“ডোনাল্ড ল্যু ফের…” কোথাও আসেন নাই; আমাদেরকে ভারতের কোলে তুলে দিতে চাইছেন


“ডোনাল্ড ল্যু ফের…” কোথাও আসেন নাই;
আমাদেরকে ভারতের কোলে তুলে দিতে চাইছেন

গৌতম দাস
১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সন্ধ্যা ১৯ঃ ৫৮
https://wp.me/p1sCvy-5pM

The Indo-Pacific Strategy in Action: Commemorating the Second Anniversary

 

আপনি যদি হন কোন পাগলা-প্রেমিক যে প্রেমিকা মেয়েটার  মন পাবার জন্য নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে বসে আছেন আর তাতে আবার আপনিই নিজ চোখে যদি দেখতে পান সেই মেয়েটাই আসলে আপনাকে না আরেক পুরুষের মন পাবার জন্য তাঁকে চিঠি মানে আকুল হয়ে প্রেমপত্র লিখছে – তাহলে এর মানে কী বুঝবেন??? এর অর্থ হল আপনি শুধু বেকুব পাগলা না, গাধাও বটে!!! সে “আকুল প্রেমপত্র” খানা আপনার হাতে আসার পরেও যদি আপনি নিজের সাথে প্রতারণা করেন, নিজেকে মিথ্যা প্রবোধ দিতে থাকেন যে আমেরিকার বাইডেন-ল্যু আবার আসবে, এই এলো বলে ইত্যাদি তবে আর আপনাকে আপনারই গড়া মিথ্যা মায়ার জগত ভেঙ্গে বাস্তবের জগতে আপনাকে কেউ আনতে পারবে?
একারণেই “ডোনাল্ড ল্যু আবার…… ” – এটুকু সংবাদের শিরোনাম শুনলেই বাংলাদেশের বিরোধী-মন ফেসবুকার-সহ সকলে হুটোপটি শুরু করে দিচ্ছে! খুবই বিপদজনক লক্ষণ এটা সন্দেহ নাই!!

মানুষ জন্মানো শিশু অবস্থায় মায়ের পেট থেকে বাইরের দুনিয়ায় একবার চলে আসা মানে, যেটাকে আমরা জন্ম নেওয়া বলি তা, একবারেরই ঘটনা। একবার জন্ম নেয়া শিশু পরে আবার সে মায়ের গর্ভে ফিরে যেতে পারে না। কোন সুযোগ নাই। আর ফিরা যায় না এমন একমুখিতা বা irreversible ঘটনা এটা! এছাড়া  মায়ের গর্ভেরও সেই পুর্ব-পরিবেশ দশা পরিস্থিতিও আর থাকে না যে সেখানে ফিরে গিয়ে শিশু চাইলেই আবার আশ্রয়-বসবাস করতে পারে! কিন্তু তবু মানুষের মধ্যে কল্পনা থাকে। ফ্যান্টাসি করে মানুষ, মানে কল্পনায় এমন বসবাস করতে চায় মানুষ! আর সেভাবে  চলে যেতে চায়; বুঝতে চায় সে অনুভুতি কেমন, ইত্যাদি। যদিও মানুষ একেবারে পরিস্কারই জানে – মানুষ জানে যে এটা একেবারেই অবাস্তবতা; তবু ফ্যান্টাসিতে করতে চায়! তাই সেখান থেকেই একটা কথ্য-ভাষ্য দেখা যায় “মায়ের গর্ভে ফিরে যাবার মতই অসম্ভব”! কোন একটা ব্যাপার একেবারেই অসম্ভব বুঝাতে তাই অনেকে বলে জন্ম নেওয়া বাচ্চার মায়ের গর্ভে ফিরে যাবার মতই অসম্ভব!

