ভারতের বাংলাদেশে ‘সৈন্য পাঠানো’ শখ

ভারতের বাংলাদেশে ‘ সৈন্য পাঠানো’ শখ

গৌতম দাস

২৭ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Yj

 

গত ২১ এপ্রিল ভারতের অনেক  প্রিন্টেড মিডিয়া তাদের সরকারি বার্তা সংস্থা পিটিআই এর বরাতে একটা রিপোর্ট ছাপায় যে ভারতের সেনাবাহিনী বাংলাদেশে আসার পরিকল্পনা করছে। পরে তৃতীয় দিনে ২৩ এপ্রিল শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকদের কাছে সেখানকার ভারতীয় হাইকমিশন জানায় যে এই খবরটা মিথ্যা (This claim is false )।

পিটিআই এর এটাকে বলে স্রেফ ইতরামো – মোদী সরকার, তার সরকারী বার্তা সংস্থা আর তার গোয়েন্দা বিভাগের সবচেয়ে দায়ীত্বজ্ঞানহীন ও নিচু একটা কাজ তারা করেছে।  দেখা যাচ্ছে ভারতের সবচেয়ে বড় সরকারি বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই), এরা বাংলাদেশবিরোধী প্রপাগান্ডায় নেমেছে, বাংলাদেশে কথিত ভারতীয় সেনা পাঠানোর প্রপাগান্ডায় নেমে এনিয়ে বানানো খবর ছেপে দিয়েছে। যাতে বাংলাদেশকে নিচা দেখানে যায় আর তাতে তাদের দেশ ও দেশপ্রেমের ভারতকে যেন দেখানো যায় অনেক উপরে।  বাংলাদেশকে মোদীর অধীনস্ত করে দেখালে তাতে নরেন্দ্র মোদী ভারতকে অনেক উপরে উঠায়ছেন দেখান যাবে এই হল তাদের বিশ্বাস। তাই, প্রচারিত সেই খবরটা হল ভারত নাকি “বাংলাদেশে আর্মি পাঠাচ্ছে” [Indian Army to send teams to Sri Lanka, Bangladesh, Bhutan & Afghanistan to fight Covid-19]। আর এই মিথ্যা খবরটা ছড়িয়েছে সরকারি সংস্থা পিটিআই।

এই খবরের ভাষ্যে ভাবটা এমন যেন ভারত যেন তার পড়শি ‘কলোনিগুলোকে’ দেখভাল ও  রক্ষার্থে এসব দেশে সৈন্য পাঠাচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপারটা হল প্রপাগান্ডা। কিন্তু এই পিটিআই কী জানে না কোনটা নিউজ আর কোনটা ভিত্তিহীন প্রপাগান্ডা? এটা অবিশ্বাস্য তাই, একেবারেই অগ্রহণযোগ্য। বিশেষত করে ভারতে প্রায়ই সে দেশের গোয়েন্দা বিভাগের কাছে “পেজ-বিক্রি” করা খবর ছাপা হয়, এটা যদি মনে রাখি। অনেকের মতে, ভারতে মিডিয়ায় এখন একটা রেওয়াজ হয়ে গেছে, কোনো পত্রিকার ফাইন্যান্সিয়াল অবস্থা যত খারাপ গোয়েন্দা বিভাগের কাছে সে তত বেশিবার নিজেকে বিলিয়ে দিবে, ‘পেজ বিক্রি’ করে অর্থ বা সুবিধা সংগ্রহ করবে।  আর সেক্ষেত্রে বিনিময়ে গোয়েন্দা বিভাগ যেভাবে যা খুশি ছাপতে চায়, সেভাবে তা যেন ছাপাতে পারে। কিন্তু সাংবাদিকতার নামে এই ইতরামো করে চলতে প্রায়ই দেখি আমরা। আর ভারতের গোয়েন্দাবিভাগকেও এদের এই দুরবস্থার সুযোগের সদব্যবহার করতে প্রায়ই দেখা যায়। গোয়েন্দাবিভাগেরও হাতেও মিডিয়া-বাজেট মানে মিডিয়াকে প্রভাবিত করার বাজেট থাকে সেটাই এখানে ব্যবহৃত হয়। ছপ্পড় ফেরে এই বাজেটের লোভ লাগিয়ে দেয়া হয়। ভারতে প্রধানধারার বাইরের অনেক ইন্ডেপেন্ডেন্ট মিডিয়া দাঁড় করার উদ্যোগ আছে, যেমন থাকে সবদেশেই.  যেমন, WIRE, SCROLL, CARAVAN ইত্যাদি। কিন্তু অনেককে দেখি হঠাত করে একটা ‘খেপ’ মেরে বসেছে। যেমন ২০১৪ সালে অমিত শাহের মমতার বিরুদ্ধে জঙ্গি প্রপাগান্ডা ও আক্রমণ। দাবি পশ্চিমবঙ্গের “বর্ধমানে জেএমবি বোমা হামলা ঘটনা” পাওয়া গেছে। আর এতে তখনও কিছু মিডিয়া পয়সা কামিয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তারপর দেখা গেলে মোদীর অফিসের প্রতিমন্ত্রী জীতেন্দ্র সিং ‘এসব কিছু না’ বলে হঠাত ঘটনায় ঠান্ডাপানি ঢেলে দিয়েছিলেন। এটাই  ভারতের দুস্থ মিডিয়ার এই সাধারণ ঝোঁক যেটা সব সময় দেখা যায়।

আলোচ্য ঘটনাটা আরো অনেক বড় গুরুত্বের এজন্য যে, দেখা যাচ্ছে এবার সরকারি পিটিআই নিজেও এই বানোয়াট খবরের ব্যবসায় এসে গিয়েছে অথচ, পিটিআই ভারতের সরকারি বার্তা সংস্থা। শুধু তাই না আরও দিক আছে।  যেমন একটা বার্তা সংস্থা বানোয়াট প্রপাগান্ডার কনট্যাক্ট নিউজ বা চুক্তিতে ছাপানো খবর ডেস্কে রাখলেই তা ঐ সংস্থার সব “প্রাহক মিডিয়া” যেমন ধরা যাক ওয়েব পত্রিকা “দ্যাপ্রিন্ট” – তাকেও নিউজটা  গ্রহণ ও নিজ পত্রিকায় তা ছাপাতেই হবে ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয়। উলটা এমনকি “দ্যাপ্রিন্ট” চাইলে এর পালটা নিজস্ব ইনভেস্টিগেটিভ রহস্যভেদী কোন রিপোর্টও ছাপতে পারে। কিন্তু ঘটেছে উলটা। দাপ্রিন্ট প্রপাগান্ডা খবরটা যত্ন করে ছাপিয়েছে।

