দিল্লিতে নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

দিল্লি নির্বাচনে মোদী-অমিতের পরাজয়ের তাৎপর্য

গৌতম দাস

১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2SL

 

দিল্লি প্রাদেশিক বা রাজ্য নির্বাচনে মোদী-অমিতের বিজেপির শোচনীয় পরাজয় ঘটেছে। আম আদমি পার্টি (আপ বা AAP) দলের আগের ২০১৫ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মতই এবারো অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে তারা ৭০ আসনের দিল্লির ৬০-এর বেশি আসন পেয়ে নির্বাচিত হয়েছে। জার্মান সরকারের ডয়েচে ভেলে [Deutsche Welle] গ্লোবাল মিডিয়া হিসেবে অত জনপ্রিয় না হলেও ফেলনা গুরুত্বের নয়। সেই ডয়েচে ভেলের (ইংরেজি সংস্করণ) এক রিপোর্টের শিরোনাম, “দিল্লির নির্বাচনী হার : প্রধানমন্ত্রী মোদীর শেষ দিনের শুরু?” [Delhi election losses: The beginning of the end for PM Modi?]।

এটা ঠিক যে, ভারতের সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ (CAA) প্রায় সব প্রভাবশালী পশ্চিমা দেশে এক ব্যাপক নাড়াচাড়া দিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ভারতের লোকসংখ্যা বা ভোক্তা বাজার প্রায় ১৩৬ কোটির; সে কথা পশ্চিমা বিশ্ব সব সময় খুবই মনে রাখে। তারা তাই এমন কিছুই বলতে চায় না পাছে তা এই বাজার হাতছাড়া হওয়ার কারণ হাজির করে ফেলে। কিন্তু মোদী-অমিতের বৈষম্যমূলক ও মুসলমানবিদ্বেষী করে সাজানো নতুন নাগরিকত্ব আইন পশ্চিমাদেশের জন্য ঐ ভোক্তা বাজারের লোভের চেয়েও আরো বড় বিপদের। সাধারণভাবে তারা আতঙ্কিত এ জন্য যে, তাদের আশঙ্কা এই আইন দুনিয়াতে বিপুল রিফিউজির ঢল তৈরি করতে পারে যারা আবার রাষ্ট্রচ্যুত। মোদীর এই আইন আগামীতে ভারতীয় মুসলমানদের রাষ্ট্রহীন রিফিউজির সারিবদ্ধ ঢল নামাতে পারে, যেটা সদ্য মোকাবিলা করা সিরিয়ান রিফিউজিদের চেয়েও হবে ভয়ঙ্কর। কারণ ভারতীয়দের ক্ষেত্রে বাড়তি বৈশিষ্ট্য হল, এরা হবে রাষ্ট্রহীন; ‘থেকেও নাই’ এমন রাষ্ট্রচ্যুত বলে তাড়ানো এক জনগোষ্ঠী।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ‘এই আশঙ্কার’ ওপর দাঁড়ানো এক নিন্দা প্রস্তাব ইতোমধ্যেই আনা হয়েছিল আর যা এখন আগামি মধ্য মার্চ পর্যন্ত মুলতবি করে রাখা আছে। ভারতের সুপ্রীম কোর্ট এনিয়ে কী রায় দেয় মূলত সেটা দেখতে আর মার্চে মোদী ইইউ সামিটে এসে কী প্রতিশ্রুতি দেন না দেখার জন্য। নতুন রিফিউজির ঢলের উদ্ভব বা মানবাধিকার রক্ষার দায় হিসেবে এর ভাগ বা দায়ভার গ্রহণ প্রশ্নে ইউরোপ আমেরিকার চেয়েও বেশি ভীত, বিশেষ করে গ্লোবাল অর্থনীতির স্থবিরতা দুনিয়াতে যখন প্রায় নিয়মিত হয়ে পড়া দশা সেই পরিপ্রেক্ষিতে। ডয়েচে ভেলের এই শিরোনাম এসব আশঙ্কায় আক্রান্ত বলে এমন হয়ে থাকতে পারে। তা আমরা অনুমান করতে করি।

