দিল্লিতে নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

দিল্লি নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

গৌতম দাস

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2SL

 

দিল্লি প্রাদেশিক বা রাজ্য নির্বাচনে মোদী-অমিতের বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। আম আদমি পার্টি (আপ বা AAP) দলের আগের ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মতই এবারো অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে তারা ৭০ আসনের দিল্লির ৬০-এর বেশি আসন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। জার্মান সরকারের ডয়েচে ভেলে [Deutsche Welle] গ্লোবাল মিডিয়া হিসেবে অত জনপ্রিয় না হলেও ফেলনা গুরুত্বের নয়। সেই ডয়েচে ভেলের (ইংরেজি সংস্করণ) এক রিপোর্টের শিরোনাম, “দিল্লির নির্বাচনী হার : প্রধানমন্ত্রী মোদীর শেষ দিনের শুরু?” [Delhi election losses: The beginning of the end for PM Modi?]।

এটা ঠিক যে, ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ (CAA) প্রায় সব প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশে এক ব্যাপক নাড়াচাড়া দিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ভারতের লোকসংখ্যা বা ভোক্তা বাজার প্রায় ১৩৬ কোটির; সে কথা পশ্চিমা বিশ্ব সব সময় খুবই মনে রাখে। তারা তাই এমন কিছুই বলতে চায় না পাছে তা এই বাজার হাতছাড়া হওয়ার কারণ হাজির করে ফেলে। কিন্তু মোদী-অমিতের বৈষম্যমূলক ও মুসলমানবিদ্বেষী করে সাজানো নতুন নাগরিকত্ব আইন পশ্চিমাদেশের জন্য ঐ ভোক্তা বাজারের লোভের চেয়েও আরো বড় বিপদের। সাধারণভাবে তারা আতঙ্কিত এ জন্য যে, তাদের আশঙ্কা এই আইন দুনিয়াতে বিপুল রিফিউজির ঢল তৈরি করতে পারে যারা আবার রাষ্ট্রচ্যুত। মোদীর এই আইন আগামীতে ভারতীয় মুসলমানদের রাষ্ট্রহীন রিফিউজির সারিবদ্ধ ঢল নামাতে পারে, যেটা সদ্য মোকাবিলা করা সিরিয়ান রিফিউজিদের চেয়েও হবে ভয়ঙ্কর। কারণ ভারতীয়দের ক্ষেত্রে বাড়তি বৈশিষ্ট্য হল, এরা হবে রাষ্ট্রহীন; ‘থেকেও নাই’ এমন রাষ্ট্রচ্যুত বলে তাড়ানো এক জনগোষ্ঠী।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ‘এই আশঙ্কার’ ওপর দাঁড়ানো এক নিন্দা প্রস্তাব ইতোমধ্যেই আনা হয়েছিল আর যা এখন আগামি মধ্য মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করে রাখা আছে। ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এনিয়ে কী রায় দেয় মূলত সেটা দেখতে আর মার্চে মোদী ইইউ সামিটে এসে কী প্রতিশ্রুতি দেন না দেখার জন্য। নতুন রিফিউজির ঢলের উদ্ভব বা মানবাধিকার রক্ষার দায় হিসেবে এর ভাগ বা দায়ভার গ্রহণ প্রশ্নে ইউরোপ আমেরিকার চেয়েও বেশি ভীত, বিশেষ করে গ্লোবাল অর্থনীতির স্থবিরতা দুনিয়াতে যখন প্রায় নিয়মিত হয়ে পড়া দশা সেই পরিপ্রেক্ষিতে। ডয়েচে ভেলের এই শিরোনাম এসব আশঙ্কায় আক্রান্ত বলে এমন হয়ে থাকতে পারে। তা আমরা অনুমান করতে করি।

দিল্লির রাজ্যনির্বাচন শেষে ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ১১ ফেব্রুয়ারি। বিজেপিবিরোধী মূলত দিল্লির এক আঞ্চলিক দল আম আদমি পার্টি (আপ) এবারের নির্বাচনে ৬২ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতেছে। আর সেই থেকে অসংখ্য কর্নার থেকে কেন ফলাফল এমন হল এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে মিডিয়াগুলো ভরপুর হয়ে উঠেছে। রাজ্য হিসেবে দিল্লি খুবই ছোট; যেখানে ভারতের পুরনো মাঝারি সাইজের রাজ্যগুলোতে ২০০ থেকে ২৫০-এর মধ্যে আসন থাকে। সেই বিচারে এগুলোর তিন ভাগের একভাগ সাইজের রাজ্য হল দিল্লি। তবুও দিল্লির এই নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় উৎসাহ অনেক বেশি। কেন?
মূল কারণ, মোদী-অমিতের নাগরিক বৈষম্যমূলক সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ পাস করার পরের ভারতজুড়ে আপত্তি ও প্রতিক্রিয়া; আর তা নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাওয়ার পর এটা ছিল কোন রাজ্যে অমিত শাহের প্রথম নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়া। এছাড়া এমনিতেও দিল্লির নির্বাচন পরিচালনায় মূল দায়িত্বে ছিলেন অমিত। যেমন শুরুতে বিজেপির নির্বাচনি প্রস্তুতিমূলক ভোটে কী হয়েছিল সে প্রসঙ্গে আনন্দবাজারের ভাষায়, “কিন্তু নরেন্দ্র মোদী, রাজনাথ সিংহ, জগৎপ্রকাশ নড্ডাদের সঙ্গে বৈঠকে শাহই আস্থা জুগিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দিল্লি বার করে নেবেন। মেরুকরণই হবে প্রধান অস্ত্র। তখনই স্থির হয়, শাহিন বাগই হবে প্রধান ‘প্রতিপক্ষ’। আর প্রচারে শাহ বলেছিলেন, ‘‘ইভিএমের বোতাম এত জোরে টিপুন যেন শাহিন বাগে কারেন্ট লাগে। “। তাই তখন থেকেই দিল্লি নির্বাচনে ঠিক কী বলে, কোন কৌশলে বিজেপি ভোটে অংশ নেয় আর তাতে ভোট প্রদানের ধরনের মধ্যে কী মেসেজ ফুটে ওঠে – এসব জানার জন্য সব মহলের ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, আর তা থেকেই এত বিশ্লেষণ।
এসব বিশ্লেষণগুলোতে কমন ব্যাখ্যার ধারাটা হল, এটা ‘উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু’ – এরই লড়াই যেখানে ‘উন্নয়ন’ জিতেছে। কিন্তু এখানে ‘উন্নয়ন’ মানে কী? আমাদের দেশের মতই, হাসিনার ‘উন্নয়ন’ বনাম নাগরিক অধিকার, এর কোনটা চান- এর মত? না, ঠিক তা নয়। তবে হয়ত কিছু কাছাকাছি। দিল্লির বেলায় এর মানে হল, নাগরিক মিউনিসিপ্যাল সুবিধা ও সার্ভিসগুলো; যেমন পানি, বিদ্যুৎ, নিষ্কাশন, বাসভাড়া, শিক্ষা ইত্যাদিতে সার্ভিস ব্যবস্থাপনা আর এর স্বল্প চার্জ বা মওকুফ করা চার্জ- এভাবে আপ দলের মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল গত পাঁচ বছর কাজ করে সাফল্য এনেছেন। এটাকেই এখানে ডাকা হচ্ছে “উন্নয়ন” বলে। আর এর বিপরীতে ‘কেন্দ্রের ইস্যু’ জিনিষটা কী?
এখানে কেন্দ্রের ইস্যু হল যেমন, সবচেয়ে জ্বলন্ত ইস্যু সিএএ বা এর সাথে এনআরসি; এ ছাড়া ধীরগতির ধসে পড়া অর্থনীতি, কাজ সৃষ্টি না হওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়াও আরেকভাবে ব্যাপারটা বলার চেষ্টা আছে। যেমন নির্বাচনী ফলাফল কী হতে পারে সেই আগাম অনুমিত ফলাফল জানার লক্ষ্যে করা সার্ভেতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেটা হল, “জাতীয় নিরাপত্তা”। বলাই বাহুল্য, এটা খুবই প্রলেপ লাগানো শব্দ। আসলে কদর্য কিছু ধারণাকে লুকিয়ে রাখতে বলা এক ‘ভদ্র শব্দ’। কারণ এর পেছনের মূল কথাটা হল, ‘মুসলমানবিদ্বেষী উসকানি দিয়ে প্রচারণার” পক্ষে কারা। এটাকে আবার বিজেপি নিজেও আরেকটা শব্দ – ‘পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ’ বলে প্রকাশ করে থাকে। যেমন এই নির্বাচনে অমিত শাহ ও তার দলের বিদ্বেষী ভাষ্য হল, কেজরিওয়াল একজন ‘জঙ্গি’ নেতা, সে পাকিস্তানের বন্ধু, মুসলমান তোষণকারী ইত্যাদি। দিল্লির এক মুসলমান-প্রধান এলাকা শাহীনবাগ, এখানকার সিএএ-বিরোধীদের মূলত নারীদের একটা স্থায়ী প্রতিবাদ মঞ্চ আছে। এ সম্পর্কে অমিতের মন্তব্য এটা নাকি এক ‘মিনি-পাকিস্তান’। তাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ কথাটার আসল মানে হল মানে, এই ক্যাটাগরিটা আসল অর্থ হল – বিজেপির হিন্দুত্ববাদী বয়ান ও এর প্রপাগান্ডাকে গুরুত্ব দিয়ে কারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে – তাদের কথা বুঝানো হচ্ছে। এরাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ক্যাটাগরিতে দেয়া ভোটার। এমনকি আনন্দবাজারের ভাষাতেও – এটা হলো “বিজেপির (হিন্দু) জাতীয়তাবাদী প্রচার এবং হিন্দু ভোট একাট্টা করার কৌশল”। অর্থাৎ হিন্দুত্বের জোশ তুলে সব হিন্দু ভোট যেন বিজেপির বাক্সে আসে, বিজেপির নেয়া এই কৌশল । এটাও অনেকসময় আরেকটা সার শব্দে প্রকাশ করা হয় – পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ। “হিন্দুর হিন্দুকে ভোট দিতে হবে আর সেটা কেবল বিজেপিকেই” – এটাই হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা কৌশলের সারকথা। এটাকেই বিজেপির হিন্দুত্ববাদ নিজেদের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ অথবা এটা “বিজেপির কৌশল” বলে প্রকাশ্যেই দাবি করে থাকে।
দিল্লির নির্বাচনের পরে ভারতের টিভির এক টকশোতে এসেছিলেন শেষাদ্রি চারি [SESHADRI CHARI]। তিনি হচ্ছেন, আরএসএসের ভাবাদর্শী পর্যায়ের এক নেতা , তিনি আবার আরএসএসের মুখপত্র এক প্রাচীন পত্রিকা ‘অরগানাইজার’-এর সাবেক সম্পাদক। তিনি বিজেপির এই ‘ঘৃণা তৈরির’ নিন্দনীয় কাজ ও ততপরতাকেও “অনৈতিক” বলে মানতে রাজি হননি। বরং দাবি করেছেন এটাই ‘বিজেপি রাজনীতির কৌশল’। দেখুন, not hate politics but strategy.।
ভারতের কনস্টিটিউশন এবং নির্বাচনী আইন অনুসারে ধর্মের ভিত্তিতে ভোট চাওয়া বেআইনি। কিন্তু যেখানে সারা ভারতই এখন ‘হিন্দুত্বে’ ভাসছে সেখানে এর বিরুদ্ধে আপত্তি তুলবে কে? আর নির্বাচন কমিশন সেখানে কোনো প্রশ্ন না তুলে আরামে কাজ করার পথ ধরবে সেটাই তো স্বাভাবিক।
ঠিক এ’কারণে বিজেপির অমিত শাহের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ এবার কিভাবে কাজ করে, আদৌ করে কিনা, সেটি সবাই দেখতে চেয়েছিল। কঠিন বাস্তবতা হল, এবারই এটা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, খোদ অমিত শাহ এবার তা নিজ মুখে প্রেসের কাছে স্বীকার করেছেন।
“ভারতে হিন্দুরাই রাজত্ব করবে, অন্য কারও কথা চলবে না। যারা অমান্য করবে তারা ‘দেশকে গদ্দারকো, গোলি মারো শালো কো’।  এভাবে বিজেপির সমাবেশ মঞ্চ থেকে স্লোগান দেয়া শুধু নয়, লিখিত বিবৃতি মানে ঠাণ্ডা মাথায় লেখা এমন এক বিবৃতি পাঠ করা হয়েছিল। কিন্তু ১১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে দুদিন ধরে অমিত শাহের ‘পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স’ থেকে গায়েব ছিলেন। বেচারা অমিত “খুব শরমিন্দা আর শোকে” ভুগছে মনে হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের অফিসেও যান নাই। দু’দিন পরে ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় এক টিভি অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রেসের সামনে তিনি বলেন, “গোলি মারো বলে বিবৃতি দেয়া অথবা ‘ইন্দো-পাক ম্যাচ’ ধরনের মন্তব্য করাটা আমাদের ঠিক হয়নি। আমাদের দল এসব মন্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চায়”। এছাড়াও, তিনি স্বীকার করে নেন যে, খুব সম্ভবত এমন মন্তব্যের জন্যই “দিল্লিতে আমাদের পরাজয় ঘটেছে”। এর সাথে তিনি এটাও স্বীকার করে নেন যে, দিল্লি নির্বাচন সম্পর্কে “তার আগাম অনুমানে ভুল ছিল”। ভেবেছিলাম, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাব। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, মূল্যায়ন ভুল হয়েছে। আমার বেশির ভাগ মূল্যায়ন ঠিক হয়,এ বার ভুল হল”। সাথে সাথেই অবশ্য বড় ধূর্ততার সাথে নিজেই বলে রাখেন – “কিন্তু তাই বলে ‘দিল্লিতে বিরোধীদের বিজয় সিএএ-এনআরসি বিরোধী কোনো গণরায় নয়”।