তাহলে শেখর গুপ্তা যিনি এতই  বর্ষীয়ান সম্পাদক, ভারতের অনেক কয়টা প্রধান দৈনিকের প্রাক্তন সম্পাদক  ও তাঁর ইন্ডেপেন্ডন্ট মিডিয়ার বড়াই – বর্তমানে “দ্যাপ্রিন্ট” এর চেয়ারম্যান ও প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্তা, তাঁর এত বড় বড় কথা বলে লাভ হল কী?   সেই “দ্যাপ্রিন্ট”-ও পিটিআইয়ের প্রপাগান্ডা নিউজটা ছেপেছে  এবং সবার চেয়ে হুবহু বেশি আর নিষ্ঠার সাথে।  তাকেও কী দিয়ে ব্যাখ্যা করব? শেখর গুপ্তের নিজের পত্রিকা ‘দ্য প্রিন্ট’- তারও এই দশা কেন? এমনকি এই নিউজ প্রসঙ্গে ‘দ্য প্রিন্ট’-এর চেয়ে ‘দ্য হিন্দুর’ প্রেজেন্টেশন অনেক শোভন। কিন্তু ‘দ্য প্রিন্ট’ পড়ে মনে হয় পিটিআইয়ের ভাষ্যটা হুবহু না তুলে  লিখলে যেন ‘দ্যাপ্রিন্ট’ পেমেন্ট কম পাবে, এই ভয়ে আছে। তাই আলোচ্য কেসটা আসলেই আরো বড়। আচ্ছা, ভারতীয় হাইকমিশন এখন  জানিয়ে দিছেন যে পিটিআইয়ের এই  খবরটা মিথ্যা – “This claim is false. There is no decision to send the Indian army …,”।  – এখন মিডিয়ার স্বাধীনতা ইনডিপেন্ডেন্টস নিয়ে মুখের ফেনা তোলা শেখর গুপ্তারা কী বলবেন? কী বা কোন “দেশপ্রেমের” আড়ালে নিজেকে  লুকাবেন? বলবেন যে “ভারতীয় হিন্দুজাতির স্বার্থে রাষ্ট্রের দেশপ্রেমে এক মিথ্যা প্রপাগান্ডা হলেও সরকারের পক্ষে থাকতে হয়েছিল! হায় রে দুস্থ হাভাতে হতভাগার দেশপ্রেম!

বাংলাদেশের মিডিয়া নিয়ে ওয়াকেবহাল যারা পিটিআইয়ের বানোয়াট কারবারটা দেখেছেন ভারতের বার্তা সংস্থা পিটিআইকে বুঝতে  তাদের বাড়তি কিছু মনোযোগ দিতে হতে পারে।  আমাদের বার্তা সংস্থা বাসস বা ইউএনবিকে দিয়ে ভারতের পিটিআই এর ধারণা নেয়া যাবে না। কারণ এদের তুলনায় পিটিআই মহীরূহ প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও, ভারতের মিডিয়া ব্যবসায় খবর সংগ্রহের খরচ কমানোর জন্য এত বড় ভারতজুড়ে নেটওয়ার্ক ছড়ানো আছে একমাত্র পিটিআই এর। এ কারণে ভারতের সব রাজ্যের সব পত্রিকার প্রধান ও প্রায় একমাত্র খবরের উৎস এই প্রতিষ্ঠান। এর বিপরীতে বাংলাদেশের মিডিয়া জগতে  কোন বার্তা সংস্থার ভূমিকা অনেক কম। কারণ আমাদের এখানে বাংলাদেশের প্রতিটা মিডিয়া হাউজেরই সবার মূলত নিজস্ব আলাদা  রিপোর্টার স্টাফ সেট থাকে। তবে তাদের সংগৃহীত খবরের খুব ছোট একটা অংশ তারা সরকারি-বেসরকারি বার্তা সংস্থা থেকেও নিয়ে থাকেন। প্রত্যেকেরই নিজস্ব বিটের সাংবাদিক আছে।  অর্থাৎ সরকথায় ভারতের নিউজ মিডিয়া জগতে বার্তা সংস্থা হিসাবে পিটিআই-এর ভুমিকা অনেক বড় প্রভাবের।

নিউজমিডিয়ায় বার্তা সংস্থার খবর ছাড়া আর এক ধরনের ‘উৎস’ থাকতে দেখা যায় – যেমন ‘আমাদের “নিজস্ব সোর্স” বা সূত্র বলেছে’। যদিও কখনওবা কথিত ‘সোর্স’ অথবা ‘সূত্র মোতাবেক’ এর কথা বলে আড়ালে গুজব বা প্রপাগান্ডাও চালিয়ে দেয়া হয়। ভারতে পেজ বিক্রি এভাবেই হয়ে থাকে। তবে “নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক” বা ‘প্রত্যক্ষদর্শী’ সোর্স-এগুলো বিশ্বাসযোগ্যও হয় অনেকসময়। তবে পিটিআইয়ের ‘আমার সোর্স বলছে’ বা ‘সূত্র মোতাবেক’ বলে এমন উৎসের খবর ছাপানোর সুযোগ কম। মূল কারণ এটা সরকারি তো বটেই; এছাড়া একটা বার্তা সংস্থা সাধারণত ‘সূত্র-খবরের’ উপরে কাজ করে না। এছাড়া ‘সূত্র-খবরের’ ধরনের কাজগুলো মূলত ব্যক্তি বা গ্রুপ মালিকের পত্রিকাগুলোর জন্যই যেন মূলত বরাদ্দ। এই সূত্রে আমরা কোনো কোনো দেশের গোয়েন্দা বিভাগকে সে দেশের কম-প্রচারিত পত্রিকাগুলোর সাথেই মূলত সরাসরি ‘কেনাবেচা’ করতে দেখি।

এসব বিচারে ‘ভুয়া সোর্সের নামে’ পিটিআই ভারতে ‘পেজ বিক্রি’ করেছে- এমন আগে দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এগুলো প্রাইভেট মিডিয়া আউটলেট এরাই মূলত করে থাকে। কিন্তু এবারই প্রথম আমরা দেখলাম সরকারি পিটিআই এমন প্রপাগান্ডায় লিপ্ত হয়েছে।

