সংক্ষেপে কিছু খাড়া কথা


সংক্ষেপে কিছু খাড়া কথা
গৌতম দাস
০৭ আগষ্ট ২০২৫   দুপুর ১ঃ ৪৬
https://wp.me/p1sCvy-6v7

 

অধ্যাপক ইউনূসের সাথে তারেক রহমানের বৈঠক হয় লন্ডনে – ছবি বিবিসি থেকে নেয়া

 

ইউনুস সাব  ৫ আগষ্ট বর্ষপুর্তি পালন করেছেন, বৃষ্টিতে ভিজে অনুষ্ঠান করে। ঐরাতেই টিভিতে এক ভাষণও দিয়েছেন। যেখানে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে রমজানের আগেই নির্বাচন হবে ঘোষণা করেছেন।
এগুলো হল বাইরে দেখতে পাওয়া কথা।  আর ভিতরে?

এটা পরিস্কার যে একাজগুলো করতে তিনি বিএনপির তারেককে সবচেয়ে বেশি আদর করেছেন কোলে নিয়েছেন। কেন? কারণ এভাবেই তিনি নিজ একক রচিত ‘জুলাই সনদ’ ঘোষণা এবং সাথে ‘জুলাই ঘোষণা’ করতে গিয়ে তিনি এটাকেই উপায় হিসাবে ব্যবহার করেছেন। মানে এই  কথিত – সনদ বা ঘোষণা – কোনটাই তার পক্ষে এটা ছাড়া সম্ভব হচ্ছিল না। মুল সমস্যাটা হল, মূল তিন-চারটা দলকেও তিনি ডেকে নিলেই এদের সব আলাদা আলাদা অবস্থান-গুলো বাইরে চলে আসত; ফলে ভাব নিয়েছেন এটা তিনি নিজের ক্ষমতায় করলেন। কিন্তু আসলে?
আসলে তিনি (১) তারেককে দুবছরের সময় ঘুষ দিয়েছেন। মানে ‘জুলাই ঘোষণা’ বলে যা তিনি -কথিত সংস্কার- রচিত করেছেন তা এখনই মানে কোন নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগেই আইনী ভিত্তি দিতে হবেই না। যার সোজা মানে আগে আইনি ভিত্তি পরে সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান, এমনটা করতে হবে না।  অর্থাৎ এগুলোর কোন কনষ্টিটিউশনাল ভিত্তি এখনই দিতে হবে না। আগে নির্বাচন হয়ে যাবে হাওয়ার উপর দাঁড়িয়ে  মানে কোন আইনি ভিত্তি ছাড়া আর পরে যেই ক্ষমতায় আসবে সে পরে এটা সংসদে পাশ করে নিবে। এর আবার সোজা মানে হল, নয়া ক্ষমতাসীন দল সেটা না করলে বা ইচ্ছা-মনমত বদল করে নিয়ে করলেও চলবে! এটাকেই আমি দুবছর তারেককে ঘুষ দেয়া বলছি।

তবে পাঠকেরা সাবধান!   
উপরের উল্লেখ করা ইউনুসের বক্তৃতায়, দুইটা জিনিষ অস্পষ্ট বা ফাঁক রাখা আছে। আপনারা ধরে নিয়েছেন সেটা আপনারা যা বুঝেছেন তাই-ই লেখা আছে। কিন্তু না! যেমন ইউনুসের টিভিতে দেয়া স্পিচ যেটা অনেক পত্রিকাই টেক্সট করে ছাপিয়েছে সেখানে নির্বাচন হবে একথা বলা হয়েছে সব জায়গায় কিন্তু কোন নির্বাচন? প্রেসিডেন্সিয়াল শাসনের প্রেসিডেন্ট (যেমন জিয়ার প্রেসিডেন্ট হওয়ার নির্বাচন, যেটা হয়েছিল রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ১৯৭৮, ৩ জুন ১৯৭৮ সালে) নির্বাচন নাকি জাতীয় সংসদ এর নির্বাচন সেটা স্পষ্ট করা নাই। জিয়ার আমলে আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ১৯৭৮ হয়েছিল  আর পরে দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ১৯৭৯, বাংলাদেশে ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ সালে অনুষ্ঠিত হয়।
আর, দ্বিতীয় অস্পষ্ট বা ফাঁক রাখা ইস্যুটা হল, তাহলে নির্বাচন হচ্ছে ইউনুস সরকারের অধীনে! তাই কী? অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আদালতের দ্বারা জীবিত (ও অস্পষ্ট) হয়ে  থাকলেও এর কথা আর কেউ এখন তুলছে না। এই এখন মানে? এখন মানে হল, ৫ আগষ্ট্রের ইউনুসের ভাষনের পরে।

