দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে…


দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে…
গৌতম দাস
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩  ১৯ঃ ৫৪
https://wp.me/p1sCvy-4Zu

 

 

                     President Biden Holds a Press Conference

 

 

শিরোনামটাই কত সুন্দর! “দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে ……!”
মানে ভারত ছেড়ে ভিয়েতনামে পালিয়ে -এরপর বাইডেন যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচছেন! সেখানে হোটেলে পৌচ্ছে যেন দশ মিনিট ভাল করে শ্বাস নিয়ে এরপরে সাংবাদিক ডেকে নিয়ে আসা হয় বাইডেনের সামনে! তাইতেই বাইডেন জানান ভারতে মোদি তাঁকে কথা বলতে দেন নাই। [কনফারেন্সের ভিডিও ক্লিপ এখানে – 4:04 থেকে মোদির প্রসঙ্গ] মানে  যেন একদম যাকে বলে চোকিং [choking] – একেবারে টুঁটি চেপে শ্বাসকষ্ট উঠিয়ে দিয়ে ছেড়েছেন!  হয়ত এতে প্রমাণ হয়েছে বাইডেন না, একেবারেই না! বরং, মোদি-ই বাইডেনের চেয়ে  বেশি পাওয়ার ফুল অন্ততঃঃ নিজ দেশে!!! ব্যাপারটা এরকমই কিছু একটা হয়ে মিডিয়ায় হাজির হয়েছে।

আসলে হয়ত, মোদি যার নাম তামাসা না করে তিনি কী কোন কাজ করতে পারেন না? বোধহয় না! হলোও তাই!  এটা এখন পরিস্কার যে মোদি তিনি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বাইডেনের সাথে জি২০ সম্মেলন চলার ফাঁকে সাইড লাইনে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। যেটা খুবই স্বাভাবিক! কিন্তু যেটা মারাত্মক অস্বাভাবিক তা হল যে ঐ দ্বিপাক্ষিক সভার পরে – না যৌথভাবে, না মোদি নিজে একা অথবা বাইডেনকে – কোন সাংবাদিক সম্মেলন করতে দেন নাই। আর এটাকে, মোদি তাঁর সাফল্য মনে করতে পারেন! তবে এটাই পারফেক্ট স্বৈরশাসকের আচরণ! কোন রিপাবলিক রাষ্ট্র বা এর শাসকের আচরণ না!  যারা পাবলিক শব্দের অর্থ বুঝে নাই তারাই প্রধানমন্ত্রী; এরই চিহ্ন এসব! অথচ পাবলিক শব্দ না বুঝলে কোন রিপাবলিক রাষ্ট্রের অর্থ তিনি কী বুঝেন? বুঝতে পারবেন?

কোন দুই সরকার প্রধান নিজেদের মধ্যে কোন বৈঠক শেষে সাংবাদিক সম্মেলন করেন, করতে হয়। এই রেওয়াজ তাঁরা মানেন এজন্য যে তাঁরা কী আলাপ করেছেন এর একটা সারাংশ অন্তত – নিজ নিজ ‘পাবলিক’ বা জনগণকে জানানো তাদের দায়িত্ব আর এটা জনগণের দিক থেকেও সেটা জানা তাদের মৌলিক অধিকার! আর সেই ‘পাবলিক বা জন-অধিকার’ পূরণ করতেই বৈঠকের পরে সাংবাদিক সম্মেলন ডাকা হয়ে থাকে। কারণ, একমাত্র সাংবাদিকেরাই পেশাদারি ভাবে ঐ বক্তব্য জনগণের কাছে নিয়ে যাবেন। এই অর্থে এখানে সাংবাদিক মানেই জন আকাঙ্খার এক ধরণের প্রতিনিধি। কাজেই মিডিয়া মানে কেবল মিডিয়ার মালিক আর মিডিয়ার শান-সৈকতের সাথে মিডিয়ার আয়ের হিসাবের বড়াই মাত্র নয়!  পাবলিক ধারণাটাকে সার্ভ করা বা সেবা দেওয়াটাই মিডিয়ার প্রধান কাজ!  তবে পাবলিক শব্দের অর্থ-তাতপর্য না জানলে এসবের কিছুই বুঝা যাবে না। আর তখনই মনে হবে সাংবাদিক সম্মেলন করা না -করা প্রধানমন্ত্রীর বাপের ইচ্ছা অথবা এসবই প্রধানমন্ত্রীর খেয়াল ও তাঁরই একক এক্তিয়ারের এলাকা যেন! কিন্তু কে কাকে বুঝাবে যে পাবলিক শব্দের অর্থ-তাতপর্য কী??? 