আবার ইংরাজিতে এমনই আরেকটা বাগধারা শব্দ আছে – ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন! কথাটা ক্রিকেট খেলায় বেশী ব্যবহৃত হয়।  মানে ব্যাটসম্যান খেলতে নেমে আউট হয়ে যাবার পর ক্রিকেট ফিল্ডের বাইরে চলে আসতে ও নিজ শিবিরে আশ্রয় নিতেই হয়।  আর সারকথায় এর অর্থ হল – “আপনি আউট, আপনি ব্যর্থ তাই আপনার স্থান এখন বাইরে”!!! অথবা এভাবটা বুঝাতে চায় যে – আপনি ব্যর্থ এখন তাই আপনি যেখান থেকে এসেছিলেন সেই প্যাভিলিয়া্নে বা মাঠের বাইরে ফিরে চলে যান। এই অর্থে ব্যাক টু প্যাভেলিয়ান মানে আপনি হেরে গেছেন কথাটাই আসলে একটু সুন্দর করে বলা!

বাইডেন ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন!
হা ঠিকই ধরেছেন কথাগুলো হচ্ছে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে নিয়ে!  বাইডেন ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন!! মানে বাইডেন, “তুমি হেরে গেছো তাই তুমি এখন মাঠের বাইরে যাও”!!!
তবে কথাটা আমি বলি নাই! যারা বাইডেনের পরাজয় হয়ে গেছে বুঝে তা এখন আবার তা ঢাকতেও শুরু করেছে অথচ পরাজয় পরবর্তি বাইডেনের সকল ততপরতাই বলে দিচ্ছে যে তিনি হেরে গেছেন!  এমনিতেই বাংলাদেশিদের জন্য বাইডেন যে পরাজিত হয়েছেন তা বুঝে ফেলার ক্ষেত্রে আমরা  সবার চেয়ে একটু আগিয়ে আছি বলতেই হয়। যেমন, বাইডেনের আমেরিকাই দাবি করে জানিয়েছে যে বাংলাদেশে কোন “ফেয়ার ইলেকশন” ঘটে নাই। আর আমরা দেখতেছি  কথিত এই নির্বাচনের পরে হাসিনা-ই আবারও সরকারে আছেন, নতুন করে বসেছেন। তাই ফেয়ার ইলেকশন না হওয়ার কথা তো আর অন্তত ঢাকার কাউকেই বুঝায় বলার কিছু নাই। যার আরেক অর্থ হল, বাইডেনের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার (যেটা নাকি বাইডেনের পররাষ্ট্রনীতির মুখ্য বৈশিষ্ট ও নীতি-পলিসি বলে দাবি করা হয়েছিল তা) এছাড়া এর সাথে বাইডেনের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভিসা নিষেধাজ্ঞা বিষয়ক যেসব পলিসি ছিল সেসব এখন ভাগাড়ে গেছে,  গোল্লায় গেছে, অকেজো হয়ে কোথায় হারিয়ে গেছে। এটা বাংলাদেশিরা নিজ শরীরি অনুভবেই টের পেয়েছে!

কিন্তু এঘটনাটা বাইডেন নিজে বা তাঁর অন্তত মন্ত্রী সভাসদ এরা কীভাবে দেখছে? তারা কী এটা খোলাখুলি স্বীকার করেছে?  না করে নাই, করছে না।  কারণ তা করলে এরপর সম্ভবত বাইডেনকেই প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ছেড়ে ভাইস প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা দিয়ে চলে যেতে হত; এছাড়া সেক্ষেত্রে, শাসনের নৈতিক শক্তি হারানো কোন ক্ষমতা মানে সে তো পরাজিত ক্ষমতাই! তার আর কিছুই অবশিষ্ট  থাকে না বলে স্বীকারের প্রসঙ্গ উঠতে পারছে না! তাহলে?