দিল্লির রাজ্যনির্বাচন শেষে ফল প্রকাশিত হয়েছে গত ১১ ফেব্রুয়ারি। বিজেপিবিরোধী মূলত দিল্লির এক আঞ্চলিক দল আম আদমি পার্টি (আপ) এবারের নির্বাচনে ৬২ আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জিতেছে। আর সেই থেকে অসংখ্য কর্নার থেকে কেন ফলাফল এমন হল এর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে মিডিয়াগুলো ভরপুর হয়ে উঠেছে। রাজ্য হিসেবে দিল্লি খুবই ছোট; যেখানে ভারতের পুরনো মাঝারি সাইজের রাজ্যগুলোতে ২০০ থেকে ২৫০-এর মধ্যে আসন থাকে। সেই বিচারে এগুলোর তিন ভাগের একভাগ সাইজের রাজ্য হল দিল্লি। তবুও দিল্লির এই নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় উৎসাহ অনেক বেশি। কেন?
মূল কারণ, মোদী-অমিতের নাগরিক বৈষম্যমূলক সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএ পাস করার পরের ভারতজুড়ে আপত্তি ও প্রতিক্রিয়া; আর তা নিয়ে প্রতিবাদের ঝড় বয়ে যাওয়ার পর এটা ছিল কোন রাজ্যে অমিত শাহের প্রথম নির্বাচনের মুখোমুখি হওয়া। এছাড়া এমনিতেও দিল্লির নির্বাচন পরিচালনায় মূল দায়িত্বে ছিলেন অমিত। যেমন শুরুতে বিজেপির নির্বাচনি প্রস্তুতিমূলক ভোটে কী হয়েছিল সে প্রসঙ্গে আনন্দবাজারের ভাষায়, “কিন্তু নরেন্দ্র মোদী, রাজনাথ সিংহ, জগৎপ্রকাশ নড্ডাদের সঙ্গে বৈঠকে শাহই আস্থা জুগিয়েছিলেন। বলেছিলেন, দিল্লি বার করে নেবেন। মেরুকরণই হবে প্রধান অস্ত্র। তখনই স্থির হয়, শাহিন বাগই হবে প্রধান ‘প্রতিপক্ষ’। আর প্রচারে শাহ বলেছিলেন, ‘‘ইভিএমের বোতাম এত জোরে টিপুন যেন শাহিন বাগে কারেন্ট লাগে। “। তাই তখন থেকেই দিল্লি নির্বাচনে ঠিক কী বলে, কোন কৌশলে বিজেপি ভোটে অংশ নেয় আর তাতে ভোট প্রদানের ধরনের মধ্যে কী মেসেজ ফুটে ওঠে – এসব জানার জন্য সব মহলের ব্যাপক কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, আর তা থেকেই এত বিশ্লেষণ।
এসব বিশ্লেষণগুলোতে কমন ব্যাখ্যার ধারাটা হল, এটা ‘উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু’ – এরই লড়াই যেখানে ‘উন্নয়ন’ জিতেছে। কিন্তু এখানে ‘উন্নয়ন’ মানে কী? আমাদের দেশের মতই, হাসিনার ‘উন্নয়ন’ বনাম নাগরিক অধিকার, এর কোনটা চান- এর মত? না, ঠিক তা নয়। তবে হয়ত কিছু কাছাকাছি। দিল্লির বেলায় এর মানে হল, নাগরিক মিউনিসিপ্যাল সুবিধা ও সার্ভিসগুলো; যেমন পানি, বিদ্যুৎ, নিষ্কাশন, বাসভাড়া, শিক্ষা ইত্যাদিতে সার্ভিস ব্যবস্থাপনা আর এর স্বল্প চার্জ বা মওকুফ করা চার্জ- এভাবে আপ দলের মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল গত পাঁচ বছর কাজ করে সাফল্য এনেছেন। এটাকেই এখানে ডাকা হচ্ছে “উন্নয়ন” বলে। আর এর বিপরীতে ‘কেন্দ্রের ইস্যু’ জিনিষটা কী?
এখানে কেন্দ্রের ইস্যু হল যেমন, সবচেয়ে জ্বলন্ত ইস্যু সিএএ বা এর সাথে এনআরসি; এ ছাড়া ধীরগতির ধসে পড়া অর্থনীতি, কাজ সৃষ্টি না হওয়া ইত্যাদি। এ ছাড়াও আরেকভাবে ব্যাপারটা বলার চেষ্টা আছে। যেমন নির্বাচনী ফলাফল কী হতে পারে সেই আগাম অনুমিত ফলাফল জানার লক্ষ্যে করা সার্ভেতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে সেটা হল, “জাতীয় নিরাপত্তা”। বলাই বাহুল্য, এটা খুবই প্রলেপ লাগানো শব্দ। আসলে কদর্য কিছু ধারণাকে লুকিয়ে রাখতে বলা এক ‘ভদ্র শব্দ’। কারণ এর পেছনের মূল কথাটা হল, ‘মুসলমানবিদ্বেষী উসকানি দিয়ে প্রচারণার” পক্ষে কারা। এটাকে আবার বিজেপি নিজেও আরেকটা শব্দ – ‘পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ’ বলে প্রকাশ করে থাকে। যেমন এই নির্বাচনে অমিত শাহ ও তার দলের বিদ্বেষী ভাষ্য হল, কেজরিওয়াল একজন ‘জঙ্গি’ নেতা, সে পাকিস্তানের বন্ধু, মুসলমান তোষণকারী ইত্যাদি। দিল্লির এক মুসলমান-প্রধান এলাকা শাহীনবাগ, এখানকার সিএএ-বিরোধীদের মূলত নারীদের একটা স্থায়ী প্রতিবাদ মঞ্চ আছে। এ সম্পর্কে অমিতের মন্তব্য এটা নাকি এক ‘মিনি-পাকিস্তান’। তাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ কথাটার আসল মানে হল মানে, এই ক্যাটাগরিটা আসল অর্থ হল – বিজেপির হিন্দুত্ববাদী বয়ান ও এর প্রপাগান্ডাকে গুরুত্ব দিয়ে কারা বিজেপিকে ভোট দিয়েছে – তাদের কথা বুঝানো হচ্ছে। এরাই ‘জাতীয় নিরাপত্তা’ ক্যাটাগরিতে দেয়া ভোটার। এমনকি আনন্দবাজারের ভাষাতেও – এটা হলো “বিজেপির (হিন্দু) জাতীয়তাবাদী প্রচার এবং হিন্দু ভোট একাট্টা করার কৌশল”। অর্থাৎ হিন্দুত্বের জোশ তুলে সব হিন্দু ভোট যেন বিজেপির বাক্সে আসে, বিজেপির নেয়া এই কৌশল । এটাও অনেকসময় আরেকটা সার শব্দে প্রকাশ করা হয় – পোলারাইজেশন বা মেরুকরণ। “হিন্দুর হিন্দুকে ভোট দিতে হবে আর সেটা কেবল বিজেপিকেই” – এটাই হিন্দুত্ববাদী প্রচারণা কৌশলের সারকথা। এটাকেই বিজেপির হিন্দুত্ববাদ নিজেদের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ অথবা এটা “বিজেপির কৌশল” বলে প্রকাশ্যেই দাবি করে থাকে।
দিল্লির নির্বাচনের পরে ভারতের টিভির এক টকশোতে এসেছিলেন শেষাদ্রি চারি [SESHADRI CHARI]। তিনি হচ্ছেন, আরএসএসের ভাবাদর্শী পর্যায়ের এক নেতা , তিনি আবার আরএসএসের মুখপত্র এক প্রাচীন পত্রিকা ‘অরগানাইজার’-এর সাবেক সম্পাদক। তিনি বিজেপির এই ‘ঘৃণা তৈরির’ নিন্দনীয় কাজ ও ততপরতাকেও “অনৈতিক” বলে মানতে রাজি হননি। বরং দাবি করেছেন এটাই ‘বিজেপি রাজনীতির কৌশল’। দেখুন, not hate politics but strategy.।
ভারতের কনস্টিটিউশন এবং নির্বাচনী আইন অনুসারে ধর্মের ভিত্তিতে ভোট চাওয়া বেআইনি। কিন্তু যেখানে সারা ভারতই এখন ‘হিন্দুত্বে’ ভাসছে সেখানে এর বিরুদ্ধে আপত্তি তুলবে কে? আর নির্বাচন কমিশন সেখানে কোনো প্রশ্ন না তুলে আরামে কাজ করার পথ ধরবে সেটাই তো স্বাভাবিক।
ঠিক এ’কারণে বিজেপির অমিত শাহের ‘পোলারাইজেশনের রাজনীতি’ এবার কিভাবে কাজ করে, আদৌ করে কিনা, সেটি সবাই দেখতে চেয়েছিল। কঠিন বাস্তবতা হল, এবারই এটা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, খোদ অমিত শাহ এবার তা নিজ মুখে প্রেসের কাছে স্বীকার করেছেন।
“ভারতে হিন্দুরাই রাজত্ব করবে, অন্য কারও কথা চলবে না। যারা অমান্য করবে তারা ‘দেশকে গদ্দারকো, গোলি মারো শালো কো’।  এভাবে বিজেপির সমাবেশ মঞ্চ থেকে স্লোগান দেয়া শুধু নয়, লিখিত বিবৃতি মানে ঠাণ্ডা মাথায় লেখা এমন এক বিবৃতি পাঠ করা হয়েছিল। কিন্তু ১১ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে দুদিন ধরে অমিত শাহের ‘পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্স’ থেকে গায়েব ছিলেন। বেচারা অমিত “খুব শরমিন্দা আর শোকে” ভুগছে মনে হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের অফিসেও যান নাই। দু’দিন পরে ১৩ তারিখ সন্ধ্যায় এক টিভি অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রেসের সামনে তিনি বলেন, “গোলি মারো বলে বিবৃতি দেয়া অথবা ‘ইন্দো-পাক ম্যাচ’ ধরনের মন্তব্য করাটা আমাদের ঠিক হয়নি। আমাদের দল এসব মন্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চায়”। এছাড়াও, তিনি স্বীকার করে নেন যে, খুব সম্ভবত এমন মন্তব্যের জন্যই “দিল্লিতে আমাদের পরাজয় ঘটেছে”। এর সাথে তিনি এটাও স্বীকার করে নেন যে, দিল্লি নির্বাচন সম্পর্কে “তার আগাম অনুমানে ভুল ছিল”। ভেবেছিলাম, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাব। স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, মূল্যায়ন ভুল হয়েছে। আমার বেশির ভাগ মূল্যায়ন ঠিক হয়,এ বার ভুল হল”। সাথে সাথেই অবশ্য বড় ধূর্ততার সাথে নিজেই বলে রাখেন – “কিন্তু তাই বলে ‘দিল্লিতে বিরোধীদের বিজয় সিএএ-এনআরসি বিরোধী কোনো গণরায় নয়”।