ঐ রিপোর্টে বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও আফগানিস্তান এই চারটা দেশের নাম উল্লেখ করে দাবি করা হয়েছে- ভারতীয় সৈন্য এসব দেশে আলাদা আলাদা গ্রুপে পাঠাতে প্রস্তুত করা হচ্ছে [The sources said the teams for Sri Lanka, Bangladesh, Bhutan and Afghanistan are being readied ]। আর তাতেই চার দেশের মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম- এই প্রপাগান্ডা খবর অস্বীকার করেছে [Dhaka needs no Indian army ……] দৈনিক নিউ এজ -কে  বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে এ মোমেন। এর পরে তা করেছেন আরেকটু পরিষ্কার ও কঠোরভাবে শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা সচিব অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল কমল গুণরত্নে [No need of military assistance from other countries… ]। শ্রীলঙ্কার বক্তব্য বেশি ক্যাটাগরিক্যাল এবং বোল্ড। তিনি বলেছেন, “সৈন্য পাঠানো প্রসঙ্গে দু’রাষ্ট্রে আমাদের মধ্যে কোনো ডায়লগও হয়নি” [there was no such dialogue that had taken place between two nations.]। অর্থাৎ তিনি বুদ্ধিমানের মত প্রকারন্তরে যেন মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, শ্রীলঙ্কা সার্বভৌম দেশ। ফলে কোন ডায়লগ ছাড়া আমি রাজি না হলে আপনি মোদী আমার দেশে সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আপনি কে? মনে হচ্ছে আমাদের অবশ্য এত সাহস হয় নাই।  মানে শ্রীলঙ্কা তার প্রতিক্রিয়া অন্যদের চেয়ে আরেকটু কড়া বা জোরদার করতে পেরেছিল বলা যায়। কারণ শ্রীলঙ্কার অন্তত দু’টি মিডিয়া এখবরের সত্যতা নিয়ে কলম্বোর স্থানীয় ভারতীয় হাইকমিশনের কাছে প্রশ্ন করলে (যেমন, শ্রীলঙ্কার ‘ডেইলি মিরর’ পত্রিকাকে)  ভারত জানিয়েছে এমন ‘খবর মিথ্যা’ (“This claim is false. ) বলে খবরটাকে অস্বীকার করেছে।

এখন এখানে এক মজার তামাশা দাঁড়িয়ে গেছে। এর অর্থ হল, ভারত সরকারের একটি অফিস আরেকটি অফিসের দাবিকে ‘মিথ্যা বলছে’, অস্বীকার করছে। শ্রীলঙ্কার ভারতীয় হাইকমিশন মানে হল ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের অংশ প্রতিষ্ঠান। কাজেই তাদের বক্তব্য ওজনদার। কাজেই এখন এর একমাত্র ফয়সালা প্রধানমন্ত্রী মোদীই করতে পারবে সম্ভবত!
এর মানে হল, পিটিআইয়ের ইজ্জত-লজ্জা কিছু থাকলে তাদেরই এখন ‘ঝুলে পড়া উচিত’। কারণ শ্রীলঙ্কার ভারতীয় হাইকমিশনই বলেছে তারা মিথ্যা বলেছে। অথচ পিটিআইয়ের দাবি এমন খবর নাকি “বিশেষ সূত্রের খবর”। এই বিশেষ সুত্র এরা তাহলে এখন কোথায়? তাহলে এমন ঘটনা ঘটে গেল কী করে? সবচেয়ে তামাসাটা হল এমন নিউজ প্রকাশের জন্য পিটিআই কোন জবাবদীহি করেছে আমরা এখনও শুনি নাই।  সরকার বা পিটিআই কাউকে ‘সরি’ বলে নাই।
এর মানে প্রমাণ হল  পিটিআই-এর এডিটরের পক্ষে দিল্লির কোন একটা প্রত্যন্ত গ্রামে বসেও কোন টংয়ের দোকান চালানোর যোগ্যতাও তাঁর নাই।  মোদীকে কাপড় পড়ায়ে ঢাকতে গিয়ে পিটিআই-এডিটর নিজেই ন্যাংটা হয়ে গেছেন!  অবস্থা এখন এমন  কোন ভারতীয় হাইকমিশন মানে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় বলছে,  পিটিআই-এডিটর এক ভুয়া নিউজ করেছে। এর চেয়ে অপমানজনক মন্তব্য পিটিআই-এডিটর এর জন্য আর কী হতে পারে?

তাহলে এমন ঘটনা ঘটে গেল কী করে?
খুব সম্ভবত এটা নেপথ্যে প্রধানমন্ত্রী মোদী আর বিজেপির ইমেজ বাড়ানোর কোনো অ্যাসাইনমেন্ট ছিল। আর এদিকে একাজ করে দিয়ে অর্থ বা পদ-পদবির লোভ ভারতের কিছু সরকারি কর্মচারী সামলাতে পারেননি, এরা তাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। আর ব্যাপারটাকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য হয়ত (মোদী সরকারের বিশেষ স্বার্থ বা দেশপ্রেম বলে ভুয়া কথার আড়ালে) গোয়েন্দা বিভাগ আর পিটিআইকে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছিল। যার মূল ভাষ্যটা হল- এটা দেখানো যে এই মোদী সরকার এতই উঁচুতে ভারতকে নিয়ে গেছে যে, পড়শি চার-চারটা রাষ্ট্রকে এখন মোদী পকেটে রেখে চালায়। আর প্রধানমন্ত্রী মোদীকে সেগুলো দেখভাল আর ঠিকঠাক করে রাখতে হয়”। এই ভাষ্যটা যেন বলতে চাইছে, ওসব দেশে সরকার বা প্রধানমন্ত্রী এক আধজন থাকে বটে তবে মোদীই সেগুলোকে মূলত চালায়ে থাকেন। – মোটামুটি এটাই সম্ভবত ছিল গগন-ফাটানো “মোদীগল্প”। আর এদিকে আমরা হয়েছি যেন মোদীগল্প বাস্তবায়ন করে দেয়ার চাকর-বাকর; কিন্তু তাতে আমরা অস্বস্তিহীন হয়ে গেলাম কিনা সে খবর নাই। “ভারতের ব্যগেজ” বইতে বইতে আমাদের মান-ইজ্জত বলে আর কিছু নাই। থ্যাঙ্কস টু শ্রীলঙ্কান জার্নালিস্ট!