ইতোমধ্যে আগেই আমি বলেছিল্লাম ইউনুস (নির্বাহী ক্ষমতার প্রেসিডেন্ট, প্রেসিডেন্ট জিয়ার মত) প্রেসিডেন্ট হতে চান! এমনকি সাথে এনসিপির কেউ কেউ তার সাথে মন্ত্রী থাকতে চান সেকথাও উল্লেখ করেছিলেন!
এখন যেটা বিস্ময়কর তা হল, এনসিপি ইউনুসের ৫ আগষ্ট্রের টিভি স্পিচকে স্বাগত জানিয়েছে, বিচ্ছিন্নভাবে। তবে গতকাল ৬ আগষ্ট সেক্রেটারি আখতার হোসেন যে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন তাতেও এমন কথা নাই যে আগে কনষ্টিটিউশনাল  আইনি ভিত্তি পরে সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠান – এভাবে পরিস্কার করে কিছু বলা হয় নাই। তবে ঐক্যমত্য কমিশনে যা যা নিয়ে ঐক্যমত হয়েছে তা বাস্তবায়ন এর নিশ্চয়তা কোথায় ও কীভাবে হবে এনিয়ে সাধারণ প্রশ্ন তোলা হয়েছে। আবার তাদের দল নয়া কনষ্টিটিউশন চাওয়ার দল সেটাই কেবল উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ না কনষ্টিটিউশন না হলে অথবা সংস্কার শেষ হওয়া ও এর আইনি ভিত্তি না থাকলে এনসিপি নির্বাচনে যাবে এমন সোজাসাপ্টা কিছুই সেখানে বলা হয় নাই।   মানে এর এমন মানে করা সম্ভব যে আরেকবার বলিলেই খাইব!  শেষ পর্যন্ত সামনে যাই ঘটুক (আগাম নিশ্চয়তা কিছু পেলে!) আমরা কথিত ফেব্রুয়ারি ২০২৬ নির্বাচনে অংশ নিবই!!! – এমন অর্থ বের করার সুযোগ রেখে দেয়া আছে – জেনে বা না জেনে!
আর জামায়াতঃ জামায়াতই প্রথম থেকে নির্বাচনের সময়ের তত্বাবধায়ক সরকারের আইনি ভিত্তি না থাকলে “মানবেন না” তা অনেক স্পষ্ট করে বলেছিল।  আর এখন মানে ইউনুসের বক্তৃতার পরে অতটা জোর দিয়ে বলছেন না; যদিও বলেছেন এমনকি নরম করে হলেও না হলে আন্দোলনে যাবেন তা উল্লেখ করেছেন।

“পিআর পদ্ধতি ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলেও জানান তাহের।…..
সংস্কার, গণহত্যার বিচার ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশার কথা জানান আবদুল্লাহ মো. তাহের। তিনি বলেন,
দাবি না মেনে নির্বাচন দিলে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হবে জামায়াত।”

আর হাত পাখা ইসলামি আন্দোলন তাদের প্রতিক্রিয়া পাওয়া একটা ভিডিও ক্লিপ পাওয়া যাচ্ছে। তাতে দেখা যায় তাদের ডাকে নাই, মানে ইউনুস একা একাই সব ঘোষণা করেছেন এনিয়ে তাদের আপত্তি আছে ইত্যাদি।

তাহলে যে কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, ইউনুস সাব বুঝেছিলেন যে ঐক্যমত্য কমিশনে কিছুই ঐক্যমত হবেই না। এর চেয়ে কাউকে দুবছরের ঘুষ দিয়ে কাউকে অন্য কিছু বা এককথায় পক্ষগুলোর সাথে আলাদা আলাদা একটা ডিল করে এগিয়ে যেতে হবে। এবং এভাবেই তিনি এপর্যস্নত আগষ্ট পার হয়ে চলেছেন।

