও জানিয়েছিলেন। কাশ্মীরের নিরস্ত্র গ-আন্দোলনের ধারার রাজনৈতিক দল হুরিয়াত কনফারেন্স। ওআইসির বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়ে তাদের বিবৃতির ভাষা ছিল আরও কড়া। তারা তুরস্ক সরকারের ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং মিশন পাঠাবার সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছিল।  ওদিকে এ বিষয়ে জাতিসংঘে ভারত ও পাকিস্তানের পাল্টাপাল্টি পরস্পরের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কারণে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস সংগঠন হিউম্যান রাইট কাউন্সিল  দুই রাষ্ট্রের দুই কাশ্মির অংশেই সরেজমিন গিয়ে তদন্ত ও প্রত্যক্ষ দেখে যাচাই করে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পাকিস্তান ও ভারত উভয় সরকারের কাছে পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত জানিয়ে অনুমতি চেয়েছিল। জবাবে পাকিস্তান তৎক্ষণাৎ রাজি বলে জানালেও ভারত এখনো এ বিষয়ে কিছু জানায়নি। ওদিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা রিপোর্ট এবং তা মিডিয়ায় আসা শুরু করেছিল এই বলে যে, ক্রসফায়ারের নামে গ্রাম ঘিরে তরুণ নেতা বুরহান ওয়ানিকে খুঁজে বের করে হত্যা করলে যে জনগণ কার্ফু ভেঙ্গে দাঁড়িয়ে যাবে – এ’সম্পর্কে ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী কিছুই আগাম জানাতে পারে নাই। এখানেই এবং এ’ঘটনা থেকেই ভারতের কাশ্মিরে কেন্দ্রীয় সরকারের এক মারাত্মক গোয়েন্দা ব্যর্থতা ঘটেছে। এই ব্যর্থতার কারণেই কাশ্মিরের বহু জেলা শহর এখন প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে। নিয়মিত আনন্দবাজারের মতো পত্রিকা মোদি সরকারের কাছে এসব বিপদের দিক তুলে ধরেছিল। আর প্রতিদিন ভারতের অভ্যন্তরীণ ও বিদেশী মিডিয়া এই ব্যর্থতা নিয়ে সোচ্চার হচ্ছিল। ফলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হয়ে ওঠার আগে জনগণের দৃষ্টিকে ও মিডিয়াকে কাশ্মির থেকে সরানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করেছিলেন মোদি। তাই ভারতের সীমান্ত শহর উরির ব্যারাকে হামলায় ১৮ সেনা হত্যা – তা সে যেই ঘটাক, একে ইস্যু করে মোদি দৃষ্টি সরানোর কাজ করতে সফল হন। মিডিয়া ও জনগণ থেকে কাশ্মিরের গণ-আন্দোলন বা লাগাতর কারফিউ কিংবা মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটনার উল্লেখ এতে হাওয়া হয়ে যায়। নতুন প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে ‘ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধ আসন্ন কি না’, আর ‘পাকিস্তান থেকে আসা কথিত জঙ্গি’ এসব হয়ে যায় মিডিয়ার মূল প্রসঙ্গ। এগুলোই যেনবা সব সমস্যার কারণ। এই দৃষ্টি ঘুরাতেই মরিয়া হয়ে যুদ্ধের হুমকির গরম বক্তৃতার আশ্রয় নিতে হয়েছিল মোদিকে।
কিন্তু তাতে ব্যাপারটা হয়ে দাঁড়ায়  – ম্যালেরিয়া হওয়াতে রোগীকে কুইনাইন খাওয়ানো হয়েছিল। কিন্তু এখন কুইনাইনের প্রভাব প্রতিক্রিয়া শরীরে ছেয়ে মারাত্মক হয়ে গেছে, ফলে তা কমানো হবে কী দিয়ে? নিজেরই বাজানো ও ঝড় তোলা যুদ্ধের দামামা এখন কমাবে কী দিয়ে? অবস্থা দেখে খোদ বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরাই নাখোশ, হতাশ হয়ে পড়েছিল। সব দিক বিবেচনা শেষে গত ২৪ সেপ্টেম্বরে নেতাকর্মীদের হতাশার মধ্যেই সবার আগে পাবলিক বক্তৃতায় ‘যুদ্ধ নয়, উন্নয়ন চাই’ আর ‘কেবল কূটনীতি হবে চরম পদক্ষেপ’ বলে নিজের মূল অবস্থান পরিষ্কার ও প্রচার করে নেন মোদী।

আর এর সাথে পরদিন তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ মোদি নিয়েছিলেন। এক হল, সর্বদলীয় মানে সংসদের সব দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে ডাকা সভা থেকে নিজের ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে উপস্থিত সবার সমর্থন নিয়ে নেন তিনি। দুই. তিনি সব মিডিয়ার কাছে ওই নীতির পক্ষে সমর্থন চান। স্বভাবতই তা অন্তরালে। এটি এক কমন ফেনোমেনা এবং চর্চা যে ভারতের জাতীয় ইস্যুতে বিশেষ করে ভারত-পাকিস্তান বিরোধ ইস্যুতে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো আর সরকারের প্রকাশ্য সমালোচনা বা বিরোধিতা করে না। এবং সেই সাথে সব মিডিয়াও সরকারের গৃহীত সিদ্ধান্তের পক্ষে প্রোপাগান্ডায় মেতে ওঠে। ফলে পরের দিন ২৫ সেপ্টেম্বর কেউ কেউ মোদির বক্তৃতার নেতি রিপোর্ট ও সমালোচনা করলেও ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ভারতীয় মিডিয়া মোদির ‘যুদ্ধ না, উন্নয়ন আর কূটনীতি’ নীতির পক্ষে অবস্থা নিয়ে পরিস্থিতি একযোগে মোদী সরকারের পক্ষে সামলে নিয়ে আসতে শুরু করে। বলা যায়, দুই দিনের মাথায় পরিস্থিতি মোদির পক্ষে ঘুরে যায়। এ কাজে মিডিয়াও আবার সাহায্য নিয়েছিল কয়েকটি ইস্যুর। যেমন এক. আগামী সার্ক সম্মেলনে একসাথে চার সদস্য দেশের যোগদানের অনীহা প্রকাশিত হয়ে পড়ে। চার দেশের যোগ না দিতে অনীহার কারণ আলাদা আলাদা ছিল। কিন্তু তা ভারতের কূটনৈতিক লবির কারণে একসাথে প্রকাশ হওয়াতে ভারতের অভ্যন্তরীণ ভোটার কনস্টিটোয়েন্সির কাছে ব্যাপারটাকে ‘মোদির প্রতিশ্রুতি কাজ করছে’ এটা সাফল্য হিসেবে হাজির করতে সক্ষম হয় ভারতীয় মিডিয়া। এ ছাড়া দ্বিতীয় ইস্যু ছিল, ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত সিন্ধু নদীর পানিবণ্টনের চুক্তি বাতিলের হুমকি। গত ১৯৬০ সালে বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় নদীর পানিবণ্টন বিরোধ মিটিয়ে এই চুক্তিতে উপনীত হতে পেরেছিল এই দুই রাষ্ট্র। আসলে ভারত-পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদী মোট ছয়টি। ওই চুক্তিতে প্রতিটি রাষ্ট্র তিনটি করে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ভাগ করে নেয়, যাতে প্রতি তিন নদীর পানিপ্রবাহের ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব এক এক রাষ্ট্রের। এভাবে ওই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছিল। উভয় পক্ষই এতে এত দিন খুশি ছিল, এখনো পানির পরিমাণ ও ভাগের দিক দিয়ে উভয়ই খুশি। কিন্তু একটি টেকনিক্যাল দিক আছে। তা হল, ওই ছয়টি নদীরই উজানের দেশ হল ভারত। অর্থাৎ ভাটির দেশ হল পাকিস্তান। সোজা কথায় প্রথমে ভারত হয়ে, এরপর ওইসব নদী পাকিস্তানে প্রবেশ করে। ঠিক বাংলাদেশের মত। ফলে নদীর পানিপ্রবাহের নিয়ন্ত্রণ করার ভূ-অবস্থানগত সুবিধাগুলো ভারতের পক্ষে। যদিও আন্তর্জাতিক নদী আইনে নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ভাটির দেশকে প্রাপ্য পানিবঞ্চিত করা সম্পুর্ণ বেআইনি। কিন্তু মোদি ব্যাপারটিকে অন্তত প্রোপাগান্ডায় নেয়ার জন্য ওই চুক্তিকে রিভিউ বা পুনর্মূল্যায়ন করে দেখার জন্য সরকারি আমলা ও টেকনিক্যাল লোকদের প্রতি নির্দেশ জারি করেছেন। বাস্তবে ভারত এই চুক্তি ভঙ্গ ও অমান্য করবে কি না, বাঁধ অথবা কোনো বাধা তৈরি করবে কি না সেটা অনেক পরের ব্যাপার; কিন্তু ইতোমধ্যে মোদির ওই নির্দেশ ভারতীয় মিডিয়া ব্যাপক প্রচারে নিয়ে গেছে। মোদী হুশিয়ারী দিয়ে বলছেন, “রক্ত ও জল একসঙ্গে বইতে পারে না, হুঁশিয়ারি মোদীর”। ফলে সাধারণ ভারতীয়দের মনে মোদী যুদ্ধ করার উসকানি যতটা তাতিয়েছিল, তা অনেকটাই এবার প্রশমিত হয়েছে এতে। যদিও মিডিয়ার এক কোণে ভারতীয় টেকনিক্যাল লোক বা প্রকৌশলীরা মন্তব্য করেছেন, এই পানি নিয়ন্ত্রণ অসম্ভব, কারণ এটি প্রবল খরস্রোতা ও খাড়া প্রবাহিত পাহাড়ি নদী। আবার পাকিস্তান থেকেও ওখানকার মিডিয়ায় পাল্টা হুঙ্কার দিয়ে বলা হয়েছে, বাঁধ দেয়ার চেষ্টা করা হলে তা বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। তবে সুবিধা হল, ভারতীয় মিডিয়া এই খবরটাকে নিজ দেশে তেমন প্রচারে নেয়নি। অবশ্য প্রথম দিন রাশিয়া-পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পূর্বনির্ধারিত এক যৌথ মহড়া এ সময়ে শুরু হওয়ার কথা ছিল, আর তা যথাসময়েই শুরু হয় বলে এটাকে ভারতের জনগণের মন খারাপ করা খবর ও ভারতের কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে ফুটে উঠেছিল। কিন্তু ভারতের মিডিয়া সেটাও সফলভাবেই সামলে নেয়।

