নেপাল রাজনৈতিক অস্থিরতায়, অভিমুখ কোনদিকে


নেপাল রাজনৈতিক অস্থিরতায়, অভিমুখ কোনদিকে

গৌতম দাস

০৯ নভেম্বর ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-3fv

‘র’ এর প্রধান সীমান্ত কুমার গোয়েল, নেপালের প্রধানমন্ত্রী খাড়গা প্রসাদ অলি ও মাওবাদী নেতা পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্ড

Democrat Joe Biden won the U.S. presidential election on Saturday after a bitter campaign…… REUTERS

বিশ্বের চলতি প্রধান ঘটনায় এখন, সবশেষের কথাটা সবার আগে বলবার সময়।  জো বাইডেন বিজয়ী নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। যদিও ট্রাম্প এখনও ভুয়া আপত্তিতে ঘোঁত ঘোঁত শব্দ তুলছেন! যা এক সপ্তাহের মধ্যে মিলিয়ে যাবে। তবে এর আগের ঘটনাবলীতে গত ৩ নভেম্বরের আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল যেখানে ট্রাম্পের প্রতিদ্বন্দ্বী জো বাইডেনকে জিতে যাবার পক্ষে আগাচ্ছিল। কিন্তু বিজয়ী হতে প্রয়োজনীয় ২৭০ ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের শেষ ৬টা পূরণ হওয়ার আগেই মনে হচ্ছিল তা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। সেটা পুনঃগণনার ফ্যারে পরে পিছিয়ে ২৫৩ হয়ে যায়। এদিকে তাতে অন্তত একটা রাজ্যে (জর্জিয়া) ভোট পুনঃগণনা শুরু হয়েছিল। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ফলাফলের পার্থক্য ১% এর নিচে হলে সেখানে ঐ পরিস্থিতিতে কেউ অনুরোধ না করলেও আপনাতেই পুনঃগণনা শুরু হয়ে যায়। তাতে আগে যদিও ফলাফলের সামগ্রিক ঝোঁকটা বাইডেনকে বিজয়ী করার দিকে ছিল তা থমকে দাঁড়িয়ে যায়। আর যতক্ষণ ফলাফল নিশ্চিত নয় ততক্ষণ এ নিয়ে এর চেয়ে বেশি কথা তখনই  আর না বলা ভাল মনে হয়েছিল। যদিও আভাস বলে সে শব্দটা আছে সেটা বিচারে এসব বুঝাবুঝির ক্ষেত্রে আমার চোখে এক অদ্ভুত ও সঠিক ইঙ্গিত দিবার উৎস হাজির হয়েছিল – ওয়াল স্ট্রিট বা আমেরিকান শেয়ার মার্কেটকে, যা স্বার্থসংশ্লিষ্টরা ছাড়া খুব কম মানুষই জানে বা আমল করে থাকে। ঘটনা হল, নির্বাচনি ফলাফল কোথায় গিয়ে দাঁড়ায় তাতে রাজনীতিবিদের চেয়েও মারাত্মকভাবে যায়-আসে যাদের তারা হল ওয়াল স্টিটে যারা সারাদিন কাটান তাদের স্বার্থ। তাই মার্কেটের প্রতিক্রিয়া্ হল, নির্বাচনি ফলাফলের অভিমুখ বুঝবার বেস্ট উপায়। হয়েছেও তাই। আমেরিকান বাজার বাইডেন জিততেছে ধরে নিয়ে গত তিনদিন ধরে বাজার চাঙ্গা!

সর্বশেষ পেলসিলভানিয়ার ইলেক্টোরাল কলেজ আসন সাথে গোনায় ধরে বাইডেন এখন ২৭৩ অর্থাৎ তিনিই প্রথম ২৭০ মার্ক ছাড়িয়ে গেলেন ফলে বিজয়ী তিনি। এছাড়া এখনও যে কয়টা গণনার সমাপ্তি টানতে বাকি তা সাথে ধরলে অনুমান করা হচ্ছে বাইডেন ৩০৬ পর্যন্ত যেতে পারে।

