বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মোদি আবার বিবিসিকে ভাড়া করেছে
গৌতম দাস
১০ ডিসেম্বর ২০২৫ বিকাল ০৪ঃ ৩১
https://wp.me/p1sCvy-6be
গত পরশু আবার বিবিসি বাংলা ভাড়া নিয়েছে মোদি সরকার। হাসিনার পলায়নের পর গত পাঁচ মাসে এটা হল মোদির তৃতীয়বার বিবিসি ভাড়া নেওয়া। টেম্পো-সিএনজিতে যেমন লেখা থাকে ভাড়ায় চালিত এটা অনেকটা সেরকম। বিবিসি বাংলার উচিত তার নিজের কপালে এমন একটা সাইনবোর্ড টাঙ্গিয়ে দেয়া যে ভাড়ায় চালিত জার্নালিজম করি আমরা! এখন মোদি ভাড়ায় চালিত জার্নালিজম এর মানে কী, এমনটা তারা পছন্দ করে কেন?
এর জবাব হল, দায়দায়িত্ব না নিয়ে মিডিয়ায় যা মনে চায় কথা ছড়ানো। যেমন বিবিসি বাংলায় এধরণের রিপোর্ট করতেছে শুভজ্যোতি ঘোষ যিনি, আমি আগে অনেকবার বলেছি, আরএসএস নেতা তথাগত রায়ের শিষ্য! এতে মোদির সুবিধা হল তিনি দাবি করবেন যে শুভজ্যোতির এই লেখার সাথে আমার সরকারের সম্পর্ক নাই। এটা অনেকটা চিন্ময়-ইসকনকে দিয়ে বাংলাদেশে মোদি সরকারের দাঙ্গা বাধানোর চেষ্টা যেটাকে মোদি সরকার আবার অস্বীকার করবেন যে চিন্ময়-ইসকন মোদি সরকারের কেউ নয়! যদিও চিন্ময় গ্রেফতার হয়ে গেলে তখন কিন্তু মোদি খোলস ছেড়ে ন্যাংটা হয়ে চিন্ময়-ইসকনের পক্ষে বিবৃতি দিবে! এই হল মোদির ভাড়ায় চালিত চিন্ময়-ইসকন ততপরতা অথবা ভাড়ায় চালিত বিবিসি জার্নালিজম কিনে পরিচালনা!
এবারের শিরোনামঃ
দিল্লি কি অবশেষে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করতে চাইছে?
বলাই বাহুল্য বিবিচির এমন রিপোর্টের স্টাইল হবে যেন বাংলাদেশের জন্য এটা সৌভাগ্য যে ইন্ডিয়া যেন দয়া করছে – এভাবে লেখা। যেমন এখানে আমরা দেখছি লেখা হয়েছে – দিল্লি কী (দয়া করে) ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক সহজ করতে চাইছে! আর ভিতরে মানে রিপোর্টের বডিতে লেখা হয়েছে একটা মৌলিক অনুমানে ধরে নেয়া কথা যেন বাংলাদেশ এক ইন্ডিয়ান কলোনি; ফলে ইন্ডিয়া যা দাবি করবে বাংলাদেশকে সেটাই করতে হবে। এককথায়, বাংলাদেশ যেন ইন্ডিয়ান ডিকটেশন [dictation] বা ফরমানে চলা এক দেশ! অর্থাৎ স্বাধীন-সার্বভৌম কোন দেশ নয়; ফলে এটা ইন্ডিয়ার হুকুমে চলা। তাই এই লেখায় ইন্ডিয়ান যারাই কথা বলেছেন তারা বাংলাদেশ তো ইন্ডিয়ান হুকুমে চলা দেশ এই মিথ্যা ভ্যানিটি বা অনুমানে ধরে নেয়া ভাবনার উপর দাঁড়িয়ে কথা বলে গেছেন। আর যেখানে বিবিসির শুভজ্যোতির কাজ হচ্ছে এমন অনুমানকে প্রশ্ন না করে চলতে দেয়া। মোদির ইন্ডিয়ার এমন খায়েসকে জায়গা করে দেয়া। কারণ, শুভজ্যোতিও তো এক ভাড়ায় চালিত বালক!