অপর দিকে পাকিস্তানের ডন পত্রিকা আরেক খবর ছাপে যে, লাহোরে চীনা অ্যাম্বাসির কনসাল জেনারেল পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের (প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের ছোট ভাই) সাথে দেখা করার সময় ভারত-পাকিস্তান বিরোধে চীন পাকিস্তানের পক্ষে থাকবে বলে জানিয়েছে। শাহবাজের তরফ থেকে বিবৃতির সূত্রে খবরটি ছাপা হয়। এই খবরটি পাক্কা দুই দিন টিকে থাকতে পেরেছিল। দুই দিন পরে চীনের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের রেগুলার ব্রিফিংয়ে এমন খবর তাদের জানা নেই বলে জানায়। তবে এ বিষয়ে চীনের অবস্থান প্রকাশ করে। তা হল, উভয় দেশ যেন সামরিক বিরোধে না জড়িয়ে বসে ডায়ালগে সমাধান খোঁজে, চীন এর আহ্বান জানায়। ভারতীয় মিডিয়া এ খবরটি ব্যাপক প্রচারে নিয়ে যাওয়াতে এটিও মোদির পক্ষে জনগণের সমর্থন আনতে সাহায্য করে মিডিয়া। শুধু তাই নয়, ভারতের মিডিয়ায় প্রচার শুরু করে যে, আমেরিকা ভারতের পক্ষে আছে। যেমন- আনন্দবাজারের এক খবরের শিরোনাম হলো, ‘চাপের মুখেও পাক তর্জন, মার্কিন প্রশাসন পাশে আছে ভারতের।’ কিন্তু এটাকে প্রোপাগান্ডা বলছি কেন? অথবা আসলেই চীন ও আমেরিকার ভারত-পাকিস্তান বিরোধে অবস্থান কী, কেন? আর সেটাই বা কত দিন থাকবে বা জেনুইন কি না? পাকিস্তানকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করার সমস্যা হিসেবে কংগ্রেস নেতা, সাবেক কূটনীতিক, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, কেরালার এমপি শশী থারুর তাকে উদ্ধৃত করে হংকংয়ের এক মিডিয়া জানাচ্ছে, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা খুবই চ্যালেঞ্জের কাজ। কারণ, বিভিন্ন রাষ্ট্রের দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ এর মধ্যে জড়িয়ে আছে। আমেরিকার আফগানিস্তানের কারণে পাকিস্তানকে দরকার। চীন পাকিস্তানে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের এক একক বড় প্রকল্প নিয়েছে। যেটা দক্ষিণে বেলুচ সমুদ্রসীমায় এক গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে সেখান থেকে দক্ষিণ থেকে উত্তর অবধি পাকিস্তানের বুক চিরে এরপর চীনের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে, এমন সড়ক যোগাযোগ গড়ে তোলা হচ্ছে। এ বছর শেষে তা প্রথম পর্যায় শেষ করা হবে। উদ্দেশ্য, এই সড়ক চীনের একমাত্র মুসলমান জনসংখ্যা অধ্যুষিত প্রদেশ জিনজিয়াংয়ের কাশগড় পর্যন্ত যাবে। এভাবে পিছিয়ে পড়া এবং ভূমিবেষ্টিত এই প্রদেশকে সমুদ্র পর্যন্ত এক্সেস দেয়া, যাতে পণ্য আনা-নেয়া সহজ হয়ে যায়। এটা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নামে পরিচিত। ফলে এমন পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে চীন থেকে আলাদা করা সত্যিই কঠিন।