এটা সে গণরায় কি না তা সামনে স্পষ্টই বুঝা যাবে। এখনই বুথ ফেরত জরিপে দেখা যাচ্ছে দিল্লি রাজ্যে মুসলমান জনসংখ্যা যেখানে ১৩% সেখানে মুসলমান ভোটারদের ৭৫% (আর এরই সাথে শিখ ভোটের ৪২%) আপ দলের পক্ষে ভোট দিয়েছে। [The AAP got the lion’s share of the Muslim vote, significant in a city-state with 13 per cent Muslims.] শাহীনবাগ যে কনস্টিটিউয়েন্সিতে পড়েছে এর নাম ‘ওখলা’ [Okhla]। সেখানে এবার ভোটারের উপস্থিতি রেকর্ডসংখ্যক। মোট উপস্থিত ভোটারের হার যেখানে ৬২% এর মতো সেখানে ওখলাতে তা ৬৬%-এর মত। আর ‘আপ’ দলের আমানতুল্লাহ খান এখানে জিতেছেন (1,30,367 votes) প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি প্রার্থীর (Braham Singh  58,540 votes) চেয়ে ডাবলের বেশি ভোটে।  এমনিতেও দেখা গেছে বেশির ভাগ আসনে ভোটাভুটির ফয়সালা হয়েছেও ষাট হাজার ভোটের কাছাকাছি।

উত্তরপ্রদেশের ‘গেরুয়া মুখ্যমন্ত্রী’ যোগী আদিত্যনাথ যার একমাত্র যোগ্যতা মুসলমানদের মারব-ধরব বলে গালিগালাজ করা, তাকে উওরপ্রদেশ রাজ্যের পড়শি রাজ্য দিল্লিতে ভাড়া করে আনা হয়েছিল প্রায় ১৩টা বিজেপি কনস্টিটিউয়েন্সিতে প্রধান সমাবেশে বক্তৃতা করতে। তিনি কেজরিওয়ালকে “জঙ্গি মদদদাতা, দেশদ্রোহী গাদ্দার, পাকিস্তানের বন্ধু ইত্যাদি বলে বক্তৃতা করেছিলেন। ফলাফল নিম্ন চাপ!  ঐ ১৩ আসনের ১১টাতেই বিজেপি অনেক ব্যবধানেই পরাজিত হয়েছে
অনেকেই অমিত শাহের স্বীকারোক্তিকে তার দলের এই হারের ফলাফল পাঠ করে, করা মন্তব্য বলে দেখেছেন। এখন মূল প্রশ্ন হল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কি এখন থেকে তাহলে ভালো হয়ে গেলেন বলে আমরা ধরে নিতে পারি?

অমিত শাহকে নিজ দলে “ম্যাজিসিয়ান” বলা হয়। গুজরাটের ২০০২ সালের দাঙ্গা থেকে এ পর্যন্ত দাঙ্গাতেই তার জয়জয়কার। তিনি নাকি যেটা চান তাই করে আনতে পারেন। দাঙ্গায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত আহত-নিহত হন, তাদেরও ভোট তিনি ব্যাগে ভরতে জানেন। ২০১৪ সালে নির্বাচনের আগে উত্তরপ্রদেশের মোজাফফরবাদের দাঙ্গায় তিনি তাই ঘটিয়েছিলেন।  সেই ‘দাঙ্গা-ওস্তাদ’ তিনিই এবার দিল্লিতে হেরে গেছেন। না, তবু এর পরেও তাঁর স্বভাব বদলাবে না। কারণ তিনি কেবল এই ‘দাঙ্গা’ কাজটাই ভালো পারেন।
এ ছাড়া আরো বড় ফ্যাক্টর হল, ২০১৬ সালের নোট বাতিলের পর থেকে ডুবে যাওয়া অর্থনীতির চিহ্নগুলো মোদী লুকিয়ে রেখেছিলেন ২০১৯ এর প্রথমার্ধ নির্বাচন হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। এরপর তা প্রকাশ হয়ে পড়ে। তাই সেই থেকে “মোদী-ম্যাজিক” বলে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। অতএব, আগামী সব নির্বাচনে বিজেপির একমাত্র ভরসা হবে “হিন্দুত্ববাদ” এর জজবা বা মেরুকরণ। কাজেই মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা ছড়িয়েই তাকে আবার ভোট চাইতে যেতে হবে। হয়তো পরের বার আরো ভাল ও কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে ঘৃণা ছড়াবেন। এক কংগ্রেস নেতা ব্যাপারটাকে ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে যে, তার কাছে নাকি গোপন সংবাদ আছে, ‘‘পাকিস্তান এ বারে দিল্লি থেকে বিহারের পথে রওনা হয়েছে’’। কেন?  আগামী অক্টোবরে বিহারে রাজ্য নির্বাচন। দেখুন মেরুকরণের ভবিষ্যত