এটা আবার বলা যায় অনেকটা যেন ধরে নেওয়া যে গত ষোল বছরের (ইন্ডিয়ার বসানো) হাসিনা শাসন যেন এখনও আছে, চলছেই! তাই এই ডিকটেশন স্টাইলে বক্তব্য বা দাবি! এজন্যই যেটাকে আমি ভদ্র ভাষায় বলেছি – এটাই ইন্ডিয়ান হেজিমনি বা আধিপত্যবাদ। এক হিন্দুত্ববাদী আধিপত্য কায়েমের প্রচেষ্টা! কাজেই বাংলাদেশের আগামি রাজনীতির মুখ্য বৈশিষ্ট ইন্ডিয়ান আধিপত্য-বিরোধী এটাই হবে! যদি না হতে পারে যে রাজনীতির ঝোঁক টা বিএনপির মধ্যে উঁকি দিতে দেখা যাচ্ছে এর মুখ্য বৈশিষ্ট হবে ইন্ডিয়ান আধিপত্য এর পক্ষে!
এবার সোজা আসা যাক মূল প্রসঙ্গেঃ
বিবিসির এধরণের তৃতীয় রিপোর্ট দিয়ে মোদির ইন্ডিয়া যা বলতে চেয়েছে তা হল, তারা এখন বাংলাদেশের সাথে দ্রুত সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চায়। কিন্ততু এতে যেন তারা বাংলাদেশকে একটা বিরাট ফেবার করছে এই ভাব ফুটিয়ে ধরে তাদের ইউজুয়াল কিছু গোয়ার্তুমিও সাথে রেখেছে যেমন, “তাদেরকে বড় ভাই মানতে হবে”। যেটা অন্যভাষায় বললে তারা দুটা শর্ত দিয়েছে। বিবিসি লিখেছেঃ
“ভারতের দিক থেকে এই প্রচেষ্টা হবে পুরোপুরি ‘শর্তাধীন’ – অর্থাৎ ভারতের দেওয়া বিশেষ কয়েকটি শর্ত পূরণ না হলে সম্পর্ক এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে দিল্লি সম্ভবত খুব একটা গরজ দেখাবে না”।
“…..আর এর মধ্যে বাংলাদেশে হিন্দু তথা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা কিংবা পরবর্তী নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অন্তর্ভুক্ত করার মতো অতি স্পর্শকাতর বিষয়ও থাকতে পারে”।
এতটুকুই না তবে এটাই মুল দাবি! মানে সাথে খুচরা দাবিও কিছু আছে সেকথায় পরে আসব।
তবে ইন্ডিয়ার আগ্রহ যে একেবারে গলে পড়তেছে তার ছাপ-ইঙ্গিত রেখে বিবিসি লিখছেঃ
“গত তেসরা জানুয়ারি (শুক্রবার) দিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সাপ্তাহিক ব্রিফিং-এ বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক প্রসঙ্গে মুখপাত্র নতুন দু’টো শব্দ যোগ করেন।
মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল একটি প্রশ্নের জবাবে বলেন, “ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের সাম্প্রতিক ঢাকা সফরের পরই প্রেস বিবৃতির আকারে এই মনোভাব স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, ভারত একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীল, ইনক্লুসিভ বাংলাদেশকে সমর্থন করে”।”
বিবিসি এরপরে নিজেই মন্তব্য জুড়ে দিয়ে লিখছেঃ “বছরখানেক আগেকার চেয়ে ভারতের এই বক্তব্যে নতুন শব্দ দু’টো হচ্ছে – গণতান্ত্রিক আর ইনক্লুসিভ (অন্তর্ভুক্তিমূলক)“।
ইন্ডিয়া আসলে বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর রাষ্ট্র ধারণাটা এখনও বুঝল নাঃ