যদি মনে রাখি তবে এসবেরই ঘটনা-আলামত শুরু হয়েছিল বলতে পারি –  গত বড়দিন (২৫ ডিসেম্বর ২০২৩) থেকে যখন, পিটার হাস এই বড়দিন এবার পালন করেছিলেন নয়াদিল্লিতে বসে। সেই থেকে আমাদের কাছে আমেরিকার পলায়নের সন্দেহ গভীরে বাড়ছিল কিন্তু একেবারে সুনির্দিষ্ট করে কিছু জানা বা বলা যাচ্ছিল না!  এরপর ৭ জানুয়ারির নির্বাচন হতে দেওয়ার “স্বাভাবিকতা” দেখে এরপর থেকে পরে ঘোষিত ফলাফল আর একেবারে ৪ ফেব্রুয়ারি, বাইডেনের লেখা শেখ হাসিনাকে চিঠি পর্যন্ত আরো সব আলামত ক্রমশ সব প্রকাশিত হচ্ছিল। এরপরেই শুরু হয়েছিল বাইডেনের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি একে এক সফল কার্যক্রম বলে প্রচার যা শুরু হয়েছিল ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে যেটা শেষে ১৫ ফেব্রুয়ারিতে ডোনাল্ড ল্যু এর ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজির দুবছর কথিত সফল সমাপ্তি উতযাপন দেখলাম আমরা।  আসলে এক আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক হল ” ইউএস ইন্সটিটিউট অফ পিস” মানে, USIP [U.S. Institute of Peace], গত ১৫ ফেব্রুয়ারি এদিন আইপিএস এর দুবছর পুর্তিতে সফলতা উতযাপনে ডোনাল্ড ল্যু কে তারা  আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। আর ঐ সভাতেই ল্যু এর দেয়া বক্তৃতার এক-দুইটা বাক্য মাত্র ছিল বাংলাদেশকে নিয়ে। আর তাতেই বাংলাদেশের মিডিয়াগুলো ঝড় বইয়ে ফেলেছিল। আবার যদিও সেখানে ল্যু বার্মা বলতে ঠিক সেখানে যে বর্তমান সশস্ত্র সংঘাত চলছে এর কথা তুলেন নাই বা বলেন নাই। সাধারণভাবে কথা বলেছিলেন। তিনি ২০১৭ সাল থেকে রোহিঙ্গা সমস্যর দায় বাংলাদেশ বইছে তা নিয়ে তিনি কথা বলেছিলেন।   মজার কথা হল সে অনুষ্ঠান ১৫ ফেব্রুয়ারি হলেও বাংলাদেশে এর প্রতিক্রিয়া হয় ১৮ ফেব্রুয়ারিতে। আর বাংলাদেশ এই শব্দ যোগ করে দিয়ে বলা পুরা কথা থেকে কেবল  ০১ঃ৪৬ মিনিটের বক্তব্যটুকুর ভিডিও এনেছে চ্যানেল ২৪ যা দেখা যাবে এখানে

আর যারা ঐ অনুষ্ঠানের পুরা ১ ঘন্টা ৪৬ মিনিটের রেকর্ডিং-টাই পেতে চান তা পাবেন এখানে।  তবে মনে রাখবেন, এর রেকর্ডিং চালুর আবার প্রথম ১৬ মিনিট পরে অনুষ্ঠানটা শুরু হয়েছিল তাই প্রথম ঐ ১৬ মিনিট পেরিয়ে বা বাদ দিয়ে শুরু করতে পারেন। আর শুরুর আবার ২৭ঃ৩৫ মিনিটে গিয়ে ল্যু এর প্রথম বক্তব্য শুরু হয়েছে। কিন্তু দুঃখের কথা এই বক্তৃতায় ল্যু বাংলাদেশ নিয়ে কিছুই বলেন নাই – শব্দটাও উচ্চারণ করেন নাই। এই অংশে তাঁর পুরা বক্তব্যটার প্রসঙ্গ হল কেবল শ্রীলঙ্কা। পরে সেকেন্ড রাউন্ডে সবার বক্তব্য শুরু হলে ল্যু আবার বলার সুযোগ নেন ৫৩ঃ ৫৪ মিনিটে।  আর তখনই তিনি কেবল দেড় মিনিটের বক্তব্যে বাংলাদেশ শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন আর সেটাই চ্যানেল২৪ রেকর্ড ক্লিপ এনেছে।