এটা সে গণরায় কি না তা সামনে স্পষ্টই বুঝা যাবে। এখনই বুথ ফেরত জরিপে দেখা যাচ্ছে দিল্লি রাজ্যে মুসলমান জনসংখ্যা যেখানে ১৩% সেখানে মুসলমান ভোটারদের ৭৫% (আর এরই সাথে শিখ ভোটের ৪২%) আপ দলের পক্ষে ভোট দিয়েছে। [The AAP got the lion’s share of the Muslim vote, significant in a city-state with 13 per cent Muslims.] শাহীনবাগ যে কনস্টিটিউয়েন্সিতে পড়েছে এর নাম ‘ওখলা’ [Okhla]। সেখানে এবার ভোটারের উপস্থিতি রেকর্ডসংখ্যক। মোট উপস্থিত ভোটারের হার যেখানে ৬২% এর মতো সেখানে ওখলাতে তা ৬৬%-এর মত। আর ‘আপ’ দলের আমানতুল্লাহ খান এখানে জিতেছেন (1,30,367 votes) প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থীর (Braham Singh  58,540 votes) চেয়ে ডাবলের বেশি ভোটে।  এমনিতেও দেখা গেছে বেশির ভাগ আসনে ভোটাভুটির ফয়সালা হয়েছেও ষাট হাজার ভোটের কাছাকাছি।

উত্তরপ্রদেশের ‘গেরুয়া মুখ্যমন্ত্রী’ যোগী আদিত্যনাথ যার একমাত্র যোগ্যতা মুসলমানদের মারব-ধরব বলে গালিগালাজ করা, তাকে উওরপ্রদেশ রাজ্যের পড়শি রাজ্য দিল্লিতে ভাড়া করে আনা হয়েছিল প্রায় ১৩টা বিজেপি কনস্টিটিউয়েন্সিতে প্রধান সমাবেশে বক্তৃতা করতে। তিনি কেজরিওয়ালকে “জঙ্গি মদদদাতা, দেশদ্রোহী গাদ্দার, পাকিস্তানের বন্ধু ইত্যাদি বলে বক্তৃতা করেছিলেন। ফলাফল নিম্ন চাপ!  ঐ ১৩ আসনের ১১টাতেই বিজেপি অনেক ব্যবধানেই পরাজিত হয়েছে
অনেকেই অমিত শাহের স্বীকারোক্তিকে তার দলের এই হারের ফলাফল পাঠ করে, করা মন্তব্য বলে দেখেছেন। এখন মূল প্রশ্ন হল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কি এখন থেকে তাহলে ভালো হয়ে গেলেন বলে আমরা ধরে নিতে পারি?

অমিত শাহকে নিজ দলে “ম্যাজিসিয়ান” বলা হয়। গুজরাটের ২০০২ সালের দাঙ্গা থেকে এ পর্যন্ত দাঙ্গাতেই তার জয়জয়কার। তিনি নাকি যেটা চান তাই করে আনতে পারেন। দাঙ্গায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত আহত-নিহত হন, তাদেরও ভোট তিনি ব্যাগে ভরতে জানেন। ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে উত্তরপ্রদেশের মোজাফফরবাদের দাঙ্গায় তিনি তাই ঘটিয়েছিলেন।  সেই ‘দাঙ্গা-ওস্তাদ’ তিনিই এবার দিল্লিতে হেরে গেছেন। না, তবু এর পরেও তাঁর স্বভাব বদলাবে না। কারণ তিনি কেবল এই ‘দাঙ্গা’ কাজটাই ভালো পারেন।
এ ছাড়া আরো বড় ফ্যাক্টর হল, ২০১৬ সালের নোট বাতিলের পর থেকে ডুবে যাওয়া অর্থনীতির চিহ্নগুলো মোদী লুকিয়ে রেখেছিলেন ২০১৯ এর প্রথমার্ধ নির্বাচন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। এরপর তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাই সেই থেকে “মোদী-ম্যাজিক” বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। অতএব, আগামী সব নির্বাচনে বিজেপির একমাত্র ভরসা হবে “হিন্দুত্ববাদ” এর জজবা বা মেরুকরণ। কাজেই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়েই তাকে আবার ভোট চাইতে যেতে হবে। হয়তো পরের বার আরো ভাল ও কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে ঘৃণা ছড়াবেন। এক কংগ্রেস নেতা ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, তার কাছে নাকি গোপন সংবাদ আছে, ‘‘পাকিস্তান এ বারে দিল্লি থেকে বিহারের পথে রওনা হয়েছে’’। কেন?  আগামী অক্টোবরে বিহারে রাজ্য নির্বাচন। দেখুন মেরুকরণের ভবিষ্যত

তাহলে, কেজরিলালের উন্নয়নের বিজয় কী জিনিষ ও তা কতটা সত্য?
বড় সত্যটা হল, কোন রাজ্য নির্বাচনেই ভারতের কেন্দ্রীয় ইস্যুগুলো ভোটার-মানুষ ভুলে যায় না, যেতেই পারে না। যদিও এর পরেও এক্ষেত্রে একটা কিন্তু আছে। সেটা হল দিল্লির “গঠন প্রকৃতির” বিশেষত্ব। যেমন দিল্লি ছিল এক রাজধানী শহর কিন্তু আসলে ছিল এক জেলা শহর মাত্র। পরবর্তিতে তার পড়শি রাজ্য একদিকে পাঞ্জাব-হরিয়ানা (মানে মুল ভারতের পাঞ্জাব রাজ্য ভেঙে হরিয়ানা বলে আলাদা রাজ্য করা হয় ১৯৬৬ সালে। আর হরিয়ানাই দিল্লির লাগোয়া পড়শি। ) আর অন্য দিকে উত্তর প্রদেশ – এদুই রাজ্য থেকে কেটে আনা জেলা শহর নিজের ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে আজ দিল্লি রাজ্য হয়েছে – ১১ জেলা শহরের। এভাবে অন্তর্ভুক্তি আবার এক দিনে হয়নি, ১৯৯৭ থেকে সর্বশেষে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে। এর সোজা অর্থ, এই অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া জেলাগুলোতে  একটা রাজধানী শহরে  যেমন থাকা উচিত সেই পানি-বিদ্যুৎ-বাস-স্কুল টাইপের নাগরিক মৌলিক সুবিধাগুলোর কিছুই ছিল না। এসব অভাব চরমে  উঠা আর নাগরিক ক্ষোভ থেকেই একে পুঁজি করে আম আদমি পার্টির জন্ম ২০১২ সালে। আর গুছিয়ে ক্ষমতায় থেকে গত পাঁচ বছরে এই ব্যবস্থার চরম উন্নতি ঘটিয়েছে কেজরিলালের আপ দলটা। এই সময়ে রাজ্যের রাজস্ব আয় তিনি বাড়িয়েছেন ৩১%। আমাদের প্রথম আলোর দিল্লির তথ্য নিয়ে লিখেছে,