এভাবে শিরোনামে আ লিখেছি যে “ইন্ডিয়া আসলে বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর রাষ্ট্র ধারণাটা এখনও বুঝল না” – ঠিক এটাই বুঝাতে চেয়েছি। আসলে এখন এটা বলাই যায় যে এখন পর্যন্ত দুনিয়ার ইতিহাসের মোটা দাগে তিনটা পর্যায় দেখা যাচ্ছেঃ এক. বিশ্বযুদ্ধ-পুর্ব কলোনিদখলের দুনিয়া দুই. কলোনিমুক্ত আমেরিকান নেতৃত্বে গ্লোবাল অর্ডারের দুনিয়া আর তিন. (এটা আসন্ন মানে হবু) চীনের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বে উইন-উইন [win-win] এর দুনিয়া।ীভাবে তিনটা পর্ব ভাগ করেছিল একই কলোনিদখল ধারণাটার ভিত্তিতে। বিশ্বযুদ্ধ-পুর্ব মানে ১৯৪৫ সালের আগের দুনিয়াটা ছিল ছোট বড় পাঁচ (বৃটিশ, ফরাসী, ডাচ, স্পানিশ ও পর্তুগীজ) কলোনিদখলদারের দুনিয়া; যারা সারা দুনিয়ার কোন ভুখন্ড খালি ছিল না সবটাই এই পাঁচ কুতুবের কেউ না কেউ দখল করে রেখেছিল – এমনই সেই দুনিয়াটা। ফলে প্রধান বৈশিষ্ট কোন আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বাণিজ্য বিনিময় নয় (সেখানে ছিল না) বংরং কলোনি দখল আর লুট – আমাদের মত দেশের অর্থনীতির সারপ্লাস বা বাড়তি মূল্য বা সঞ্চয় সব লুট ও নিজ কলোনি মালিক দেশে পাচার – এই ছিল ওর মুখ্য বৈশিষ্ট।
আর দুইঃ বা দ্বিতীয় ধারার মূল বৈশিষ্ট হল, অন্যের ভুখন্ড কলোনি করে রাখা অপরাধ মানে একটা কলোনিমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের দুনিয়া এবং এমন স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোর সকলকে সদস্য করে নিয়ে একটা পুঞ্জীভুত [ইউনাইটেড] রাষ্ট্রপুঞ্জ [United Nations বা জাতিসংঘ] প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থায় গড়া একটা গ্লোবাল অর্ডার [Global Order] দাঁড় করানো। যার আরেক বৈশিষ্ট হল, আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বাণিজ্য এর গ্লোবাল এক্সচেঞ্জ বা বিনিময় ব্যবস্থা স্থাপন [আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে]। প্রাতিষ্ঠানিকতা হিসাবে মুলত জাতিসংঘ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক; এদের মাধ্যমে আমেরিকার নেতৃত্বে একটা গ্লোবাল অর্ডার (গ্লোবাল সিস্টেম) প্রতিষ্ঠা পায় তাতে যেটা মূলত এক গ্লোবাল পলিটিক্যাল সিস্টেম আর একটা গ্লোবাল ইকোনমিক সিস্টেম গড়ে তুলেছে। এভাবে এক
আর তিনঃ এটাকে বলেছি চীনের গ্লোবাল অর্থনৈতিক নেতৃত্বে উইন-উইন বৈশিষ্টের দুনিয়া। এই পর্বকে বুঝতে হবে আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বাণিজ্য বিনিময়ের দ্বিতীয় পর্যায় হিসাবে। আর এই দ্বিতীয় পর্যায়টাই উইন-উইন পর্যায়।
অর্থাৎ হবু চীনের নেতৃত্বের দুনিয়াতেও আগে তৈরি হওয়া গ্লোবাল অর্ডারেও আরো পরিবর্তন আসবে। কিন্তু সেটা পলিটিক্যাল ও ইকোনমিক দুই ক্ষেত্রেই নয় বরং মূখ্যত সেটা ইকোনমিক অর্ডার বা সিস্টেমে। মানে গ্লোবাল বিকাশ পর্বের এই তিনটা পর্যায়কে যদি গরীব দেশের অর্থনীতির সারপ্লাস বা বাড়তি মূল্য বা সঞ্চয় সব লুট ও নিজ কলোনি মালিক দেশে পাচার – এই চিন্তা ফ্রেমের মধ্যে থেকে দেখি তবে প্রথম পর্বটা হলঃ সারপ্লাস পশ্চিমে নিয়ে যাওয়া আর যেখানে দ্বিতীয় পর্বটা হল, ঐ সারপ্লাস ফিরে পশ্চিম থেকে পুবে (এশিয়া ও আফ্রিকা ল্যাটিনো ভুখন্ডে) যার নতুন নাম বিনিয়োগ – এই নামে লূট করা সারপ্লাস এর ফিরে আসা।
তাহলে তৃতীয় পর্বের বৈশিষ্ট কী? উইন-উইন কেন?