একটা সোজা কথায় সে প্রশ্নটা করা যাকঃ
ডোনাল্ড ল্যু নিজের আইপিএস উতযাপন বক্তৃতায় ছোট্ট করে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ এনেছেন। তিনি বলেছেন বার্মা বা রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু ফেরার প্রসঙ্গটা দীর্ঘায়িক হতে পারে; জটিলতা বাড়তেও পারে। তাই বাংলাদেশ আর ভারতকে নাকি সতর্ক থাকতে হবে! কিন্তু কী আশ্চর্য বাইডেন-ল্যু এর বার্মা এক্ট বলে কী জানি একটা ছিল না? যেটা নাকি আমাদের রক্ষকবচ? ল্যু-রা এই বার্মা এক্ট দিয়েই নাকি আমাদেরকে রক্ষা করবেন??? এটাই তো দয়াময়ী বাইডেন-ল্যু এর আশ্বাস বাক্য ছিল না??? তো সেটা এখন কোথায় গেল?? এর তো কোনই হদিসও নাই!!!! আর উলটা ল্যু আমাদেরকে নিজ নিজেই নিজের আত্মরক্ষার কানপড়া দিচ্ছেন কেন??? আমাদের রক্ষাকর্তা হবার সাধ-আল্লাদ ছিল যার সেই আমেরিকা – আহা রে আমেরিকা – আমাদের ত্রাতা আমেরিকা তুমি কোথায় গেলে তাহলে?  

তাই এবারের আবার ল্যু এর প্রসঙ্গ –  এটা অবশ্যই আমাদের মিডিয়ার সৃষ্টি হৈ চৈ! মানে একটা উচ্ছ্বাস বা হাইপ তোলা যেন পাঠক হৈ চৈ শুরু হয়ে এসব মিডিয়ার হিট বা TRP বাড়ে বা দর্শক আছড়ে পরে তাদের নিউজে – এটা সেধরণের এক নিউজ রিপোর্ট ছিল।
যেমন মানবজমিনেরটা দেখা যাক – ওর শিরোনাম হল  ডনাল্ড লু ফের দৃশ্যপটে। এই শিরোনামটাই উস্কানিমূলক!  কারণ, বিগত দুবছর বাইডেনের আমেরিকা যেভাবে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতির পক্ষে, ওর পিছনে দাঁড়িয়ে নিজ নানান পদক্ষেপ বা ঘোষণায় আন্দোলনকে সাহস দিয়ে গেলেও গত সেপ্টেম্বর ২০২৩ থেকে এরাই আবার মাঠ ছেড়ে চলে গেছিল। তবু বিরোধীদলগুলো এখনও আমেরিকান সমর্থন আবার আসবে, আমেরিকা আবার এই এলো বলে ইত্যাদি অনুমান ছড়িয়ে রেখে চলছেই – কিছুই গুটায়ে ফেলে নাই – তাতে করে আম-জনতার মনে একটা গভীর কিন্তু ভুল আশা এখনো জিইয়ে আছেই যে আমেরিকা আবার আসবেই……! !

অথচ এই বাংলাদেশের বেলাতেই বাইডেন ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন! কথার আসল অর্থ হল এবার বাইডেন-ল্যু আবার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিতে এসেছে! গত ২০০৮ সাল মানে গত ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ১/১১ এর ক্ষমতাদখলের পরের বছর যেভাবে আমেরিকা বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছিল যেই দগদগে ক্ষত আমাদের ভুলবার নয় – আর যা পরে ২০১৭ সাল নাগাদ ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে তিনি আমেরিকাকে এখন থেকে প্রত্যাহার করে নিলেও কার্যত হাসিনা সরকারের ভারত-নির্ভরতা ও ভারতকে কোলে ধরে রাখার চেষ্টা থেকেই গিয়েছিল। কারণ, বাংলাদেশ বা ভারতে দুদেশেই পুরানা ক্ষমতাসীন সরকারেরাই থেকে গেছিল বলে আমেরিকান প্রত্যাহারের কোনকিছুই প্রকাশ করতে হয় নাই বা প্রকাশ্যে দেখাতে বাধ্য হয় নাই। এছাড়া নানান উসিলায় প্রায়ই নয়া আমেরিকান চাপ আসছিলই! তাই হাসিনা ততই ভারতকে চেপে ধরে রেখে চলছিলেন যা রুটিন ওয়ার্ক  এর মত ডাল-ভাত হয়ে গেছিল!