ওদিকে ফলাফল পুরা প্রকাশিত হওয়ার আগেই এখনও ক্ষমতাসীন ট্রাম্প নিজের বিজয় ঘোষণা করে বক্তৃতা প্রচার করে দিয়েছেন। আর সাথে তিনি এমন একটি ধারণা প্রচার করে চলেছেন যেন, তিনি বা তাঁর দল এখন আমেরিকান সুপ্রিম কোর্টে অসংখ্য (ভিত্তিহীন হলেও) অভিযোগ নিয়ে একবার হাজির হতে পারলেই আদালত ট্রাম্পের বিজয়ের পক্ষে রায় দিয়ে দেবেন। কিন্তু কেন এমন হবে? এর জবাবটাও তিনি প্রচার-প্রপাগান্ডা করছেন আরেক কানকথা ছড়িয়ে যে, এখনকার সুপ্রিম কোর্টের ৯ জন বিচারকের মধ্যে ৬ জনের নিয়োগ হয়েছে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টদের হাতে; মানে তারা কনজারভেটিভ চিন্তার মানুষ এ’হল অনুমান। অতএব এ’কারণে ট্রাম্পই নিজের জিতে যাবার পক্ষে আদালতের রায় পাবেন। কিন্তু এটা খুবই আবেগি এবং সরল দলবাজি চিন্তা। আমেরিকার সাধারণ সমাজ ও বিচার সমাজ কি এতই নিচা ও হাল্কা-চিন্তা করা লোক – গর্ধব বোকা আর অবিবেচক? এখানে সবচেয়ে বড় ভুল-অনুমানটা হল সাধারণ  আমেরিকানদেরকে আবেগি মনে করা।  কাজেই এই অনুমান ভিত্তিহীন। যদিও বিচারকদের কেউ রক্ষণশীল চিন্তার হতেই পারেন; তাই বলে কোনো যুক্তি-প্রমাণ বা শক্ত কারণ ছাড়াই কি তাঁরা রায় দিতে পারেন? এটা বেশি কথা বলা। এছাড়া আরেকটা কথা মনে রাখতে হবে, প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী ধরনের নির্বাহী ক্ষমতাধারীরা যা করতে পারেন একজন বিচারক তা পারেন না। সেটা হল, কোন নির্বাহী কোন সিদ্ধান্ত নিলে সে সিদ্ধান্তের পক্ষে কারণ তিনি প্রকাশ্যে নাও বলতে পারেন; ‘রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা’ ইত্যাদির কথা তুলে। কিন্তু একজন বিচারক রায় লেখার সময় কারণ উল্লেখ করে সেটা যে ন্যায়সঙ্গত এর সপক্ষে সাফাই দিয়েই তাকে রায় লিখতে হয়। অতএব ট্রাম্পের চাপাবাজি বা বুলি বন্ধ হবে!
আর ঠিক সে কারণে এখন আমেরিকান বিশ্লেষকরাই মিডিয়াতে মন্তব্য করছেন, বিচারককে কেবল প্রমাণ হাতে পাওয়ার পরেই আর ন্যায়সঙ্গত কারণ দেখিয়েই রায় লিখতে হবে। আর এর চেয়েও বড় কথা, বাস্তবে যেসব নির্বাচনী অসঙ্গতির অভিযোগ তুলে মামলা করা হয় বা এবার হয়েছে সেখানে কথা একটাই বলা হচ্ছে, ‘অভিযোগ দেয়া হয়েছে’ কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রমাণসহ অভিযোগ তোলা হয়নি। ফলে বিচারক তা আমলে না নেয়ার সম্ভাবনাই প্রবল হচ্ছে। তাই এক কথায় বললে, ট্রাম্প ও তার রিপাবলিকান দলের ভূমিকা এখন এতই নোংরা ও ধ্বংসাত্মক যে, যেকোন সময় জনমত উল্টে তাদের এসব তৎপরতার বিরুদ্ধে চলে যেতে পারে। আমেরিকার সাধারণ নাগরিক সারা দিন এত কঠিন বাস্তবতার মধ্যে কষ্টকর জীবনযাপন ও বসবাস করতে হয় যে, কোনো আবেগে প্রভাবিত হওয়ার চেয়ে এরও আগে কঠিন বাস্তব দিকটা তাদের আগে চোখে পড়ে। তাদের কাছে আবেগ যেন বিলাসিতা, তাই দূরে থাকে আগে থেকেই। ফলে তারা যখন দেখতে পেয়ে যাবে যে, ট্রাম্প প্রমাণ দেয়ার চেয়ে অভিযোগ তোলার দিকেই বেশি আগ্রহী তখন তারা খোদ ট্রাম্পেরই হাত ছেড়ে হতাশ হয়ে সরে যেতে দেরি করবেন না। এভাবে একবার জন-মনোযোগ হারিয়ে ফেললে এটাই ট্রাম্পের হেরে যাওয়ার বাস্তব অবস্থা পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলতে পারে। মানুষকে কষ্ট দিতে আর হতাশ করে ফেলতে ট্রাম্প ও তার দল বা সরকারের এসব কাজও আরেক দিকে প্রচণ্ড নষ্টা ভূমিকা পালন করেছে।

গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদলের কালের নির্বাচনঃ
আমেরিকার এবারের নির্বাচনটা হচ্ছে এমন এক সময়ে যখন একই সাথে গ্লোবাল নেতৃত্ব পালাবদলের কাল এটা। যেখানে বাস্তবে গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলে যাবার আগে, খুব সম্ভবত, এটাই শেষ আমেরিকান নির্বাচন অথবা যুদ্ধবাজ রিপাবলিকানদের জন্য শেষ সুযোগ। অর্থাৎ এবার ট্রাম্প যদি জিতেন, তবে গ্লোবাল নেতৃত্ব বদল তাতে থামবে না যদিও। কিন্তু একটা যুদ্ধের ভেতর দিয়ে ফলাফল হিসাবে গ্লোবাল নেতৃত্ব বদলটা আসবে হয়ত। অর্থাৎ একটি যুদ্ধপরিস্থিতির পরেই কেবল গ্লোবাল নেতৃত্বে পালাবদল ঘটবে। ট্রাম্পের এই মনোভাবের প্রতিক্রিয়াতেই যেমন সারা এশিয়া বিশেষত সাউথ-এশিয়ায় ভারতের পড়শি রাষ্ট্রগুলোর উপর প্রচণ্ড আগ্রাসী ও চাপ সৃষ্টিকারী হয়ে আমেরিকা গত কয়েক মাস থেকে গত সপ্তাহ পর্যন্ত তৎপর হয়েছিল। পম্পেই বা স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্তারা বাংলাদেশসহ নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ইত্যাদি দেশে সফরে গিয়ে এমন মরণ-চাপ তৈরি করে চলেছিলেন।
এটি সত্য যে, এবারের আমেরিকান নির্বাচন এত চাপের মধ্যে হওয়ার মূল কারণ গ্লোবাল অর্থনীতির অর্ডারের নেতৃত্বের পালাবদল একেবারেই আসন্ন, তাই। তবে বাইডেন জিতলে সেটা তুলনামূলকভাবে কম উত্তেজনা ছড়িয়ে শান্তিপূর্ণ ডায়লগের মধ্য দিয়ে ঘটার সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। কিন্তু এসব কিছুকে যা ছাড়িয়ে গেছে তা হল, বাংলাদেশ ছাড়াও নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, পাকিস্তানেও- এসব দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে নোংরামি আর খোয়াখেয়িতে ভরপুর করে তুলেছে ভারত-আমেরিকা। এরা বাধ্য করছেন এসব দেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে আমেরিকা, ভারত না চীন এভাবে কোনো একটার ‘পা-চাটা দালাল’ হয়ে তারা নিজ দেশটাকেই যেন বিভক্ত করে ফেলে এমন বেপরোয়া হোক। আর এতে আস্তে আস্তে সব হারানো ভারতের ভূমিকাও আরো মরিয়া আমেরিকান বরকন্দাজ যেন, যার কাজ হলো নিজের সঙ্কীর্ণ স্বার্থে এসব নোংরামিকে আরো তুঙ্গে তোলা।

বড় উদাহরণ বা শিকার এখন নেপালঃ
গত দু’সপ্তাহ ধরে এমনই হুমকির মুখে পড়া দেশ হল নেপাল। ইংরেজিতে ‘র’ [RAW] হল ভারত-রাষ্ট্রের বহিস্থ গোয়েন্দা সংস্থা, যার ঘোষিত প্রধান কাজই হল, প্রতিবেশী দেশে অন্তর্ঘাতমূলক ক্ষতিকর কাজ করে বেড়ানো। এসব অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করে হাত পাকানো ‘র’ এর অপারেশন ডিরেকটর ছিলেন বি রমন। যখন একটা বড় সময় ‘র’ এর প্রধান ছিলেন আর এন কাও। তাই রমনের লেখা এক বইয়ের নাম “দ্যা কাও-বয় এন্ড ‘র’ ” – আগ্রহীরা পড়তে পারেন। আবার মূলত পড়শি দেশে অন্তর্ঘাতমূলক কাজ করে বেরায় একারণে ভারতের পক্ষে ‘র’ নিয়ে প্রকাশ্যে আলোচনার সুযোগ নাই। তাই তা ভারত সরকার নিজেই করে না বা প্রায় হয় না বললেই চলে। আর এটাই স্বাভাবিক। ঠিক যেমন ওয়াশরুমে গিয়ে আমরা কী করি তা নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো আলোচনা করি না, এমন ‘নোংরা কিছু’ যেন এই প্রতিষ্ঠান। তবু নেপালে ঘটনার শুরু এই ‘র’ এর কারবার থেকেই। বর্তমান ‘র’-এর প্রধান, সীমান্ত কুমার গোয়েল তিনি, নেপাল সফরে গিয়েছিলেন গত ২১ অক্টোবর প্রকাশ্যে এবং প্রটোকল ভেঙে ‘ওয়ান-টু-ওয়ান’ নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সাথে ২ ঘণ্টা ধরে বৈঠক করে ওই দিনই ফিরে এসেছেন। এতদিন ‘র’-এর প্রসঙ্গ উঠলে তা লিখেছি – ‘ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা’ এভাবে সৌজন্যে। আজ প্রকাশ্যে লিখতে হবে। কারণ ‘র’-এর প্রধান ৯ সদস্যের টিম নিয়ে ভারতীয় বিমানবাহিনীর এক বায়ুযানে চড়ে ভিন দেশে গিয়ে প্রকাশ্যে একনাগাড়ে ১৬ ঘণ্টা (যেখানে শিডিউল ছিল ৯ ঘণ্টার) তৎপরতা চালিয়ে মধ্যরাতে নিজ দেশে ফিরেছেন। অথচ ভারতীয়দের দিক থেকে দেখলেও এমন কাজ, এটা লক্ষণ বা ইঙ্গিত হিসেবে খুবই খারাপ উদাহরণ হয়েছে। একজন প্রধানমন্ত্রীর সাথে কেন ‘র’-এর প্রধানকে মিটিং করতে হবে, বা তিনি তা করবেন? যেমন, মানুষ নিজ শরীরের মধ্যেই নিজের বর্জ্য নিয়ে ঘোরে। এর মানে এই নয় যে, আমরা তা প্রদর্শন করে বেড়াবো। এটা তো প্রটোকলেও পড়ে না। এই সফর এটা ভারতের কোনো হামবড়া ভাব বাড়বে না বা ক্রেডিট নয়। কারণ এর উল্টা মানেটা হল, ভারত যেন নিজের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কাজ ‘র’-এর হাতে তুলে দিয়েছে। যার মানে তাহলে এটা কি ইঙ্গিত যে, ভারতের বিদেশ বিভাগ ফেল করেছে, তারা অযোগ্য? কাজেই ভারতের নিজ প্রশাসনের কিছু নিয়ম প্রটোকল তো অন্তত ভারতের নিজের জন্যই মানা উচিত ছিল! এখন একটা উদাহরণ থেকে গেল যে, চাইলে ভারত সরকার এমন ‘ন্যুইসেন্স আচরণ’ করতে নেমে যেতে পারে! এছাড়া গোয়েলের এই সফরকে আড়ালে রাখতে বা ঝাপসা করে ফেলতে অনেক ভারতীয় মিডিয়া পুস্পদাহালের সাথে গোয়েলের সাক্ষাত হয়েছে বলে মিথ্যা দাবি করেছে। অনেক মিডিয়া মাধব চন্দ্র নেপাল সহ আরো নেতাদের কথা বলএছে। কিন্তু দাহালসহ সকলেই পরে মিডিয়ার সামনে জানিয়েছে এসব কথা মিথ্যা অনুমান। বরং পুস্পদাহাল ও মাধব এই খবরকে উড়িয়ে দিয়েছেন Former prime ministers Dahal and Madhav Kumar Nepal on Thursday morning refuted reports suggesting their meetings with Goel.. তাঁরা এই সভাকে ভুল কাজ ও অপরিপক্ক কূটনীতিবোধ [wrong and termed it diplomatic immaturity.] বলে চিহ্নিত করেছেন।