তবে ঘটনা্টা মোদিকে বাইডেনের ভারত ত্যাগ করার ২৪ ঘন্টার  মধ্যে ভীষণ বিপদ আর বিব্রতকর অবস্থায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। কারণ, ভিয়েতনামে পৌছেই বাইডেন সাংবাদিক সম্মেলন করার কারণে সবকিছুই দেশে-বিদেশে প্রকাশিত হয়ে পড়েছে।  প্রথম আলোর দিল্লি সংবাদদাতা লিখছেন, 

“বাইডেনের সফরে সংবাদ সম্মেলন করা নিয়ে কিছুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারতের টানাপোড়েন চলছিল। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল মোদি-বাইডেন দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর সে দেশের প্রথা অনুযায়ী সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করতে। যেকোনো দেশের নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর হোয়াইট হাউসে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করা যুক্তরাষ্ট্রের রীতি। সেই রীতি মেনেই গত জুন মাসে মোদির সফরের সময় হোয়াইট হাউস কাভার করা সাংবাদিকদের প্রশ্ন করতে দেওয়া হয়েছিল। যদিও সংক্ষিপ্ত, তবু সেই সফরে প্রধানমন্ত্রী মোদিকে ভারতীয় গণতন্ত্র, সংখ্যালঘু সমাজের অবস্থান ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে জবাবদিহি করতে হয়েছিল। গত ৯ বছরে মোদির শাসনামলে সেটাই ছিল প্রথম ঘটনা। দেশে-বিদেশে কোথাও তাঁকে প্রশ্ন করার যে অধিকার কাউকে দেননি, সেই প্রথম তা দিতে তিনি বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ, সেটাই ছিল সফরের শর্ত।
সেই শর্তের কথাই এবার যুক্তরাষ্ট্র মনে করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর কোনো রকম প্রশ্নোত্তর পর্বের মুখোমুখি হতে মোদি রাজি হননি। ভারতের পক্ষ থেকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, প্রশ্নোত্তর পর্ব বা সংবাদ সম্মেলন—কোনোটাই করা হবে না। এমনকি প্রেসিডেন্ট বাইডেন আলাদাভাবেও কোনো সংবাদ সম্মেলন করতে পারবেন না। সিএনএন তা নিয়ে এক প্রতিবেদন প্রচার করেছিল। সেই প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ভারতে না হলেও বাইডেন ভিয়েতনাম গিয়ে সফররত সাংবাদিকদের সেই অধিকার দেবেন”।

আসলে বেচারা মোদি! তারও যে কী কষ্ট আর ঝামেলায় দিন কাটছে সেট মোদি ছাড়া আর কেউ বুঝবে না!!!  তিনি গত একমাস ধরে হরিয়ানায় মুসলমান কোপানোর এক জরুরী কাজে, এসাইনমেন্ট নিয়ে ব্যস্ত আছেন, সামনে নির্বাচন। হরিয়ানার গুরগাঁও এর নুহ [Haryana’s Nuh] এলাকাটা মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ট। মুখ্যমন্ত্রী যোগী সেখান থেকে মুসলমান নিশ্চিন্ন করার “বুলডোজার পলিসি” নিয়েছেন বলা হচ্ছে। তা যেন কম কম দেখা যায় এজন্য এখানে প্রগতির পত্রিকাত দিক থেকে থেকে দেখেন, হরিয়ানায় মুসলমান অঞ্চলে এবার উচ্ছেদের হুমকি। এখন আপনারাই বলেন যে, অন্তত এই অবস্থায় সাংবাদিক কেউ যদি মোদিকে জিজ্ঞাসা করে বসে যে হরিয়ানার নুহ এলাকায় কী হচ্ছে? তখন মোদি কী বলতেন?? তখন হিন্দুত্ববাদকে এমন দেশি-বিদেশির সামনে পরা ইজ্জত কে বাঁচাতো? কাজেই এটা তো ‘হিন্দুত্ববাদের জাতীয় স্বার্থ’, প্রগতিবাদের স্বার্থ; তাই না? কাজেই কীসের সাংবাদিকতা আর পাবলিক? ফেলায় রাখেন সব!