এই পর্বের মূল বৈশিষ্ট হবে ১। স্বীকার করে নেয়া হবে পুরানা তৃতীয় বিশ্ব (বা একালে চীন যেটাকে গ্লোবাল সাউথ বলছে) ধারণার দেশগুলোকে। সেটা এই অর্থে যে গ্লোবাল আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বাণিজ্য বিনিময় ব্যবস্থায় তোমরা আসলে খুবই গুরুত্বপুর্ণ পার্টনার। অর্থাৎ আগে যেমন ভাবা হয়েছিল – তোমরা তৃতীয়বিশ্ব হইলা আমরা যাদের লুট করবো সে আইটেম মাত্র। তোমাদের ভুমিকা হইল নিজেকে লুট হতে দেওয়া। আর সেখান থেকে (দ্বিতীয় পর্ব বলেছি যেটাকে) আমেরিকান নেতৃত্ব যে আন্তঃরাষ্ট্রীয় পণ্য বাণিজ্য বিনিময় এর যাত্রা এতে ইতিবাচক দিকটা হল, আমাদের মত দেশ বিনিয়োগ পেয়ে পুরানা স্থবির অর্থনীতি সচল হয়েছিল। যদিও এই বিনিময়টাই ছিল অসম। তাই তৃতীয় পর্বে এসে এই অসাম্য অনেকটাই কমবে পুরাটা নির্মুল না হলেও। আর সবচেয়ে বড় কথা এখানে গরীবদেশকেই বড়লোকেরা সাহায্য করতে এসেছে তাই তারা দাতা এই ভাবনাটা ঢিলা হয়ে যাবে। এর জায়গা নিবে পার্টনার কনসেপ্ট। যেমন বাংলাদেশ একটা ভাল বিনিয়োগের জায়গা বলেই চিনা বিনিয়োগ গন্তব্য বাংলাদেশ! তাই বাংলাদেশে চীনের কাছেও তার জন্যও দরাকারি এক গুরুত্বপুর্ণ পার্টনার। এটাই একটা বিনিময়ের উভয় প্রান্তের রাষ্ট্রের লাভালাভ এর ধারণা – তাই এটা উইন-উইন! যে বিনিয়োগকারী রাষ্ট্র উইন-উইন দিকটা আমল না করবে সে ব্যবসা-সম্পর্ক হারাবে। এছাড়া শেয়ার্ড ভ্যালু চেন ধরনের এক নয়া উতপাদন ব্যবস্থা আসতেছে। এখানে সেসব দিক বিস্তার করলাম না। আমাদের মূল প্রসঙ্গে ফিরে যাই।
কিন্তু ইন্ডিয়া সেই তিমিরেঃ
যেটা বলছিলাম ইন্ডিয়ান বুঝাবুঝিতে (একাদেমিক বা ব্যবহারিক রাষ্ট্র-সরকারে) সবখানে রাষ্ট্র তাদের কাছে কে কাকে কলোনিদখল করে আধিপত্য প্রভাবে রাখতে পারে এর বেশি কিছুই না। এটাই সেট করে দিয়ে যাওয়া নেহেরুয়ান রাষ্ট্র বুঝাবুঝি। এর সারকথা হল, রাষ্ট্র মানেই কে বুদ্ধি খাটিয়ে কার উপর আধিপত্য খাটাতে পারে যেন এই খেলা একটা। যেটা আসলে শাসক বলতে যদি আপনি বৃটিশ শাসক বুঝেন আর এটাই স্থায়ীভাবে শাসক সম্পর্কে ধারণা জ্ঞান করেন তাহলে যেখানে আপনি পৌছাবেন। কাজেই দুনিয়ার তাবত পরিবর্তনগুলো হচ্তেছে বা আসছে তাতে অন্যকোন দিকে তাকানো যাবে না বরং এতে অন্যরাষ্ট্রকে নিজ কলোনি বা আধিপত্যের ক্ষেত্র হিসাবে ব্যবহারের যেসব সুযোগ যদি দেখতে পাওয়া যায় তবে ঝাপায় পরে গ্রহণ করা -এটাই ইন্ডিয়ায় কংগ্রেস-বিজেপি নির্বিশেষে শাসক চিন্তা যা আসলে তাদের রাষ্ট্র-বোধ! এটাই আসলে নেহেরুয়ান আধিপত্যকামী এক রাষ্ট্র-চিন্তা! ইন্ডিয়া তাই সারা দুনিয়াতে না পারুক তার পড়শী এলাকায় এমন হেরুয়ান আধিপত্যকামী এক রাষ্ট্র-চিন্তা দিয়ে পরিচালিত হতে যায়। এটাই তার পররাষ্ট্রনীতি বা বোধ!