পিটিআইয়ের ঐ প্রপাগান্ডা রিপোর্টে একটা বাক্য ছিল যে অংশটা কোনো পত্রিকা কপি করতে  বাদ দেয়নি। বাক্যটা হল, “সার্ক রিজিয়নে করোনা মহামারী ঠেকানোর জন্য একটা কমন ফ্রেমওয়ার্ক গড়ার কেন্দ্রীয় ভূমিকায় এগিয়ে রয়েছে ভারত  [New Delhi has also been playing a key role in pushing for a common framework in dealing with the crisis.]”। কিন্তু মোদীকে এই – “প্লেয়িং কী রোল” –  করতে তারে কে এত ডাকতেছে?
আচ্ছা মোদীর সাথে আমাদের প্রধানমন্ত্রী  সার্কের করোনা বৈঠক করতে গেছিলেন কেন? এই কী রোল দেওয়ার জন্য নয় তো? চাঁদাই বা দিয়েছিলেন কেন? মোদীকে প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করতে দেয়া- ‘প্লেয়িং কী রোল’ করার জন্য নয় নিশ্চয়? কিন্তু এতে খুশি হয়ে তিনি যখন খুশি তখন, কোন আলাপ আলোচনা ছাড়াই কিছু দেশে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দিতে পারেন? তাই কী? সত্যি অবিশ্বাস্য! অথচ ‘সার্বভৌমত্ব’ বলে একটা শব্দ আছে! মনে হয় না ভারতের কেউ শব্দটা শুনেছে!

এখানে আলোচ্য পিটিআইয়ের ঐ মিথ্যা রিপোর্টের কিছু অসংলগ্ন বৈশিষ্ট্য লক্ষ করা যাকঃ
একঃ  পিটিআইয়ের ওই রিপোর্টে মাত্র চারটি দেশের নাম আছে। কিন্তু পাকিস্তান বা নেপালের নাম নেই কেন?  ভারত বা মোদীর কী নাম নিতে ভয় লেগেছে! না কোনো ‘ঝাপ্টা’ খাওয়ার সম্ভাবনা ছিল? সার্কের সদস্য তো অন্তত সাত রাষ্ট্র।

দুইঃ ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘মোদি সরকারের বন্ধুত্ব-সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করে মহামারী সামলাতে ৫৫টা দেশে অ্যান্টি-ম্যালেরিয়ার ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন পাঠানো হয়েছে, আর তা আমেরিকাতেও” [As part of its policy to help friendly countries to deal with the pandemic, India is also supplying anti-malarial drug hydroxychloroquine to 55 countries] । কিন্তু ঘটনা হল, এই তথ্য অর্ধসত্য অথবা কোথাওবা পুরাটাই অসত্য। যেমন, এই ওষুধ ভারতের প্রয়োজনের তুলনায় দশ গুণ উৎপাদিন হওয়া সত্ত্বেও গত সপ্তাহে ভারত থেকে তা রফতানি নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছিল। গোঁফে তা দিয়ে যেন দাম বাড়াবার আনন্দ উপভোগ করতে চায় ভারত। কিন্তু পরে ট্রাম্পের হুমকি-ধমক খেয়ে তৎক্ষণাৎ সব রফতানি বাধা খুলে দিয়েছিল মোদী সরকার। শুধু তাই নয়। এরপর থেকে মোদি দাবি করছেন, এখন তিনি উদার হয়ে গেছেন, ৫৫টি দেশে ভারতীয় ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন  পাঠাবেন।

তিনঃ কিন্তু সবচেয়ে ভয়াবহ সত্য ও তথ্য হল, হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন করোনাভাইরাস নিরাময়ের কোন ওষুধই নয়। এটা মূলত ম্যালেরিয়া তাড়ানোর ওষুধ। অথচ ভারত সরকার গত দুই সপ্তাহের বেশি ধরে এমন ভাব আনছে যেন ক্লোরোকুইনই করোনাভাইরাসের ওষুধ এবং ভারতই এই মহা-ওষুধের আবিষ্কারক, অথবা যেন এবারই এটা প্রথম আবিষ্কার হল। অথচ এই কথাগুলোর কোনটাই সত্য নয়। অনেক আগেই এই ওষুধ আবিষ্কৃত আর ভারতের ম্যালেরিয়া রোগীর জন্য তাদের নিজেদেরই এটা অনেক লাগে, তাই অনেক প্রস্তুত করা হয়ে থাকে। কিন্তু তবু এটা আগে বা কখনো করোনার ওষুধ হিসেবে অনুমোদিতই নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO  বা হু) ’র কাছেও অনুমোদিত নয়।

চারঃ ঐ একই রিপোর্টের পরের বাক্যও অসত্য।
যেমন পরের বাক্যে রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন অ্যামেরিকান ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশনের দ্বারা করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ট্রিটমেন্ট বলে চিহ্নিত করা হয়েছে…”। এটা শতভাগ মিথ্যা তথ্য – [ Hydroxychloroquine has been identified by the US Food and Drug Administration as a possible treatment for COVID-19] ।

মজার কথা হল, মিথ্যা করে হলেও ২১ এপ্রিলের এই রিপোর্টেই প্রথম অ্যামেরিকায় যে ফুড অ্যান্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) বলে ওষুধের অনুমোদনদাতা বা অথরিটি প্রতিষ্ঠান বলে কেউ আছে, তা নিয়ে প্রথম ভারতের মিডিয়ায় কোন স্বীকারোক্তি পাওয়া গেল। কারণ, গত দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভারতের প্রতিটি দৈনিকসহ মিডিয়ায় ম্যালেরিয়ার ওষুধ ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন নিয়ে তুঙ্গে তুলে আলাপ করা হচ্ছিল এভাবে যে ১. ভারতেই করোনার ওষুধ পাওয়া গেছে। ২. তা ভারতের হাতেই আছে। ৩. তা বিশাল ‘গেম চেঞ্জার’, ‘ভারত খেলা বদলে দিতে পারে’ ইত্যাদি। কিন্তু এসবের বাইরে আসল কথাটা যে এই ওষুধের এফডিএ অনুমোদন নাই – এটা কোন মিডিয়ায় উল্লেখ করা হচ্ছিল না। অর্থাৎ প্রমাণিত কার্যকারিতার প্রমাণ  বা অনুমোদনই নেই এবং কার্যকারিতা প্রমাণিত নয় – এ দিকটা ভারতের সব মিডিয়া চেপে চলেছিল।

কেন?
প্রথমত এর জন্য মূলত দায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। আর সেই আড়ালে লুকাতে চেয়েছে ভারতের ব্যবসায়ী-মহলসহ ক্ষমতাসীন মোদীর দলবল। তাই তারা এই ওষুধ একবার ব্যবহারে শুরু হয়ে গেলে তারা সবাই কত বিলিয়ন ডলারের মুনাফায় লালে লাল হয়ে যাচ্ছে- এই লোভে মশগুল ছিল।  ট্রাম্পের ঘনিস্ট বন্ধুরা এবং তিনি নিজেও এই ওষুধের প্রস্তুতকারি কোম্পানির SONAFI এর কিছু শেয়ারের মালিক বলে, ট্রাম্প এই ওষুধের পক্ষে একটা প্রপাগান্ডা বলয় গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন।