আর বাইডেন হাতের কাছে বা পাশে মোদিকে – সাংবাদিকের সামনে পেলে কী করতেন এর এক সহজ ভাষ্য বা চিত্রকল্প আমরা পাই ভিয়েতনাম থেকে। সেখানে মানে ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয় পৌছে বাইডেন বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বন্ধুত্ব ও অংশীদারত্ব আরও জোরদার কীভাবে করা যায়, তা নিয়ে আমি ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিস্তারিত আলোচনা করেছি। যা আমি সব সময় করে থাকি, এবারও তা করেছি। শক্তিশালী সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়ে তুলতে মানবাধিকারকে সম্মান করা, নাগরিক সমাজ ও স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকা থাকা যে গুরুত্বপূর্ণ, সেই প্রসঙ্গ তুলে ধরেছি”। অর্থাৎ খুবই ভদ্রভাবে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন মোদি কেমন “দায়ীত্ববান জনপ্রতিনিধি ও প্রধানমন্ত্রী”!
কথাগুলো যত মোলায়েমভাবে বলা তাতে এর প্রতিটা শব্দ দিয়েই বাইডেন আসলে মোদিকে ছিড়ে ফালা-ফালা করে দিয়েছেন! মানে বাইডেনের পলিসি তো এখন আসলে সবার জন্যই এক।  আর সংক্ষেপে তা হল – মানবাধিকার রক্ষা করে চলেন, নাগরিক বৈষম্য করা ত্যাগ করেন নাহলে উনি স্যাংশন দিবেন।  বাইডেনের এই ওষুধ হাসিনার জন্য যা  তা এখন শক্তিমান ভারতের মোদির জন্যও তাই! এতে হাসিনা-মোদি সাক্ষাত হলে তারা একই নিঃস্পেষক বাইডেনকে বদ-দোয়া দিতে পারেন কিংবা নিজেরা পারস্পরিক সহমর্মিতায় গলা জড়াজড়ি করে কাঁদতে পারেন! কিন্তু বাইডেনের হাত থেকে তাঁরা কেউই ছাড় পাচ্ছেন না; কারণ, তাঁরা দুজনই বাইডেনের বন্দী যেন!

ঘটনা হল অনেক কিন্তু তা্মাসা তবু আমাদের পিছু ছাড়ছে না! তাহলে হাসিনা-মোদি এরা দুজনেই যদি এভাবে একই বাইডেনের বন্দিশালার বন্দি হয়ে থাকেন তাহলে হাসিনার বন্দীমুক্তির সুপারিশ মোদী বয়ে নিয়ে বাইডেনের কাছে যাবেন – এই যে গল্প গত কমপক্ষে দুমাস ধরে এই সৌম বন্দোপাধ্যায়,  প্রথম আলো আর ওদিকে অগ্নি রায় আর ডয়েচ ভেলে, ডেইলি স্টার চালিয়ে গেল, তার কী হবে???? যেমন গত ১৮ জুন মোদির আমেরিকা সফরের চারদিন আগে সৌম্য প্রথম আলোতে লিখেছিলেন বাইডেন-মোদি বৈঠক, মোদির আলোচনায় থাকছে বাংলাদে । আর এখান থেকেই শুরু হয়েছিল ডাহা মিথ্যাগুলো প্রথম আলোর সাথে মিলে প্রপাগান্ডা করা।  মানে এতদিন মোদির গোয়েন্দা বিভাগের ফান্ডের অধীনে থেকে এসব প্রপাগান্ডা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর এবার সৌম্য লিখে গেছেন আর প্রথম আলো তা ছাপিয়ে গেছে। কিন্তু এবার? এবার আর মোদির খিদমতের ফান্ড এর অধীনে না। এবার বাইডেন-রাহুলের ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়ে মোদির আকাম ফাঁস করে দেয়া। তাই এবারে সৌম্যের লেখা ও প্রথম আলোর ছাপা বক্তব্যের শিরোনামঃ দিল্লিতে কথা বলতে দেওয়া হয়নি, ভিয়েতনামে গিয়ে ভারত নিয়ে যা বললেন বাইডেন। মানে মোদিকে কবর দিয়ে সৌম্য আর প্রথম আলো এখন বাইডেন-রাহুল গান্ধী ক্যাম্পে গিয়ে উঠলেন! এতে ওদিকে, মাঝখান থেকে মোদি-হাসিনা দুজনেই ক্ষতিগ্রস্থ – তাতে কেউ কারও হয়ে একই বাইডেনের কাছে সুপারিশ করবে বা মিথ্যা আশ্বাস পরস্পরকে দিবে সে মূরোদ আর কারো নাই!! কারণ, মোদির সুপারিশের ভান্ড ফুটা হয়ে, সব মিথ্যা উদাম হয়ে পড়েছে!!! এটাই তো হওয়ার কথা,  আর কত? আর তাই হয়েছে!!