তাহলে, কেজরিলালের উন্নয়নের বিজয় কী জিনিষ ও তা কতটা সত্য?
বড় সত্যটা হল, কোন রাজ্য নির্বাচনেই ভারতের কেন্দ্রীয় ইস্যুগুলো ভোটার-মানুষ ভুলে যায় না, যেতেই পারে না। যদিও এর পরেও এক্ষেত্রে একটা কিন্তু আছে। সেটা হল দিল্লির “গঠন প্রকৃতির” বিশেষত্ব। যেমন দিল্লি ছিল এক রাজধানী শহর কিন্তু আসলে ছিল এক জেলা শহর মাত্র। পরবর্তিতে তার পড়শি রাজ্য একদিকে পাঞ্জাব-হরিয়ানা (মানে মুল ভারতের পাঞ্জাব রাজ্য ভেঙে হরিয়ানা বলে আলাদা রাজ্য করা হয় ১৯৬৬ সালে। আর হরিয়ানাই দিল্লির লাগোয়া পড়শি। ) আর অন্য দিকে উত্তর প্রদেশ – এদুই রাজ্য থেকে কেটে আনা জেলা শহর নিজের ভিতরে ঢুকিয়ে নিয়ে আজ দিল্লি রাজ্য হয়েছে – ১১ জেলা শহরের। এভাবে অন্তর্ভুক্তি আবার এক দিনে হয়নি, ১৯৯৭ থেকে সর্বশেষে ২০১২ সাল পর্যন্ত সময়ে। এর সোজা অর্থ, এই অন্তর্ভুক্ত করে নেয়া জেলাগুলোতে  একটা রাজধানী শহরে  যেমন থাকা উচিত সেই পানি-বিদ্যুৎ-বাস-স্কুল টাইপের নাগরিক মৌলিক সুবিধাগুলোর কিছুই ছিল না। এসব অভাব চরমে  উঠা আর নাগরিক ক্ষোভ থেকেই একে পুঁজি করে আম আদমি পার্টির জন্ম ২০১২ সালে। আর গুছিয়ে ক্ষমতায় থেকে গত পাঁচ বছরে এই ব্যবস্থার চরম উন্নতি ঘটিয়েছে কেজরিলালের আপ দলটা। এই সময়ে রাজ্যের রাজস্ব আয় তিনি বাড়িয়েছেন ৩১%। আমাদের প্রথম আলোর দিল্লির তথ্য নিয়ে লিখেছে,

ভারতের মহাহিসাব নিয়ন্ত্রক কার্যালয়ের উপাত্ত বলছে, ২০১৫ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে দিল্লির রাজস্ব আয় ৩১ শতাংশ বেড়েছে। আর এ আয় গেছে স্কুল ও হাসপাতালের উন্নয়নে। যদিও এ সময়ে দিল্লিতে কেন্দ্রীয় সরকারের বরাদ্দ ৭ শতাংশ কমেছে। দিল্লি ভারতের অন্যতম প্রধান রাজস্ব উদ্বৃত্ত রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

কিন্তু এর চেয়েও বড় কথা, স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এর নেতা কেজরিওয়াল আদর্শ মুখ্যমন্ত্রী। পদত্যাগী এই সাবেক আমলা ম্যানেজমেন্ট বোঝেন ভালোই। তিনি বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী বড়লোকদের বিদ্যুতের রেট তুলনায় বেশি ধরে সে আয় দিয়ে গরিব কম ব্যবহারকারীদের ভর্তুকির ব্যবস্থা গড়ে তুলেছেন। ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ফ্রি। একই ব্যবস্থা পানি ব্যবহারেও। আবার নারী বাসযাত্রীর ভাড়া ফ্রি। স্কুল ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে বিপুল বিনিয়োগ করেছেন। তাতে ইংলিশ স্কুল ছেড়ে অবস্থাপন্নরাও সরকারি স্কুলে সন্তান নিয়ে ফিরেছেন। আজ আনন্দবাজার লিখেছে, মহিলা ভোটেই কুর্সিতে কেজরী, বলছে ফল-পরবর্তী সমীক্ষা। একারণে মূলত নারীরা তুলনায় আপ পার্টিকে ভোট দিয়েছে বেশি। এমনকি নাকি স্বামীরা বিজেপি-কংগ্রেসের সমর্থক হলেও স্ত্রীরা আপ দলকে ভোট দিয়েছে।  আর এসব ম্যানেজমেন্ট কৃতিত্বের মূল সুফলভোগী হল সরাসরি স্বল্প আয়ের মানুষ। এতে আপ দলের মূল ক্ষমতার ভিত্তি হয়েছে এই স্বল্প আয়ের লোকেরা।  নির্বাচনে কেজরিওয়াল নিজের এই সফলতাকেই তুলে ধরেছেন, আর প্রতিদান চেয়েছেন। এমনকি ভোটারদের বলেছেন, আপনি বিজেপি বা কংগ্রেসের সদস্য বা সমর্থক হয়েও থাকেন তবে দল ত্যাগ না করে আমার কাজের প্রতিদান ও আমাকে উৎসাহ দিতে আমার দলকে একটা ভোট দিন। আসলেই তো তিনি ‘স্বল্প আয়ের মানুষের বন্ধু’। না হলে দিল্লির মত ব্যয়বহুল রাজধানী শহরে গরীবদের বসবাস করা আরো কঠিন হয়ে যেত। কাজেই দিল্লির এই বিশেষ গঠন প্রকৃতি – এটা উন্নয়ন বনাম কেন্দ্রের ইস্যু – এই নাম দিয়ে ডাকা ও দেখা সবটা সত্যি নয়। আর এর মানে এই নয় যে, সিএএ-এনআরসি ইস্যু বা কাজ সৃষ্টির ইস্যুতে তাদের কিছু এসে যায় না।

তবে সার কথা হল, দিল্লিই প্রথম কথিত ম্যাজিসিয়ান অমিত শাহ ও তার দলের যে সারা ভারতে “অপরাজেয়” ভাব তৈরি হয়ে গিয়েছিল সেই দর্প এবার চূর্ণ করে দিয়েছে। নিঃসন্দেহে এই ভাঙা আত্মবিশ্বাস কতটা অমিতরা ফেরত আনতে পারেন তা এখন দেখার বিষয়!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে ‘দিল্লিতে পরাজয়ের তাৎপর্য”এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

আসছে, আবার বাবরি মসজিদ!