সবচেয়ে বড় কথা –  শুরু থেকেই প্রমাণিত যে, এই ম্যালেরিয়ার ওষুধ হার্টের রোগীর জন্য  নিষিদ্ধ ও ব্যবহার মারাত্মক হতে পারে। বিশেষত অসংলগ্ন অস্থির হার্টবিটের চাপের মুখে রোগী পড়ে যেতে পারেন। অথচ তা ভারতের কেউ বলছেন না। তবে ট্রাম্প এই ওষুধের গ্লোবাল কোম্পানি সানোফির শেয়ারের মালিক বলে তিনিও এটাকে ‘প্রমাণিত’ ওষুধ বলে চালিয়ে দিয়ে চান। এফডিএ-এর ওপর তিনি চাপ দিয়ে যতটুকু করতে পেরেছেন, তা সত্ত্বেও এখনো ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’কে  এফডিএ এখনও করোনার ওষুধ হিসেবে অনুমোদন দেয়া হয়নি। তবু এটা বাজারে পাওয়া যায়। তবে সেটা ম্যালেরিয়ার ওষুধ হিসেবে। কোনো ডাক্তার এই ওষুধকে কেবল ‘অফ ড্রাগ’ হিসেবে ব্যবস্থা দিতে পারেন শর্তসাপেক্ষে। সেটা কেবল মরণাপন্ন করোনা রোগীর ক্ষেত্রেই। তবে রোগীকে জানিয়ে ব্যাখ্যা করে ‘সজ্ঞান-সম্মতি’ লিখিতভাবে নিয়ে, রোগী যদি রিস্ক নিতে রাজি থাকেন কেবল এমন বিশেষ পরিবেশে ও শর্তে তা সম্ভব বলে ডাক্তার ব্যবস্থাপত্র দিতে পারে। এটাও ট্রাম্প করেছেন এফডিএ’র কমিশনারের ওপর চাপ সৃষ্ট করে। এই প্রসঙ্গে বিস্তারিত গত সংখ্যায় লিখেছিলাম।

সবচেয়ে বড় কথা মাত্র গত ২৩ এপ্রিল ভারতের প্রথম যে পত্রিকা ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন ওষুধের অনুমোদনহীনতার কথা ভারতে প্রকাশ করে দিয়েছে –   মিথ্যা লোভ ভেঙেছে ও রিপোর্ট করে দিয়েছে- সেটা কলকাতার ইংরেজি ‘টেলিগ্রাফ’। এর রিপোর্টের বাংলা শিরোনাম- ‘লোভ-লালসার ড্রাগ থেকে সাবধান হয়ে যান’ (ওয়ার্নিং অন কাভেটেড ড্রাগ, Warning on coveted drug)।  এতে যে খবরটা আগেও সত্য ছিল তা ভারতের ভিতরেই আরও মেলে তুলে ধরেছিল কলকাতা টেলিগ্রাফ।  ঐ রিপোর্ট আমেরিকার ভার্জিনিয়া স্কুল অব মেডিসিনের স্টাডি-গবেষণার ফলাফলের রেফারেন্স উল্লেখ করে বলছে, ‘এজিথ্রোমাইসিন নামে অন্য ওষুধের সাথে অথবা একা –  ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’ এই ম্যালেরিয়া ওষুধের করোনাভাইরাসের নিরাময়ে কার্যকারিতার কোনো প্রমাণ নেই” [……had found no evidence that hydroxychloroquine (HCQ), used with or without the antibiotic azithromycin, reduced mortality or the need for ventilation in hospitalised Covid-19 patients.]।

কিন্তু তবু আজ ২৬ এপ্রিল ভারত নিজেদের তৈরি ওষুধ হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন যা আসলে করোনার জন্য অনুমোদনহীন, আ বাংলাদেশকে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তাহলে ৫৫টা দেশে ভারতের অকার্যকর ‘হাইড্রক্সি-ক্লোরোকুইন’ এই ম্যালেরিয়া ওষুধকে পাঠাবার মোদীর উদ্দেশ্য তাহলে কী?  এই প্রশ্ন থেকেই যায়। অকার্যকর ওষুধ পাঠিয়ে বাজার ধরা? মোদী তো দেখা যাচ্ছে একদম ট্রাম্পের পারফেক্ট শিষ্য!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ২৫ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও  পরেরদিন প্রিন্টে  আর প্রসঙ্গ : বাংলাদেশে ‘ সৈন্য পাঠানো’ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

করোনায় সরকারি প্রণোদনা কাকে দিবেন

করোনায় সরকারি প্রণোদনা কাকে দিবেন

গৌতম দাস

১৩ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2WY

 

  Image MSN.COM,করোনায় প্রণোদনা কাকে দেবেন

করোনাভাইরাস মহামারী নিয়ে দুনিয়াজুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েই চলছে। গত শুক্রবার সারা দুনিয়ায় মোট মৃত্যু এক লাখ ছাড়িয়েছে। এদিকে বাংলাদেশেও করোনাবিষয়ক খবরে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ হয়ে উঠেছে “লকডাউন”। শব্দটা একটা গোটা জেলাশহর তো বটেই, আবার একটা পাড়া বুঝাতেও সময়ে ব্যবহার করা হচ্ছে।

কিন্তু লকডাউন শব্দটার অর্থ একটা নয়, দুটা। বলা সম্ভবত ভাল যে এটা যুগ্ম অর্থের শব্দ। এমনকি এমন এক দ্বৈত বা যুগ্ম অর্থের শব্দ যেটা সাধারণত দেখা যায় যে, এসব শব্দ একটা অর্থে ব্যবহৃত হলে শব্দের অন্য অর্থটা সেখানে আর হাজির থাকে না। কিন্তু লকডাউন শব্দটার দুই-অর্থই সবখানে বজায় থেকে চলে। লকডাউন কথার মূল অর্থ কোন এলাকা যেটা একটা দেশ বা জেলা বা পাড়াও হতে পারে, সেই এলাকাকে ওর সব পড়শি সব এলাকা থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করা। আমরা শব্দটা তাই ব্যবহার করছি স্বাস্থ্য সুরক্ষার্থে বিচ্ছিন্ন করা অর্থে যেমন, ল্যাবে কোন পরীক্ষিত ফলাফলে মানে, প্রমাণিত কোনো ভাইরাস সংক্রমণের কেস হলে, এটা এরপর যাতে সেই পরিবার-সমাজে আর না ছড়িয়ে পড়ে তাতে বাধা দেয়ার জন্য,রোগীকে বিচ্ছিন্ন করা অর্থে আমরা বলি, লকডাউন করা হয়েছে।