তাহলে কী তিনি সব সমাধান করে ফেললেন?
এমন বাক্যে জটিলতা টা হল, কোন নির্বাচন হচ্ছে তাহলে ইউনুসকে প্রেসিডেন্ট না তারেককে প্রধানমন্ত্রী? নাকি এর মানে ইউনুস প্রেসিডেন্ট আর তারেক ছোটভাই এমন নয়ত????? এর পরিস্কার ধারণা পাওয়া যায় না। যদিও তারেকের সাথে পশ্চিমা দেশের কূটনীতিকেরা লন্ডন উড়ে গিয়ে দেখা করছেন – এমন খবরে বিএনপি সমর্থকেরা উতফুল্ল হয়ে উঠেছে! এদিকটা এখনই একেবারেই পরিস্কার নয়। আরো সময় লাগবে!

কিন্তু একটা গভীরতম কাঁটা মানে একটা পক্ষ এখনও উপরের আলোচনার বাইরেঃ
সেটা হল আর্মি!
যতদুর জানা যায় ওয়াকারের মূল সমস্যা বা ব্যক্তিগত স্বার্থ হল, ১৪০০+ মৃত্যুর মুল হুকুমদাতা হাসিনার প্রথম বাস্তবায়ক (বা সেনাদেরকে প্রধান কমান্ড রেস্পনসিবিলিটির দায়) হিসাবে বিচার; যেটা আবার জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের পাঠানো সংশ্লিষ্টদের তালিকা ও বিচারের অনুরোধ এবং বিচার শেষে রিপোর্ট পাঠানোর আদেশ / অনুরোধ / পরামর্শ! এখান থেকে মুক্ত হওয়া খুবই কঠিন। যদিও কথিত ধারণা এখন চলছে যে ইউনুসের আকাঙ্খার নির্বাচন টা সমাপ্ত করে দিতে পারলে ওয়াকারকে স্বেচ্ছা অবসর নিয়ে তিনি সম্ভবত আমেরিকায় তাঁর মেয়ের কাছে চলে যেতে দিবেন!  কিন্তু নিশ্চয়তা?  সেটা এক আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে একেবারেই নাই! কারণ, দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক অনেক ধরনের ফ্যাক্টর এখানে জড়িত!
এদিকে তাঁর সঙ্গিসাথীরা মানে ৪৫০ জনের বাকীরা? বিশেষ করে এই গ্রুপের লিডার সিনিয়ার আর্মিরা? এদের ভাগ্য কী হবে সেক্ষেত্রে?  এনিয়ে ইউনুসের কোন ভাবনা / পরিকল্পনা আছে জানা যায় না। সম্ভবত তা নাই!   তাহলে তাঁরা নিউট্রাল বা স্থির হবে কী প্রকারে???? যদিও মুরোদের কথা এদিক থেকে ভাবলে যতটুকু জানা যায় এরা বিদ্রোহ করা বা একটা ক্যাওয়াজ গন্ডগোল লাগাতে পারবে হয়ত কিন্তু সফলতার কোন সম্ভাবনা নাই! এদের অনেকে আবার এখনও ইন্ডিয়ার সাথে সম্পর্কিত; সেকারণে অনেকে মনে করে ইউনুসের পরিকল্পনায় ইন্ডিয়ার ভাগে কিছুই যদি না আসে তবে এসব কথিত বিদ্রোহিরা নিজেদের শক্তিশালী অনুভব করতে পারে। কিন্তু আসল কথাটা যদিও  শক্তিশালী অনুভব আর বাস্তবে শক্তিশালী হওয়া এদুটো এক কথা না!  বরং আকাশ-পাতালের ফারাক!
যাহোক, সারকথাটা হল, এটা একটা ফ্যাক্টর!
এখন এই সুত্রে আরেক অংশ মানে ওয়াকার-বিরোধী, এরাও আরো বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু আমার জানা মতে এদের অবস্থান মনোচাব কনসার্ণ বা বক্তব্য নিয়ে ইউনুস আমল করেছেন বা করছেন তা আমার জানা নাই। বরং তিনি ধরেই নিয়েছেন যেন ওরা তো আছেই তাঁকে সমর্থন দিয়ে যাবে মানে তিনি যা করবেন তাতেই!!!!!
কিন্তু এই অনুমান একেবারেই ভিত্তিহীন!  সারকথায় বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায়, আমেরিকা তাও আবার সেয়ান পাগলা ট্রাম্পের আমেরিকা বাংলাদেশকে যেভাবে দেখতে ছাইবে সাজাতে চাইবে  সেদিন আর নাই। আমেরিকা আমাদেরকে ইন্ডিয়ার হাতে তুলে দিয়েছিল যাতে ইন্ডিয়া আমাদেরকে নিয়ে যা খুশি করতে পারে। সেদিনও নাই, আমেরিকার সে মুরোদও নাই। সর্বোপরি আমেরিকার সেই আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে অপমান আমরা ভুলবো না শুধু তাই নয় বরং সেই সুত্রে তৈরি হওয়া ইন্ডিয়ান দানব হাসিনার ফ্যাসিজমের উত্থান ঘটেছিল। আর সেই ইন্ডিয়াসহ সেই দানবকে আমরা উপড়ে ফেলে দিয়েছি। ফলে আবার সেই আমেরিকার কোলে এবার সরাসরি বাংলাদেশকে তুলে দিবার চেষ্টা হলে ইউনুসের দশা-পরিণতি হবে হাসিনার চেয়েও খারাপ! তা বলাই বাহুল্য! একথাটা ইউনুস সাবকে মনে রাখতে হবে!!!! যদিও ইদানিং তার মুভমেন্টে এর ঘাটতি দেখছি আমরা!