এ তো গেল দ্বিপক্ষীয় কারণ। এর চেয়েও বড় কারণ আছে- গ্লোবাল অর্থনীতি অর্থাৎ গ্লোবাল ক্যাপিটালের স্বার্থ। গত মাসে চীনে জি-২০ এর সভা অনুষ্ঠিত হয়ে গেল। জি-২০ মানে হল, অর্থনীতির সাইজের দিক থেকে দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উপরের দিকের রাষ্ট্র যারা – এমন টপ ২০টি বড় অর্থনীতির দেশের সম্মেলন। উদ্দেশ্য গ্লোবাল অর্থনীতিতে কিছু কমন সাধারণ স্বার্থের দিক নিয়ে একমত হওয়া ও সিদ্ধান্ত নেয়া। যেমন এবারের মূল ঐকমত্য হল, গ্লোবাল মন্দা বিষয়ে। দুনিয়াজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়ায় ১৯৩০ সালে প্রথম মহামন্দা আসে। মহামন্দার সারার্থ হলো, সব রাষ্ট্রের নিজ মুদ্রার মান-দাম কমিয়ে অন্যের ওপর বাজার সুবিধা নেয়ার চেষ্টা করে অন্যকে ডুবিয়ে নিজে টিকে থাকার চেষ্টা। এই ঘটনার লেজ ধরেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এসেছিল, যা থেকে প্রতিকার হিসেবে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম। এ প্রতিষ্ঠানের মূল কাজ হলো আবার যাতে মন্দা না হয় তা ঠেকানো। তবুও ২০০৭-০৮ সালে আবার মন্দা দেখা দিয়েছিল। আফগানিস্তান-ইরাকে যুদ্ধে গিয়ে আমেরিকাসহ পশ্চিমাদের বিপুল যুদ্ধ খরচের এই ভারসাম্যহীনতা থেকে এর জন্ম বলে মনে করা হয়। আমেরিকাসহ পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর বিপুল অর্থ ঢেলে ব্যক্তি-কোম্পানিগুলোর ধস ঠেকায়। অথচ পশ্চিমের বাইরে চীন তখনো ডাবল ডিজিটের অর্থনীতি টেকাতে পেরেছিল, কারণ সে যুদ্ধের বাইরে। ফলে পশ্চিমাদের চোখে গ্লোবাল মন্দা ঠেকানোর ক্ষেত্রে চীনকে এক ত্রাতা হিসেবে দেখা হয়েছিল। চীন টিকলে তার ছোঁয়া ও প্রভাবে পশ্চিম তার সঙ্কট কাটাতে সুবিধা পাবে তাই। মন্দা দুনিয়াজুড়ে ছেয়ে যেতে বাধা হবে চীন তাই। পশ্চিম সেই থেকে মন্দা একেবারে কাটিয়ে উঠতে পারেনি, ওদিকে গত দুই বছর চীনের অর্থনীতি নিচের দিকে; কিন্তু ইতোমধ্যে ভারতে আগের কংগ্রেস আমলে ডুবে যাওয়া ভারতের অর্থনীতি এবার মোদির আমলে এখনো উঠতির দিকে। গ্লোবাল অর্থনীতিতে যে রাষ্ট্রের অর্থনীতিই উঠতির দিকে পশ্চিমের চোখে সে আকর্ষণীয় ও আদরের। অতএব কোনোভাবেই ২০০৭-০৮ সালের মহামন্দা আবার ফিরে আসুক তা ঠেকাতে সবার মিলিত প্রচেষ্টাই এবারের জি-২০ এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল। ফলে এবার জি-২০ এর সর্ব সম্মতিতে, সবাই মিলে প্রতিশ্রুতি ও সিদ্ধান্ত নেয়, সঙ্কটের মুখে নিজ মুদ্রার মান-দাম কমানো এমন পদক্ষেপের পথে কেউ যাবে না। এ কথা থেকে এটা স্পষ্ট যে, সম্ভাব্য ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের ফলাফলে তা গ্লোবাল অর্থনীতিকে ডুবিয়ে মন্দার দিকে নিয়ে যেতে সাহায্য করতে পারে। অতএব এই বৈশ্বিক সাধারণ স্বার্থের কারণে বড় অর্থনীতির কোনো রাষ্ট্রই সম্ভাব্য এই যুদ্ধকে নিজের স্বার্থের বিপক্ষে, নিজের জন্য বিপদ হিসেবে দেখে। যেন বলতে চায়, যুদ্ধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন দেয়ার বা পাওয়ার এটা সময় নয়।
গ্লোবাল উদ্বেগ ও ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থের এ দিকটি সম্পর্কে মোদির জানা, সবাই তাকে সতর্ক করেছে; কিন্তু তবুও মোদির কিছু একান্ত স্বার্থ আছে। একালে দলের সঙ্কীর্ণ স্বার্থকে রাষ্ট্রের স্বার্থ হিসেবে চালিয়ে দেয়ার চল শুরু হয়েছে। আগামী ফেব্রুয়ারিতে ভারতের সবচেয়ে বড় উত্তর প্রদেশে (সাথে পাঞ্জাবসহ আরো কয়েকটি) রাজ্য সরকারের নির্বাচন। এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মোদি বা বিজেপি এখানে হেরে গেলে এখান থেকেই নীতিশ-মমতার নেতৃত্বে আগামী ২০১৯ সালের কেন্দ্রের নির্বাচনের লক্ষ্যে আঞ্চলিক দলগুলোর জোট গঠনপ্রক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে। ফলে আগামী ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পাকিস্তান ইস্যু হওয়ার সম্ভাবনা।
ওপরে লিখেছিলাম, মিডিয়াসহ মোদি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। এর তৃতীয়টি হল, খুবই সীমিত পর্যায়ে সামরিক অ্যাকশন, যাতে আগামি ভোটে মোদির মুখ রক্ষা হয়। ভোটের বাক্স ভরে উঠে। এক কথায় বললে, “যুদ্ধ না উন্নয়ন আর কূটনীতি” এই নীতির পক্ষে ভারতের মিডিয়া একযোগে দাঁড়িয়েছিল খুবই সফলভাবে। মানুষের মন থেকে যুদ্ধে না যাওয়ার পক্ষে আগের তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করে আনতে পেরেছিল; কিন্তু সম্ভবত সামরিকবাহিনীকে আগেই প্রধানমন্ত্রী মোদী সীমিত হামলার কোনো পরিকল্পনা তৈরি করে আনতে বলেছিলেন, যা তারা হাজির করেছিল একা মিডিয়াই তাতানো ক্ষোভ প্রায় সবটাই প্রশমিত করতে পারার পরে। সেই অর্থে আবার এই সামরিক এডভেঞ্চার তা ছোটখাট বলা হলেও মোদীর সেদিকে না গেলেও চলত।  কিন্তু সম্ভবত লোভে পড়ে, বাড়তি লাভের আশায় মোদী এই সামরিক অ্যাকশনের পক্ষে সম্মতি দিয়ে দেন। এই পরিকল্পনা মোতেও ছট খাটও নয়, রিস্কবিহীনও নয়। বরং মোদীর ভারতের জন্য আগুন নিয়ে খেলার মত রিস্কি। কিন্তু মোদী আগামি ফেব্রুয়ারির গুরুত্বপুর্ণ রাজ্য নির্বাচনে ভাল করার লোভে এই আগুন নিয়ে খেলা খেলতে গিয়েছেন। এর অর্থ এখন মূল্যায়ন বসলে পরিস্কার দেখা যাবে, আগামী নির্বাচনে ভোটে সুবিধা দেয়ার কাজেই সামরিক বাহিনী ও এর ঐ পরিকল্পনা দেশের নয় দলের স্বার্থে ব্যবহৃত হয়ে গেছে। বিশেষত সামরিক হামলা তা যত ছোট দিয়ে শুরু হোক না কেন, এখন পাল্টাপাল্টি বড় থেকে আরো বড় হামলার দিকে দুই দেশ জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা প্রবল হয়ে উঠবে। এ সম্ভাবনা ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। শেষে এটা পুর্ণ যুদ্ধে না পরিণত হয়। যেটা তারা উভয়ে কেউ চায় না; কিন্তু সেখানেই গিয়ে পৌঁছবে। বিশেষ করে ভারত “সার্জিক্যাল অপারেশন” এই গালভরা নামের হামলা করতে গিয়ে যে কেলেঙ্কারির জন্ম দিয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে, ইচ্ছা না থাকলেও ভারতকে এরপর আরেক দফা হামলায় যেতে হবে। কারণ ভারতের ঐ গালভরা নামের হামলায় এক ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের হাতে ধরা পরে আছে। ভারত প্রথম হামলা করার পর  মিডিয়াকে বীরদর্পে জানিয়েছিল, নিজের কোনো ক্ষয়ক্ষতি ছাড়াই তারা নাকি পাকিস্তানের ‘অনেক’ ক্ষয়ক্ষতি করে দিয়ে এসেছে। যেন বলা হচ্ছিল, এখন ভারতের মিডিয়া মোদীর পক্ষে নির্বাচনী ক্রেডিট বিতরণ করতে নেমে পড়তে পারে। কিন্তু সন্ধ্যা লাগতেই জানা গেল, এক ভারতীয় সেনা পাকিস্তানের হাতে আটকা পড়ে আছে। অথচ এটা আগে থেকেই এটা জানা সত্ত্বেও ভারতীয় বাহিনীর নেতারা তা লুকিয়ে অস্বীকার করে রেখেছিলেন। এটা ছাড়া যেটা এখন আর এক সবচেয়ে বড় সমস্যা তা হল – দুই দেশের বাহিনীই এখন প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে ঢুকে গেছে। ফলে ক্ষয়ক্ষতির নিরপেক্ষ সত্যতা জানা প্রায় অসম্ভব। তবে কি পূর্ণ যুদ্ধের (পারমাণবিক বোমা পকেটে রেখে) দিকেই যাবে বা যাচ্ছে পরিস্থিতি? সেই সম্ভাবনা ক্রমেই বাড়ছে। দুই পক্ষই তা না চাইলেও নিজ নিজ জনগণের কাছে বীরত্ত্ব আর  ‘ইজ্জত রক্ষার স্বার্থ’ দেখাতে গিয়ে পূর্ণ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ভাল সম্ভাবনা আছে।  এই সম্ভাবনা প্রবলতর হবে যদি না মধ্যস্থতাকারী হিসেবে চীন-আমেরিকা যৌথভাবে এগিয়ে আসে ও মাঝখানে গিয়ে দাঁড়ায় । পুরনো ইতিহাস বলছে, মধ্যস্থতাকারীর কিছু ভূমিকা আছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[লেখাটা এর আগে গত ০২ অক্টোবর ২০১৬ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে ০৩ অক্টোবর) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আরও সংযোজন ও এডিট করে আবার ছাপা হল। ]

হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা

হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা
গৌতম দাস
১২ সেপ্টেম্বর  ২০১৬, সোমবার ০০ঃ০১

http://wp.me/p1sCvy-1R1

ভারতের জন্মের শুরু থেকেই ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে বিস্তর চড়াই-উতরাই আছে। কখনো তা চরম তুঙ্গে, আবার কখনো তুলনামূলক শীতল। কিন্তু এবারের চরম অবস্থা নিজগুণেই যেন তুলনাহীন। টাইমস অব ইন্ডিয়া ২৭ আগস্ট কাশ্মীর নিয়ে রিপোর্টে জানাচ্ছে, কাশ্মিরের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া চলমান কারফিউ ২৭ আগস্টে পঞ্চাশতম দিন পূর্ণ করেছে। কিন্তু পুরা ঘটনার বেজ-ফ্যাক্টস মানে, কী থেকে ঘটনা স্ফুলিঙ্গে রূপ নিল সেটা কী? সেটা ভারত সরকারের ভাষায় বলা যাক। ভারতের এনডিটিভির খবর অনুবাদ করে আমাদের বাংলা ট্রিবিউন কী ছেপেছে সেটা দেখে নেয়া যেতে পারে।  সেই ভাষ্যটা হল,  হিজবুল মুজাহিদিন নামে ‘সন্ত্রাসবাদী’ সংগঠনের নেতা বুরহান ওয়ানী গত ৯ জুলাই ২০১৬ ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। তার ওই মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়া রাজনৈতিক গণ-অসন্তোষ ঠেকাতে সরকার ঘোষিত কারফিউ অমান্য করেছিল জনগণ এবং জানাজায় অংশ নেয়া থেকে অসন্তোষ ও এর তীব্রতা শুরু। আর তা এবার ৫০ দিন পূর্ণ করল। ‘বন্দুকযুদ্ধ’ শব্দটি আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাত দিয়ে তৈরি। এই শব্দ দিয়ে আমরা অনেক কিছু ঘটনা বুঝে ফেলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই আমাদের পরিচিত এই বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে ব্যাপারটা বুঝানো হল। যদিও টাইমস অব ইন্ডিয়া সুনির্দিষ্ট করে ‘এনকাউন্টার’ শব্দ ব্যবহার করেছে। এটা ভারতীয় গণমাধ্যমের শব্দ। অপর দিকে যে শহরে ৫০ দিন টানা কারফিউ দিয়ে রাখতে হয়, সেখানকার জনজীবনের অবস্থা কী, মানুষের আয়-ইনকাম দিন এনে খায়, তা সহজেই অনুমান করা যায়।

কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের সরকার সবসময় যথেচ্ছাচার বলপ্রয়োগে দাবড়ে সমাধান করে এসেছে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয় নাই। কিন্তু এবার বুরহান এনকাউন্টারের পরের পরিস্থিতি যে এমন অগ্নিরূপ ধারণ করবে, কারফিউ দিলেও যে তা ভেঙ্গে মানুষ বুরহানের জানাজায় অংশগ্রহণ করে বসবে এগুলো তাদের কল্পনারও বাইরে ছিল। কাশ্মীরের রাজ্য সরকারে উপরে কেন্দ্রের নিরাপত্তা বাহিনীর রুস্তমি চলে থাকে। এজন্য আইনগত ভাবেই সামরিক বাহিনীকে বিশেষ ক্ষমতা দেয়া আছে। বিগত ১৯৫৮ সালের এক আইনে (ওটা প্রথম আইন আসামের নাগাদের জন্য ছিল। পরে ঐ আইনের আদলে ১৯৯০ সালে বিশেষ করে কাশ্মীরের জন্য এক আইন প্রনয়ন করা হয়) যার নাম Armed Forces (Special Powers) Acts (AFSPA)। ফলে বলা যায় এই বাহিনীই এই প্রথম কার্যত পর্যদুস্ত হয়েছে। কলকাতার আনন্দবাজার এই বিষয়ে একটা রিপোর্ট লিখেছে যার শিরোনাম, “কোন পথে উপত্যকায় শান্তি আসতে পারে, হাতড়ে বেড়াচ্ছে নয়াদিল্লি”।  যেখানে ভারতের গোয়েন্দা-নিরাপত্তা মহলের হারু ও পর্যদুস্ত মনোভাব প্রকাশ পেয়েছে। আনন্দবাজার সেখানে লিখছে,  “প্রাথমিক ভাবে পরিস্থিতি সামলাতে না পারার জন্য গোয়েন্দা ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছে কেন্দ্র। এক জন জঙ্গির মৃত্যুর প্রতিবাদে কাশ্মীরে যে এত বড় মাপের অশান্তি হতে পারে, সে বিষয়ে কোনও ধারণাই ছিল না গোয়েন্দাদের। এমনকী দিল্লিতে বসে শীর্ষ গোয়েন্দাকর্তারা দাবি করেছিলেন,বিক্ষোভ সাময়িক। দশ দিনেই থেমে যাবে। তা যে কবে থামবে,সে ধারণাও নেই কারও! উপত্যকার অশান্তি সেটাই!”।খুব সহজে কাতর হন না এমন ভারতীয় বুদ্ধিজীবীর গায়েও আঁচ লেগেছে। আর চুপ থাকা যায়নি এবং আনন্দবাজারের রিপোর্ট তা ধারণ করতে বাধ্য হয়েছে বলা যায়। এসব পরিমাপের দিক থেকে অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও কাশ্মিরের এবারের ঘটনায় আর চুপ থাকতে পারেননি। আনন্দবাজারের ভাষ্যটাই তুলে আনছি, এক টিভি সাক্ষাৎকারে অমর্ত্য সেন বলেছেন,

“সরকার এতটাই খারাপভাবে কাশ্মির-পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছে যে এটাকে ভারতীয় গণতন্ত্রের ওপরে সবচেয়ে বড় দাগ হিসেবেই দেখছে গোটা বিশ্ব”। চার দিক থেকে সবাই বিষয়টিকে সরকারের পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে গিয়ে নাড়াচাড়ার ত্রুটি হিসেবেই দেখছে তাতে সন্দেহ নেই। সেটা এখানে তুলে ধরতে একটু বড় এক উদ্ধৃতি আনন্দবাজার থেকে আনছি। লিখেছে “সমালোচনা হচ্ছিলই। কাশ্মিরের উত্তপ্ত পরিস্থিতির জন্য মূলত বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি দুষছিল মোদি সরকারকে। আরএসএস নেতাদের একাংশও মনে করছেন, কাশ্মিরের পরিস্থিতি ঠিকভাবে সামলানো হচ্ছে না। কিন্তু নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনও এভাবে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে মুখর হওয়ায় চাপ আরো বাড়ল প্রধানমন্ত্রী মোদি ও তার সরকারের ওপরে। কাশ্মিরিদের মধ্যে যে দেশের বাকি অংশ সম্পর্কে নানা রকম মত রয়েছে, সে কথাও অবশ্য উল্লেখ করেছেন অমর্ত্য। কিন্তু সেই বাস্তবতার নিরিখেও সরকার যে ভূমিকা নিচ্ছে, অমর্ত্যরে মতে সেটা বড় রকমের ভুল। এই সূত্রে তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, কাশ্মিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখা জরুরি। তবে সেটাই কাশ্মিরিদের মূল সমস্যা বলে ধরে নেয়াটা ভুল। …অমর্ত্য সেনের এই সমালোচনার জবাবে সরকারের তরফে কেউ মুখ খোলেননি তাৎক্ষণিকভাবে। এবং ভূস্বর্গে অব্যাহতই রয়েছে অশান্তি। দক্ষিণ কারের কাজিগুন্দে নিরাপত্তাবাহিনীর গুলিতে গুরুতর জখম আরো একজনের মৃত্যু হয়েছে আজ। এই নিয়ে ১১ দিনে উপত্যকায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে হলো ৪৪। তবে গুলি চালনার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে সেনাবাহিনী।”

আনন্দবাজারের এই রিপোর্ট গত ২০ জুলাইয়ের। ফলে নিহতের সংখ্যা এটা সর্বশেষ সংখ্যা নয়। কারফিউর ৫০তম দিনে মৃতের মোট সংখ্যা ছিল ৬৯ জন।
এক কথায় বললে মোদি সরকার এবারের কাশ্মির ইস্যুটি নিয়ে বড়ই পেরেশান আর বেকায়দায় আছে। বেকায়দায় পড়লে মানুষ আরো উল্টাপাল্টা কাজ করে বসে। এখানেও তাই হয়েছে। আর সেটাই এখানে  আমাদের এই রচনার মুল প্রসঙ্গ।