আসছে, আবার বাবরি মসজিদ!

গৌতম দাস

 ০৪ নভেম্বর ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Mh

SC has asked the special judge conducting the trial to deliver judgement within 9 months ইন্ডিয়া টুডে

ভারতের প্রধান বিচারপতি চলতি মাসে অবসরে যাচ্ছেন। খুব সম্ভবত ১৭ নভেম্বরের মধ্যে। এদিকে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার ইস্যু আমাদের মনে কিছুটা আবছা হয়ে এলেও ইস্যুটা মুছে যায়নি। সেটা আবার উঠে আসতে যাচ্ছে এ মাসেই; কারণ ভাঙ্গা মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ হবে কিনা সে বিষয়ে আদালতের রায় প্রকাশিত হবে। আর তা হওয়ার কথা প্রধান বিচারপতির অবসরে যাবার আগেই।

লাগাতার তিন বছর ধরে নানান তোড়জোড়ের পর আরএসএস-বিজেপি হিন্দুত্বের জিগির তুলে সেই ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। এটা যে  কথিত উগ্র হিন্দুত্ববাদী মানুষ এর পরিকল্পিত দাঙ্গাহাঙ্গামার আয়োজন দিয়ে ভেঙ্গে ফেলা হয়েছিল এনিয়ে এক স্টিং অপারেশন বিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল, ২০১৪ সালে।  আর পাবলিকলি উন্মোচিত বিষয় হয়েই ছিল এটা যে আরএসএস-বিজেপির নানান অঙ্গসংগঠনসহ প্রধানত “বিশ্ব হিন্দু পরিষদের” নেতৃত্বে উন্মাদনার দাঙ্গা বাধিয়ে এই মসজিদ ভেঙে ফেলা হয়েছিল। এক্ষেত্রে, তাদের অভিযোগ বা অজুহাত ছিল যে, এখানে আগে রামমন্দির ছিল, তাই তারা পুনরায় সেই মন্দির স্থাপন করতে চেয়ে মসজিদ ভেঙ্গেছিল।
মসজিদ ভেঙে ফেলার পরে ইস্যুটা এরপরে একপর্যায়ে সুপ্রিম কোর্টে আসে। তবে তা এই বলে যে, ঐ ভাঙা মসজিদের  স্থানে রামমন্দির গড়া আইনানুগ হবে কি না, এরই বিচার হবে আদালতে। কিন্তু দীর্ঘ দিন নানা অছিলায় এটা ঘুরেফিরে বন্ধ থাকার পর এ বছর থেকে শুনানির তারিখ পড়তে শুরু করেছিল।

মসজিদ ভাঙ্গা, আজ প্রায় ২৭ বছর আগের সেই ঘটনা এটা। এ ছাড়া বিজেপি এখন ক্ষমতায়। তাই বুক ফুলিয়েই এখন বিজেপি প্রকাশ্যেই বলছে, হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে সেই উন্মাদনাকে ক্যাশ করে ভোটের বাক্স ভরানোর লক্ষ্যেই তারা বাবরি মসজিদ ভেঙেছিল। এছাড়া তাদের এই হিন্দুত্ববাদের জিগির তোলা, “এর ফায়দা ও মুনাফা নাকি কংগ্রেস” বা অন্য কেউ নিতে পারবে না।

সম্প্রতি এই কথাগুলোই টেনে এনেছেন ‘শেষাদ্রি চারি’[SESHADRI CHARI]।  শেষাদ্রি বিজেপি দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির একজন সদস্য আর, ভারতের ‘দ্য প্রিন্ট’ [The Print] নামে এক অনলাইন পত্রিকায় তিনি, এক মতামত-কলাম লিখেছেন। ‘দ্য প্রিন্ট’ ভারতের ঠিক মেইনস্ট্রিম না হলেও মেইনস্ট্রিম পত্রিকার কিছু সম্পাদক ও সিনিয়রদেরই নিজস্ব এক পত্রিকা, তাই একটু ব্যতিক্রমী ও আমলযোগ্য। কলাম লেখক শেষাদ্রি চারি আবার আরো গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য যে তিনি ‘অরগানাইজার’ [The Organiser] পত্রিকার প্রাক্তন সম্পাদক। কোন ‘অরগানাইজার’ পত্রিকা? এর এত বিখ্যাতিই বা কী? ১৯৪৭ সালের ভারতভাগের কিছুদিন আগে থেকে প্রকাশিত শুরু হওয়া আরএসএস-হিন্দু মহাসভার প্রধান মুখপাত্র ও প্রাচীন দলীয় সংগঠক পত্রিকা এই অরগানাইজার; যেটা, সেই থেকে এখনও প্রকাশিত হয়ে চলেছে।

শেষাদ্রির লেখা সেই কলামের শিরোনাম হল, “বিজেপি জানে – এক ব্যাংক-চেক দু’বার ভাঙানো যায় না, অযোধ্যা এমনই এক ইস্যু [“BJP knows Ayodhya issue is a ‘cheque that cannot be encashed twice” ]।’ বাবরি মসজিদ ভাঙার ইস্যুটা উত্তরপ্রদেশের অযোধ্যায় বলে একে “অযোধ্যা” ইস্যু বা কখনো সেই স্থানে রামমন্দির বানাতে চায় বলে একে “রামমন্দির আন্দোলনের” ইস্যু বলে অনেকে ডাকে। শেষাদ্রির এই লেখায় তিনি সেখানে স্পষ্ট করেই বলেছেন, আজকের (২০১৯) দ্বিতীয়বার বিজয়ী মোদী সরকার পর্যন্ত বিজেপির যে ধারাবাহিক উত্থান, এর শুরুটাই হয়েছিল সেই ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলার লাভালাভ থেকেই। লাভালাভ বুঝাতে তিনি লুকোছাপা না করে পরিস্কার দু’টি শব্দ বা ধারণা ব্যবহার করেছেন – এক. বলেছেন ‘পলিটিক্যাল ডিভিডেন্ট’ [political dividends ] বা রাজনৈতিক লাভের ভাগ-মুনাফা।
এছাড়া দুই. ‘নির্বাচনী ইস্যুতে একে ব্যবহার’ [utility as an electoral issue] অর্থে এই ইস্যুর ব্যবহারযোগ্যতা। অর্থাৎ বাবরি মসজিদ ভেঙে দিয়ে ভারতের জনগণের হিন্দু ধর্মীয় আবেগকে উসকে তুলে সামাজিক বিভক্তি বা হিন্দু-অহিন্দু পোলারাইজেশন করে ফেলা আর এরপর সেই আবেগকে বিজেপির ভোটের বাক্সে ক্যাশ করে নেয়া – এই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। আর এটা ব্যবহার করেই তারা ১৯৯২ সাল থেকে আজ পর্যন্ত বিস্তর লাভ তুলে চলেছে। এ পর্যন্ত ক্ষমতার শিখরে উঠে এসেছে।
মানুষের জীবন চলে যাচ্ছে, গেছে অথচ এরা ডিভিডেন্ট খুজছে এর ভিতরে! ধিক এই রাজনীতি!