আবার এখন বাইডেন-ল্যু এখন ব্যাক টু দা প্যাভেলিয়ন! হয়ে গেলেও তাদের ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [আইপিএস] একেবারেই অর্থহীন অকেজো আর নুন্যতম ফল দেখাতে পারছে না অথচ সামনে্র নভেম্বর ২০২৪ বাইডেনকে আমেরিকান  নির্বাচনে নিজ জনগণের মুখোমুখি হতে হবে, তাঁর চলতি সরকারের সাফল্য কী এনিয়ে কথা বলতে হবে!  তাই মিথ্যা হলেও এবারের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে আইপিএস এর দুবছর পালনের দিন বাইডেন-ল্যু দাবি করছেন যে তারা এক সফল আইপিএস পলিসি যেন দেখিয়েছেন। চিঠি লিখে বাইডেন হাসিনাকে খায়েশ ব্যক্ত করে বলছেন যে বাংলাদেশ-আমেরিকা একসাথে  সফল আইপিএস পলিসি উতযাপন করতে চান!! আর বাস্তবতা হল, হাসিনার লিখিত আইপিএস বাইডেনের থেকে আলাদা!  হাসিনার আইপিএস-এ চীন কোন এনিমি  বা শত্রু নয় বা এভাবে দেখানো হয় নাই। বরং চীনের নামই নেন নাই হাসিনা!

তাহলে বাইডেন-হাসিনা একসাথে সফল(?) আইপিএস পলিসি উতযাপন করবেন কীভাবে?  আর অন্তত হাসিনা তো বাস্তবে তা করেনও নাই!

কিন্তু পরাজিত বাইডেন আবার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছেন। এটা করে হলেও বাইডেন নিজেকে সফল বলে দেখাতে চাইছেন!!!! তিনি এতই মরিয়া!! কিন্তু হাসিনা সরকার কী তা মেনে নিয়েছে!!! বা কিভাবে নিয়েছে?
গত ৭ জানুয়ারির নির্বাচনের দিনের পরের ১১ জানুয়ারির মধ্যেই হাসিনার নয়া এমপিদের শপথ থেকে শুরু করে নয়া সরকারের মন্ত্রীদেরো শপথ অনুষ্ঠানও শেষ করে ফেলেছিলেন। এরপর ১১-২৭ জানুয়ারি মোটামুটি টানা প্রায় প্রতিদিন আমরা দেখেছি চীনের প্রসঙ্গ আর ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদুতের সাথে নানা দেখা সাক্ষ্যাত, আলোচনা পরিকল্পনা। এমনকি হাসিনার সম্ভাব্য চীন সফরের লক্ষ্যে চীনা দাওয়াত জানানোও ঘটে গিয়েছিল!!
কিন্তু হায় সব ওলট-পালট! ২৮ জানুয়ারি থেকে ৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভিন্ন চিত্র। ৪ ফেব্রুয়ারি বাইডেনের লেখা  হাসিনাকে চিঠি আর এর আগে ভারতের অজিত দোভালের সফর থেকে সব উলটা চিত্র হয়ে যায়। আজও কেউ বা মিডিয়ার কেউ জানে না অজিত দোভাল ঠিক কবে এসেছিলেন, কয়দিন ছিলেন- এছাড়া ঠিক কী নিয়ে আলাপ করতে এসেছিলেন।  সরকারের দিক থেকেও এই সফর সম্পর্কে আজও মিডিয়াকে কিছুই জানানো হয় নাই। তাই বাংলাদেশের মিডিয়ায় যে যতটুকু জানিয়েছে তা মূলত অনুমান-নির্ভর আর নয়ত ভারতের মিডিয়ায় ছাপানো গারবেজ-প্রপাগান্ডার বরাতে যা খুশি লেখা!  অর্থাৎ সবমিলিয়ে  – বাইডেনের হাসিনাকে লেখা চিঠি ছাড়া সব কিছুই অস্পষ্ট। আর প্রবল ইঙ্গিত ছড়ানো হয়েছে যেন বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব (আগের ২০২১ সাল বাইডেন ক্রষমতার শপথ নিবার আগের মত”  বাইডেনের গণতন্ত্র-মানবাধিকার পলিসি নিয়ে হাজির হবার আগের মতই যেন আছে!