তবে ঘটনাস্থল এবার ঠিক কাশ্মীর নয়। কাশ্মীর থেকে ব্যাঙ্গালোরে, যদিও ইস্যু সেই একই কাশ্মীর। ব্যাঙ্গালোরে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন ‘অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের’ (এআই) শাখা অফিস কাশ্মিরে মানবাধিকার ইস্যুতে এক সেমিনারের আয়োজন করেছিল।
কিন্তু বিজেপির ছাত্রসংগঠন ‘অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদের’ (এভিবিপি) অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে যে, তাদের আয়োজিত ঐ কাশ্মির বিষয়ক সেমিনারে ভারতের বিরুদ্ধে ও ভারতীয় সেনাদের বিরুদ্ধে লাগাতার স্লোগান দেয়া হয়েছে। তাই অ্যামনেস্টি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবিতে এর পরের দু-তিন দিন ধরেই ব্যাঙ্গালুরুতে তীব্র বিক্ষোভ দেখাচ্ছে বিজেপির ছাত্র শাখা। যদিও জবাবে অ্যামনেস্টি দাবি করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে দেশদ্রোহের অভিযোগ আনার কোনো ভিত্তিই থাকতে পারে না।
ঘটনার সূত্রপাত সেমিনারের একজন বক্তা, কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিত নেতা আর কে মাট্টু দাবি করেছিলেন “ভারতীয় সেনার মতো সুশৃঙ্খল বাহিনী দুনিয়াতে কমই আছে”। এই তথ্যগুলো নিয়েছি ভারতীয় বিবিসির ১৬ আগস্টের এক রিপোর্ট থেকে। ব্যাঙ্গালুরুতে ঐ সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছিল এর আগের শনিবার, মানে ১৩ আগস্ট। ওই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন কিছু কাশ্মীরি ছাত্র, যারা বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র হিসেবে ব্যাঙ্গালুরুতে বসবাস করেন। ফলে হিন্দু পণ্ডিত নেতা মাট্টুর ওই বক্তব্যের পর সভায় উপস্থিত কাশ্মীরি যুবকেরা প্রতিবাদে ফেটে পড়েন, তাঁরা কাশ্মীরের স্বাধীনতার দাবিতে স্লোগান দিতে শুরু করেন। আসলে ঐ সভায় হিন্দু নেতা আর কে মাট্টুসহ কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের উপস্থিতিও গণ্ডগোল লাগানোর দিক থেকে পরিকল্পিত বলা যায়। দাওয়াতি না হয়েও তারা গণ্ডগোল পাকানোর উদ্দেশ্যে সভায় শুরুতে দলবেঁধে ওই সভায় প্রবেশ করেন। এরপর উসকানিমূলকভাবে কাশ্মীরে সেনাবাহিনীর তৎপরতার পক্ষে উগ্র ও কড়া সাফাই বক্তব্য দিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলেছিলেন। পরিকল্পিতভাবে অনুষ্ঠান ভণ্ডুল করে দিয়েছিল তারা।
কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের পর ঘটনা পরিকল্পনায় মঞ্চে হাজির হয় এভিবিপি। পরের দিন গুলোতে  বিজেপির ছাত্র শাখা এভিবিপি, তারা ঐ অনুষ্ঠানে স্লোগানের ভিডিও প্রচার করে এবং শহরে অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে মিছিল করে জনমত খেপিয়ে তুলতে চেষ্টা করেছিল। একপর্যায়ে তাঁরা ব্যাঙ্গালুরু অ্যামনেস্টির অফিসে হামলা করেছিল। পরে পুলিশ উপস্থিত হলে পুলিশের ওপর উলটা চাপ সৃষ্টি করে অ্যামনেস্টির বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা’ করে।
এ বিষয়ে বিবিসি তাদের রিপোর্টে লিখেছে, অনেকটা তাদের চাপের মুখেই ব্যাঙ্গালুরুর পুলিশ ‘অ্যামনেস্টি ইন্ডিয়ার’ বিরুদ্ধে দেশদ্রোহসহ আরো নানা অভিযোগে এফআইআর দাখিল করে। এ ছাড়া বিবিসি আরো লিখেছে, বিদ্যার্থী পরিষদের নেতা সাকেত বহুগুনা বলছেন, “অ্যামনেস্টি ও তাদের মতো আরো কিছু এনজিও বারবার এটাই বলে চলেছে কাশ্মিরে সব সমস্যার মূলে আছে ভারতীয় সেনা। তারা এমন একটা ন্যারেটিভ তৈরি করতে চাইছে যে, কাশ্মিরের মুসলিমরা সেনাদের হাতে নির্যাতিত। তাদের অনুষ্ঠানে প্রকাশ্যে কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে, এখন বলুন কোন দেশ এটা সহ্য করবে যে, তাদেরই একটা অংশকে আলাদা করে ফেলতে প্রকাশ্যে উসকানি দেয়া হচ্ছে?’।
কাশ্মির ইস্যুতে সাধারণভাবে বিজেপির অবস্থান হল, যেভাবে সাকেত বহুগুনার বক্তব্যে দেখা গেছে, মোটা দাগে সেটাই। কাশ্মিরের নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ উঠলেই সেটাকে তারা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ’ বলে অভিযোগ আনে। সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে তারা জনমনে জায়গা করে নিতে চেষ্টা করে থাকে।
উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগিরে অনেকে বিভ্রান্ত হতে পারেন যে কাশ্মিরের নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ উঠালে তা সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ’ হতেও পারে। কিন্তু না, এটা রাষ্ট্রদ্রোহের কাজ নয়। এটা আমার কথা নয়, এ নিয়ে বহু রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার বক্তব্য ও ঐ ধরণের বহু মামলায় বেকসুর খালাসের রায় আছে। আশির দশকে পাঞ্জাবের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সময় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট প্রথম এমন রায় দিয়েছিলেন। যা পরে অন্যান্য অনেক ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলা হিসেবে কোর্টের সামনে আনা হয়েছিল। এখানে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের পরিষ্কার সীমা টেনে দেয়া লাইন হচ্ছে, ভারত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের স্লোগান – সেটা কাশ্মিরের স্বাধীনতা চাই অথবা পাঞ্জাবের স্বাধীনতা চাই; যা-ই তোলা হোক এগুলো ‘রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ’ ঘটে এমন কাজ নয়। স্বাধীনতার দাবি করে স্লোগান দিলে তা রাষ্ট্রদ্রোহ হবে না। তা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অথবা সেনাবাহিনী যার বিরুদ্ধেই স্লোগান হোক না কেন। তবে একমাত্র কেবল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে স্লোগান দিলে বা সশস্ত্র সাংগঠনিক তৎপরতা চালালে বা সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলন চালালে তা অবশ্যই রাষ্ট্রদ্রোহ হবে।
বিজেপি এই রায়ের কথা জানে। তবুও সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের মোড়কে হাজির করে আবেগ থেকে ফায়দা নিতে চাওয়া তাদের হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কৌশল। তারা বলছে, ‘কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য স্লোগান দেয়া হচ্ছে। এখন বলুন, কোন দেশ এটা সহ্য করবে?’ – হ্যাঁ, ভারত রাষ্ট্রই এটা সহ্য করবে, নিরস্ত্র হলেই করবে। করতে হবে এটাই সুপ্রিম কোর্টের রায়। সেনাবাহিনী অন্যায় করলেও এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা যাবে, যদি তা নিরস্ত্র হয় এবং তা রাষ্ট্রদ্রোহিতা হবে না।

ওদিকে ব্যাঙ্গালুরুর ঘটনার আরেক তামাশার দিক আছে। কর্ণাটক রাজ্যের রাজধানী ব্যাঙ্গালুরু (পুরানা নাম ব্যাঙ্গালোর)। এর রাজ্য সরকার বা প্রাদেশিক সরকার হল কংগ্রেস দলের ফলে এর বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেসি। বিবিসি তাদের ওই রিপোর্টে বলছে, “কর্ণাটকের মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধারামাইয়া আবার যুক্তি দিচ্ছেন, একটা সভায় দেশবিরোধী স্লোগান ওঠার পরও সরকার হাত গুটিয়ে থাকতে পারে না। তাই বিষয়টি নিয়ে তার পুলিশ তদন্ত শুরু করেছে”। অর্থাৎ একজন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী তিনিও বিজেপির রাজনীতি অনুসরণ করে ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা ভাবতে বাধ্য হচ্ছেন, পছন্দ করছেন। কেন? তিনি তো বিজেপি করেন না, কংগ্রেস দল করেন ও সেই দলের মুখ্যমন্ত্রী! তাতে কী? তিনিও বিজেপির সস্তা উগ্র জাতীয়তাবাদের জিগির তুলে জনমনে বিভ্রান্তি জাগানোর বিরুদ্ধে দাড়াতে, সত্য বলতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ বিজেপি হিন্দুত্বের জিগিরের এমনই এক আবহাওয়া তৈরি করে ফেলেছে। ফলে তিনি কিছুতেই ঐ  হিন্দুত্বের সেন্টিমেন্টের জোয়ারের সামনে দাড়াতে চাচ্ছেন না, এতে তিনি অজনপ্রিয় হয়ে যেতে পারেন। অর্থাৎ হিন্দুত্বের সেন্টিমেন্টের জোয়ার তুলে এর সামনে ভয় দেখিয়ে কংগ্রেসের মুখ্যমন্ত্রীকেও বিজেপির রাজনীতি করতে বাধ্য করেছে বিজেপি। অথচ সব দলই জানে ‘দেশবিরোধী স্লোগান’ দেয়াকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা বা অভিযোগ কোনো হাইকোর্ট আমল করবেন না, বেকসুর খালাস দিয়ে দেবেন। কিছু দিন আগে দিল্লীতে জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নেতা কাহানাইয়ার মামলাতেই একই ঘটনা হয়েছিল। মামলা চলে নাই। কাহানাইয়া এখন মুক্ত কিন্তু কয়েক মাস তাকে জেলে থাকা সহ বিশাল হয়রানী পোহাইতেই হয়। অর্থাৎ আদালত পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে মানুষকে হয়রানি করার সুযোগ নিতে, হয়রানির রাজনীতি করতে কংগ্রেস বিজেপির থেকে প্রতিযোগিতায় পেছনে পড়ে থাকতে চায় না। এই হলো হিন্দুত্বের রাজনীতি, এই তার মহিমা।
হিন্দুত্বের রাজনীতির মহিমা এতই যে, বিবিসি লিখেছে, ‘কর্ণাটকের রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই দিলেও দিল্লিতে দলের জাতীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি বলছেন, “একটা প্রতিষ্ঠানকে এভাবে কাঠগড়ায় তোলা যায় কি না তা নিয়ে তার সন্দেহ আছে”।
মি. সিংভির বক্তব্য, ‘ভারতবিরোধী ভাবাবেগে উসকানি দেয়ার জন্য একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে এফআইআর হতেই পারে, কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতিতে একটা প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা বোধ হয় সমীচীন নয়।’ ‘কোনো ব্যক্তি হয়তো তার বাকস্বাধীনতার সীমা ছাড়িয়ে গেছেন, কিন্তু তার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে একটা সংস্থাকে এভাবে অভিযুক্ত করা ভুল বলেই আমার ধারণা।’ অর্থাৎ কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র অভিষেক মনু সিংভি জানেন বুঝেন নিজেই এটাকে ‘ভারতবিরোধী ভাবাবেগে উসকানি’ দিয়ে নাচা বলছেন। এর পরও হিন্দুত্বের রাজনীতি করার লোভ না ছেড়ে বরং চিকনে মেরে ‘কর্ণাটকের রাজ্য সরকার এই সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই’ বক্তব্য দেয়ার চেষ্টা ছাড়তে চাচ্ছে না। যাতে এ-ও হয় সে-ও হয়, এমন একটা ঝাপসা অবস্থান থাকে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