ভারতের মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপাত্ত বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দিল্লির রাজস্ব আয় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। আর এ আয় গেছে স্কুল ও হাসপাতালের উন্নয়নে। যদিও এ সময়ে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ ৭ শতাংশ কমেছে। দিল্লি ভারতের অন্যতম প্রধান রাজস্ব উদ্বৃত্ত রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এর নেতা কেজরিওয়াল আদর্শ মুখ্যমন্ত্রী। পদত্যাগী এই সাবেক আমলা ম্যানেজমেন্ট বোঝেন ভালোই। তিনি বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী বড়লোকদের বিদ্যুতের রেট তুলনায় বেশি ধরে সে আয় দিয়ে গরিব কম ব্যবহারকারীদের ভর্তুকির ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ফ্রি। একই ব্যবস্থা পানি ব্যবহারেও। আবার নারী বাসযাত্রীর ভাড়া ফ্রি। স্কুল ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। তাতে ইংলিশ স্কুল ছেড়ে অবস্থাপন্নরাও সরকারি স্কুলে সন্তান নিয়ে ফিরেছেন। আজ আনন্দবাজার লিখেছে, মহিলা ভোটেই কুর্সিতে কেজরী, বলছে ফল-পরবর্তী সমীক্ষা। একারণে মূলত নারীরা তুলনায় আপ পার্টিকে ভোট দিয়েছে বেশি। এমনকি নাকি স্বামীরা বিজেপি-কংগ্রেসের সমর্থক হলেও স্ত্রীরা আপ দলকে ভোট দিয়েছে।  আর এসব ম্যানেজমেন্ট কৃতিত্বের মূল সুফলভোগী হল সরাসরি স্বল্প আয়ের মানুষ। এতে আপ দলের মূল ক্ষমতার ভিত্তি হয়েছে এই স্বল্প আয়ের লোকেরা।  নির্বাচনে কেজরিওয়াল নিজের এই সফলতাকেই তুলে ধরেছেন, আর প্রতিদান চেয়েছেন। এমনকি ভোটারদের বলেছেন, আপনি বিজেপি বা কংগ্রেসের সদস্য বা সমর্থক হয়েও থাকেন তবে দল ত্যাগ না করে আমার কাজের প্রতিদান ও আমাকে উৎসাহ দিতে আমার দলকে একটা ভোট দিন। আসলেই তো তিনি ‘স্বল্প আয়ের মানুষের বন্ধু’। না হলে দিল্লির মত ব্যয়বহুল রাজধানী শহরে গরীবদের বসবাস করা আরো কঠিন হয়ে যেত। কাজেই দিল্লির এই বিশেষ গঠন প্রকৃতি – এটা উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু – এই নাম দিয়ে ডাকা ও দেখা সবটা সত্যি নয়। আর এর মানে এই নয় যে, সিএএ-এনআরসি ইস্যু বা কাজ সৃষ্টির ইস্যুতে তাদের কিছু এসে যায় না।

তবে সার কথা হল, দিল্লিই প্রথম কথিত ম্যাজিসিয়ান অমিত শাহ ও তার দলের যে সারা ভারতে “অপরাজেয়” ভাব তৈরি হয়ে গিয়েছিল সেই দর্প এবার চূর্ণ করে দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এই ভাঙা আত্মবিশ্বাস কতটা অমিতরা ফেরত আনতে পারেন তা এখন দেখার বিষয়!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘দিল্লিতে পরাজয়ের তাৎপর্য”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক

প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক

গৌতম দাস

 ২০ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2RG

‘Don’t worry about NRC’, Modi tells Hasina – New York, Sept 27 (UNB)

ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়ছেই, তাতে যতই এটাকে সুপ্ত করে ফেলে রাখা অথবা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করা হোক না কেন! এটা লুকিয়ে থাকছে না। এর চেয়ে বড় কথা, সব হারানো মরিয়া মোদীর হাতে আমাদের বিক্রি হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দরজায় কড়া নাড়ছে। বিগত ২০০৯ সালে এই সম্পর্ক শুরু হয়েছিল ‘বন্ধু-রাষ্ট্র’ বলে সোনার-পাথরের বাটি ধরনের এক অর্থহীন শব্দ দিয়ে। অথচ যা সোনার তৈরি তা আবার পাথরেরও, এমন হওয়ার সুযোগ কোথায়? অর্থাৎ রাষ্ট্রস্বার্থ মাত্রই তো তা আপনা-আপনা। যদি না দলীয় বা ক্ষমতায় থাকার স্বার্থের সাথে একে মাখিয়ে ফেলা হয়। একালে এসে যেটা আবার হয়েছে ‘স্বামী-স্ত্রী’ বলে আরেক ফালতু শব্দে। কূটনীতির জগৎ সম্পর্কে মন্ত্রীদের ন্যূনতম ধারণা থাকলে এসব শব্দ ব্যবহার আমাদের শুনতে পাওয়ার কথা নয়। সরকারকে কৌশলগত কাভার দেয়ার জন্য অনেক শব্দ অনেকসময় ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু তাই বলে এভাবে এসব শব্দ দিয়ে নিজেই নিজেকে খাটো নিচা করে দেখানো, বেইজ্জত করা কাম্য নয়। তবে কথিত স্বামী-স্ত্রীর অধস্তনতার সম্পর্ক যে এখন বড় ধরণের সঙ্কটে মুখোমুখি হয়েছে আর মতবিরোধ প্রকাশ্য হয়ে যাচ্ছে এর সবচেয়ে ভাল প্রমাণ হল দুবাই থেকে প্রকাশিত এক ইংরাজি দৈনিক গালফ নিউজ পত্রিকায়  সম্প্রতি দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাতকার [শিরোনাম “Citizenship Amendment Act is India’s internal matter, Sheikh Hasina says”]। বলতে গেলে তিনি সেখানে সরাসরি ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধিত আইন [Citizens Amendment Act, CAA] বা সিএএ-কে সমালোচনা করে “অপ্রয়োজনীয়” বলেছেন, “We don’t understand why [the Indian government] did it. It was not necessary,” । এটা আমাদের জন্য খুবই কৌতুহলের যে গত দশ বছরে প্রধানমন্ত্রী হাসিনা সম্ভবত এই প্রথম ভারতের বা মোদী সরকারের খোলাখুলি ও প্রকাশ্য এমন সমালোচনা করলেন, নিজের অসম্মতি অপছন্দের দিক প্রকাশ করলেন। নিঃসন্দেহে এটা প্রকাশ্য মতবিরোধ বা স্বার্থবিরোধে। তবে এটাকে তিনি এখন কোথায় কোনদিকে কতদুর নিতে চান তা বুঝতে আমাদের অপেক্ষা করতে ও চোখ খোলা রাখতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী হাসিনার এই সাক্ষাতকারকে একই সাথে আন্তর্জাতিকভাবে আম-পাবলিকের কাছে মোদীর বিরুদ্ধে জনসমক্ষে বিচার দেয়া হিসাবেও পড়া যেতে পারে। ব্যাপারটা হল, ভারত সরকারের সিএএ বা এনআরসির কারণে ভারতের সম্ভাব্য বিতারিত মুসলমানেরা বাংলাদেশ অভিমুখে লাইন লাগিয়ে রওনা দিবে না। কারণ সিএওএ বা এনআরসি এগুলো ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। একথাগুলোই হাসিনার গত অক্টোবর ২০১৯ সালে ভারত সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী মোদী তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন [… Modi has in person assured me]। এই কথাগুলো গালফ নিউজে সাক্ষাতকারের মুখ্য ফোকাস হয়ে হাজির করা হয়েছে। তাই এটা মোদীর বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ নালিশ অবশ্যই, কিন্তু নিজ সরকার টিকানোর ফ্যাক্টর ভারত – এই অধস্থন ও নির্ভরশীলতার সম্পর্কের দশ বছর পার হবার পর এখন এর কোন মুল্য তাতপর্য কী আছে? নাকি তাতপর্য বা সব মানে হারিয়েছে বলেই এটা এখন আম-পাবলিকের দ্বারস্ত – আমরা কি এভাবে পড়ব?

সিএএ বাস্তবায়নঃ
ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ অফিসিয়ালি গত ১০ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়েছে বলে গেজেট হয়েছে। আর এদিকে কঠিন বাস্তবতা এমন যে বিজেপি বা মোদী সরকারকে এই সিএএ বাস্তবায়ন করতে যেতেই হবে। মোদী এমনই কোণের এক চিপায় পড়েছে। বিজেপির জন্য মরি আর বাঁচি ধরনের এক মরিয়া নিরুপায় অবস্থা এটা। কেন? কারণ, ভারতের অর্থনীতির নিম্নগতির মুখে আর বিশেষ করে সহসা এর রিকভারির সম্ভাবনা কম বলে, সরকারের ইমেজের প্রশ্নে আর সরকার চালানো ও লাগাতার আগামি রাজ্য নির্বাচনগুলোতে পাবলিকের মুখোমুখি হতে হলে বিজেপির কাছে আর কোনো বিকল্প নেই। ফলে এমনিতেই চরম হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির হাতে হিন্দুত্বের ভিত্তিতে সামাজিক পোলারাইজেশন উসকে তুলে টিকে যেতে পারলে তবেই হয়ত তার রক্ষা – এখন সে এই অনুমানে গিয়ে ঠেকেছে। নইলে জন্ম থেকেই বিজেপি-আরএসএস যেমন সারা জীবনে ক্ষমতার ধারে কাছে যেতে পারেনি সেই রকমের দিনগুলোতে তাকে চিরদিনের মত আবার ফিরে যেতে হবে।
তাহলে অবজেকটিভ বাস্তবতাটা হল, বিজেপি বা মোদী সরকারকে মরিয়া হয়ে যেভাবেই হোক সিএএ বাস্তবায়ন করতেই হবে, হিন্দুত্বের হুজুগ তুলতে পারতে হবে।

কিন্তু সিএএ বাস্তবায়ন মানে আসলে কী? ঠিক কী হবে এতে এখানে? ব্যাপারটাকে খুবই সিরিয়াসলি নিয়েছে এমনকি কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকাও। তারা সরাসরি কথাগুলো নিজের পত্রিকার কোনো রিপোর্ট হিসেবে নয়, সম্পাদকীয় হিসেবে মানে নিজেদের কথা হিসেবে দায়িত্ব নেয়া ভাষ্য হিসেবে প্রকাশ করেছে। সেখানে বলেছে, “নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ ১০ জানুয়ারি গেজেটে বিজ্ঞাপিত হল অর্থাৎ সরকারিভাবে চালু হল। কৌতুহলের বিষয়, তার পাঁচ দিন আগেই উত্তরপ্রদেশ সরকার ঘোষণা করে, তারা আইনটি কার্যকর করতে শুরু করেছে। জেলা প্রশাসকদের বলা হয়েছে (একটি রিপোর্ট অনুসারে কেবল মৌখিকভাবে) এই আইনে উপকৃত ব্যক্তিদের, অর্থাৎ নির্দিষ্ট তিন দেশ থেকে আগত ছয়টি ধর্মের ‘শরণার্থী’দের, শনাক্ত করতে; সেই সঙ্গে সপ্তম যে ধর্মটি ছাড় পাচ্ছে না, তার ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ চিহ্নিত করতে”। আনন্দবাজারও ব্যাপারটা টের পেয়ে সহ্য করতে না পেরে সরাসরি লিখেছে – তবে কি দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটাই প্রধান,অর্থাৎ ‘বেআইনি’ মুসলিম বাসিন্দাদের চিহ্নিত করা?

