নিকাহ আর তালাক একসাথে করার মত কাজ না
গৌতম দাস
০৪ ডিসেম্বর ২০২৪ সন্ধ্যা ০৬ঃ ৩১
https://wp.me/p1sCvy-5W0
ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে কোন ভারত ন্যায় বা সমকক্ষতা এর জায়গা নাই। এটাই ভারতের অবস্থান। কাজেই ভারতের হাত ধরে ক্ষমতায় যেতে চাওয়া আবার পানির ন্যায্য হিস্যা চাওয়া – এদুটো একসাথে চাওয়া যাবে না।
ঠিক যেমন, নিকাহ আর তালাক একসাথে করা যায় না। একসাথে করার কাজ না। এটা কে না জানে?
দুইটার মধ্যে ঠিক কেবল যেটা চান এমন কেবল একটাই নিতে পারবেন আপনি। একসাথে দুইটাই নিবেন এটা পারবেন না আপনি। হবে না; শত চাইলেই পারবেন না। পাবেন না।
কিন্তু বিএনপি বা তারেক জিয়া যেন এমন পরস্পরবিরোধী দুটাই একসাথে চেয়ে ফেলেছে। হয়ত অসর্তকতায়!
আমি গত এক সপ্তাহ (বা হয়ত এরও বোধহয় বেশি হবে) ধরে লাগাতর বলে আসছি যে বিএনপি (সাথে জামায়াতও) গত ২০০১-৬ তাদের সরকারের আমলে যদি কিছু মারাত্মক ভুল, অন্যায়, ত্রুটি হয়েই থাকে বলে তাদের এখন উপলব্দি হয়ে থাকে সেটা কোনই সমস্যা না। এজন্য সোজা পথ হল, আপনার কনষ্টিটিউয়েন্সি মানে পাবলিকের কাছে যান যারা আপনাদেরকে আগে নির্বাচিত করেছিল এবং আগামিও করতে পারে – সেই একমাত্র ক্ষমতাবান হল জনগণ, যারা সব ক্ষমতার মূল উতস তাদের কাছে যান। সব খুলে বলেন, কোনই অসুবিধা নাই। এজায়গায় পাবলিক সব বুঝে। কোন দোষটা খাটো করে দেখতে হবে বা কোনটা প্রধান করে বা কোনটা তখনকার মত মাফ করে দিতে হবে ইত্যাদি সব পরিস্কার বুঝতে পারে পাবলিক – একেবারে আম-আদমি মাঠে বা শহরের যারা ওয়ার্কিং ক্লাস – এরা এজায়গায় সব বুঝতে পারে।
কাজেই সৎ ভবাবে তাদেরকে খুলে বললে তারা সবসময় সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়ে থাকে; ইতিহাসও তাই বলে। ফলে বিএনপি (সাথে জামায়াতও) তাদের উচিত অবস্থান হতে হবে একমাত্র জনগণের কাছে সারেন্ডার। অন্য কারো কাছে নয়। অনেকে মনে করতে পারে আপনার শত্রুরা এটা নিয়ে মাতম তুলবে তখন কী হবে? আমি মনে করি কিছুই হবে না। আপনি প্রতিশ্রুতি দেন, পাবলিকের মনে বিশ্বাস জন্মানোর মত করে ব্যাখ্যা করেন আপনাদের কিছুই হবে না। বিশেষ করে যখন আপনি দেখাতে পারবেন যে আপনার আরেক ভুয়া আত্মঘাতি বিকল্প ছিল আপনার ভারতের কাছে যাওয়া কিন্তু আপনি যান নাই।
কারণ, ভারতের কাছে নিজের দুর্বলতা তুলে ধরে প্রকাশ করে তাদের অধীনে তাদের পায়ে চুমা দিয়ে তাদের খেদমতে তাদের স্বার্থে দেশের স্বার্থ বেচে দেন নাই। নিজের দুর্বলতা তুলে ধরে প্রকাশ করে ভারত যেন এনিয়ে দেশ-বিদেশে কথা ছড়িয়ে না দিয়ে আপনাকেই যেন ক্ষমতায় ফিরে আসার ব্যবস্থা করে দেন – এই চিন্তা, এই অবস্থান বা কথিত রাজনীতি দেখিয়ে আপনি আবার কোন চোরের ক্ষমতা তৈরি করতে চান এটা কখনই সৎ ও বাস্তবোচিত পদক্ষেপ হবে না। তাহলে তো হাসিনা টিকেই যেন এভাবেই!!! কোন মানুষ কারো হাতে ব্ল্যাকমেলের স্বীকার হয়ে তা রেখে দিতে পারে না। এর চেয়ে মৃত্যু হাজার গুনে শ্রেয়! ভারতের অনুগ্রহের ক্যাম্পে যাওয়া মানে নিজের