“Ayodhya is no longer an issue that can yield political dividends for any party, regardless of whether it opposes or supports the Ram Mandir movement. While the Ram Mandir-Babri Masjid dispute remains an emotive issue, it has outlived its utility as an electoral issue. To borrow a phrase used by a late BJP leader, it is a ‘cheque that cannot be encashed twice’ ”.

গত ১৯৯২ সাল থেকে শুরু করে তিনি পরের প্রতিটি নির্বাচনে ১৯৯৮, ১৯৯৯, ২০০৪, ২০০৯, ২০১৪ ও ২০১৯ এভাবে, বিজেপির নির্বাচনী মেনিফেস্টোতে বারবার বাবরি মসজিদ ইস্যু কিভাবে ছিল – মসজিদ ভাঙা স্থানে সেখানে রামমন্দির নির্মাণ করতে হবে – এই ইস্যু সব সময় কিভাবে হাজির ছিল বর্ণনায় সেটা উল্লেখ করছেন। আবার এটাও বলছেন, কিন্তু বিজেপির সরকার ১৯৯৮ সালের নির্বাচনের সময় থেকে নিজে জবরদস্তি মন্দির নির্মাণ না করে আইনি পথে (মানে আদালতের রায়-নির্দেশে) এর বাস্তবায়নের কথা বলে গেছে মেনিফেস্টোতে। কেন?
শেষাদ্রির ব্যাখ্যা হল, তার লেখার শিরোনামে যা বলা হয়েছে – চেক দু’বার ভাঙানো যায় না। অর্থাৎ বিজেপি মন্দির নির্মাণ ইস্যু থেকে আবার দ্বিতীয়বার অর্থ বা ফয়দা তুলতে পারবে না। যদিও এখন থেকে মন্দির নির্মাণ আসলে সে অবশ্যই করবে – ভুলে আয় নাই যাবে না। তবে ‘আদালতে রায়ে যেভাবে বলবে’ সেভাবে। অর্থাৎ এতে দায় হবে আদালতের। আবার তিনি স্পষ্ট করে দিচ্ছেন, এই মন্দির নির্মাণ ইস্যু থেকে কংগ্রেস চাইলেও বিজেপিকে বাদ দিয়ে ইস্যুটাকে নিজের ভোটবাক্স ভরতে কাজে লাগাতে পারবে না।

কথা ঠিক বটে। কারণ বিজেপি যেমন ন্যাংটা হয়ে হিন্দুত্ববাদের পক্ষে ভারতীয়দের নাগরিক নয়, ‘হিন্দু’ হয়েই ভোট দিতে আহ্বান জানায়, এই সুযোগটা তাদের মত করে কংগ্রেস দলটাও নিতে পারবে না। শুধু তাই নয়। বিজেপির প্রত্যক্ষ ইসলামবিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে ন্যূনতম কোনো সমালোচনা বা বিরোধিতা করে বিরোধী বক্তব্য দেয়ারও মুরোদ নেই কংগ্রেসের; বরং এমন কাজ করলে “হিন্দু পরিচয়ের ভোট” তাতে আরও টান পড়বে; তা আর তার বাক্সে না যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। বাস্তবে এটাই স্পষ্ট ধরা পড়েছিল গত নির্বাচনেও। আর ২০১৬ সালের আসামের রাজ্য নির্বাচন চলাকালীন সময় থেকেই আগেই প্রস্তুতি নেয়া একটা সার্ভ-স্টাডি করা হয়েছিল। সেই রিপোর্টের ফাইন্ডিংসও তাই ছিল। এই কারণে, কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীও গত নির্বাচনে (মে ২০১৯) বিজেপির হিন্দুত্ববাদের ন্যূনতম কোনো সমালোচনা বা বিরোধিতা দূরে থাক নিজেই “আরেক ব্র্যান্ডের হিন্দুত্ব” নিয়ে ভোট চাইতে নেমেছিলেন। আবার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন যে, তাঁর এটা “সফট হিন্দুত্ব”। অর্থাৎ এটাও আর এক ব্র্যান্ডের হিন্দুত্বই। মানে হিন্দুত্বই ভারতের সব রাজনৈতিক দলের বা প্রধান দুই দলের জন্য একমাত্র রাজনীতির বয়ান-কাঠামো।

আবার শেষাদ্রি আর এ্ক ইঙ্গিত দিয়ে বলছেন, রামমন্দির নির্মাণ ইস্যুতে সুপ্রিম কোর্টের আসন্ন রায় কোনো-না-কোনোভাবে, কোনো-না-কোনো শর্তে এক রামমন্দির নির্মাণ করার পক্ষেই যাবে বলে তিনি মনে করেন। সারা ভারতে এখন প্রবল হিন্দুত্বের জোয়ার বইছে, বিশেষ করে কাশ্মীরে ভারতের দখলদার হয়ে ওঠার পর থেকে পরিকল্পিত আবেগ জাগিয়ে মানুষের মাঝে ধ্বংসাত্মক জিগিরে পৌঁছানো হয়েছে। এটাই শেষাদ্রির অনুমান বা পরিস্থিতি নিয়ে রিডিং।