তাহলে এটা হল, ভারতের ‘মুসলমান খেদানোর’ প্রোগ্রাম। অর্থাৎ সরাসরি বললে, ভারতের মুসলমান বিতাড়নের প্রোগ্রামে নেমে পড়েছে বিজেপি সরকার আর আশা করছে এর প্রতিক্রিয়ায় ভারতে সামাজিক-রাজনৈতিক মেরুকরণ ঘটবে, পরিণতিতে ব্যাপকভাবে হিন্দুত্বের উত্থান-জাগরণে ভোটের বাক্স ভরে উঠবে। তাতে ওই বিতাড়িত মুসলমানদের কী হবে, তারা কোথায় যাবে, তাতে বাংলাদেশের কী হবে ইত্যাদি দিক নিয়ে ভাবার দায় নেয়ার অবস্থায় বিজেপি বা মোদি-অমিতেরা নেই। মনে হচ্ছে, তাদের এখন আপনি বাঁচলে বাপের নাম অবস্থা!

এই অবস্থার বিপরীতে বাংলাদেশের সরকারের হাতে কী আছে? আছে এক ‘আশ্বাস’। গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ভারত-বাংলাদেশ দুই প্রধানমন্ত্রীর দু’বারের সাক্ষাতে ‘মোদী আশ্বাস’ দিয়েছিলেন বলে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল।  উপরে গালফ নিউজে ছাপা সাক্ষাতকারেও আমরা একই রেফারেন্স দেখলাম। কিন্তু প্রশ্ন হল, সেই আশ্বাস কী এখন কার্যকর আছে অথবা থাকবে? এর বাস্তব মূল্য কী? প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সমালোচনা দেখে মনে হচ্ছে তিনিও ভরসা পাচ্ছেন না!

আসলে, কঠিন বাস্তবতাটা হল, এটা “ভরসা অযোগ্য” হয়ে গেছে। আমরা যখন দেখতে পাই ও বুঝি যে বিজেপি বা মোদী সিএএ বাস্তবায়নে মরিয়া দশায়, অর্থাৎ আমাদের আশ্বাসদাতারই মরি-বাঁচি অবস্থা – তখন আশ্বাসের মূল্য অনুমেয়! উত্তরপ্রদেশে সিএএ বাস্তবায়ন নিয়ে কী হচ্ছে তা আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়তে আমরা দেখলাম। উত্তরপ্রদেশে বিজেপির কট্টর হিন্দুত্ববাদী মুখ্যমন্ত্রীর সরকার ক্ষমতায়। আর উত্তরপ্রদেশ ভারতের সবচেয়ে বড় রাজ্য যেখানে মুসলমান জনসংখ্যা প্রায় ২০%।

এছাড়া, মোদীর আশ্বাসের ভাষ্যের একটা টেকনিক্যাল দিক আছে। ‘মোদীর আশ্বাস’ ছিল এই বক্তব্য যে “এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু” হয়ে থাকবে। তাই মোদী এখন কি বলে বসতে পারেন যে, তিনি এনআরসি ইস্যুতে আশ্বাস দিয়েছিলেন কিন্তু সিএএ ইস্যুতে দেননি? তা অবশ্য আমরা এখনো জানি না। তবে ভারতেই অভ্যন্তরীণভাবে মোদী সরকার তার বিরোধীদের সাথে এখন একটা বড় বিতর্ক করছে যে, “এনআরসি আর সিএএ আলাদা” ইস্যু। আর এনআরসি নিয়ে মোদী সরকার নাকি এখনো কোনো ‘কাজই শুরু’ করেনি। আরও পয়েন্ট তুলে বলতে পারেন, বাংলাদেশকে দেয়া কথিত আশ্বাস যখন দেয়া হয়েছিল তখনো ভারতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী (সিএএ) তাদের সংসদে আনাই হয়নি।

আর এখন পানি অনেক দূর গড়িয়ে সব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। মোদি সরকার যেভাবেই হোক সিএএ বাস্তবায়নে মরিয়া হবে তা আমরা সবাই দেখতেই পাচ্ছি। কারণ মোদী এটাকে তার দলের অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে হাজির করে ফেলেছে। কাজেই ‘আশ্বাসের’ ওপর যে ভরসা রাখা যাচ্ছে না অথবা যায় না সেটা বাংলাদেশ সরকারের কাজ-কারবারেও স্পষ্ট যে সে এটা ওয়াকিবহাল। যেমন ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্কের উত্তেজনা যে আছে ও বাড়ছে তা নিয়ে প্রকাশ্যে যতই আড়ালে রাখা হোক তা আড়ালে থাকছে না। দেশে-বিদেশে তা চর্চার বিষয় হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ভারত-বাংলাদেশের মন্ত্রী-পর্যায়ের সাক্ষাৎ সব একের পর এক বন্ধ হয়ে গেছে। অন্তত এই তথ্যকে কেন্দ্র করে এটা এখন দেশী-বিদেশী মিডিয়ায় ইস্যু। এ নিয়ে ভারতের মিডিয়াতেই বেশি প্রকাশিত রিপোর্ট এটা, যার সর্বশেষ হল, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের ভারত সফর বাতিল। যদিও এখানে কারণ বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর মধ্যপ্রাচ্য সফরে সঙ্গী হতে গিয়ে সেই প্রায়োরিটিতে প্রতিমন্ত্রীর এই সফর বাতিল করা হয়েছে।

এখন বলাই বাহুল্য, সিএএ বাস্তবায়নের পরিণতি ও প্রতিক্রিয়া কী হতে যাচ্ছে বা হতে পারে তা নিয়ে গ্লোবাল পরিসরে রাজনৈতিক (হিউম্যান রাইট) দিক ছাড়িয়ে তা এখন অর্থনৈতিক দিক থেকেও শঙ্কা সৃষ্টি করবে, এটাও স্বাভাবিক। কারণ কোন ইকোনমিই আর লোকাল নয়, ইকোনমি মাত্রই তা গ্লোবাল ও কানেকটেড। যেমন এত দিন জাপান ছিল অবকাঠামো খাতে কম সুদে ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে বড় ঋণদাতা- সরাসরি দ্বিপক্ষীয় বা এশিয়ান-দাতা আইডিবির মাধ্যমে ঋণদাতা। গত তিন বছরের ফেনোমেনা হল, এর সাথে আরও যোগ হয়েছে – ব্যাপক ‘ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট’ মানে বাংলাদেশে ব্যবসায়ে বিনিয়োগ নিয়ে জাপান এখন হাজির।

বাংলাদেশে তুলনামূলক সস্তা আর ভাল মানের শ্রমের লোভে জাপানি ম্যানুফ্যাকচারিং এখন স্থানান্তর হচ্ছে এখানে। তাই সোজা ভাষায় বললে, স্বাভাবিকভাবেই মোদীর এসব দায়িত্বজ্ঞানহীন অধিকার-লঙ্ঘনের তৎপরতার খবরে যা সবাংলাদেশকে সম্ভাব্য অস্থিতিশীল করে ফেলার ইঙ্গিত – এটা নিয়ে, এসব বিনিয়োগকারীরা শঙ্কিত। এরই একটা ঝলক আমরা দেখতে পাই জাপানি মিডিয়ায়। বিনিয়োগকারীদের পছন্দের এমন এক মিডিয়া হল – ‘নিক্কি এশিয়ান রিভিউ [Nikkei Asian Review ]। সেখানেই প্রকাশিত এক রিপোর্টে শঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়েছে – এটা কী বাংলাদেশে ‘আরেক রোহিঙ্গা সঙ্কট’ তৈরি করতে যাচ্ছে? ওই রিপোর্টের শিরোনাম হলো, “আরেকটি রোহিঙ্গা-সঙ্কট সৃষ্টি করতে পারে ভারতের নাগরিকত্ব আইন, আশঙ্কা বাংলাদেশের”।
ওই রিপোর্টে বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সারোয়ার মাহমুদের কিছু বক্তব্যও ছাপা হয়েছে। তিনি বলেছেন, “ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার বাংলাদেশী প্রতিপক্ষ শেখ হাসিনাকে যে আশ্বাস দিয়েছেন তার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি মনে করেন যে ভারতের এনআরসি বাংলাদেশে কোনো প্রভাব ফেলবে না”। তবে শেষে তিনি বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি।’
নিক্কি রিভিউয়ে যদিও লেখা হয়েছে যে, এর মানে হল ওই মহাপরিচালক “এই আশঙ্কাকে পাত্তা দিচ্ছেন না”। হ্যাঁ, সে কথা সত্য। কিন্তু বুঝতে হবে মহাপরিচালকের ভাষ্যটা বাংলাদেশের ‘অফিসিয়াল’ কূটনীতিক ভাষ্য। অফিসিয়ালি বাংলাদেশ সরকার এখনও ‘মনের শঙ্কার’ কথা অফিসিয়ালি বাইরে আনার সিদ্ধান্ত নেয়নি। তবে নিক্কির ওই রিপোর্ট বাংলাদেশের এক সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৈহিদ হোসেনের বক্তব্যও এনেছে। সেটা হল, তৈহিদ হোসেন সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে, “বাংলাদেশের মাথার ওপর সিএএ একটি খাঁড়ার মতো ঝুলে আছে। যেকোনো সময় এটা সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে”। আসলে এটাই জেনুইন ভাষ্য। আমাদের সরকার এই ‘প্রাক্তন’ মুখগুলোকেই অ্যাক্টিভ করে মনের কথাগুলো আরো বেশি করে ইনফরমালি বাইরে আনার চেষ্টা করতে পারে।

বাংলাদেশের সরকার বিষয়টা নিয়ে ওয়াকিবহাল। কিছু প্রস্তুতির প্রকাশ্য দিকটাও আমরা সাদা চোখে দেখতে পাই। যেমন সীমান্তের এক কিলোমিটার এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক চাইলে যেন বন্ধ করে রাখা যায়, এর কার্যকারিতা ইতোমধ্যে এক মহড়ায় টেস্ট করে রাখা হয়েছে। কিন্তু কিছু সঙ্কীর্ণ নির্বুদ্ধিতাও আছে। এ ছাড়া সরকারের কিছু স্থায়ী নিজ দুর্বলতা আছে, যা ফলাফলে সরকারকে ভারতের সাথে তোষামোদকারীর ভুমিকায় হাজির করে রাখে বা রেখেছে। এটাই স্থায়ী সমস্যা, যা সমালোচকরা অনেকসময় বাংলাদেশকে ভারতের বাঁদী-রাষ্ট্র বা ভেসেল রাষ্ট্র বলে মূল্যায়ন করে দেখিয়ে থাকে।

নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ- এই আইনটা দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মূলত হিন্দুরা সরকার বা রাষ্ট্রের নিপীড়নে বা ‘পারসিকিউশনে’ [Persecution] আছে – এটা স্পষ্ট করে লিখে দাবি করে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের এই দাবির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হল, “এটা বিএনপি আমলে হয়েছে”। আর শাহরিয়ার কবিরকে দিয়ে বলানো হয়েছিল যে, বাংলাদেশের হিন্দু জনসংখ্যা নাকি ২% বেড়েছে। কারণ তারা ভারত থেকে ফিরে এসেছে। সরকারের এসব প্রতিক্রিয়াকে নির্বুদ্ধিতা বললেও কম বলা হবে।
প্রথমত, ভারত সিএএ আইনে অভিযোগ করছে বাংলাদেশ হিন্দুদের ‘পারসিকিউশনের’। তাহলে, ভারত ফেরত পাঠানোর সময় সেই হিন্দুদের না পাঠিয়ে কেবল এবং একমাত্র মুসলমানদেরই আনছে কেন? এই প্রশ্ন ওদের মুখে ছুড়ে দেয়া উচিত ছিল। এ ছাড়া ভারত যদি নিশ্চিত চিহ্নিত করেই হিন্দুদের ‘পারসিকিউশনের’ কথা জানে তাহলে তো কাজটা সহজ। তাহলে এর প্রমাণগুলো বাংলাদেশের কাছে বুঝিয়ে দিলে বাংলাদেশ বিনাবাক্যে তাদের ফিরিয়ে নেবে, পুনর্বাসিত করবে এই প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ দিতে পারে, প্রতিকার হিসাবে দেয়া উচিতও। ফলে দিয়ে দিক। আর যে নিপীড়িত হিন্দু ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছে এখন আগেই তাদের সীমান্তে পাঠিয়ে হয়রানি না করে তাদের সেসব ‘নিশ্চিত চিহ্নিত’ ডকুমেন্ট আগেই বাংলাদেশের কাছে পেশ করে তাদের ফেরত নেয়ার একটা মেকানিজম তৈরিতে বাংলাদেশ রাজি আছে সে প্রস্তাব দিলেই তো হয়।
এখানে ‘গায়েবি’ অভিযোগের সুযোগ বন্ধ করাই হতে পারে বাংলাদেশের মূল স্বার্থ। সেখানে বাংলাদেশও ‘বিএনপি আমলে হয়েছে’ আর ‘২% ফেরত’- এসব গায়েবিভাবে বক্তব্যে তুলে ধরেছে। এটা আত্মঘাতী ও নির্বুদ্ধিতা। আবার দেখা যাচ্ছে,  সরকার ধরেই নিয়েছে এই ইস্যুতে যাদের শুনানোর জন্য এই ভাষ্য সরকার দিচ্ছে, তারা যেনবা বাংলাদেশের পাবলিক। অথচ সরকার বাস্তবে এই ভাষ্যের খাতক হবার কথা ভারতের মোদী-অমিত। কিন্তু আবার এর মানে কি সরকার ভারতের কাছে বিএনপির নামে বিচার দিচ্ছে? সে ক্ষেত্রে এটা কি কোনো সরকারের কাজ হতে পারে, না সাজে? সরকার চালানো কি খেলাপাতি খেলা! যে কীছু হলেই আমি না বিএনপি! বলতে হবে?
উল্টোদিকে, বাংলাদেশে ২০০১ সালে নির্বাচনের পরে পরে ‘আওয়ামী লীগকে কেন হিন্দুরা ভোট দেয়’ এই অজুহাতে হিন্দু নির্যাতনের অভিযোগ সেকালেরই অনেক লিডিং মিডিয়ায় এসেছিল। কিন্তু আমাদের অনেকের ধারণা সরকারের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগের তদন্ত করালে এবং একেবারে বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত করালে সেটা বোধহয় সরকারের বিরুদ্ধেই যায়!  এটা স্বল্পবুদ্ধি ও কূটচিন্তার মানুষের ধারণা।  বিএনপিও এটাই বুঝেছিল। অথচ বিএনপি সরকার যদি সেকালে ওই অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত করে রাখত, তাহলে আজ না ভারত না বর্তমান সরকারের পক্ষে ইচ্ছামত কোনো অভিযোগ তোলা সম্ভব হত। কাজেই তদন্ত না করাটা সবসময় কোন সরকারের পক্ষেই যাবেই এই অনুমান ভিত্তিহীন।
নিরপেক্ষ তদন্ত করা সেকালে হয়ে থাকলে সেই ভাষ্যটাই এখন সব আটকে দিতে পারত। মূল কথাটা হল, সরকারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ এলে পালালে তো হবে না, মুখোমুখি হতে হবে। বিশ্বাসযোগ্য নিরপেক্ষ তদন্ত হতে হবে। প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। দায় নিতে হবে। উপযুক্ত প্রতিকার দিতে হবে। এতে কমপক্ষে পুরা দল নিজেকে পরিষ্কার আর অভিযোগমুক্ত রাখতে পারবে। যেটা আসলে একটা দলের জন্য বিরাট অ্যাসেট। বিএনপি নিশ্চয়ই আজ মানবে সে কথা। সেকালে দলের বিশেষ কিছু লোকের কুস্বার্থে আজ অন্যের সব আবর্জনা আর খারাপ উদ্দেশ্যের দায় বিএনপির মাথায় আসছে।

দ্বিতীয়ত, ভারতের সংসদের বক্তৃতায় অমিত শাহ্ দাবি করেছিল বাংলাদেশে নাকি ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ স্বাধীনতার পর থেকেই হচ্ছে। অর্থাৎ কোনো সরকারের আমলকেই তিনি বাদ দেননি। এমনকি বিজেপি-আরএসএসের প্রতিনিধি বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা গোবিন্দ প্রামাণিক বা প্রিয়া সাহার অভিযোগও তো তাই। কাজেই মোদী-অমিতের কাছে বিএনপির নামে অভিযোগ দিয়ে বাংলাদেশের সরকার কোথায় পালাতে চায়? সরকার চালানো খেলাপাতি না যে সব মুখে অস্বীকার করে অন্যের ওপর দায় দিতে হবে- এসব কোনো বুদ্ধিমান মানুষের কাজ নয়। আজ অবস্থা তৈরি হয়েছে এমন যে মোদী-অমিত আমাদের সরকারের ‘আমরা না, বিএনপি’ টাইপের ছেলেখেলাকেই রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করে বলবে যে, বাংলাদেশের সরকার বলেছে যে ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ হয়েছে। অর্থাৎ অমিত শাহরা চাইলে বলতে পারবে যে নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ বিলে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের নাম উল্লেখ করে রাখা জায়েজ আছে।
এ কারণেই আমাদেরকে অন্য সরকারের অভিযোগ সিরিয়াসলি নিতে হবে, প্রমাণ চাইতে হবে। প্রমাণিত হলে দায় নিতে হবে। প্রতিকার দিতে হবে। আর প্রমাণ না দিতে পারলে মাফ চাইতে বাধ্য করতে হবে।

সরকারের স্থায়ী দুর্বলতাঃ
সাধারণভাবে আমরা সবাই বুঝতে পারি ভারতের মোদী-অমিতের এসব ন্যুইসেন্স আর ইসলামবিদ্বেষ জাগিয়ে ভারতের ক্ষমতায় থাকার চেষ্টা নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ, মেজরিটি মানুষ খুবই বিক্ষুব্ধ। অথচ এটাকে নিজের ক্ষমতার উৎস হিসেবে নিতে বা এই বিক্ষোভের ভয়েস ও প্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে হাজির করতে সরকার অপারগ। কারণ গত ১০ বছর এর উল্টা লাইনেই হেঁটেছে সরকার। নির্বাচনের মাধ্যমে নিজের গণভিত্তি তৈরি করে নেবে সে পথেও সরকার নেই। সম্ভবত সে পথে ফেরার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। ওদিকে, সরকারের অনুমান তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে ফেলতে পারার ক্ষেত্রে বিদেশীরা (মূলত আমেরিকা) বিরাট হুমকি। ঠিক যেমন করে ২০০৭ সালে বিদেশীরা এক সরকার এনেছিল। পরিণতিতে এই সরকার বসেছিল। অতএব এই হুমকি কাউন্টার করতে ভারতকে পাশে রাখতে হবে, তোষামোদ করতে হবে – ভারত নির্ভরশীলতা এখান থেকেই – সরকারের অনুমান এমন বলে মনে হয়। ফলাফলে, মোদী-অমিতের সব ন্যুইসেন্সের বিরুদ্ধে জনগণ তৈরি হলেও সরকার তা ব্যবহার করার ‘জনপ্রতিনিধি’ হওয়ার সুযোগ নিতে পারছে না। এই হলো বাংলাদেশের বাস্তবতা ও সঙ্কট।
আজ এটা পরিষ্কার মোদী-অমিতের এখন আর নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী বা সিএএ নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প কিছু হাতে নেই। মোদি-অমিতের বিচারে ‘মুসলমান খেদানো’র প্রোগ্রাম এখন তাদের একমাত্র সম্ভাবনা -আয়ু ও বাঁচোয়া! বাকি সব হারিয়েছে তারা। এখন জায়গা মত সুযোগ পেলে বাংলাদেশের সরকারকেও তাদের লক্ষ্যে বেচে দেয়ার চেষ্টা করবে, এমনই তলানিতে ঠেকেছে তারা! একারণে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে এনআরসি বা সিএএ ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু হিসাবে রাখবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া সত্বেও অমিত শাহ্‌ ২০১৮ সাল থেকে নিয়মিত যে কোন নির্বাচন এলেই  “অনুপ্রবেশকারী” মানে “মুসলমান খেদানো”, আর তেলাপোকা বা উইপোকা বলে গালি দিয়ে তুচ্ছ করে তাদের পিষে মারার কথাই বেপরোয়া বলে চলেছেন। এটাই প্রমাণ যে কোন প্রতিশ্রুতি রক্ষার অবস্থায় বিজেপি বা মোদী-অমিতেরা নাই। অসুস্থ, বর্ণবাদী এরা এমনই বেপরোয়া!