লকডাউনের দ্বিতীয় অর্থ হল, অর্থনৈতিক অর্থে যেখানে এতে অর্থনীতিটাও পরিণতিতে লকডাউন হয়ে গেছে। কাজেই একটা পাড়াকে লকডাউন করা  মানে ঐ পাড়ার সাথে (ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়াকে বিচ্ছিন্ন করার সাথে সাথে) অর্থনৈতিক লেনদেন-বিনিময়ও বন্ধ করা হয়ে যায়, বিচ্ছিন্ন  করা হয়ে যায়। যদিও সেক্ষেত্রে কেবল খুবই সীমিত পর্যায়ের একটা ‘একমুখী কিছু ভোগ্যপণ্য সরবরাহ’ সেখানে চালু রাখা হয়। তাই, এভাবে লকডাউন শব্দটা না চাইলেও সবসময় একই সাথে এ দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়ে যায়।

অতএব দুনিয়াজুড়ে ভাইরাসের আতঙ্কে বিচ্ছিন্নকরণ করা মানে একই সাথে অর্থনীতিও বিচ্ছিন্নকরণ। তাই অর্থনৈতিক  বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক এখন দুনিয়াজুড়ে। আর অর্থনীতিকেও ‘বিচ্ছিন্ন’ করার অর্থ হল অর্থনীতির ঢলেপড়া, স্তব্ধ বা স্থবির মৃত হয়ে যাওয়া। তাই ভাইরাসের শঙ্কার পাশাপাশি লকডাউনের ফলে দুনিয়াজুড়ে এখনকার আরেক সবচেয়ে বড় শঙ্কা হল করোনার দশায় পড়া বন্ধ অর্থনীতি কি দুনিয়াজুড়ে আবার কখনও জীবিত হবে, চালু হবে? হলে কবে, কিভাবে হবে? নাকি অর্ধেক বা ত্রিশ ভাগের বেশি ওচল থেকে যাবে যা আর কখনোই চালু হবে না? নাকি একে কোনো চাবুক দিয়ে চাবকাতে হবে মানে প্রণোদনা দিয়ে চালু করতে হবে ইত্যাদি অসংখ্য প্রশ্ন এখন চার দিকে। এই আশঙ্কা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কার চেয়ে কোনো অংশে কম নয় বা কম প্রভাবের নয়।

একটা উদাহরণ নেয়া যাক। বাংলাদেশে এখন চৈত্র-বৈশাখের গরম চলছে। এরই মধ্যে তাপমাত্রা ৩৯ ডিগ্রি পর্যন্তও পৌঁছেছিল কয়েক দিন। আমরা তা খেয়ালও করেছি হয়তো কেউ। প্রতি বছরের মত এবারও আমাদের টিভিগুলোতে চৈত্র- বৈশাখ মাসের মত করে বিজ্ঞাপনের ধরণও বদলে ছিল। যেমন এবারের গরমের জন্য নতুন এয়ার কন্ডিশনার  ধরনের হোম অ্যাপ্লায়েন্সের এড; অথবা ট্যালকম পাউডার কিংবা বৈশাখী উৎসব আসন্ন বলে ক্রেতার মনে সুড়সুড়ি তোলার এড বা পণ্যের লোভ দেখানোও শুরু হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ তাতে ছন্দপতন ঘটে যায়। লকডাউনের দিন বাড়ানোর নির্দেশ আসাতেই  এখন প্রায় সব বন্ধ। উতপাদক-বিক্রেতারা এথেকে বুঝে যায় যে এই লকডাউন অবস্থায় এখন আর এড দেখানোটা মাঠে মারা যাবে। কারণ দোকানপাট মানে বেচাবিক্রিই বন্ধ। ওদিকে টিভিতে গান-নাটক ইত্যাদির বিনোদন ধরনের প্রোগ্রামে নতুন রেকর্ডেড আগে তৈরি অনুষ্ঠান প্রায় শেষ হয়ে আসছে। কারণ নতুন রেকর্ডিং বন্ধ। আর এসব মিলিয়ে টিভির আয় হিসাবে পাওয়া বিজ্ঞাপনে টান পড়তে শুরু করেছে। এই টানাটানি এখন ক্রমশ কর্মী মানে তাদের পরিবার পর্যন্ত পৌঁছাবে। এর ফলাফল এই পরিবারগুলো এখন সাবসিস্টেন্স (নুন্যতম “টিকে থাকার” ) মানে, ন্যূনতম খাওয়ার পণ্য ছাড়া অন্য কিছু কিনবে না। এটা আসলে হাজার হাজার এমন উদাহরণের একটা মাত্র। এভাবে সবাই যদি “টিকে থাকার” [[subsistence] ক্রেতা হয়ে যাই, এর মিলিত ফলাফল হল অর্থনীতি শুকিয়ে ক্ষীণ হয়ে আসা; সবাই মিলে ডুবে মরার মত হবে। এটাই সামগ্রিক অর্থনীতির ঢলে পড়া।
আসলে এর উল্টোটা ছিল স্বাভাবিক সময়ে; যখন তা চালু থাকে, তখন পণ্যের ভোক্তা যখন বাড়ে তাতে উৎপাদনও পাল্লা দিয়ে বাড়ে, তাতে নতুন কাজ সৃষ্টিতেও বৃদ্ধি ঘটে আর তাতে আবার নতুন ভোক্তাও বাড়ে। এভাবে একটা চক্র তৈরি হয়, সব মিলিত যার ফলাফল হল, সবার প্রবৃদ্ধি বেড়ে চলা। আর এখন ঠিক এটারই উলটা – সাবসিষ্টেন্স লেবেলে পৌছানোর দিকে সকলের ধেয়ে চলা।

এই হল অর্থনীতির চাকা ঘুরানোর অদ্ভুত ও কঠিন খেলা।  সামগ্রিকভাবে আমাদের অর্থনীতির চাকা স্থবির হয়ে আসতে চাইছে। যদিও অর্থনীতিতে এমন চাকা ঘুরার বা ঘুরানোর নিয়ম হল একটা চাকা ঘুরলেই তা ধীরে ধীরে অসংখ্য চাকাকে ঘুরিয়ে তুলতে পারে। তাহলে এখনকার জন্য আমাদের নির্ধারক প্রশ্ন হল – কোন চাকা সবার আগে ঘুরানোর চেষ্টা করব? অনেকে চাকা ঘুরানোর প্রসঙ্গটা চাহিদার চাকার দিক থেকে শুরু করতে চাইতে পারেন। চাহিদা নতুন চাহিদা সৃষ্টি করে; ফলে তা নতুন উৎপাদন আর নতুন কাজও। যেসব চাহিদা সহজেই প্রথমে পূরণ করে দেয়া সম্ভব ও উপযুক্ত যাতে তা চালু করে দিলে বা বাড়িয়ে তুললে তা অন্যসব চাহিদার চাকাকে ঘুরাতে, চালু করতে সবচেয়ে বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ একটা প্রাইম মুভার (প্রথমে যে চাকা ঘুরে অন্যদের ঘুরায়) [Prime mover] বা এমন মূল চাকার সন্ধান পেতে হবে আমাদের সবাইকে।