আবার নেপাল মানেই কেবল ওর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী খাড়্গা প্রসাদ অলি (কেপি অলি), তা তো না। নেপালের অন্যান্য ডেজিগনেটেড নেতা বা জনপ্রতিনিধিরাও আছেন। আছে অলির নিজ রাজনৈতিক দল অন্যান্য নেতৃত্ব। কিন্তু ব্যক্তি অলির কোনো দুর্বলতায় তাঁকে বেকায়দায় ফেলে এই সফরের অনুমতি ‘র’-এর প্রধান আদায় করে নিয়েছেন বলে মনে করার কারণ আছে। যেমন এই সফরের ফরমাল উদ্দেশ্য কী? তা প্রধানমন্ত্রী অলি না নিজের দলে, না মন্ত্রিসভায়, না মিডিয়ায় কখনো আলোচনা করেছেন বা জানিয়েছেন। এমনকি নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও কিছু জানাননি।  করোনাকালে ভারত-নেপাল ফ্লাইট বন্ধ। তাই কেবল গোয়েলকে সামরিক বিমানে করে নেপালে আসতে গেলে আগাম অনুমতি যেটা দরকার, এর অনুরোধের ফাইলটাই কেবল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে চালু করে দেয়া হয়েছিল। এছাড়া আর কোথায়ও কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না যদিও নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্ষমতাসীনদের দলে অলিরই উপদলের লোক। আবার এটা কি ফরমাল না ইনফরমাল সফর, তা নিয়ে নেপালের মিডিয়ায় আলোচনা হচ্ছে; যার জবাবে এটা ফরমাল তা কেউ বলতে পারছে না। বিশেষত যখন এই সফরে আলোচনার এজেন্ডা বলেও কিছু ছিল না। আবার প্রধান প্রটোকল ভঙ্গের ঘটনাটা হল, বিদেশী সফর হয়ে থাকে সবসময় কাউন্টারপার্টের (মন্ত্রী হলে মন্ত্রী, সচিব হলে সচিব, জেনারেল হলে জেনারেল এভাবে) আমন্ত্রণে ও মূলত তাঁর সাথেই এবং আগাম ঠিক হয়ে থাকা এজেন্ডা ধরে। তবে সেটা কখন সাথে যেমন, প্রধানমন্ত্রীর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ পর্যন্তও হতে পারে। কিন্তু কোথাও কোন আলোচনা-সাক্ষাৎ পুরাটা ওয়ান-টু-ওয়ান হবে না, প্রতিনিধিদল থাকবে সাথে। কিন্তু অলি প্রথম যে প্রটোকল ভেঙে নিজেকে অপমান বা নিচা করেছেন  (‘র’ তা হতে দিয়েছে) তা হল, তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়ে আরেক দেশের গোয়েন্দা প্রধানের (সচিব বা সচিবের নিচে প্রটোকলে যার অবস্থান) সাথে এবং ওয়ান-টু-ওয়ান বৈঠক করেছেন এবং তাও কোন এজেন্ডা ছাড়া বৈঠক; কিভাবে তিনি করেন এটা? ন্যূনতম আত্মসম্মানবোধ থাকলেও এটা তাঁর করার কথা নয়।