কয়েক বছর ধরে আদালত রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে মামলা ফেলেই রাখা ছিল, শুনানির কোনো তারিখও ফেলা হয় নাই, বলা যায়। মনে হয়েছে ২০১৯ সালের মে মাসের কেন্দ্রীয় নির্বাচন শেষ হওয়ার আগে আদালত কোনো তারিখ ফেলতে চায়নি। তবে মে মাসের পর গত তিন মাসে একনাগাড়ে চল্লিশ কার্যদিবস ধরে শুনানি সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করা ও শুনাশুনির তর্ক চলেছিল। পরে সেসব প্রক্রিয়ার সমাপ্তিও ঘোষণা করা হয়েছে। এখন রায় দেয়ার অপেক্ষায়, তবে তারিখ ঘোষণা হয়নি। কিন্তু প্রধান বিচারপতির অবসরে যাওয়ার আগে শেষ কার্যদিবস ১৭ নভেম্বর বলে সবার অনুমান, এর আগেই রায় ঘোষণা তিনি করে যাবেন।

ভারতে এই রায় বাস্তবে শেষে কী আসে, তাতে ভারতে কী প্রতিক্রিয়া হয়, আর তাতে সীমান্ত ছাপিয়ে বাংলাদেশে কী প্রতিক্রিয়া হয় – এ নিয়ে আমাদের স্থানীয় হিন্দু জনগোষ্ঠীর মধ্যে কানখাড়া উদ্বিগ্নতা আছে। এমনকি ভারতের মিডিয়ায়ও একটা কমন অনুমান আছে যে, রায় যা-ই আসুক অমিত শাহ তা থেকে নির্বাচনী ফয়দা ঘরে তোলার লক্ষ্যে কিছু-না-কিছু পরিকল্পনা করে রেখেছেন বলে তাদের অনুমান।

অন্যদিকে, ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থায় ধস নেমেছে, সে কথা আর ঢাকা থাকছে না। যদিও আমরা সেই ২০১৬ নোট বাতিলের সময় থেকেই এটা শুনে আনছি। কিন্তু পরিসংখ্যান-তথ্য লুকিয়ে রাখা, ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা দেখা, নির্বাচনের পর এসব তথ্য রিলিজ দেয়া বা হিন্দুত্বের নানা রকম জোয়ার তুলে ইত্যাদিতে খবর দাবিয়ে রেখে মোদী এ’পর্যন্ত চলে এসেছেন। তাতে শেষ বিচারে সেই ২০১৬ সাল থেকেই, নির্বাচনে অর্থনৈতিক দুরবস্থার প্রভাব খুব কমই দেখা গেছে। আবার, কোথাও ভোটারেরা স্বীকারও করেছেন যে, অর্থনৈতিক হাল খারাপের খবর তারা জেনেও একে কম গুরুত্ব দিয়েই তারা হিন্দুত্ব-জিগির সংশ্লিষ্ট ইস্যুর প্রভাবে মোদীকেই আবার ভোট দিয়ে ফিরিয়ে এনেছেন। বলাই বাহুল্য, হিন্দুত্ববাদের রঙ এতই গাঢ়। তবু গত মাসে এই প্রথম মহারাষ্ট্র-হরিয়ানা এই দুই রাজ্যের নির্বাচনে সম্ভবত অর্থনৈতিক হাল খারাপের খবর প্রভাব ফেলেছে। বিজেপি সে কারণে ফল খারাপ করেছে বলে মানে করা হচ্ছে। যদিও শতভাগ নিশ্চিত কেউই নয়, কারণ পরবর্তীকালে এর আরও ধারাবাহিক প্রভাব থাকে কিনা দেখতে সবাই অপেক্ষা করতে চাইছে।

সবচেয়ে বড় উলটা কথাটা হল, বিজেপি ছাড়া ভারতের সমাজের রাজনৈতিক-সামাজিক সব শক্তি তবুও হিন্দুত্ববাদের চাপে উল্টো নিজেরাই কোণঠাসা হয়ে আছে। এদিন সহসাই কাটছে কি না, কাটবে কি না বা কবে? কেউ বলতে পারে না। কিন্তু খেয়ে-না-খেয়ে হিন্দুত্ববাদ, হিন্দুইজম বা হিন্দুগিরি এভাবে সারা ভারতের কোনায় ছড়িয়ে পড়ল কেন? এর জবাব কী?

লক্ষণীয় যে ভারতে এমন কোন বিরোধী দল বলে কেউ নেই যে, হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে সরাসরি কিছু বলে বা হিন্দুত্ববাদের বয়ানের পাল্টা কোনো বয়ান হাজির করতে গিয়েছে বা পেরেছে। বরং সবার ভয় ও ধারণা যে, তাতে তাদের আরো ভোট হারানোর সম্ভাবনা। সে কারণে তারা কেউ মুখ খোলে না। হিন্দুত্ববাদের এতই দাপট! তাই আবার সেই প্রশ্ন, ভারতের পরিস্থিতি কেন এমন হল?

এককথায় জবাব, রামমোহন রায় থেকে নেহরু-গান্ধী পর্যন্ত সবাই স্বাধীন ভারত বলতে একটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতই বুঝেছে, আর এরই বাস্তবায়নে কাজ করে গেছে আজীবন, এমন রাষ্ট্রেরই ভিত্তি গড়ে চলেছে। আরো সোজা করে বললে, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের বাইরে কোন স্বাধীন ভারত হতে পারে, এটা তাদের চিন্তা-কল্পনার অতীত ছিল। আর বলা বাহুল্য, এখানে ধর্মীয় বলতে এক হিন্দু জাতীয়তাবাদই তারা বুঝেছিলেন। ভারতের ন্যাশনাল আর্কাইভে গান্ধী রচনাবলী সংকলনে “হিন্দুইজম কী” – এই শিরোনামে আসলে ‘গান্ধীর হিন্দু জাতীয়তাবাদ কী’- এমন লেখাগুলোর একটা আলাদা সঙ্কলন আছে। ভারতে “ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট ইন্ডিয়া” নামে কেন্দ্রীয় সরকারি স্বায়ত্তশাসিত প্রকাশনা সংস্থা আছে। তারা এটা প্রকাশ করেছে। এর আবার অনলাইন পিডিএফ ভার্সনও [What is Hinduism, by MAHATMA GANDHI, First Edition 1994] পাওয়া যায় এই লিঙ্কে। এছাড়া বাংলাদেশের এক প্রকাশনা সংস্থাও এরই এক প্রিন্টেড বই প্রকাশ করেছে (2011) গান্ধীর “হিন্দু ও হিন্দুধর্ম কী” নামে। গান্ধীর রাজনীতি যে গান্ধীর হিন্দুইজম বা হিন্দু জাতীয়তাবাদ – এরই প্রমাণ ছড়িয়ে আছে এসমস্ত লেখাগুলোয়।
অথচ ভাবসাবে সবাই মনে করে, নেহরু-গান্ধীরা এক আধুনিক রিপাবলিক ভারতই গড়ে গিয়েছেন। অথচ কঠিন সত্যিটা হল, এই ভিত্তিহীন ধারণার রিভিউ বা পুনর্পাঠ মূল্যায়ন করে সংশোধন করে নেওয়ার সময় অনেক আগেই পার হয়ে গেছে। যেমন গান্ধীর কোনো নাগরিক ধারণা নেই, পাওয়া যায় না। অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা বা নাগরিকের মানবিক মৌলিক অধিকারের ধারণাও নেই। তবে হিন্দুইজমের ধারণা আছে। এছাড়া কথিত “হিন্দু-মুসলমানের মিলন বা ঐক্য” – কিভাবে হবে এ নিয়ে তার ব্যাপক কথা, চর্চা তৎপরতা বা বাণী আছে।