আগেই বলেছি গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ছিল বাইডেন-ল্যু এর পেয়ারের কিন্তু অকেজো ইন্দো-প্যাসেফিক স্ট্রাটেজি [আইপিএস] শুরুর দুবছর পুর্তি-সমাপ্তির দিন। যে দিনকে আইপিএসের কথিত সাফল্য এর দিন; আর যা বাইডেন-হাসিনা যৌথভাবে উতযাপনের জন্য প্রস্তাব রেখেছেন বাইডেন। কিন্তু হাসিনা এনিয়ে কোন সাড়া দিয়েছে আমাদের জানা নাই। তিনি নিজের কাজ নিয়ে নিজের মত ব্যস্ত থাকলেও  আমরা ডোনাল্ড ল্যু-কে পাই USIP এই থিঙ্কট্যাঙ্কের সাথে উতযাপন করতে।
শুধু তাই না, ঐ উতযাপন অনুষ্ঠানে ডোনাল্ড ল্যু – কিছুদিন আগে শ্রীলঙ্কায় অর্থনীতিতে দুর্যোগ বা ভেঙ্গে পড়া ঘটেছিল তা থেকে উঠে জাগার ঘটনাকে আইপিএসের সাফল্য বলে দেখাচ্ছেন। এখানেই শেষ না তিনি একাজে ভারতেরও অংশগ্রহণকে আমেরিকা-ভারতের সাফল্য হিসাবে এই প্রথম তুলে ধরেছেন। যেটা এর আগে কখনই আমরা দেখি নাই শুধু না বরং ভারতেরই অসন্তোষ দেখেছি যে শ্রীলঙ্কায় ভারতের সব প্রভাব সাফল্য একা আমেরিকা নিয়ে গেল বলে। শ্রীলঙ্কায় নগদ অর্থ বা ঋণদান নয়, ভারত বস্তুগতভাবে খাদ্যপণ্য আর জ্বালানি গ্যাসের সিলিন্ডারের সরবরাহ জুগিয়েছিল। তাদের দাবি মত যা নাকি তিন বিলিয়ন ডলার মুল্যমানের মত । কিন্তু ফলাফলে দেখা যায় চীন-ভারত সবাইকে ফেলে শেষে আমেরিকার প্রভাবের সেখান জয়জয়কার হয়। অথচ এখন ল্যু শ্রীলঙ্কার এই অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে আমেরিকা-ভারতের সাফল্য হিসাবে হাজির করেছেন।