তবে পরের দিন দেশে প্রচণ্ড সমালোচনার মুখে তিনি নিজের প্রেস উপদেষ্টাকে দিয়ে এক ছোট্ট প্রেস নোটে বলালেন যে, “ভারতের ‘গুপ্তচর সংস্থা’ ‘র’-এর প্রধান সামন্ত গোয়েল প্রধানমন্ত্রী অলির বাসভবনে এসে সাক্ষাৎ করেছেন। বৈঠকের সময় নেপাল-ভারতের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে বিপর্যস্ত হতে না দেয়া, আলোচনার মধ্যমে সমস্যার সমাধান, পারস্পরিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে তিনি নিজ ধারণা ব্যক্ত করেন।…… সূর্য থাপা, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উপদেষ্টা”।

নেপাল-ভারতের তিতা হয়ে থাকা সম্পর্কঃ
নেপাল-ভারত সম্পর্ক আগেও তিতা কম ছিল না, কিন্তু গত এক বছর ধরে তা ‘ভীষণ তিতা’ হয়ে আছে। মূলত কালাপানি, লিপুলেখ আর লিম্পিয়াধুরা- এই জায়গাগুলো বর্তমানে ভারতের দখল নিয়ন্ত্রণে রয়েছে; যা নেপাল মনে করে এগুলো তার ভূখণ্ড। তাই পাল্টা এগুলো অন্তর্ভুক্ত করে নেপাল এক নতুন মানচিত্র প্রকাশ করেছে যা আগে নেপালের সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ করে নিয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রী অলি, তার দলের নাম এখন, নেপাল কমিউনিস্ট পার্টি। আমাদের সিপিবি ধরনের; তবে অনেক গণভিত্তি এর হয়ে গেছে নির্বাচনী রাজনীতি করতে করতে। নেপালের এক মাওবাদী দলটা ছাড়া নেপালের আর সব রাজনৈতিক দলই আগের রাজতন্ত্রের আমলে রাজার অনুগত হয়ে চামচামি করে ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগ করে ক্ষমতার কিছু স্বাদ পেত। কিন্তু মাওবাদীদের উত্থানের কারণে আগের সেই ভারসাম্য উৎখাত হয়ে যায়। তাতে সেই রাজতন্ত্রও উৎখাত হয়ে নেপাল এক রিপাবলিক গণক্ষমতার রাষ্ট্র এখন। গত সেপ্টেম্বর ২০১৫ সালে এক নয়া কনস্টিটিউশন চালুর পরে, যেটা ভারত মেনে না নেওয়া থেকেই চরমবিরোধের শুরু হয়। ভারতে নেপালে সমস্ত পণ্য আমদানির পথ অবরোধ করে রাখে প্রায় টানা ছয় মাস। আর তা থেকে সাধারণ নেপালবাসীরা প্রায় সকলেই চরমতম ভারতবিরোধী হয়ে যায়। এরপর থেকেই এই ভারতবিরোধী অল-আউট সেন্টিমেন্ট – এই পপুলিজমের নেতা হয়ে বসেন অলি। অথচ এর আগে তিনিই ছিলেন নেপালি কংগ্রেসের পরের গুরুত্বের চরম ভারতপ্রেমী রাজনৈতিক দল।  এখনকার গোয়েল-সফর সংকটে নেপালের মিডিয়া লিখছে, সে সময় নাকি অলির খাতির ভারতের রাজনীতিবিদ বা নেতাদের চেয়েও বেশি ছিল ‘র’-এর সাথে।
তাই নেপালের এক সিনিয়র সাংবাদিক লিখছেন, “ওলি সেই ব্যক্তি ২০১৫ সালের অবরোধের আগে যাকে সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করত ভারত। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চেয়েও দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার সাথে নিয়মিত যোগাযোগ হতো ওলির। মনে হচ্ছে, ভারতের সাথে সম্পর্কের অচলাবস্থা নিরসনের জন্য তার প্রচেষ্টাতেই গোয়েল নেপাল সফর করলেন”। এমন একটা সম্ভাবনা হিসাবে  ব্যাখ্যা করেছেন নেপালের সিনিয়র সাংবাদিক Yubaraj Ghimire। তার সাবধানি ব্যাখ্যাটা হল, অলির উপদেষ্টা সুর্য থাপার কথা বিশ্বাস করলে ভারত গত একবছরের তিতা সম্পর্কের সময় থেকে উঠে আসার জন্য আবার ‘র’-কেই ব্যবহারের জন্যই সামনে এগিয়ে দিয়েছে। এমন একটি মুখ-আড়ালের ব্যাখ্যা ভারত থেকেই দেয়া হচ্ছে। কিন্তু অবিশ্বাস্য দিকটা হল, নেপালের সব মিডিয়া গত দু’সপ্তাহ ধরে হন্যে হয়ে খুঁজছে কেন ‘র’-এর প্রধান গোয়েল এসেছিলেন। কেউ হদিস করতে পারেনি কিন্তু সবাই আশঙ্কা করছে, এগুলো সামনে নেপালে আকস্মিক সরকার বদল বা খারাপ সময়ের ইঙ্গিত!