অতএব বাংলাদেশ ইন্ডিয়ার চোখে আধিপত্য কায়েম করে একে নিয়ন্ত্রণ করার এক রাষ্ট্র মাত্র।
তবে এই সুযোগটা সে পেয়েছিল ২০০৭ সালের আমেরিকা বাংলাদেশকে ইন্ডিয়ার হাতে তার আধিপত্যে আমাদেরকে সঁপে দিয়েছিল বলে। বিনিময়ে ইন্ডিয়া আমেরিকার চীন ঠেকানী (অর্থনৈতিক উত্থান ঠকানী) হাতিয়ার হতে পারবে এই অনুমানে, এই চুক্তিতে। কিন্তু ধর্মের কল বাতাসে নড়ে! মানে চীনের প্রভাব (যেটাতা চীনের ঋণ-বিনিয়োগদানের সক্ষমতা থেকে উতসারিত) এটা কমে যাওয়া বা আমেরিকার তা ঠেকিয়ে দেওয়া দূরে থাক কোনই ফয়দা আনে নাই। বাংলাদেশে চীনা ঠেসে দেওয়া ঋণ-বিনিয়োগ এর বাস্তবতা ও চীনের সক্ষমতাই বলে দেয় আমেরিকার চিন্তা-আকাঙ্খা ছিল অবাস্তব!
কাজেই বাংলাদেশের উপর ইন্ডিয়ার আধিপত্য খাটানোর কোন বাস্তব সুযোগ অনুপস্থিত!
কিন্তু এসব বুঝাবুঝি ইন্ডিয়ার একাদেমিক, রাষ্ট্রীয় নীতি বা কূটনীতিক জ্ঞানের মধ্যে অনুপস্থিত। নেহেরুয়ান রাষ্ট্র বুঝাবুঝি বা ১৯৪৫ সালের পরের দুনিয়াটা আসলে কী সেই বোধ না থাকার জন্য।
কাজেই আমরা এখন ফিরে যাই বিবিসি যেটা লিখেছে ভারতের “…প্রেস বিবৃতির নিজ মনোভাব আকারে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে যে, (বাংলাদেশে) ভারত একটি গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীল, ইনক্লুসিভ বাংলাদেশকে সমর্থন করে”। আর এই বিবৃতিতে নাকি দুইটা নয়া শব্দ আছে গণতান্ত্রিক আর ইনক্লুসিভ।
যার অর্থ আবার বিবিসি-ই বলে দিয়েছে সেটা হল মানুষের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার সে দেশে ক্ষমতায় আসুক, আর দুই বা ইনক্লুসিভের অর্থ হল, – “সমাজজীবনে সংখ্যালঘুদের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত” – আর “রাজনীতিতে সব ধরনের শক্তিকে ঠাঁই দেওয়ার” মানে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে দেওয়া বুঝানো হয়েছে……।
বাংলাদেশ কীভাবে চলবে সেটা কী ইন্ডিয়া ঠিক করে দিতে পারেঃ
প্রথম প্রশ্ন হল, বাংলাদেশকে কী ইন্ডিয়ার কথা শুনে চলতে হবে? কেন? বাংলাদেশ কী ইন্ডিয়ার কলোনি?