USIP এর ঐ অনুষ্ঠানের ভিডিওতে দেখা যায় কেবল ল্যু-ই নন অন্যান্য আলোচকেরা আবার কোয়াড [QUAD] এর প্রসঙ্গ আনছেন কেন? কোয়াড কী কার্যত মৃত নয়ঃ
USIP এর ঐ অনুষ্ঠানের ভিডিওতে দেখা যায় কেবল ল্যু-ই নন অন্যান্য আলোচকেরাও এমনভাবে ভারতের প্রসঙ্গ এনেছেন বাইডেনের গত তিন বছরের শাসনামলে যেন বাইডেন খুবই ভারত-ঘনিষ্ট ছিলেন!!!  যেটা বাস্তবে একেবারেই উলটা ছিল!  আর সেটা বাইডেনের চয়েস ছিল না। মূল কারণ, বাইডেন ভারতের উপরও নিজের  গণতন্ত্র-মানবাধিকার পলিসি প্রয়োগ করতে গেছিলেন। প্রতিবছর ভারতের মুসলমানেরা ধর্ম-পালনে ও জীবনযাপনে নিগৃহিত হচ্ছে এই ছিল তাঁর মূল বক্তব্য এবং আমেরিকান প্রশাসনিক সিস্টেমে এক স্বাধীন (ধর্মীয়) কমিশনার আছেন যার কাজই হল এনিয়ে প্রেসিডেন্টকে রিপোর্ট দেয়া যে কোন দেশের মানুষের ধর্ম পালনের অধিকার ক্ষুন্ন হল! তাই বাইডেন এনিয়ে বহুবার মোদির বিরুদ্ধে  সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন। শুধু তাই না বিপরীতে, বাইডেন কংগ্রেসের রাহুলের সাথেও যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। রাহুলদের যেন সুবিধা হয় তাই মোদির জিগরি দোস্ত গৌতম আদানির বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছেন। বেচারার শেয়ার মালিকানায় ধ্বস নামিয়ে দিয়েছেন।  হেজ [Hedge] ফান্ড ব্যবসায়ী বা ওপেন সোসাইটি” এই দাতব্য বা থিঙ্কট্যাঙ্কের মূল ফাইন্যান্সার জর্জ সোরেস-কে দিয়ে বাইডেন মোদির প্রিয় ব্যবসায়ী গৌতম আদানির ব্যবসায়িক সব গুমো্র আর কথিত অপততপরতার ফিরিস্তি দিয়ে শেষ বিচারে শুধু আদানিকেই নয় খোদ, মোদিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন!  বাইডেন নিয়মিত ভারতীয় মুসলমানদেরকে নিপীড়নের জন্য মোদিরকে দায়ী করেছেন। যে কারণে এক পর্যায়ে পুরানা প্রেসিডেন্ট ওবামাও মোদিকে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন মোদির এই মুসলমানবিদ্বেষী নীতির কারণে একদিন ভারত বিভক্ত হয়ে যেতে পারে!  অর্থাৎ গত তিনবছর ধরে বাইডেন তার গণতন্ত্র-মানবাধিকার পলিসির লাইনে মোদিকে আক্রমণ করে গেছিলেন।
অথচ এখন এবারের ঐ আইপিএস সাফল্য উতযাপন সভায় ভারতের প্রশংসায় সব ভরে উঠেছিল! আবার কোয়াড [QUAD] নিয়েও ভারতের সাথে কাজের স্মৃতি আউড়ানো হয়েছে সেখানে। অথচ কোয়াড কার্যত মৃত! কারণ, অষ্ট্রেলিয়ার আমেরিকান পারমানবিক সাবমেরিন কেনাকে কেন্দ্র করে AUKUS  নিয়ে একপর্যায়ে ভারত জানিয়ে দিয়েছিল যে ভারত কোয়াড বা অন্যকিছুর নামে অন্য দেশ বা জোটে সেটাকে সামরিক জোট বুঝায় বা  এমন ততপরতাও বুঝায় –  এমন কিছুতে ভারত থাকতে চায় না; জড়াবে না। এথেকেই QUAD অকার্যকর হয়েছিল আর AUKUS নিয়ে কিছুদিন চর্চা হয়ে সব শেষ ঠান্ডা হয়েগেছিল। যার মূল কারণ বলা যায়, মোদি সরকারের উপর বাইডেনের গণতন্ত্র-মানবাধিকার পলিসির চাপাচাপি।
অথচ এখন তাহলে ল্যু এন্ড গংয়ের  আইপিএস সাফল্য উতযাপন সভায় ভারতের প্রশংসা কিভাবে? পুরা পরিস্থতিকে তারা এমন ভাবে তুলে ধরেছেন যেন বাইডেনের তিনবছর ভারতের সাথে সম্পর্ক তার আগের ওবামা আমলে [২০০৮ সালে বুশের সময়েই বাংলাদেশকে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল যাতে ভারত বাংলাদেশ নিয়ে যা খুশিকরতে পারে যা পুরা ওবামা আমলেও বজায় ছিল ] যেমন ছিল – (ভারতের হাতে তুলে দেওয়া এক বাংলাদেশ) ঠিক তেমনই যেন আছে।  যা খুবই খারাপ ইঙ্গিতপুর্ণ! যার থেকে আমাদের শঙ্কা যে বাইডেন-ল্যু পিটার হাসেরা আমাদেরকে আবার ভারতের কোলে উঠিয়ে দিতে চাইছে!!!