কিন্তু আমাদের সরকার নিজে বা খোদ বাংলাদেশ কী মোদী-অমিতের ন্যুইসেন্স থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারবে? আমরা আশঙ্কিত! কারণ, সরকার ভুল রাস্তায় হাঁটছে। এছাড়া, আমাদের সরকারগুলো স্বাধীনতার পর থেকেই ‘হিন্দু পারসিকিউশন’ করে থাকলে নির্যাতনের শিকার সেই হিন্দুদের বদলে মুসলমানদের সীমান্তে জড়ো করা হচ্ছে কেন? এই সাধারণ স্ববিরোধিতাটাকেও প্রশ্ন করতে ভুলে গেছে আমাদের সরকার!

এরই ভিতরে সরকারের মুজিববর্ষ পালনের গুরুত্বপুর্ণ  “মুলবক্তা” অতিথি হয়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।  মুসলমানবিদ্বেষী এত ঘৃণার চাষাবাদ যার মনের কোণে কোণে তিনি আরও প্রায় তিন মাস সিএএ বাস্তবায়ন করে কত কিছু যে করে আসবেন কে জানে? আবার আসার পর বাংলাদেশে তার কেমন লাগবে, কাটবে; আর আমরাই বা তাকে কীভাবে নিব? ভাববার আছে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ১৮ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে মোদির নিজ সঙ্কটে ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

 

মোদী-অমিতের গন্তব্য কী জরুরি আইন জারি

মোদী-অমিতের গন্তব্য কী জরুরি আইন জারি

গৌতম দাস

 ১৩ জানুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Rl

অমিত শাহ্ যে গুজরাটের দাঙ্গাবাজ পুরান গুণ্ডা, দিল্লিতে এসেও তিনি সে প্রমাণ আবার রাখলেন।
ভারতের একাডেমিক জগতের ও হবু শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষার শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় কোনটা? ভারতের অভ্যন্তরীণ বিচার ও চোখে নামকরা, উঁচু প্রেস্টিজের বিশ্ববিদ্যালয় বলতে সম্ভবত সবাই বলবে জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়, সংক্ষেপে জেএনইউ [JNU]

সেই জেএনইউতে গত ৫ জানুয়ারি সন্ধ্যার অন্ধকারে রাস্তার আলো নিভিয়ে সব গেটে পুলিশি সহযোগিতায় পাহারা বসিয়ে কেবল বিজেপি সমর্থকদের লাঠিসোটা নিয়ে প্রবেশ ঘটানো হয়েছিল। এরপর তাদের দিয়ে হলে হলে ঢুকে বিরোধী শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে স্টুডেন্ট ইউনিয়নের নেতাদের নির্বিচারে হামলা করে পিটানো হয়েছে। আবার কয়েক ঘণ্টা পর হামলাকারীদের অবাধে জেএনইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়া নিশ্চিত করে, সব রাস্তার বাতি জ্বেলে দিয়ে সব গেট থেকে পুলিশ প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তিতে এসব হামলাকারীর কিছু ছবি মিডিয়াতে দেখা গেছে। তাতে হামলাকারী সবারই মুখ কাপড় দিয়ে ঢাকা দেখা ছিল। এই হামলায় ছাত্র সংসদের ভিপি ঐশী ঘোষ ও কয়েকজন শিক্ষকসহ প্রায় ৩০ জন গুরুতর আঘাতের শিকার হয়েছেন। আনন্দবাজার লিখেছে, ‘প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জন পড়ুয়াকে (পিজি) এমস-এ ভর্তি করা হয়েছে। অন্তত দু’জনের অবস্থা গুরুতর। শুধু হস্টেল নয়, ক্যাম্পাসে গাড়িও ভাঙচুর করা হয়। পাথর ছোড়া হয়। মেয়েদের হস্টেলে এসিড নিয়েও হামলার চেষ্টা হয় বলে অভিযোগ” [গেরুয়া’ হামলায় রক্তাক্ত জেএনইউ]। “প্রতিবাদ করতে গিয়ে মার খেতে হয় জেএনইউয়ের ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব রিজিওনাল ডেভেলপমেন্ট’-এর অধ্যাপিকা সুচরিতা সেন-সহ একাধিক শিক্ষক-শিক্ষিকাকে। সুচরিতাকে এমস-এ [AIIMS] ভর্তি করতে হয়েছে”। এখানে লক্ষণীয়, হামলাকারীরা এসিডও বহন করছিল আর তা নিয়ে হামলা হয়েছে।

ইংরেজি ওয়েব মিডিয়া ‘দ্য স্ক্রল [THE SCROLL]’ চারটি প্রশ্ন তুলে এক আর্টিকেল লিখেছে। এক. ফুটপাথের আলো নিভিয়ে রাখা হয়েছিল কেন? দুই. কেন গেটের পুলিশ বেছে কাউকে ঢুকতে দিয়েছিল, আর কাউকে দেয়নি? তিন. যারা আগ্রাসীভাবে ও সশস্ত্র হয়ে ঢুকছিল পুলিশ কেন তাদের আটক করে রাখেনি? চার. গেটেই সন্ত্রাসী গ্যাংটাকে পুলিশ কেন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেনি?

বলা বাহুল্য, এই চার প্রশ্নেই সব জবাব ও পুলিশের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ আছে।

তবে মূল কথা, মুখ ঢেকে মুখোশ পরে হামলা করলেও মিডিয়ায় বা সামাজিক স্তরে হামলাকারীরা আর ‘অজ্ঞাত’ নয়। মিডিয়াতেই এটা প্রতিষ্ঠিত যে হামলাকারীরা আরএসএসের ছাত্র সংগঠন এবিভিপি (অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ, ABVP), তাদের নেতৃত্বই এই হামলা হয়েছে। আনন্দবাজার লিখেছে, “বিকেল থেকেই ক্যাম্পাসে ভিড় জমতে শুরু করে। মুখোশধারী গুণ্ডারা প্রথমে সাবরমতী ধাবার বাইরে জড়ো হয়। পড়ুয়াদের অভিযোগ, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের এবিভিপি নেতা-নেত্রীরা ভাড়াটে গুণ্ডাদের নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢোকে। রড, লাঠি, বাঁশ নিয়ে পড়ুয়াদের ওপর চড়াও হয় তারা। হস্টেলের আলো নিভিয়ে দিয়ে হামলার পাশাপাশি সাবরমতী, কাবেরী, পরিয়ার হস্টেলে ভাঙচুরও চলে। পড়ুয়াদের অভিযোগ, আরএসএস-ঘনিষ্ঠ কয়েকজন শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের চিনিয়ে দিয়েছিলেন”। ……”ভিতরে যখন হামলা চলছে, তখন গেটের বাইরে স্লোগান ওঠে ‘গোলি মারো শালো কো’, ‘ভারত মাতা কি জয়’, ‘জয় শ্রী রাম’ “।   এছাড়া আর এক রিপোর্টে লেখা হয়েছে, “বিরোধীদের অভিযোগ, মোদী-অমিতের তত্ত্বাবধানেই হামলাকারীরা বাইরে থেকে জেএনইউয়ে ঢুকেছিল। হামলার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে বিজেপি ও সঙ্ঘের স্থানীয় নেতাদের চিহ্নিত করে নাম প্রকাশ করে দিয়েছে কংগ্রেস। প্রকাশ্যে আসা ভিডিয়োগুলো সঙ্ঘের অস্বস্তি বাড়িয়েছে”।

জেএনইউ নিয়ে গর্ব বা একে নামকরা বলার পেছনে অনেক কারণ বা বৈশিষ্ট্য আছে। যেমন এর সাবেক ছাত্ররা ভারতের একাডেমিক বা কর্মজগতে বড় বড় জায়গা নিয়ে আছেন। আবার অনেক গরিব বা সামাজিক স্ট্যাটাসের বিচারে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীও এখানে প্রবেশের সুযোগ পেয়ে থাকেন। মূলত মেধাবী হওয়ার কারণে এখানে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়ে নিজের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে গড়ে নিতে পেরেছেন। বলা যায় চেপে বসা সামাজিক স্ট্যাটাস বা স্তরভেদ তারা উলটে দিয়েছেন তাতে, তিনি মুসলমান বা দলিত অথবা গরিব যাই হোন না কেন! এসব মিলিত কারণে জেএনইউতে সাবেক স্টুডেন্ট বা সাবেকি শব্দটাও বেশ গর্বের। কিন্তু সেটা এই হামলার ঘটনায় বিজেপির বিরুদ্ধে গেছে। হামলা চলাকালীন বা পরে বা দূরে থেকেও এই সাবেকরাই ঘটনার নিন্দা করে পাশে এসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। আর তাতে এমনকি মোদি সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী নিজের সাবেকি পরিচয়ের গৌরব টিকিয়ে রাখতে গিয়ে হামলার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়ে বসেন। এমনকি কেন্দ্র সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর ও অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ হামলার নিন্দা করেন। যেটা অন্য অনেক মন্ত্রী আর সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের কাছকাছি বা পক্ষের মতো শোনায় এমন বিবৃতি দিয়েও ভারসাম্য আনা সম্ভব হয়নি। হামলার ঘটনায় ক্ষুব্ধ এমন প্রাক্তন স্টুডেন্টদের কিছু প্রতিক্রিয়া সংগ্রহ করে একটা রিপোর্ট [মনোবল চুরমার করতেই কি হস্টেলে হামলা] এখানে আছে, আগ্রহীরা দেখতে পারেন।