একইভাবে গ্লোবাল অর্থনীতির চাকাকেও আবার সচল রাখা বা দেখতে চাওয়া যাদের প্রথম মাথাব্যাথা বা যারা মূল দায়িত্বে বা সংশ্লিষ্ট সেই পরিসরে যেমন আই এমএফ বা জি২০-এর সভায়, সেখানে ইতোমধ্যে এ ব্যাপারে তাদের ঐকমত্য হল বাজারে প্রচুর অর্থঢালা ব্যয় বাড়ানোতে যেতে হবে। মানে কৃচ্ছতার উল্টোটা। যেমন এব্যাপারের সবচেয়ে প্রচলিত চিত্র হল, গ্লোবাল পরিসরে সরকারি বন্ড আগে থেকেই বাজারে থাকলে তাতে লভ্যাংশ বাড়িয়ে বেশি দিয়ে এগুলোকে ফিরে সরকার কিনে নিয়ে বাজারে অর্থ সরবরাহ সাধারণত বাড়ানো হয়ে থাকে।  এভাবে মোট অর্থঢালা ব্যয় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে এক ঐকমত্যের সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়েছে গত জি২০ রাষ্ট্রগুলোর [What is the G20] বিশেষ সভা থেকে। কিন্তু সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশ-ভারতের মত দেশে অর্থনৈতিক স্থবিরতা ভাঙার ক্ষেত্রে কোথায় আঘাত করা উচিত, মানে কোথায় প্রাথমিক চাহিদা বাড়াবার উদ্যোগ নিলে অন্য সব চাকাকে সে সবচেয়ে বেশি কার্যকরভাবে সচল করে ফেলতে পারে – সেই জায়গাটা কী হতে পারে?

কোথায় প্রণোদনার অর্থ ঢালবেনঃ
এর আগে গত বছর (২০১৯) অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে কলকাতায় জন্ম নেয়া অভিজিত-এস্থার নোবেল দম্পতির কথা বলেছিলাম। গত সপ্তাহে ভারতের ব্যবসায়ীদের সংগঠনের সমিতি মানে চেম্বার অব কমার্সের কলকাতা রাজ্য শাখা, অনলাইনে কথা বলার এক ভার্চুয়াল সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন। যেখানে অভিজিত-এস্থার ছিলেন মূল বক্তা-অতিথি তাদের (আমেরিকায়) বোস্টনের বাসাতে বসেই।

ভারত বা বাংলাদেশে আমদের সরকারগুলো ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিয়ে শুরু করে দিয়েছে , নানান প্যাকেজ ঘোষণা শুরু হয়ে গেছে দেখতে পাচ্ছি।  কেবল ব্যবসায়ীদেরকে দেয়াকে কেন্দ্র করে এসব প্রণোদনার অর্থনৈতিক প্যাকেজ ঘোষণা করা মানে বুঝা যাচ্ছে এখানে সরকারের  পিছনের-অনুমান হল হল এসব প্যাকেজই চাহিদা বা উদপাদন বাড়ানোর প্রাইম মুভার বলে সে নিশ্চিত হয়েছে।  অর্থাৎ এসবের কোন প্রমাণ সাথে হাজির না করলেও এই সরকারি উদ্যোগগুলো বুঝাতে চাইছে, এই প্রণোদনাই একমাত্র প্রাইম মুভার ফলাফল আনবে।

কিন্তু এই প্রসঙ্গে অভিজিতের প্রস্তাব এখানে একেবারে রেডিক্যাল এবং আলাদা। তার সাহসী পরামর্শ হল, গরিবের হাতে টাকা পৌঁছানো, যাদের এটা এখন ভাত খাওয়ার অর্থ সবচেয়ে বেশি দরকার।

নোবেল বিজয়ী অভিজিৎ-এর রেডিক্যাল প্রস্তাব হল, ঘরে খাবার নাই এমন গরীবের হাতে টাকা পৌছানো। যাদের  এখন ভাত খাওয়ার অর্থ সবচেয়ে বেশি দরকার। 

ফলে তাঁদের ন্যূনতম চাহিদা মেটানোটা আমাদের প্রায়োরিটি হতে হবে। মোদীর গত টার্মে ২০১৫ সালের একটা সফল প্রকল্প ছিল “জনধন প্রকল্প”।  যার সারকথাটা হল, যেখানে গরিব কৃষককে ১০ টাকা দিয়ে একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে দেয়া হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল সরকার যাতে সরাসরি এমন গরীব উৎপাদকের হাতে প্রয়োজনে যেকোন অর্থ সরাসরি পৌঁছাতে পারে। অভিজিত এই প্রকল্পের অবকাঠামো সুবিধা নিয়ে সরাসরি গরিব কৃষকের চাহিদা পূরণ করে দিয়ে অর্থনীতির প্রাইম চাকাকে ঘুরাতে চাওয়ার পক্ষপাতী। এটাই তাঁর আসল কথা।

যদিও তাঁর বক্তব্যের এই মূল অংশ চাপা পড়ে যায় তাঁর বক্তব্যের অন্যকিছু সহ-মন্তব্যের কারণে।  ভারতের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাটা হল, করোনা আক্রমণে ছেয়ে ওঠার আগে থেকেই ভারতের অর্থনীতি স্থবির হয়েই ছিল। তাই এখন অভিজিতের গরীব-প্রণোদনার প্রস্তাবে এমন  প্রশ্ন উঠা ছিল স্বাভাবিক যে, সরকারের হাতে তো এখন এমন যথেষ্ট বাড়তি অর্থ নেই। সে কথা চিন্তা করে  তাই অভিজিত আগাম বলেছিলেন, “নতুন টাকা ছাপিয়ে হলেও” সরকারের এটা করা উচিত।