এনিয়ে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মিডিয়া রিপোর্টই ভারতের মিডিয়ায় যা ছাপা হয়েছে, তা। যেমন ইন্ডিয়া  টুডে যেটা মূলত প্রো-মোদি সেটাও কংগ্রেসের জয়রাম রমেশের এক টুইট বা এক্স বার্তাকে উদ্ধৃত করে রিপোর্ট করেছেঃ “Na karunga, na karne dunga…’: Congress mocks PM over Biden’s speech in Vietnam”। মানে  মোদির হয়ে যেন জয়্রাম রমেশ বলছেন যে,  “মোদি নিজেও প্রেসের সাথে কথা বলবেন , না বাইডেনকেও বলতে দিবেন”।
এই রিপোর্টাই বাংলা করে আমাদের TBS ছেপেছে। শিরোনামঃ ভিয়েতনাম গিয়ে বাইডেন জানালেন, নরেন্দ্র মোদিকে মানবাধিকার ও মুক্ত গণমাধ্যমের কথা বলেছেন। এক কথায় বললে, প্রায় পনেরো বছর ধরে প্রেস এড়িয়ে চলা মোদি এবার একেবারে বাইডেনের হাতে ধরা খেয়ে গেলেন। একজন প্রধানমন্ত্রীর প্রেসের সাথে সম্পর্ক-মুলাকাত-বাতচিত থাকবে না এটা ছোট-বড় যেকোন আধুনিক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর ইমেজের জন্য, তিনি কেমন শাসক তা বুঝবার জন্য – একটা সবচেয়ে কালো দাগ অবশ্যই! সেটাই মোদির গায়ে লেগে গেছে!

একইভাবে কলকাতা থেকে কলকাতা টিভি-ও মোদির বিরুদ্ধে কড়া এক রিপোর্ট লিখে বলেছেঃ “……ভিয়েতনামে গিয়ে বৈঠকের বিষয় নিয়ে হাটে হাঁড়ি ভাঙলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট”, যে লেখার শিরোনাম হলঃ মোদিকে মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলেছি: বাইডেন। এই রিপোর্টটা আসলে সাজানো হয়েছে – যত কড়াভাবে সম্পাদক মোদিকে বধ করতে পারবেন ততই পাবলিকের দৃষ্টি আকর্ষণ তথা কাভারেজ ভাল হবে মিডিয়ার – এই সুত্রে!

তাহলে, মোদির শাসনের সমস্ত সঞ্চয় ইতি-ইমেজ সব কালো কালিতে ঢেকে গেছে – যেটার দেশের ভিতরে প্রভাব হয়ত ইজ্জত একটু ‘কম ডুবে যাবে’ ধরণের কিন্তু দেশের বাইরে মোদির ইজ্জত একেবারেই ম্লান হয়ে গেছে। বিশেষ করে পশ্চিমা মুল্যবোধের নুন্যতম চর্চা আছে এমন যেকোন দেশে। আর আমাদের দেশে মোদি ও হাসিনার সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হল, মোদি হাসিনার হয়ে বাইডেনের কাছে সুপারিশ করে দিবে এই বকোয়াজ সেটা আর এখন লীগের কর্মি বাহিনীও বিশ্বাস করবে না। তারা শকড হয়ে যাবে! – সেটাই এখন এতই উদাম হয়ে গেল!

বাইডেনের কাছে যে মোদির নিজের বেইল নাই সে করবে হাসিনার জন্য সুপারিশ? কিভাবে?

 

আপডেটঃ   ২০২৩;

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Leave a comment