কেন  জেএনইউ’র বিরুদ্ধে অমিত শাহের এত রাগ ক্ষোভঃ
সাধারণভাবে জেএনইউতে কমিউনিস্ট চিন্তা এখনো তুলনায় প্রভাবশালী ও ডমিনেটিং ধারা। সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি তার আমলে জেএনইউ স্টুডেন্ট ইউনিয়নের (সংসদ) প্রেসিডেন্ট ছিলেন। গত তিন সেশনে এখানে স্টুডেন্ট ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট কমিউনিস্ট। এমনিতেও শাসক-চিন্তা বা শাসক-বয়ান বিরোধিতা করে চলার এক ঐতিহ্য জেএনইউতে ছিলই। তবে এটা সম্ভব হয়েছে জেএনইউ “স্বায়ত্তশাসিত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়” আইনে চলা ও শুরু থেকেই তা চর্চা করা হয়ে আসছে বলে। তাই এটা কমিউনিস্ট চিন্তা-চর্চারও এক সেন্টার হতে সুযোগ পেয়েছিল, এমনকি এর কমিউনিস্ট নকশালী অপর ধারাও। তবে এমন কমিউনিস্ট প্রভাব কেবল ছাত্রছাত্রীদের কারণে নয়, মূলত ফ্যাকাল্টি মেম্বাররাও অনেকে “প্রগতিশীল ও বামপন্থার” অনুসারী বলে। এভাবেই চলছিল। কিন্তু গত ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর সারা দুনিয়াতেই ‘প্রগতিশীলতা’ বা ‘বামপন্থা’ সবচেয়ে অগ্রসর চিন্তাধারা মনে করার এই ভ্যানিটি ভেঙে পড়তে শুরু করেছিল। ফলে দুনিয়াজুড়ে এই চিন্তার আধিপত্য ভেঙে পড়ার শুরু এঘটনা থেকে। এছাড়াও পরে তা আবার আরেক বড় ধাক্কা খেয়েছিল। নতুন শতাব্দীতে ২০০১ সালের পর আল কায়েদা ফেনোমেনার কারণে গ্লোবাল নতুন মস্ত ইস্যু হাজির হয়ে যায় – ‘ইসলাম প্রশ্ন’। ‘ইসলাম ইস্যু’ এমন অজস্র গুরুত্বপূর্ণ ও সিরিয়াস প্রশ্ন তুলে এনেছিল যেমন ধরা যাক, স্পিরিচুয়ালিটি কী? শুধু তাই নয়, আরো দিক হল এই প্রশ্নের জবাব পাওয়াটা কী খুব এসেনসিয়াল মানে অনিবার্য প্রয়োজন? এসব গুরুতর প্রশ্নের জবাব কোনো প্রগতিশীলের কাছে তৈরি ছিল না। বরং এগুলো অপ্রয়োজনীয় প্রশ্ন মনে করে তারা ফেলে রেখে দিয়েছিল। কিন্তু সমসাময়িক প্রধান প্রশ্নগুলোর জবাব দিতে না পারলে, তৈরি না থাকলে যেকোনো চিন্তার আধিপত্য ভেঙে পড়তে বাধ্য। আসলে, শুধু তাই নয়, এক ধর্মবিদ্বেষ বিশেষত ইসলামবিদ্বেষ দিয়ে এই জবাবহীনতার খামতি ঢেকে রাখা হয়েছিল এতদিন। তবে অবশ্যই আবার ব্যাপারটা এমন নয় যে, প্রশ্নকর্তাদের কাছেও জবাবটা আছে বা ছিল। তাই সার-অবস্থাটা হল, যে বুঝতে বা আমল করতে চায় সে বুঝবে চিন্তা-জগতের বিরাট ঘাটতির গর্তটা কোথায় লুকিয়ে আছে! কারণ এটাও পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল যে, আসলে ঘাটতি লুকাতে চাইলে এই দুর্দশাকে ‘টেরর বা সন্ত্রাসীদের’ কারবার বলে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বুশের কোলে উঠে পড়ার রাস্তা খোলা ছিল। তাই অনেকে সেকালের ‘আমেরিকান প্রেসিডেন্ট’ বুশের কোলে উঠেও নিজেকে প্রগতিশীল বলে দাবি করছিল।

আর যারা নিজেকেই ফিরে দেখা – মানে রিভিউ আর ক্রিটিক্যাল চোখ ফেলে মানে নিজেরই পর্যালোচক হয়ে নিজেকে ঢেলে সাজিয়ে নেয়ার সাহস রাখে তারা নিজেকে পুনর্গঠনের পথ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু লক্ষণীয় যে, এই পথে বাংলাদেশও যতটা এগিয়েছে ভারত এর ধারেকাছেও আসেনি। খুব সম্ভবত এর একটা কারণ ভারতের রুলিং বা শাসক শ্রেণীর বয়ান। নিজের অভ্যন্তরীণ প্রয়োজন কম্বিনেশন ও বিকাশের কারণে ভারতের একাডেমিক জগতও এখানে স্বাধীনভাবে না বরং শাসক-বয়ানের নিরিখে সমস্যাটাকে দেখেছিল। এই বড় গুরুত্বপুর্ণ দিকটা আমল না করে পাস কাটাতে চেয়েছিল। তাই নিজ চিন্তার খামতি নয় বরং ব্যাপারটাকে ‘টেররিজম’ হিসেবে দেখার বয়ান মেনে নিয়েছিল। তাই ‘ইসলাম প্রশ্ন’ ভারতের  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোসহ কোনো একাডেমিক দুনিয়ায়, এখনো তেমন জবাব না জানা প্রশ্ন হিসেবে দেখা দিয়েছে – স্টাডি খোঁজাখুঁজি গবেষণা চলছে এমন জানা যায় না। যদিও ভারতের স্ট্রাটেজিক ইনস্টিটিউট অনেকগুলোই আছে যেখানে রাষ্ট্রের ডিফেন্সের চোখে ক্ষমতাকে রক্ষার আলাপ সেখানে চলে, তা দরকারিও হয়ত। কিন্তু নিজ চিন্তার দোষত্রুটি, নিজ ইসলামবিদ্বেষের বোঝা বা নিজ চিন্তায় ঘাটতি বুঝার বিষয়টা সেখানে ইস্যু হওয়ার সুযোগ পায় নাই। তা না হওয়ারই কথা, অবশ্য। এক কথায় এসবের মিলিত কারণে ভারতের একাডেমিক ভ্যানিটি এখনো প্রগতিশীল ও বামপন্থার অনুসারী হয়েই আটকে আছে। তবু ভারতের অন্তত দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন প্রগতিশীলতা ও বামপন্থার প্রভাব দেখা যায়- জেএনইউ আর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়। তবে জেএনইউ তুলনায় অনেক বেশি প্রভাবশালী।

কিন্তু বিজেপি-আরএসএসের চোখে, তাদের হিন্দুত্ববাদের চোখে তাকে বধ করতে, তার বয়ান ফুটো করে দিতে, তাকে প্রভাবহীন করতে প্রশ্নে জর্জরিত করে ফেলার এখনো ক্ষমতা রাখে ও পারে এই প্রগতিশীল ও বামপন্থার বয়ান। তাই বয়ানের সক্ষমতা এ’প্রসঙ্গে বিজেপি তাকে চ্যালেঞ্জ করা প্রতিপক্ষ হিসাবে কংগ্রেসের চেয়েও কমিউনিস্টদের প্রধান শত্রু মনে করে। এর অবশ্য অন্য একটা বড় কারণ আছে। বিষয়টা ভোট বাক্সের, বয়ানের তত নয়।

ভারতের প্রধান ধারার সব রাজনৈতিক দলই একটা পর্যায় পর্যন্ত কমবেশি মূলত হিন্দু জাতীয়তাবাদী। তা চিনার উপায় হল, যারা-ই ‘জাতি’ ধারণাটা অনিবার্য ভেবে প্রত্যক্ষে-পরোক্ষে গ্রহণ করেছে মানে রাজনীতিকে রাষ্ট্র-নাগরিক-অধিকার এই ফ্রেমে না ভাবতে পারে না। বুঝে না বা বুঝতে চায় না বা বুঝেনি, বরং  ব্যাপারটাকে রাষ্ট্র নয় “জাতি” হিসেবে বুঝেছে। যেমন ভারতীয় “জাতি” বা হিন্দু “জাতি”  হিসেবে- এমন এরা সবাই এই দলের এই ধারার। যে অর্থে কমিউনিস্টরাও জাতীয়তাবাদকে সহযোগী মনে করে ও পাশে রেখেই হাঁটে। তুলনায় কংগ্রেস মূলত হিন্দুইজমের জাতি-বাদী রাজনীতির ধারক এবং আগের তুলনায় কম প্রকাশ্য এই অবস্থান একালে বিজেপির হিন্দুত্ববাদের সাথে মোকাবিলা করতে  গিয়ে রাহুল গান্ধী হিন্দু ভোট হারাবার ভয়ে বিজেপিকে “হিন্দুত্ববাদকে সমালোচনা করতে ভয় পায়, এড়িয়ে চলে। বরং নিজেই নিজেকে “সফট হিন্দুত্ববাদী” বলে লেভেল দেয়। এর বিপরীতে কেউ হিন্দু বলে কমিউনিস্টদের ভোট দেবে তা অবশ্য কমিউনিস্টদের মনে আশা নাই বলে তাদের পরোয়াও নাই। এ কারণে বিজেপির হিন্দুত্বের সমালোচনায় কমিউনিস্টরা তুলনায় অন্তত কংগ্রেসের চেয়ে এগিয়ে ও বেপরোয়া। এ কারণেই কমিউনিস্ট প্রভাব অমিত শাহের বিশেষভাবে চক্ষুশূল। এ জন্যই কমিউনিস্টদের “টুকরে টুকরে গ্যাং” বলে নাম দিয়ে তুচ্ছ করা শুরু করেছেন অমিত শাহ্। বিজেপির চোখে ‘হিন্দু-জাতির’ জন্য ‘দেশপ্রেম’ একটা আবশ্যিক বৈশিষ্ট্য আর যাদের তা নেই তারা দেশদ্রোহী- এই বিচারে কমিউনিস্টরা নাকি “দেশদ্রোহী”। মুখ ঢেকে অন্ধকারে হামলার সময় তাই বিজেপি কর্মীদের স্লোগান ছিল- এই “দেশদ্রোহীদের” বিরুদ্ধে। এই প্রতিহিংসা এটা নাকি তাদের আসলে ‘মরাল-শক্তি’ যোগানদার উৎস।

অমিত শাহের দৃঢ়বিশ্বাস ভারতে মোদী-অমিতের যে বাধাহীন তাণ্ডব বা প্রভাব বাড়ছিল তা হঠাৎ নাগরিকত্ব ইস্যুতে পা-হড়কে পড়ে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ এই কমিউনিস্টরা, অন্যেরা ততটা না। সংখ্যায় এরা কিছুই না কিন্তু ‘এরা গ্যাং’। বিরাট উসকানিদাতা, যা হিন্দুত্ববাদের সুড়সুড়ি বা বিজেপির তৈরি পোলারাইজেশন উল্টে দিতে পারে। অতএব, এদের দৈহিকভাবে হামলা করো, ভয় দেখাও, যেভাবে পারো দমাও।