দুর্বলতা/ভুল তাদের হাতে তুলে দেওয়ার সোজা মানে যারা আপনাকে একপর ব্ল্যাকমেল করবেই আপনি জানেন তাদের হাতেই নিজেকে সঁপে দেওয়া। আপনার কোন বিশেষ মুর্হুর্তের একান্ত পারসোনাল ছবি আপনি কারো হাতেই তুলে দিতে পারেন না। আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি আমরা এভাবে এরপর আজীবন ব্ল্যাকমেলার দের কব্জায় থেকে যাবো। তাই একমাত্র বিকল্প ও সোজা রাস্তা হল নিজ জনগণের কাছে যাওয়া।
কিন্তু বিএনপি ইতোমধ্যেই অনেক দুরেঃ
কিন্তু বিএনপি ইতোমধ্যেই সে পথে অনেকদুর আগিয়ে গেছে। বিশেষ করে কিন্তু মির্জা ফকরুলকে সামনে দিয়ে তার মুখ দিয়ে বিএনপির মুখ্য নেতারা যা করে ফেলছেন তা ভারতের আধিপত্য ঢেকে আনার পথে অনেকদুর চলে যাওয়া। বিশেষ করে মির্জার দুইটা কাজ; এক. “আপনারা ভাবতে পারেন ………..” – বলে প্রতারকের আবেগ তুলে যে বক্তৃতা আর দুই. প্রায় ২১ টা রাজনৈতিক দলকে (যারা হবু সংসদের এক-আধটা সদস্য আকাঙ্খীরা সহ যারা ভারত তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দিবে বসে ক্ষমতার স্বপ্ন দেখছে, বিভোর হয়ে গেছে ) সাথে নিয়ে প্রতীকীভাবে বললে – যার সামনে প্রথম আলো [এটা নাকি এক স্বাধীন সংবাদপত্রের উদাহরণ] আর পিছনে মোদি / র-এর হাত রাখা আছে – এভাবে বাংলাদেশের মেজর রাজনৈতিক দলকে সংগঠিত করে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া। এতাই আগামিদনের ইতিহাসে এই কালপর্বকে কিভাবে আঁকা হবে সেটারই চিত্র হয়ে গেছে।
তবে এসব ঘটানার শেষপর্ব এখনও মঞ্চে আসে নাই। যেমন, বিএনপি কী আগামিতে ও বাস্তবে এই অবস্থান কে সংশোধন করে নিয়ে চাইলেই নয়া বিএনপি হয়ে উঠে আসতে পারবে? অথবা কতটা সংশোবিত হয়ে উঠতে পারবে? নাকি আর এমন কিছুই করার সব পথ তারা নিজেরাই বন্ধ করে ফেলেছে ইতোমধ্যেই? এসবই real বা বাস্তবের মাঠে ও সময়ে হাজির কী করে হয় তা দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। যদিও আমার ব্যক্তিগত ফিলিং হল সব শেষ ও ফাইনাল! গত দুদিন যতজন বড় নেতার সাথে কথা বলার সুযোগ পেয়েছি মানে তাদের ভাবনা বুঝাবুঝি জানতে পেরেছি তাতে মনে হয়েছে তারা আর ফিরতেই পারবেন না! ডিল ডান!!!
কিন্তু আজকে এলেখার প্রসঙ্গ বাড়তি আরো কিছু, মানে উপরের কথাগুলোরও বাইরেঃ
বাড়তি প্রসঙ্গটা কী?
নিচের ভিডিও টা সবার আগে দেখে নিতে পারেন।
ভারত থেকে পানির নায্য হিস্যা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াই হবে: তারেক রহমান | BNP
সাদা চোখে শিরোনাম বা ভিডিও দেখেও মনে হতে পারে যে, আরে, এটাই তো বিএনপির জন্য সঠিক লাইন!! কিন্তু এটা আপতিক। মানে আপাতত অর্থে হয়ত এসব কথা সঠিক! কিন্তু গুঢ় দিক বলে আরেক দিক আছে। সেটা এখানে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
সোজাসাপ্টা একথাটার উত্তর খুজেন, আপনি যদি আপনার পানির হিস্যা এবং ন্যায্য হিস্যা চান তাহলে আবার একইসাথে কী আপনি ভারতের সাথে নুন্যতম কোন আপোষ, ভারতের অধীনে থেকে তাদের তুলে দেওয়া ক্ষমতায় আসীন হওয়ার চিন্তা করতে পারেন?