নেপালের দুই কমিউনিস্ট পার্টির এক হওয়াঃ
এদিকে গত সাধারণ নির্বাচনের (২০১৭ নভেম্বর) আগে থেকে আরেক বড় পরিবর্তন নেপালে ঘটেছিল । নেপালে ২০১৫ সালের কনস্টিটিউশন চালুর পর থেকেই কেবল নেপালের রাজনীতিতে  চীনের উপস্থিতি ঘটেছিল। তাও সেটা ঘটেছিল ভারতের পণ্য অবরোধের বিপরীতে বিকল্প হিসাবে চীনের ভিতর দিয়ে নেপাল বাইরের দুনিয়ার সাথে পণ্য আমদানি-রপ্তানির বাণিজ্য সম্পর্ক করতে পারে কিনা, এরই খোজ করতে গিয়ে। তাই  নেপালের রাজনীতিতে সেই প্রথম চীনের উত্থান ঘটেছিল। এতে ক্রমশ চীনের সাথে সারা নেপালের ব্যাপক সম্পর্ক হয়েছিল। বিশেষত সেটা আবার অলির কমিউনিস্ট পার্টি আর মাওবাদী পার্টির সাথেও। তাই চীনের পরামর্শ ও অনুরোধে এই দুই পার্টি এক পার্টি হওয়ার প্রক্রিয়া চালু করে। আর একসাথে ঐ নির্বাচনে লড়ে তারা ক্ষমতায় এসেছিল, দু-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে যেটা এখনও আছে। কিন্তু এক হওয়ার প্রক্রিয়া খুব সুখকর হয়নি। বেশির ভাগ সময় যে মূল অভিযোগটা সবার উপরে ভেসে থেকেছে তা হল, অলি দলের কাউকেই না বলেকয়ে বা আলোচনা না করে চলেন। দলীয় ফোরামে কোনো সিদ্ধান্ত নেন না, সব সিদ্ধান্ত নেন একাই। আর তা সবাইকে মানতে বাধ্য করেন। আর দ্বিতীয় বড় অভিযোগ হল, তাদের নতুন দলের নীতি ও সিদ্ধান্ত হল কেন নেতা একসাথে একের অধিক পদ ধারণ করে রাখবেন না। কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে, তাহলে একইসাথে দলীয় প্রধানের পদ দখল করে থাকলে যেকোন একটা ছেড়ে দিতে হবে, এরকম। অথচ অলি সেটা আজও মেনে চলেন নাই, প্রয়োগ করেন না।
অবস্থা এমনই চরমে যে, অনেকেই মনে করছে এই দ্বন্দ্বের এখন একটাই সমাধান – কমিউনিস্ট পার্টি আবার ভাগ হয়ে যাওয়া। যেটা এখন কেবল চীনের অনুরোধে খুবই হাল্কাভাবে এক হয়ে আছে। কিন্তু বাস্তবতা অসহনীয় পর্যায়ে। তবে এবার দল ভাগ হলে, তা আবার আগের মতোই আগে যে যার গ্রুপ বা উপদলে ছিল, সেভাবে ফিরবে না। বড় অংশটা বরং মাওবাদী পুষ্প কমল দাহালের পক্ষে চলে যাবে। যেমন যারা ওলির আগের কমিউনিস্ট দলের সিনিয়র নেতা হিসাবে অলির সাথে ছিলেন, মাধব কুমার নেপাল বা ঝালানাথ খানাল; দল ভাগ হলে এরা এখন পুস্পকমলের সাথেই যাবেন। এরা অলির আচরণ দেখতে দেখতে এতই বিরক্ত।  কিন্তু দল ভাগ হওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান ফ্যাক্টর হল, যেকোন ভাগ হওয়া মানেই ভারত সেই ফ্রাকশনকে মদত দিবে। আর সর্বোপরি, প্রো-ইন্ডিয়ান নেপালি কংগ্রেসে দলের সাথে কোয়ালিশনে সরকার করা যায় কি না সে দিকে পরিস্থিতি টার্ন নিবে। মূল কথায়, নেপালে আবার ঘরোয়া অস্থিতিশীলতা প্রবেশ করবে।

সংবাদ না থাকলে যা হয়, নেপালজুড়ে গুজবঃ
কিন্তু আজব ঘটনাটি হল নেপালজুড়ে একটি পক্ষ যে গুজব ছড়াচ্ছে তা হল, পুষ্প দাহালের মাওবাদী ফ্রাকশন ভারতের সহযোগিতায় অলিকে পদচ্যুত করতে চাইছে। এই গল্পটা অলি ছড়িয়েছিলেন সেই গত জুলাই থেকে। এখানেও দেখুন, “ভারতকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য, নেপালের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি’। অথচ এই গল্পটার সবচেয়ে স্ববিরোধী বা বে-মিলের অংশটা হল, ভারত যদি অলিকেই ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাহলে সেই অলির সাথে একান্তে  ‘র’ এর প্রধান গোয়েল এই সাহসী মোলাকাত করছেন কেন? কী করে করবে? তাই এই অ্যাবসার্ড প্রপাগান্ডাটা পাবলিক খাবে এমন মনে হয় না! এর মানে আবার এও নয় যে এমন ঘটনা ঘটাবার চেষ্টা অলি করতে পারে না। মরিয়া অবস্থায় পৌছালে নিরুপায় হয়ে তিনি তা করতেও পারেন। কিন্তু আগেই বলে দেয়া যায় তা এক ব্যর্থ প্রচেষ্টায় পরিণত হবার সম্ভাবনাই বেশি হবে।