এখন কথা হল, আপনি গান্ধী যদি “হিন্দু জাতীয়তাবাদই” করবেন তাহলে আবার হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য খুঁজতে যাচ্ছেন কেন? হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যের দূত হওয়ার খায়েশ কেন? আর কেমনেই বা হবেন? কারণ, আপনাকে হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত বানাতে হবে- এই খায়েশেটাই তো সব দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের উৎস! এছাড়া আবার হিন্দু-মুসলমানের দুটা আলাদা ধর্মকে এক বানাবেন? এটা কি আদৌ সম্ভব? আর এর চেয়েও বড় কথা এটা কি আদৌ দরকারি? মানে এসেনশিয়াল? কেন? এটা কেমনে একটা রাষ্ট্র নির্মাণের পূর্বশর্ত হতে পারে? এই ধারণা তিনি কোথায় পেয়েছেন?

অথচ এক ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত হইতে হইবে’- গোঁ-ধরা এই না-বুঝ, অবুঝের চিন্তা- এটাই তো সব সমস্যার গোড়া। আবার দেখেন যারা হিন্দু নয় অথবা যারা হিন্দু হয়েও হিন্দু জাতীয়তাবাদের রাষ্ট্র চায় না তাদেরকে কেন হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত তাদেরও কাম্য বলে মানতে হবে? এর কোন সুযোগ গান্ধী রাখেন নাই! অথচ তিনি নাকি মহাত্মা? ভারতের বিবেক?

আবার আরও কথা হল, গান্ধীর হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত বানালে পরে সেটাকে আরও উগ্র হিটলারি ব্যাখ্যার আর একটা হিন্দু জাতীয়তাবাদ, যেটাই আসলে মোদী-আরএসএসের হিন্দুত্ববাদ সেটাও তো আসবেই। হিন্দুত্বের পোলারাইজেশন বিভক্তি তুলে নিজের ভোটের বাক্স মোদী-অমিতরা তো ভর্তি করতে আসবেই – তাদের ঠেকাবেন কী দিয়ে? গান্ধী নিজের জীবদ্দশাতেই তিনি হিন্দু মহাসভা-আরএসএস এদেরকে  ঠেকাতে পারেননি। ব্যর্থ হয়ে এদের হাতেই তিনি গুলি খেয়ে মরেছেন।

আরএসএস সংগঠন (১৯২৫) জন্মের পর থেকে এ’পর্যন্ত চারবার নিষিদ্ধ হয়েছিল। এর দ্বিতীয়বারেরটা হয়েছিল নাথুরাম গডসের হাতে গান্ধীর গুলিতে মৃত্যুর (৩০ জানু ১৯৪৮) পরবর্তীকালে বা পরিণতিতে। আর সর্বশেষ নিষিদ্ধ হয়েছিল ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ভাঙার সংশ্লিষ্টতায়। আর এখন সেই আরএসএস আবার খুব সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে ভাইব্রেন্ট তৎপর সংগঠন। আর ভারতের রাজনীতির অবস্থা পরিস্থিতি হল, হিন্দুত্বের জোয়ার উচ্ছ্বাস উন্মাদনার সামনে সেই গান্ধীর কংগ্রেস বা নেতা রাহুল গান্ধী কোণঠাসা- তারা বিজেপির হিন্দুত্ববাদের কোন সমালোচনাই করতে পারে না, অক্ষম। উল্টো নিজেরাই নিজেদের তৎপরতাকে “সফট হিন্দুত্ববাদ” বলে ডাকে, মেনে নিয়েছে! এই হল গান্ধী ও তাঁর হিন্দুইজমের পরিণতি!

তবু সেই নেহরু-গান্ধীরাই সৌভাগ্যবান। কারণ, হিন্দু জাতীয়তাবাদী হওয়ার পরও তারাই কমিউনিস্ট প্রগতিবাদী চোখে প্রগতিশীলতার প্রতীক। আর দোষী হলো জিন্নাহ ও পাকিস্তান। জিন্নাহ-রাই নাকি ধর্মের ভিত্তিতে পাকিস্তান বানিয়েছে, দেশভাগ করেছে।

আচ্ছা, গান্ধী যদি হিন্দু জাতীয়তাবাদের ভারত বানাতে চান তাহলে এই কাজ ও ততপরতা – এটাই কী জিন্নাহ ও পাকিস্তানকে মুসলিম জাতীয়তাবাদ করার দিকে ঠেলে দেয়া, নয়? গান্ধীরা যদি হিন্দু জাতীয়তাবাদ করতে চলে যায় তাহলে তা জিন্নাদের মুসলিম জাতীয়তাবাদ করার দিকে বাধ্য করে ঠেলে দেওয়াই। অথচ তা থেকেই কেবল জিন্নাহরাই ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার অপরাধে অপরাধী ! তাহলে ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গড়ার কাজ কারা শুরু করেছিল – তা বুঝাবুঝি ঢাকনা খুলতে কেউ আগ্রহি বা রাজী না। বুঝাই যাচ্ছে এই প্রগতিবাদীরা গান্ধী সম্পর্কে কিছুই পড়ে দেখেনি। এটা তাদের গভীর মুসলমান অন্ধবিদ্বেষ ও বিপরীতে হিন্দু জাতীয়তাবাদ প্রীতি। তবে মূল সমস্যা সম্ভবত এখানে যে, রাষ্ট্র চিনতে বুঝতে হয় কিভাবে এটাই তাদের কখনো জানাই হল না!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা এর আগে গত  ০২ নভেম্বর ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরদিন প্রিন্টে আবার বাবরি মসজিদ!এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]