ইন্ডিয়া যদি বাংলাদেশের হিন্দুদের রক্ষাকর্তা হিসাবে নিজেকে হাজির করতে চায় তাহলে আমরাও কী ভারতের মুসলমানদের রক্ষাকর্তা হবো না কেন? মোদি সেটা মানবেন না কেন? সবার আগে মোদির ইন্ডিয়ার সবাইকে এর জবাব দিতে হবে।
দুইঃ এটা বড়ই তামাসার যে ইন্ডিয়া এখন ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার চাইতেছে। কেন? তাহলে গত ১৬ বছর হাসিনা কীভাবে ক্ষমতায় ছিল? তখন কেন এমন শর্ত ইন্ডিয়ার মুখ থেকে বের হয় নাই? তার মানে ইন্ডিয়া আসলে ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার নয় হাসিনাকেই আবার যেকোন ভাবে ক্ষমতায় সরকারে দেখতে চাইছে।
আসলে হাসিনা ও তার দল আগামি রাজনীতিতে বা নির্বাচনে অংশ নীতে পারবে কিনা সেটা ঠিক হবে আমাদের আদালতে! তাদের উপর যে গুম-খুন, অপহরণের মামলা আছে সেই মামলার রায়ের দ্বারা এটা নির্ধারিত হবে। আর এনিয়ে ইন্ডিয়ার কোন কিছু দাবি করার কোন সুযোগ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে নাই।
অথচ বিনা সিক্রি যার জীবিনটা কেটেছে একজন পেশাদার কূটনীতিক হিসাবে তিনি এসব দাবি করছেন। যেন তিনি কূটনীতিক নয় এক দাইনি বুড়ির পরিচয় পেতে চাইছেন!!!
যেমন শর্ত দিচ্ছেন আমরা পাকিস্তানের সাথে কেমন কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখব। বলছেন, “বাংলাদেশের মাটিকে পাকিস্তান যে কোনওভাবে ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে বা সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে ব্যবহার করবে না, সেটা নিয়ে শতকরা একশোভাগ নিশ্চিত হতে পারলে তবেই ভারত এই সম্পর্ক নিয়ে এগোতে পারবে”, বলেন ভিনা সিক্রি। এখন তামাসাটা হল, মোদির ইন্ডিয়া ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক করেছে। এখন বিনা সিক্রির মত আমরা কী ভারতকে ইসরায়েল নিয়ে বলতে গিয়েছি? নাকি বিনা চাচ্ছেন আমরাও ইসরায়্বেল নিয়ে আমরাও মোদিকে পাল্টা শর্ত দেই???
আবার বিবিসি লিখছে, “…ভিনা সিক্রির কথায়, “যত দ্রুত সম্ভব সে দেশে নির্বাচন আয়োজনের ওপর ভারত জোর দেবে। শুধু তাই নয়, সে নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হতে হবে, এবং তাতে সব দল ও মতাবলম্বীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।”
আমরা নির্বাচন দ্রুত না দেরিতে করব এনিয়ে বিনা বলার কে? আর সব দল বলতে আমাদের আদালত হাসিনা ও লীগকে বাইরে রাখে কিনা তা ঠিক করবে সেখানে বিনা কথা বলার কে?
আসলে যেকথা বলছিলাম, ১৯৪৫ সাল পরবর্তী রাষ্ট্র ধারণাটা কোনদিকে গিয়েছে এনিয়ে সারা ইন্ডিয়াতেই বুঝাবুঝি নাই। তাই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশে বিনা সিক্রি কী দাবি করতে পারেন না সেই লাগাম-বোধও তাদের গড়ে উঠে নাই। কাজেই বিনা সিক্রি আপনি পরে আসেন……।
ইন্ডিয়ান হেজিমনি বা আধিপত্য উচ্ছেদই হবে বাংলাদেশে আগামি রাজনীতির মূল বৈশিষ্ট! এটা হতেই হবে তা আমরা আরো নিশ্চিত হলাম!!!
আর এমন হলে, মানে ইন্ডিয়া যদি আধিপত্যশীল এক কলোনি-মালিক যেন এমন থাকতেই চায় তবে, ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক সহজ স্বাভাবিক হবার হবার দরকার কী, সুযোগই বা কৈ? যেখানে সহজ স্বাভাবিক সম্পর্ক মানেই হল ইন্ডিয়ান আধিপত্য! এর কী আমাদের দরকার আছে?
লেখকঃ
গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com
আপডেটঃ সন্ধ্যা ০৭ঃ ২৫ ১০ জানুয়ারি ২০২৫