আরেকটা গুজব হল, পুষ্প দাহাল অংশ থেকে বেরিয়ে অলি ভারতের প্ররোচনা ও সহযোগিতায় নেপালি কংগ্রেসের সাথে মিলে প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার গড়তে চাইছে। হয়ত ভারত এটা চায় তা নিয়ে কিঞ্চিত সত্যতা আছে। কিন্তু এই গুজব-গল্পটারও বিরাট দুর্বল দিকটা হল, গত পাঁচ বছরে অলি ভারতবিরোধী অবস্থান ও বক্তব্যের জন্য ‘চ্যাম্পিয়ন’ – সবার উপরে – এভাবেই তিনি নিজেই নিজের ইমেজ তৈরি করে এসেছেন। এমনকি এই তো গত বছর এসময়ে লিপুলেখ ভারত দখল করেছে বলে ভারতবিরোধী যে ইমেজ তিনি নিজের জন্য দাঁড় করিয়েছেন, সেই তিনি এখন আবার এক প্রো-ইন্ডিয়ান সরকার গড়বেন, কেমন করে? তাও আবার নেপালি কংগ্রেসের সাথে মিলে যার ইমেজ হল গত নির্বাচনের পর থেকে যতদূর সম্ভব ভারতের কোলের ভেতরে ঢুকে যেয়ে বসা দল। তবে সেটা যাই হোক দ্বিতীয় এই গল্পটার সত্যতাো হয়ত কম নয়। কারণ?

ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট দলের অলি-দাহাল সংঘাতঃ
অনুমান করা হচ্ছে, পুরান দুই ধারার দুই কমিউনিস্ট নেতার সংঘাত আবার মারাত্মক জায়গায় যাচ্ছে বা চলে গেছে। সর্বশেষ গত জুন-জুলাইয়ে এই সংঘাত তুঙ্গে উঠলে সেসময় চীনা পরামর্শে সে যাত্রায় সেবারের সংঘাত সেসময়ের মত মিটিয়ে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে তা আর মিটবে না। এই অনুমানকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে গত পরশু ৬ নভেম্বরের নেপালের সেতপতি [Setopati] নামের এক ওয়েব মিডিয়া রিপোর্ট থেকে।  সেখানে দলের বিরোধের বহু কিছুরই উল্লেখ আছে।  সারকথায়, এই দলীয় ভিতরের সংঘাতই ভারতের জন্য সুযোগ বয়ে আনবে মনে করছে ভারত। তাই হয়ত গোয়েলের এই সফর!

কিন্তু গোয়েল-অলির কোন পরিকল্পনা বা ষড়যন্ত্র একেবারেই ফেল করার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।  বিরাট বিপদে পরে এটা বরং অলির খড়কুটো আকড়ে ধরার মত প্রচেষ্টা। তাঁর প্রধান সমস্যা হল, তিনি ভারতবিরোধী চ্যাম্পিয়ান ইমেজ ব্যবহার করে পরিত্রাণ পেতে চান, কিন্তু বাস্তবতা হল তাকে আবার ভারতের কোলেই আশ্রয় নিতে হচ্ছে। ফলে তার চ্যাম্পিয়ান ইমেজ বিশ্বাস অযোগ্য ও বিক্রি অযোগ্য হয়ে হাজির হবেই। এটাই অলির প্রধান সংকট।

দ্বিতীয়ত ভারতের আরেক বড় সংকট হল, নেপাল-ভারত চুক্তি ১৯৫০। এটা দাসখত চুক্তি বলে দাবি ও প্রচার করেই মাওবাদী রাজনীতি ১৯৯৬ সাল থেকে আন্দোলন সুচনা করে আজ ক্ষমতায়। তাই নেপালে সাধারণ্যে একথাটা প্রতিষ্ঠিত যে এই টা দাসত্ব-চুক্তি। পরবর্তিতে তাই দুদেশের কিছু সিনিয়র সিটিজেনকে প্রতিনিধিত্ব দিয়ে তারা মিলে একটা কমিটি এই চুক্তির রিভিউ ও প্রস্তাব করার জন্য দুদেশ থেকে গঠিত হয়েছিল। তারা পর্যালোচনা শেষ করে, চুক্তি বাতিল করে নতুন কিছু করার প্রস্তাব করেছে। কিন্তু মোদী গত ২০১৮ সাল থেকে সময়াভাবের অজুহাতে কমিটির সাথে দেখা করছে না; যার ব্যবহারিক মানে হল, ঐ যৌথ রিপোর্টকে স্বীকার বা আমলে নিতে চাচ্ছেন না মোদী। ফলে ভারত চাইছে একবার কোন প্রো-ইন্ডিয়ান দল বা জোট ক্ষমতায় গেলে ঐ প্রস্তাবকে স্থায়ী ধামাচাপা দেওয়ার ব্যবস্থা করে।

নেপালি রাজনীতিতে নুন্যতম করণীয়ঃ
তবে গ্লোবাল নেতার পালাবদলের কালে, সাবধানে থাকতে নেপালের করণীয় কাজের গাইড লাইন কী হতে পারে সে হিসাবে দুটা  সার কথা বলা যায়। এটা বাইডেনের জিতা বা না-জিতা নিরপেক্ষ। এক, নেপালের দলগুলো কেউ ভারতের, কেউবা চীনের, কেউবা আমেরিকার দালালির এজেন্সি নিয়ে বসে পড়লেই সব শেষ! তাই কোনমতেই এটা হওয়া যাবে না। আর দুই, এসব এড়িয়ে নেপাল যেন এই তিন দেশের যেকোন প্রস্তাবে ‘না’ বলার ক্ষমতাটা কখনো নিজে্দের হাতছাড়া করে, এদুইটা জিনিষ ঠিক থাকলে নেপালের অনেক কিছুই করা সম্ভব! ওদিকে বাইডেনের বিজয় নিশ্চিত হয়েছে। তাতে কী নেপাল কোন সুবিধা পাবে?