আসলে এই হচ্ছে, নিকাহ আর তালাক একসাথে করার চিন্তা। অর্থাৎ এগুলো হল, অর্থহীন চিন্তা; কারণ আগের চিন্তা-অবস্থানের সাথে পরের চিন্তা-অবস্থান যে মিল হচ্ছে না সেদিকটা আমল না করে কথা বলার বোকামি!
এরপরেও আরেকটা তথ্য দেইঃ
এখানে পাবেন ইমিডিয়েট সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান কী হবে – সে সংক্রান্ত ধারণা।
আমি সবসময় পাঠক তো বটেই রাজনৈতিক নেতা, নীতি-অবস্থা নির্ধারকদেরকে বলি পড়াশুনা করতে। আপনাদের সময় ও এক্সপার্ট-বোধ নাও থাকতে পারে সেক্ষেত্রে ওস্তাদ পলিটিক্যাল বোধসম্পন্ন লোক ভাড়া করেন। তাতে সমাবেশে হাজার খালেক লোক কম হলেও এর ইমপ্যাক্ট বা বেনিফিট বেশি হবে।
কিন্তু আবার সাবধান! যেমন মির্জা আলমগীর তিনি কিন্তু ইতোমধ্যেই এমন কিছুটা প্রাকটিস করে থাকেন! তাহলে সমস্যাটা ঠিক কোথায়? তবে তিনি মনে করেন দুনিয়ার ওস্তাদ পলিটিক্যাল বোধসম্পন্ন মানুষ মানেই হল কমিউনিস্ট-প্রগতিশীলেরা। তাই তিনি কেবল কামাল নামের কমিউনিস্টদের কাছেই যান। মানে যেতেন যারা আবার সত্তর দশকের কমিউনিস্ট। যারা মনে করেন বিএনপি তো একটা নির্বাচন-ক্ষমতার দল। তাই কোন রেডিক্যাল কাজ বিএনপির জন্য হারাম! তো রেডিক্যাল মানে? একেবারে অরিজিনাল মানে হল, আপোষহীন রাস্তার লড়াই-গণ আন্দোলন এগুলো তো বটেই এমনকি সময়ে সেমি-সশস্ত্র বা সশস্ত্র পর্যন্ত যেতে হবে যেয়ে বসবে। এই কমিউনিস্টেরা আসলে এখন শুধু বাংলাদেশ না, সারা দুনিয়ার জন্য অভিশাপ! আল্লা আএদের যত তাড়াতাড়ি উঠায়ে নেয় ততই দুনিয়ার জন্য মঙ্গল!
আচ্ছা তাহলে বলেন তো -কমিউনিস্ট মশাই- আওয়ামি লীগ কী তাহলে রেডিক্যাল বা বিপ্লবী দল? অথচ বিএনপির মতই (আপনাদের তুচ্ছ চোখে দেখা দল বিএনপি) বুর্জোয়া – নির্বাচন আর ক্ষমতার লোভের ‘নিচা’ দল কী আওয়ামি লীগও নয়???? তাহলে ১৯৭১ সালে সশস্ত্র যুদ্ধের নেতা আওয়ামি লীগ কী করে পারলো হলো??? মানে হল, যা আওয়ামি লীগের বেলায় হালাল তা বিএনপির বেলায় হারাম, কেন? এমন প্রগতিশীলতা ভাগাড়ে ফেলে আসেন আগে! এই পরামর্শ তিনি ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর (যেদিন খালেদা জিয়াকে বাসার সামনে বালির ট্রাক দিয়ে……) মির্জাকে দিয়েছিলেন। আর সেজন্য এই কমিউনিস্ট-পরামর্শ মির্জা আলমগীর শুনার পরে নেতিয়ে পরে শুয়ে গেছিলেন। আর এটাই মূল কারণ ঐ দিনের ব্যর্থতার। বহু প্রস্তুতি থাকার পরেও বিএনপি রাস্তাতেই নামে নাই।
অতএব এখনকার জন্য মূলকথাটা হল, এই ঘটনা থেকে শিক্ষাটা হল, ওস্তাদ পলিটিক্যাল বোধসম্পন্ন মানুষ অবশ্যই হায়ার করবেন; কিন্তু একটাই শর্ত উনাদের লেজ তুলে চেক করে নিবেন যে মানুষটা কমিউনিস্ট কিনা! হলে সটান বাদ দিতে হবে, এতাই একমাত্র ক্রাইটেরিয়া!