অমিত শাহের এই হিসাবটাও ভুল। বর্তমানে নাগরিকত্ব ইস্যুতে বিজেপিবিরোধী এই আন্দোলনের আসলে এখন পর্যন্ত মূল শক্তি ঠিক কমিউনিস্টরা নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক শিক্ষার্থীরা যাদের মধ্যে কমিউনিস্টরাও আছে অবশ্য। একজন মানুষ কেবল মুসলমান বলে তাকে অধিকারবঞ্চিত করতে হবে, আর এর দায় বিজেপি ঐ শিক্ষার্থীদেরও নিতে ও সমর্থন করতে বলবে – এটা একেবারেই অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে শিক্ষার্থী তরুণদের কাছে।  বিজেপির এই ঘৃণার মূল্যবোধ তরুণ শিক্ষার্থীদের কাছে অগ্রহণযোগ্য আর তা হওয়াই স্বাভাবিক। পশ্চিমবঙ্গ আর আসাম (নর্থ-ইস্ট) বাদে (এদুটো স্ব স্ব সমাজের মেজরিটি অংশ বলে ফোরফ্রন্টে) বাকি রাজ্যে এবারের আন্দোলনের মূল শক্তি কিন্তু এই তরুণ শিক্ষার্থীরাই। সম্ভবত এটা বলা সেফ হবে যে, গত প্রায় ছয় বছর মোদী-অমিতেরা মুসলমানদের “জয় শ্রীরাম” বলানোর বল প্রয়োগ বা লিঞ্চিং-এর হুজুগে যে তরুণদের সংগঠিত করেছিল তারা আলাদা, তারা অন্য সেটের তরুণ। লিঞ্চিংয়ের তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তরুণ শিক্ষার্থীদের তুলনায় সমাজের কম শিক্ষিত ও কম শহুরে অংশের। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তরুণ শিক্ষার্থীরা এখনো কম শিক্ষিত ও কম শহুরে তরুণদের রিপ্লেস করে নিজের ডমিনেটিং জায়গা ধরে রাখতে পারছে, লিঞ্চিংয়ের তরুণদের মাঠছাড়া করে রাখতে পারছে।

তবে কম শিক্ষিত ও কম শহুরে আগের তরুণদের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তরুণ শিক্ষার্থীদের সমর্থক ও পাশে এসে দাঁড়ানোর মত জনগোষ্ঠী সমাজে সংখ্যাগরিস্ট মনে হচ্ছে। যেমন এমন জনগোষ্ঠির মধ্যে সমাজের মুসলমানরা তো আছেই সেই সাথে বিভিন্ন রাজনৈতিক কারণে যারা বিজেপিবিরোধী এমন সবাই এদের সাথে শামিল হয়েছে।

কাজেই নাগরিকত্ব ইস্যুতে যারা মোদী-অমিতের সরকারের বিরোধী, যারা প্রতিবাদের সংগঠক বা পালটা বয়ানদাতা তারা সবাই-ই কমিউনিস্ট এমন ধারণা সত্য নয়। তবে মূল গোষ্ঠিটা যারা – সাধারণভাবে বললে এরা “আধুনিক মনের ফ্রিডম”’ পছন্দের তরুণ বলা যায়। যাদের সাথে বিজেপির মূল্যবোধের ফারাক বা গ্যাপ অনেক বড়।

তবে কেউ শাসক হিসেবে সামনে গণপ্রতিরোধ দেখলে তাদের পিটিয়ে, ভয় দেখিয়ে ঠাণ্ডা করতে হবে – এই চিন্তা, এটা হিটলারি চিন্তা চর্চা করার পথ। এতে মনের প্রতিহিংসা কিছু মিটে বা কমে হয়ত, এছাড়া আরও কোন লাভ নাই লাভ হয়নি কোনদিন, লাভ হয় না। তাই নিরাপদেই বলা যায়, বিজেপির মুল্যবোধ আসলে প্রতিহিংসা মাখানো মানে প্রতিহিংসা-সম্পন্ন। বিজেপির ভবিষ্যত আটকে আছে অন্তত এখানেই।  কিন্তু আমরা নিশ্চিত থাকতে পারি একারণে বিজেপি এখন জবরদস্তি মানে বল্প্রয়োগের রাস্তা ধরার সম্ভাবনা বাড়বে। তাহলে সব মিলিয়ে অমিত শাহের চোখে এসব কিসের ইঙ্গিত?

পরিকল্পিত দাঙ্গা করে সেখান থেকে নিজেই নিজের লক্ষ্য বের করে আনাতে অমিত শাহ্ নিজেকে সিদ্ধহস্ত মনে করেন। ২০০২ সালে গুজরাটে মুসলমান মেরে হাত পাকিয়ে তার এই গভীর আস্থা অর্জনের শুরু। সেই অমিত শাহ্ এখন কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আর ওদিকে জেএনইউ দিল্লির কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের অন্তর্গত। অর্থাৎ জেএনইউ দিল্লির রাজ্য সরকারের এখতিয়ারের এলাকা নয়। এই সুযোগ নিয়ে অমিত শাহ্ দিল্লির পুলিশ কমিশনার অমূল্য পট্টনায়কের অধীনে জেএনইউয়ের তাণ্ডব ঘটিয়েছেন। ক্যাম্পাসে এবিভিপিকে ঢুকিয়ে গুণ্ডামি করে আবার তাদের সেফ এক্সিটের ব্যবস্থাও করে দিয়ে পুলিশ ফিরে গেছে। কিন্তু তবু অমিত শাহ্ এখানে পরাজিত। এখনও জেএনইউয়ে ছাত্র-শিক্ষক পেটানো নিয়ে টুঁ শব্দ করেন নাই প্রধানমন্ত্রী মোদী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত। তবুওও তারা পরাজিত এবং এই হামলার কিছুই লুকানো থাকবে না। কেন?

কারণ ইতোমধ্যেই পরের দিন মানে সাত জানুয়ারির এক টিভি টকশোতেই সব ফাঁস হয়ে যায়। ভারতের টকশো বাংলাদেশের টকশোর মতো নয়, ভয়ের কোন খাঁড়া ঘাড়ের ওপর ঝুলছে- ঠিক এ রকম নয়, তুলনামূলক অর্থে স্বাধীন। আর ভাল টকশো মানে ভার টিআরপি- এটা প্রতিযোগিতামূলক টিভি-মিডিয়ার ভারতে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ঐ কথিত টকশোতে, এক টিভি চ্যানেলে বিজেপির পক্ষ থেকে ছিলেন এবিভিপির দিল্লি শাখার এক যুগ্ম সম্পাদক অনিমা সোনকর। টকশোতে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে চাপ সামলাতে না পেরে একপর্যায়ে ওই মুখোশ-হামলার পক্ষে সাফাই দিতে গিয়ে তিনি সব স্বীকার করে ফেলেন। তিনি বলেন, “সেদিন এমনই ‘ভয়ের পরিবেশ’ তৈরি হয় যে, ‘আত্মরক্ষায়’ রড, লাঠি এমনকি এসিড সাথে রাখার পরিকল্পনা করেছিলেন তারা। নির্দেশও তেমনই ছিল-” এটা আনন্দবাজার লিখেছে। আরো লিখেছে, “অনিমার দাবি, বামপন্থী পড়ুয়াদের ‘লাগাতার আক্রমণের’ মুখে এবিভিপির সদস্য ও নেতারা এত ‘ভীত-সন্ত্রস্ত্র’ ছিলেন যে, ঘর থেকে বাইরে বেরোলে সাথে আত্মরক্ষার সরঞ্জাম রাখতে বলা হয়েছিল প্রত্যেককে। লাঠি, রড, গোলমরিচ গুঁড়ার স্প্রে, এসিড – যে যা হাতে পেয়েছেন, তা-ই সাথে নিয়ে রেখেছিলেন বলে জানান তিনি। টিভি চ্যানেলে তিনি এ-ও মেনে নিয়েছেন যে, বিকাশ এবিভিপির কর্মী [যাকে বিভিন্ন মিডিয়ায় ছবিতে স্পষ্ট চেনা যাচ্ছিল।] বেফাঁস বলছেন বুঝতে পেরেই অবশ্য বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় লাঠি হাতে যাকে দেখা যাচ্ছে, তিনিই বিকাশ কি না, তা নিশ্চিত করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। বলেন, ‘কোনো হস্টেলে এসিড আক্রমণের ঘটনাও তার জানা নেই”।

এক কথায় বললে, অমিত শাহ্ এখন পুরা ধরা খেয়েছেন। সব কিছুই এখন ওপেন সিক্রেট। ঘটনা এখন আদালত পর্যন্ত যদি যায় বা যখন যাবে তাতে পুলিশ অফিসারসহ অনেকেই নিজেকে শাস্তি বা চাকরিচ্যুতি থেকে বাঁচাতে পারবেন মনে হয় না। তাতে পুলিশ তদন্ত রিপোর্ট এখন অমিত শাহ্ যেভাবেই লেখান না কেন!

তাহলে এখন অমিত শাহ্ এ ঘটনা থেকে কী শিক্ষা নেবেন? এটা বলাই বাহুল্য, মুখোশ পরে এমন বেধড়ক মারের দেয়ার উদ্যোক্তা অমিত শাহকে সামনে আরও অনেকবার করতে হবে, বুঝাই যাচ্ছে। এছাড়া তার পক্ষে আরো চার বছর ক্ষমতায় থাকা মুশকিল হবে। তাহলে উপায়?

একটাই সহজ উপায় আছে। আর অমিত শাহ্ ধীরে ধীরে তাই গ্রহণ করতে যাচ্ছেন সম্ভবত!
সেটা হল – জরুরি আইনকরে দেওয়ার ‘ঘোষণা দেয়া। না, ভারতে জরুরি আইন কোন অপ্রচলিত বা নতুন তা নয়। ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭৫ সালের জুনে এর নমুনা রেখে গিয়েছেন। জরুরি আইন মানে এতে বিরাট সুবিধা হল, সমস্ত “নাগরিক মানবিক অধিকার” স্থগিত করে রেখে দিতে পারে রাষ্ট্র ও সরকার। তাতে মিডিয়াসহ বহু কিছুই এখানে নির্দেশ দিয়ে বন্ধ করে দেয়া যায়। যেমন, মিডিয়ায় টকশো চালু রেখে জেএনইউ’র মত মুখোশ-হামলা ঘটনা চালাতে যাওয়াতেই তো সব সমস্যা, অমিতের বিরাট ভুল হয়েছে।   আগেই যদি জরুরি আইন জারি কথা থাকত তাহলে মিডিয়ায় বিধিনিষেধ আরোপ করে রাখা যেত। কাজেই যুগ্ম সম্পাদক অনিমা সোনকরকে টিভি টকশোতে জবাবদীহীতা করতে আসতে হত না।  কাজেই জবরদস্তি বা বলপ্রয়োগ করতে চাইলে ‘জরুরি আইন’ জারি করে নেয়ার চেয়ে ভালো বিকল্প নেই। যেমন এছাড়া এবার সবই তো ঠিক ছিল কিন্তু যুগ্ম সম্পাদক অনিমা সোনকর টকশোতে কথা বলতে গিয়েই সব কেঁচে গিয়েছে। কাজেই এই টকশোটা বন্ধ থাকলে এসবের ফাঁস হওয়ার কোনো সুযোগই থাকত না। তাহলে নিশ্চয় অমিত শাহ্ এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে রাখবেন।
অতএব মোদী-অমিত কী এখন জরুরি আইন ঘোষণার গন্তব্যের দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে গেলেন?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ১১ জানুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে “ মোদি-অমিত কি জরুরি আইনের দিকে?”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]