লেখাটা এর আগে গত ২৮ আগষ্ট দৈনিক নয়াদিগন্তে অনলাইনে (প্রিন্টে ২৯ আগষ্ট) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও সংযোজন ও এডিট করে আপডেট ভার্সান হিসাবে এখানে আবার ছাপা হল।

 

 

মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়

মোদী কেন বেলুচিস্তানের ‘মানবাধিকারকর্মী’ হতে চায়
গৌতম দাস
০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬, বৃহষ্পতিবার

http://wp.me/p1sCvy-1Nl

 

ঘটনার শুরু ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর গত ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবসের ভাষণ থেকে। সেখানে তিনি এই ভাষণে বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ( এবং সাথে পাকিস্তানের কাশ্মীর অংশেও) দমন করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ এনেছেন। ‘আমি বালুচিস্তান, গিলগিট, ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের বিষয়ে বলতে চাই। এ নিয়ে ভারত সরব হওয়ায় গত কয়েক দিনে ওখানকার অনেক লোক আমাকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আমি তাঁদের কাছে কৃতজ্ঞ।’’ এর ব্যাখ্যা হিসেবে ভারতের পক্ষ থেকে (ভারতীয় সাংবাদিকদের পক্ষ থেকে ব্যক্তি যোগাযোগে করলে) নাকি বলা হয়েছে, মোদী স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ এনেছেন এ জন্য যে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীও আগের দিন ১৪ আগস্ট তাদের স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে ভারত-অধিকৃত কাশ্মিরে চলমান লাগাতার বিক্ষোভ, কারফিউর প্রসঙ্গ টেনে একে ‘কাশ্মিরের স্বাধীনতা সংগ্রাম’ বলে চিহ্নিত করেছিলেন। তার মানে এসব আসলে একটা পাল্টাপাল্টি ব্যাখ্যা, যেখান থেকে সত্যতা বের করা কঠিন। তবে ১৪ আগস্টের আগেও ড্রেস রিহার্সেলের মত করে মোদী বেলুচ প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। গত ১২ আগস্ট ছিল প্রধানমন্ত্রী মোদির সাথে ভারতের কাশ্মিরকেন্দ্রিক সব রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠক হয়। মুজাহিদ কমান্ডার বুরহান ওয়ানির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কাশ্মিরে লাগাতার কারফিউ কাশ্মিরের জনজীবন স্থবির করে রেখেছে। সেখান থেকে বের হওয়ার উপায় হিসেবে ঐ বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই বৈঠকে মোদী সর্বপ্রথম বেলুচিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। আনন্দবাজারের রিপোর্টের ভাষায়, ‘গত শুক্রবার কাশ্মির প্রসঙ্গে সবর্দলীয় বৈঠকে প্রথম এই নিয়ে মুখ খোলেন প্রধানমন্ত্রী। এই নতুন পদক্ষেপের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মোদি সেই বৈঠকে বলেছিলেন,পাক-অধিকৃত কাশ্মির ও বালুচিস্তানের মানুষ যারা এখন অন্য কোনো দেশে থাকেন, তাদের সাথে যোগাযোগ করে পাকিস্তানের নির্যাতনের কথা সামনে আনতে হবে।’ সার কথা হল, কাশ্মির অসন্তোষে বুরহান ইস্যুর পর থেকে বর্তমানে ভারত যে চাপের মুখে আছে সেখান থেকে মুক্তি পেতে পাল্টাপাল্টিতে পড়ে ঘটনা এখন মোদীর ভারতের পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ পর্যন্ত ঠেকেছে।

নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তোলা অন্তত ভারতের দিক থেকে একেবারেই নতুন অস্ত্র। এই অস্ত্র ভারতের জন্য শুধু নতুন তাই নয়। কারণ মানবাধিকার ইস্যু সবসময়ই দু’ধারী তলোয়ারের মত। কাঁচের ঘরে বসে অ্ন্যের উপর ঢিল ছুড়ার মত। ফলে তা ব্যবহার করতে গিয়ে নিজের হাত ক্ষতবিক্ষত করে ভারত নিজের জন্যই বিপদ ডেকে আনবে। এক কথায় বললে কারো বিরুদ্ধে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ আনা ভারত কখনোই নিজের কাজ মনে করেনি বা নিজের চায়ের কাপ হিসেবে গ্রহণ করেনি। আজ ভারত যেমন এক এককাট্টা রাষ্ট্র বলে দেখি কলোনি আমলের বৃটিশ-ভারত ঠিক তা ছিল না। সরাসরি কিছু প্রাদেশিক (সেকালে প্রেসিডেন্সী বলা হত) সরকারি এলাকা আর প্রায় ৫০০ এরও বেশি ছোট বড় করদ রাজ্য – এই সব মিলিত ভুখন্ডটাকে বলা হত বৃটিশ-ভারত। বিগত ১৯৪৭ সালে ভারতের জন্মের সময় থেকেই অন্তত পরের তিন বছর ধরে সমানে পিটাপাটা আর সামরিক বলপ্রয়োগ করে বিভিন্ন রাজার রাজ্যকে মুল ভুখনন্ডে অন্তর্ভুক্তিতে বাধ্য করতে হয়েছিল। অর্থাৎ নেহেরুর নেতৃত্বের নতুন ভারত সরকারের অধীনে পুরান স্টাইলে কোন রাজাকে কর-খাজনা দিয়ে করদ রাজ্য হয়ে থাকার ব্যবস্থা রাখেন নাই। যেখানে ভারতভুক্তি আপোষে হয় নাই সেখানে সামরিক বল প্রয়োগ করে তা করা হয়েছিল। এর পরবর্তিকালের ভারতে একের পর এক লাগাতার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও মাওবাদী আন্দোলনের সমস্যা ভারত রাষ্ট্রকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। কাশ্মির, পাঞ্জাব, নকশাল আর উত্তর-পূর্বের সাত বোন রাজ্যের আন্দোলন সেসবের উদাহরণ। যে রাষ্ট্রকে জন্মের পর থেকেই লাগাতার বিচ্ছিন্নতাবাদী বা রাজনৈতিক সমস্যাকে রাষ্ট্রের সশস্ত্র বলপ্রয়োগ, হত্যা-নির্যাতনের ভেতর দিয়ে দমিয়ে নিজের রাষ্ট্রকে সংহত রাখতে হয়েছে ও হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট সেই রাষ্ট্রের কাছে ‘মানবাধিকার’ শব্দটিই হারাম। কারণ সে নিজেই সর্বক্ষণ ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ কাঁধে নিয়ে ঘুরছে। স্বভাবতই ওই রাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজি হবে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ধারণাটি যেন দুনিয়াতে নেই, এমন ভাব ধরে থাকা। জন্মের পর থেকে এটাই এত দিন ভারত রাষ্ট্রের পুরানা সব সরকারের গৃহীত নীতি ছিল। ছিল বলতে হচ্ছে, কারণ অগ্রপশ্চাৎ যথেষ্ট বিবেচনা করে মোদি সেই নীতি এখন ভেঙেছে তা মনে করা যাচ্ছে না। খুব সম্ভবত চলতি কাশ্মীর ক্রাইসিস আরও মহীরুহ হয়ে সামনে আসতেছে এটা আঁচ  করে, মোকাবিলায় উপায়ন্ত না দেখে আপাতত “কুইনাইন খাইয়ে” যেভেবেই হোক জ্বর ছাড়াবার ব্যবস্থা এটা। এতে এরপর কুইনাইন সারাবে কে সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ধারণাটি যেন দুনিয়াতে নেই, এমন ভাব ধরে থাকা – এটাই এতদিনের ভারতের নীতি ছিল তা সবচেয়ে ভালোভাবে প্রমাণিত দেখা যায় পশ্চিমা রাষ্ট্রের সাথে ভারতের সম্পর্কের দিকে, বিশেষ করে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কের দিকে তাকালে। যেকোনো পশ্চিমা বিদেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পাতানোর শুরুতে ভারত সব সময় সবার আগে কবুল করিয়ে নেয় যে ‘কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু’, ভারত এই ইস্যুর ‘কোনো আন্তর্জাতিকায়ন চায় না’, এমনকি ‘জাতিসঙ্ঘেও মুখোমুখি হতে চায় না’ – এ ব্যাপারে ভারতের সেই পরদেশী বন্ধু একমত আছে। এমন একমত হবার পরই কেবল ভারত সে রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কে আগায়। সে কারণে যে আমেরিকা মানবাধিকার ইস্যুকে অন্য রাষ্ট্রের পেছনে লাগার, তাকে বিব্রত করার বিষয় হিসেবে ব্যবহার করে প্রতি বছর রিপোর্ট বের করে থাকে, অথচ সে ভারতের কাশ্মির ইস্যুতে উল্টো নিজেকেই নিয়ন্ত্রিত রাখে। তো এই হল, ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন’ ইস্যু কেন ভারতের চায়ের কাপ নয়, এটা ভারতের জন্য নয়- এই ভাব ধরে রাখার ভারতীয় স্টাইল। তাই ‘মানবাধিকার’ ভারতের জন্য ‘নো গো’ বা অগম্য এলাকা- এভাবেই এত দিন ছিল। ভারতের কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীদের ব্রিফিংও এত দিন এই আলোকে সাজানো ছিল, এভাবেই চলে আসছিল।
তাই  ‘বেলুচিস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন’ দমন করতে গিয়ে পাকিস্তান সরকার ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে’- মোদির এই নতুন বয়ানের পথ অনুসরণ করা দেখে সবচেয়ে বেশি শঙ্কিত হয়েছে ভারতের ভেতরেরই অন্য রাজনৈতিক, প্রাক্তন আমলা ও মিডিয়া গোষ্ঠী। তাঁরা দেখতে পাচ্ছে, মোদির রাজনৈতিক লাইনটি এ রকম যে, মোদি এখন থেকে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে ‘মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ’ তুলবে। আর তাতেই নাকি পাকিস্তান কুপোকাত হয়ে যাবে। মোদির এই লাইনের আরেক বৈশিষ্ট্য হল, ভারতের কাশ্মিরের অসন্তোষ তৈরি করার জন্য পুরোপুরিভাবে পাকিস্তান সরকারকে দায়ী করে দোষ চাপানোর ফলে অনেক রিলিফ পাওয়া যাবে, চাপ কমানো যাবে। ঠিক যেমন বেলুচিস্তানে অসন্তোষের জন্য পাকিস্তান ভারতকে দায়ী করে থাকে। উভয় পক্ষের এসব দায়ী করার ঘটনার সাথে সবচেয়ে ভাল তুলনীয় ঘটনা হল, ঠিক যেমন পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হত ভারতের প্ররোচনাতেই নাকি পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ হয়েছে। যেন বাংলাদেশের জনগণের কোনো রাজনৈতিক আকাঙ্খা বা লড়াই-আন্দোলন বলে কিছু ছিল না। আবার তাই বলে বাংলাদেশের আন্দোলন বলশালী হলে এর মধ্যে ভারতের কোনোই স্বার্থ-প্রভাব ছিল না, এটা ঠিক তা বলাও নয়। ব্যাপারটা হল হবু বাংলাদেশ ও ভারত উভয়পক্ষই নিজের নিজের স্বার্থ দেখেছিল। ফলে স্বার্থের এক সম্মিলন আমরা দেখেছিলাম। তবে প্রপাগান্ডার সময় মুখ রক্ষার্থে পাকিস্তান ভারতের প্ররোচনার কথাই বলবে। ঠিক যেমন ভারতের কাশ্মির সমস্যা ইস্যুতে ভারত পাকিস্তানের প্ররোচনাকে দায়ী করার পথ ধরতে চাইছে। প্রচারণার এসব স্টাইল নতুন নয়। যেটা নতুন তা হল ভারতের আমলা কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীরা মোদীর এই নতুন রাজনৈতিক লাইনের ভেতর বিরাট বিপদ ও সমস্যা দেখছে।
আনন্দবাজার পত্রিকা ঘটনার পরের দিন অর্থাৎ ১৬ আগস্ট মোদির বক্তব্য নিয়ে বেশ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ তারা তখনো ছিল খোশমেজাজে, কারণ বিপদ তখনো কেউ তাদের মনে করিয়ে দেয়নি। এ দিনের আনন্দবাজারের দু-দু’টি রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, ‘ভারত-পাক সঙ্ঘাতের নয়া কেন্দ্র চিরবিদ্রোহী বালুচিস্তান’ এবং ‘কাশ্মিরের জবাবে বালুচ তাস, পাকিস্তানকে ফের খোঁচা মোদির’– যা তাদের স্পষ্ট উচ্ছ্বাসের প্রকাশ। আনন্দবাজার সবসময় তাতানো সেনসেশনাল আর খুবই সস্তা জাতীয়তাবাদী শিরোনামে রিপোর্ট লিখে থাকে। এই উচ্ছাস তেমনই। তবে সে হানিমুনের পিরিয়ড এখানেই শেষ। এর পরের দিন থেকে আনন্দবাজারসহ সব মিডিয়া, কূটনীতিক সবাই খুবই সতর্ক, যার প্রতিফলন দেখা যায় মিডিয়া রিপোর্টগুলোতে। পরের দিন ১৭ আগস্ট থেকে মিডিয়া পুরো উল্টে যায়। যেমন এবার আনন্দবাজারের রিপোর্টের শিরোনাম হল, ‘লাভ কী হবে বালুচ তাসে, উঠছে প্রশ্ন’ অথবা আরও একদিন পর ১৮ আগস্টের রিপোর্ট, ‘বালুচিস্তান নিয়ে বেপরোয়া হতে গিয়ে মোদি এখন ঘোর কূটনৈতিক প্যাঁচে’। এখানে ভারতীয় বাংলা পত্রিকার রেফারেন্স দিয়ে বাংলায় বুঝানোর সুবিধা নিলাম। ইংরেজি পত্রিকা রিপোর্টগুলোও কমবেশি একই রকম।
তাহলে কূটনীতিক বা মিডিয়াকর্মীরা এতে কী বিপদ দেখলেন? তারা আসলে বলতে চান মানবাধিকার রেকর্ডের রিপোর্ট নিয়ে পাকিস্তানের সাথে ভারত প্রতিযোগিতা করলে তাতে পাকিস্তানের যা হবে হোক, কিন্তু ভারতের কাপড় খুলে যাবে। কারণ জন্ম থেকেই বিচ্ছিন্নতাবাদ বা রাজনৈতিক আন্দোলনের হুমকি সামলাতে গিয়ে ভারত মারাত্মক দুস্থ ও বিপজ্জনক অবস্থায় আছে; কারণ তার মানবাধিকার রেকর্ড খুবই খারাপ। ফলে মানবাধিকারের কথা যত চেপে রাখা বা এড়িয়ে যাওয়া যায় ততই ভাল।
তাই আনন্দবাজার লিখছে, “…দ্বিধাবিভক্ত দেশের কূটনৈতিক এবং রাজনৈতিক শিবির। অনেকের প্রশ্ন, ইসলামাবাদের ঢিলের বদলে পাটকেল ছোড়ার এই নতুন পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে দাঁড়াবে কি না?”। আর সবশেষে লিখছে, তবে কূটনীতিকদের একাংশের মত, “বালুচিস্তান নিয়ে ভূকৌশলগত খেলা চালিয়ে পাকিস্তানের ওপর চাপ তৈরি করা যাবে। কিন্তু তাতে কাশ্মির সমস্যা মিটবে না। বালুচিস্তানের সাথে চিন ও ইরানের স্বার্থও জড়িত। মোদির এই তাসে ওই দু’টি দেশও ক্ষুব্ধ হবে বলেই মত অনেক কূটনীতিকের”। যদিও মোদীর এই মানবাধিকার বয়ানের লাইনের আরও এক আসল কারণ আছে তা এখানে আনন্দবাজার বলে নাই। সেটা এই রচনার শেষের দিকে আনব।
অর্থাৎ এখানেও আসল কারণ লুকিয়েছে মিডিয়া রিপোর্ট। সাবেক পররাষ্ট্র সচিব ও কংগ্রেসের সাবেক বিদেশমন্ত্রী সলমন খুরশিদ, তিনি আসল কারণ কিছুটা বলেছেন। আনন্দবাজার বলছে, সলমন খুরশিদের মতে, “অন্য দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি নিয়ে ভারতের উদ্বেগ রয়েছে ঠিকই। কিন্তু খোলাখুলিভাবে তা নিয়ে ভারত নাক গলায় না। …সে দেশের নেতাদের কাছে ঘরোয়াভাবে আমরা উদ্বেগ জানাই ঠিকই। কিন্তু সেটাকে কখনো নীতি হিসেবে ব্যবহার করি না। তাহলে পাকিস্তানের সাথে আমাদের পার্থক্য কী হলো? …বালুচিস্তান নিয়ে ভারত গলা চড়ালে পাকিস্তানও কাশ্মির নিয়ে আরো সরব হওয়ার সুযোগ পাবে”। তবে কংগ্রেস দল সলমন খুরশিদের কথাকে নিজ দলের কথা তা বলতে পারেনি। বরং বলেছে এটা সলমনের ব্যক্তিগত মতামত। আনন্দবাজার এর কারণ ব্যাখ্যা করে বলছে, “ভোটের রাজনীতির কথা ভেবে কংগ্রেস মোদির পাকিস্তান বিরোধিতা থেকে দূরে যেতে চায়নি। তাই এমন সিদ্ধান্ত”।
এখানে এখন একটা তথ্য দেইয়া যাক। পাঠকের মনে হতে পারে এগুলো ভারত-পাকিস্তানের “সাদিও পুরানা” ক্যাচাল, এতে আমাদের কী! এমন দেশী পাঠককে সন্তুষ্ট করার জন্য তথ্যটি হল, আমাদের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সম্প্রতি ভারত সফরে গিয়েছিলেন। তিনি সেখানকার তথ্যমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ শেষে ইংরেজি দৈনিক ‘দি হিন্দু’ পত্রিকার সাথে কথা বলেছেন। ওই পত্রিকার এসংক্রান্ত রিপোর্টের শিরোনাম, ‘মোদীর বেলুচিস্তান ইস্যুতে বাংলাদেশের সমর্থন’ (Bangladesh backs Modi on Balochistan)। ওই রিপোর্ট থেকে দু’টি উদ্ধৃতি আনব এখানে। এক. ইনু বলেছেন, “বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে (বেলুচ) মুক্তি আন্দোলন সমর্থন করতে বাধ্য এবং আমরা শিগগিরই বেলুচিস্তান প্রসঙ্গ আমাদের সরকারের নীতি ঘোষণা করব”। এরপর উদ্ধৃতি দুই. “দক্ষিণ এশিয়ায় সীমাপারের টেররিজম পাঠিয়ে আর বেলুচদের মতো গণতান্ত্রিক জনগোষ্ঠীর ওপর তাদের নিজ ভূখণ্ডে নির্যাতন করে ইসলামাবাদ কী পেতে চায় তা ব্যাখ্যা করা উচিত”।
মানবাধিকারের নীতিগত দিক থেকে এবং সে বিচারে আমাদের তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্য সঠিক। যেকোনো মুক্তি আন্দোলন বা রাজনৈতিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারি নির্যাতনের কারণে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ খুবই মারাত্মক। কিন্তু তবু তথ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে ভারত সন্তুষ্ট হয়েছে কি না বলা মুশকিল। কারণ, যে কেউই ওই একই বাক্যে বেলুচ শব্দের জায়গায় কাশ্মির আর ইসলামাবাদের জায়গায় দিল্লি বসিয়ে ফেলার সুযোগ আছে। এতে ভারতের কোনো সরকারি পাঠক খুশি না হয়ে উল্টো বিপদ দেখে ফেলতে পারেন।