বাইডেনের বিজয়ের প্রভাব কতটুকু পড়বেঃ
খুব বেশি না। নেপালের একটা সুবিধা হবে এতটুকুই যে বাইডেন আসাতে নেপালের উপর আমেরিকার সরাসরি চাপ কিছুটা কমবে। যেটা ট্রাম্পের শেষ আমলে অনেক আগ্রাসী হতে চাচ্ছিল। আর দুই, মূলত বাইডেনের বিজয়ে ভারতের পিছনে আমেরিকান সমর্থন বেশ কিছুটা ঢিলা হয়ে যাবে। ফলে নেপালের উপর চাপ দিবার ক্ষেত্রে ভারতের কিছু সক্ষমতাও। মুল কারণ ইন্দো-প্যাসেফিক সহ যেকোন চীনবিরোধী জোটের উদ্যোগ গত ছয়মাসে যেভাবে দানব হয়ে উঠেছিল সেটা এখন ঝিমিয়ে পড়ার সম্ভাবনা বড়বে। এই বড় পরিবর্তন সম্ভবত আসন্ন। বাইডেনের আমলেও আমেরিকার চীনবিরোধী কোন জোটের উদ্যোগ হয়ত এখনও থেকেই যাবে কিন্তু তা আগে যেমন সামরিক ও অর্থনৈতিক দুটারই জোট হতে চেয়ে আগে বাড়ছিল সেটা প্রথমত এখন কেবল “অর্থনৈতিক” হওয়ার দিকে নেমে, ছোট হয়ে যাবে। সামরিক দিকটা বাদ যাবে।  ফলে বাইডেনের বিজয় ভারতের মোদীর জন্য এক বিরাট ক্ষত এবং ক্ষতি নিতে আসতে পারে।

তাই চীনের চাপে ভারত এতদিন আমেরিকার যত আগ্রহ ও যাকিছুকে নিজের জন্য সম্ভাবনা এতদিন দেখছিল তা অনেককিছুই এখন গুটিয়ে যাবার সম্ভাবনা। ফলে ততটাই নেপালের উপর ভারতের প্রভাব ফেলার ক্ষমতা। আর যদিও বাংলাদেশ এখানে প্রসঙ্গ না তবু একটা বাক্য বলে দেয়া উচিত। এই একই আলোকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ বিচার করতে যাওয়া ভুল হবে। কারণ বাইডেন সাথে করে আনবেন হিউম্যান রাইট ভায়োলেশনের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান। এই অবস্থান, যেটা বাংলাদেশের উপর প্রচন্ড চাপ তৈরি করতে এগিয়ে আসবে। বাংলাদেশ সরকারের জন্য যা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হবার সম্ভাবনা।  ওদিকে ট্রাম্পের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্ক এসপার ইতোমধ্যেই পদত্যাগপত্র রেডি করেছেন; কিন্তু যাকে কাজ চালিয়ে যেতে অনুরোধ করা হয়েছে। আর ট্রাম্পের দ্বিতীয় লোক, ট্রাম্পের ‘পার্টনারস ইন ক্রাইম’ – পররাষ্ট্রমন্ত্রী পম্পেই, তিনি এখন কোথায় তা জানা যায় না। তবে যদি তিনি আগামি সপ্তাহে আবার কোন ভিনদেশ ভ্রমণে না বের হন তবে এটাকে আমরা কোয়াড আর ইন্দো-প্যাসিফিক নিয়ে হৈচৈ তোলা, চাপ তৈরি সমাপ্তির প্রথম লক্ষণ বলে গণ্য করতে পারি!

তবুওও নেপালের উপর চাপ-প্রভাব তৈরির ভারতের রুটিন চেষ্টা সেটা অব্যাহতই থাকবে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত  ০৭ নভেম্বর ২০২০, দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরদিনই প্রিন্টেও  “নেপাল থেকে শিক্ষা ” – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে ঐ লেখাটাকে এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

One thought on “নেপাল রাজনৈতিক অস্থিরতায়, অভিমুখ কোনদিকে

  1. স্যার আপনার লেখা দেখে আপনার সাথে কথা বলার খুব ইচ্ছে হয়েছে।আপনি কি কথা বলবেন আমার সাথে?সাংবাদিক মনির হায়দারের সাথে আপনার আলোচনা ইয়ুটিউবে দেখেছি ,খুব ভালো লেগেছে।আপনার নির্মোহ বিশ্লেষন অসাধারন লেগেছে।আপনার এই পেজেও নিয়মিত আসি।আমি জাপান প্রবাসী বাংলাদেশী জাপানিজ।
    ধন্যবাদ

    Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s