এসব কারণেই এই অনুমান জল্পনা-কল্পনা বেড়েছে যে বাইডেন ক্ষমতা শেষ হয়ে যাবার আগে কী নিজ ব্যর্থতা ঢাকতে আবার বাংলাদেশকে ভারতের হাতে সওদা করে দিয়ে যেতে চাচ্ছেন?
এটা আমাদেরকে আরো স্পষ্ট পরিস্কার করে খুটিনাটি-সহ সব বুঝতে হবে। তবে ইতোমধ্যেই যেটা দৃশ্যমান তা হল হাসিনার মুখ থেকে উঠা চীন এখন আর প্রসঙ্গই নয় আবার এর মানে বাইডেনের আমেরিকা-ভারত কোন নয়া উদ্যোগ বা অফার পেয়ে কী হাসিনা খুশি? উতফুল্ল? না তাওও নয়! মানে প্রধান দ্বন্দ্ব – গত দুবছরের বাইডেন-ল্যু এর সাথে হাসিনার দুরত্ব আর গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে হাসিনা তা ভুলে এখন বাইডেনের দিকে আগিয়ে আসছেন বলে মনে হচ্ছে না!  আর এসবের পরিণতি হল যেন সবকিছু স্থবির হয়ে গেছে! আর তামাশা হিসাবে বারবার উঠে আসছে বাইডেন-ল্যু এর বোকা বোকা পানিপ্রার্থীর মত সব আচরণ – হাসিনার মান ভাঙ্গানোর নানান কসরত ইংরাজিতে যেটাকে উউ [WOO] বলে! আর ভদ্র তবে সংস্কৃত-ঘেঁষা বাংলায় বলে “প্রণয় ভিক্ষা” চাওয়া! যেগুলোর দিকে তাকানো যায় না এমনই অসহ্য!!! এই হল এখনকার বাইডেনের পরিণতি!!!

যদিও আগামি একমাসের মধ্যে হাসিনার মধ্যে আবারও যদি চীন সফরে যাবার জন্য ব্যাকুল-উদগ্রীব হতে দেখি তো আমাদের অবাক না হওয়াই সম্ভবত সঠিক হবে! 

সবশেষে একটা কথাই বলব! বাইডেন-ল্যু এর দশা যদি হয় হাসিনা সরকারের প্রণয় ভিক্ষুক হওয়া; তবে আমাদের বিরোধীদলেরা সেই – বাইডেন-ল্যু এরাই আবার আমাদেরকেও নাকি উদ্ধারে আসবে; এই আসতেছে –  আসতেছে বলে তারাই বা তাহলে কার কাছে কী ভিক্ষা করছে!!! এর কোন জবাব খুঁজে পাই নাই!!! কেবলই বিস্মিত হয়ে আছি, থাকছি! আর বিরোধীদের এ এক অদ্ভুত অসহায়ত্ব দেখে যাচ্ছি!!!

 আপডেটঃ  ১৯ ফেব্রুয়ারি  ২০২৪, সন্ধ্যা সাতটা ১৮
সর্বশেষ আপডেটঃ  ২০ ফেব্রুয়ারি  ২০২৪, দুপুর দুইটা ৪৫

গৌতম দাস
রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

Leave a comment