সবশেষে এখানে মোদীর মানবাধিকার কর্মী হবার এই লাইন কেন নিলেন এর আসল কারণ নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। এটা সেপ্টেম্বর মাস। প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহ ২৫ তারিখের আশেপাশে নিউইয়র্ক বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের নিয়ে সরগরম থাকে। কারণ জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলি বা সাধারণ পরিষদের বৈঠক চলে। বিগত ১৯৪৮ সাল থেকে জাতিসংঘের মূল রাজনৈতিক ক্ষমতাধর নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মীরে গণভোট দিবার এক প্রস্তাব পেন্ডিং বা চাপা পড়ে আছে। এজন্যই ভারত বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের আগে কবুল করিয়ে নিয়ে রাখে যে, “কাশ্মির ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু”, ভারত এই ইস্যুর “কোনো আন্তর্জাতিকায়ন চায় না”।  কাশ্মীরের অসন্তোষ চলছে। এবারের বুরহান ইস্যুতে এপর্যন্ত প্রায় ৭৫ এর উপরে মানুষ সেখানে মারা গিয়েছে।  তাই ভারতের আশঙ্কা পাকিস্তান এবারের জাতিসংঘের জেনারেল এসেম্বলিতে কাশ্মীর ইস্যুকে সরগরম করার চেষ্টা করবে। তাই পালটা কৌশল হিসাবে আগেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের আর টেররিজমের ইস্যু তুলে রাখার কৌশল নিয়েছে ভারত। অন্যান্য মিডিয়া ব্যাপারটা আবছা ভাষায় বললেও ভারতের livemint পত্রিকা স্পষ্ট করে লিখেছে পাকিস্তান ২২ জন ডিপ্লোম্যাট নিয়োগ দিয়েছে যারা কাশ্মীরে ভারতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ইস্যু নিয়ে ভারতের বিরুদ্ধে লবি করবে। মোদীর ভাষ্য জাতিসংঘে এই লড়াইয়ে জিতবার জন্যই সে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে। তাই এবারের G20 বা টপ ২০টা অর্থনীতির রাষ্ট্রের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেল গত ৫ সেপ্টেম্বর চীনে। মোদী সেখানকার বক্তৃতায় নাম না ধরে ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও টেররিজমের অভিযোগ তুলে বক্তৃতা করেছেন। আর ওদিক সিপিএম এর সীতারাম ইয়াচুরী মোদীকে অভিযোগ করছেন যে তিনিওই পাকিস্তানকে জাতিসংঘে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনি বলছেন,

We are giving an opportunity to Pakistan by raising the Balochistan issue. Now Pakistan may say that since India is taking about Balochistan, which is an integral part of that country, they have the right to talk about Kashmir. With this kind of foreign policy, we are giving an opportunity to others to internationalise the Kashmir issue, Mr. Yechuri said.

অর্থাৎ ইয়াচুরি বলতে চাইছেন, আমরা সবসময় বলে এসেছিলাম, “কাশ্মীর ইস্যু ইন্টারনাশনালাইজ করতে দিব না। সেখান থেকে মোদী সরে আসাতেই এটা ঘটতেছে”। এখন দেখা যাক, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমরা কী দেখব। আগামি নভেম্বরে সার্ক সম্মেলন বসার কথা পাকিস্তানে। আদৌও তা হবে কিনা তা পুরাটাই নির্ভর করছে এই সেপ্টেম্বরের ফলাফল কেমন কী হয়, তিক্ততা কেমন মাত্রায় ছড়ায় ইত্যাদি অনেক কিছু উপরে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সরকার প্রধান যেতে পারছেন না বলে প্রচার হওয়া শুরু করেছে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

[এই লেখাটা এর আগে দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকায় অনলাইনে ২১ আগষ্ট ২০১৬ (প্রিন্টে ২২ আগষ্ট) ছাপা হয়েছিল। এখানে তা আবার আরও অনেক কিছু সংযোজন ও এডিট  করে আবার ফাইনাল ভার্সান আকারে ছাপা হল।]