এবার হেড লাইনে সারকথাঃ
১। ফেব্রুয়ারিতে কী নির্বাচন হবে? আমরা তো এখনও নিশ্চিত জানি না সেটা কিসের নির্বাচন –  নির্বাহি প্রেসিডেন্টের নাকি জাতীয় সংসদের? সেটা এখনও কেউ জানে না। ফলে অনিশ্চিত!
২। আমেরিকা রাষ্ট্রদুত ট্রেসি লন্ডনে তারেককে বুঝাতে গিয়েছিল ইউনুসের হয়ে, সেটা এই বলে যে তারেক যেন ইউনুস সাবের সাথে “ক্ষমতার ছোট ভাই” হয়ে থাকে; কিন্তু সেটা কী তারেক রাজি হবে, পালন করতে? তাই এটাও অনিশ্চিত!
৩।  ইউনুস সাবের বাংলাদেশকে একচেটিয়া আমেরিকার কাছে বন্ধক রাখার চেষ্টা কী তিনি সংবরণ করবেন? থামবেন? এটাও অনিশ্চিত! যদিও আরও একটু বাড়লে তিনি উতখাত হওয়ার রিস্ক নিবেন তা বলা যায়!
৪। উনি নির্বাহি প্রেসিডেন্ট হতে হলে আইনি ভিত্তি কোথায় পাবেন? যেখানে এখনও কথিত ফেব্রুয়ারী নির্বাচনেরই কোন আইনি ভিত্তি নাই এবং তা অনিশ্চিত?
৫। এতদিন পর্যন্ত ইউনুস সাব ‘আর্মি ফ্যাক্টরকে’  উপেক্ষা বা আন্ডার-এস্টিমেট করে চলছেন বলে আমার বুঝাবুঝি! অথচ একচেটিয়াভাবে না আমেরিকা, না চীন এর কোলে উঠানো যাবে না। যারাই বাংলাদেশকে উঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টাকরতে যাবেন এমন চেষ্টা কে “আর্মি ফ্যাক্টর” প্রতিহত করবেই নিজ স্বার্থে – এটা ইউনুস সাবের বুঝতে পারা উচিত! আর এবিষয়ে সেটা যদি ইন্ডিয়া হয় তো এনিয়ে আর্মির অবস্থান হাসিনাকে উপড়ে ফেলা দেখে যে কারো আগেই বুঝে যাওয়া উচিত! এসব কারণে, যেকোন সময় ইউনুস সাবের ভুলে বা সীমা ছাড়ালে তিনি নিজে ক্ষমতাকে অনিশ্চিত  করে ফেলতে পারেন!

তাই,  কথিত ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হচ্ছে কিনা-সহ আমাদের জন্য সামনের দিনগুলো সবই অনিশ্চিত!

 

 

গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

আপডেটঃ   ০৭ আগষ্ট, ২০২৫    রাত ০৮ঃ৪৮
 

 

 

 

 

Leave a comment