তারেক জিয়া কথাগুলো বলেছিলেন, একটা সম্ভবত প্রাইভেট বিশ. এর আসরে। একাদেমিক জায়গা হিসাবে বক্তব্য হয়ত ঠিক! কিন্তু যখন আওপনার মাথায় ঢুকে গেছে যে ভারতের সাথে একটা রফা একটা আপোষরফা করেই আপনাকে ক্ষমতা পাবার পথ তখন – এই বক্তব্ব্য স্ববিরোধী বা কনফ্লিক্টিং!
যেকথা বলছিলাম, আরেকটা তথ্য – এখনকার মোদি / র – এখন থেকে কোন অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশের সাথে কথা বলবে দল অথবা সরকারের সাথে এধারণা তারা দিয়ে দিয়েছে ও তাদের প্রকাশিত সেই মনোভাব আছে বিবিসি বাংলার এক লেখায়। তা আমি আগে আলোচনা করেছি সে লেখার শিরোনাম ছিল – ‘রোড ম্যাপ’ – আসলে কাদের দাবি? ভারতের! এখানে। আর ঐ পুরা লেখাটাই যে রেফারেন্সে লেখা সেটাই হল বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত ভারতের পক্ষ থেকে লেখাটা। খুবই মজার শিরোনাম – বিবিসির,
হিন্দু, হাসিনা, হতাশা : যে সব কারণে দিল্লি ও ঢাকার সম্পর্ক কিছুতেই সহজ হচ্ছে না
এই লেখার সারকথা হল, ভারতের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে,
১। ভারতের সাথে বাংলাদেশ সমান – এমন সমান মর্যাদা বোধ বা সমকক্ষতা – এটা মেনে কোন সম্পর্ক ভারত বাংলাদেশের সাথে করবে না।
২। তাই, পানির হিস্যা এবং ন্যায্য হিস্যা এজাতীয় কোন ন্যায় বা সমকক্ষতা এসব ধারণা ভারতের কাছে গ্রহনীয় নয়।
৩। ইতোমধ্যে ইউনুস সাহেব ভারতের সাথে পানির হিস্যা এবং ন্যায্য হিস্যা ইতোমধ্যে এসব কথা তুলে মিডিয়ায় বসে ফেলেছেন তাই ভারত ইউনুস সরকার কে স্বীকার করবে না, কোন ডিল করবে না। আসলে সেই থেকে একারণেই এখন প্রতিদিন ভারতের আগ্রাসী স্টেপ প্রতিদিন বাড়ছে।
এজন্যই ভারত দ্রুত নির্বাচনী রোড ম্যাপের পক্ষে সমস্ত পথে চাপ সৃষ্ট করে চলছে। যাতে নির্বাচিত বিএনপি-জামাত ইত্যাদি কেউ এসে গেলে ইউনুস ফেলে দিতে ভারত ন্যায় বা সমকক্ষতা এসব ধারণা ভারত বাইরে রেখেই যেকোন ডিল বা সম্পর্ক করতে পারে।
তাহলে, এখন এই মুহুর্তে তারেক জিয়ার
ভারত থেকে পানির নায্য হিস্যা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক আদালতে লড়াই –
এই বাক্যের প্রতিটা শব্দ বিএনপির ভারতীয় ইস্যুতে মির্জা ফকরুল কে দিয়ে বলানো আগের সব অবস্থানের সাথে কনফ্লিক্টিং।
তাহলে????
বিএনপিকে দ্রুত সতর্কতার সাথে এই দুরকম অবস্থান সংশোধন করে নিতে হবে। হয় ভারতের সাথে নিকাহ আর না হয় তালাক এক টাই করতে হবে। অপশন এতটুকুই। একসাথে দুটা করা যাবে না। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে কোন ন্যায় বা সমকক্ষতা এর জায়গা নাই।
লেখকঃ
গৌতম দাস, রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com
আপডেটঃ ডিসেম্বর ২০২৪
শেষ আপডেটঃ ২০২৪