এদিকে এটা এখন গ্লোবালি প্রতিষ্ঠিত সত্য বলে ধরে নেয়া হয়েছে যে, আমরা ইতোমধ্যেই এক গ্লোবাল অর্থনৈতিক মহামন্দায় প্রবেশ করে গেছি। বিশেষত আইএমএফের প্রধানের এ নিয়ে স্বীকারোক্তিমূলক বক্তব্যের পরে আর কোনো তর্ক থাকে না। সে কথা মনে রেখে অভিজিতের প্রস্তাব, এই অবস্থায় ভারতের ম্যাক্রো বা সামগ্রিক অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কায় ডুবে গিয়ে চিন্তা করার চেয়ে কিছু সদর্প সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তিনি বলেছেন, “প্রথাগত, সাবধানি পথে হেঁটে এই পাহাড়প্রমাণ সমস্যার মোকাবেলা করা শক্ত। চাহিদার চাকা সচল রাখতে প্রয়োজনে টাকা ছাপিয়েও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠানো জরুরি। তাতে মূল্যবৃদ্ধির হার মাথাচাড়া দেবে কি না, সেসব ভাবার সময় এখন নয়। কারণ, এই অবস্থায় তা না করলে, অর্থনীতিকে চড়া মাশুল দিতে হতে পারে বলে সম্ভাবনা থাকছে”। কলকাতার আনন্দবাজারে এভাবেই লেখা হয়েছে। এনিয়ে ইংরাজি টেলিগ্রাফের রিপোর্টিংও এখানে

এমনকি তিনি ‘আর্গু’ করছিলেন – তিনি মানছেন স্বভাবতই একটা মুদ্রাস্ফীতি হবে এতে। কিন্তু তিনি বলছেন, এটা পরে আলাদা করে মোকাবেলা করা যাবে এবং তা সম্ভব। তাঁর একথা অবশ্যই তা সত্যি কারণ, একালে প্রত্যেক রাষ্ট্রে একটা কেন্দ্রীয় (রিজার্ভ) নিয়ন্ত্রক ব্যাংক (বাংলাদেশ ব্যাংকের মত) থাকায় এবং এর হাতে ম্যাক্রো অর্থনীতির পরিচালনার যেমন এর ঘোষিত ফিসক্যাল বা মনিটরি পলিসি ঘোষণা ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকার কারণে বাজারে মুদ্রার (টাকার) প্রবাহ বাড়ানো বা কমানোর মেকানিজমে যদি সদিচ্ছা থাকে তবে তা নিয়ন্ত্রণ তুলনামূলক সহজ কাজ। যদিও সাবধান, আজকাল টাকা ছাপানো বলতে এর অর্থ বাজারে মদ্রার সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়া বুঝায়। অ্যামেরিকান ফেড (ফেডারল রিজার্ভ) এটাই করে। এভাবে বুঝতে হবে।

কিন্তু অভিজিতের পরামর্শের উজ্জ্বল দিকটা হল তিনি চাহিদা বাড়ানো বা চাহিদা ধরে রাখার প্রাথমিক চাকা হিসেবে ব্যবসায়ীদের প্রণোদনা দিবার কথা তিনি বলেননি। সেদিকে তিনি যানই নাই। বরং তিনি উলটা বলেছেন, গরিব মানুষের পকেটে টাকা দিতে। তিনি আসলে জোর দিয়েছেন এই জনগোষ্ঠির বিপল সংখ্যাটার দিকে। এক বিরাট ভোক্তা বাজার এটা। এটাকে তিনি আসলে পালটা শক্তি হিসাবে দেখে সেই শক্তিকে ব্যবহার করতে রেডিক্যাল হতে চেয়েছেন। সারা পশ্চিমের কোনো রাষ্ট্রের যে সুবিধাটাই নেই। এ কারণে এটা অপ্রচলিত, কিন্তু বাস্তব।

বাংলাদেশে চিত্রটা এর কাছাকাছিই। আমরাও আমাদের লকডাউন করেছিলাম; কিন্তু দিন এনে খাওয়া লোকগুলোর ঘরে চাল নেই।  এই পরিকল্পনা এখনও করি নাই।  তাদের ঘরে খাবার কোন ব্যবস্থা না করেই।  তাঁরা চেয়ারম্যান মেম্বারের কাছে আকুতি জানিয়ে রাস্তায় ভিড় করছে, সৈনিকের পায়ে ধরে আকুতি জানাচ্ছে তাকে রাস্তা-ছাড়া না করতে। নারায়নগঞ্জের এমন এক ছবি আমরা দেখেছি; চিত্রটা খুবই মর্মান্তিক। নিশ্চয় লকডাউনের বাস্তবায়ন মানে, অবশ্যই সমাজের সবার ঘরে থাকা। কিন্তু এখানে গরিব-বড়লোকের সুপ্ত একটা ইস্যু আছে। বড়লোকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার খাতিরে তাদের ভাইরাসমুক্ত থাকার স্বার্থে গরিবকে খালি পেটে ঘরে থাকার নিদান দিচ্ছি, জোর করছি আমরা। তাই নয় কী? কেন? এটা যুক্তিযুক্ত হয় কী করে? আমরা অন্তত এক মাসের বিনা পয়সায় রেশন বরাদ্দের কথা তুলছি না। কিন্তু সরকার এটা না যেন বাকি সব কিছুই করতে আগ্রহী।

নিশ্চয় লকডাউনের বাস্তবায়ন মানে, অবশ্যই সমাজের সবার ঘরে থাকা। কিন্তু এর ভিতরে গরিব-বড়লোকের সুপ্ত একটা ইস্যু আছে। বড়লোকের স্বাস্থ্য সুরক্ষার খাতিরে তাদের ভাইরাসমুক্ত থাকার স্বার্থে আমরা গরিবকে খালি পেটে ঘরে থাকার নিদান দিচ্ছি, জোর করছি আমরা। গরীবের না খেয়ে হলেও তাদের ঘরে থাকার বিনিময়ে আমরা বাকিরা নিজেরা ভাইরাসমুক্ত থাকতে চাইছি। তাই নয় কী? কেন? এটা যুক্তিযুক্ত হয় কী করে?

আবার যেটুকু  দশ টাকা কেজি চাল কিনার ব্যবস্থা আছে [মানে যার হাতে অন্তত দশটা টাকা আছে কেবল তাদের জন্য] তাতে প্রতিদিন ‘দশ টাকার চাল’ চুরি করার ঘটনার লুটপাট রিপোর্টেড হচ্ছে। আমরাও কি আমাদের “না-আয়ের” সব গরিবের  হাতে চাল তুলে দিয়ে একটা প্রোগ্রাম চালু করতে পারি না? এমন চার কোটি লোকের চাহিদা মেটানো আমাদের অর্থনীতিতে এক প্রণোদনা হতে পারে। এ জন্য এক-দুই মিলিয়ন ডলার ব্যয়ের সক্ষমতা আমাদের অর্থনীতির আছে। আবার চাইলে বিশ্বব্যাংকের করোনা ‘রিকভারি ফান্ড’ আছে। সেখান থেকে চাওয়া যেতে পারে। এছাড়া তাদের কোনো অনুদান ফান্ড আছে কি না, তাও চেক করা যেতে পারে। আমরা ইতোমধ্যেই জেনেছি সরকার আইএমএফের কাছে ৭০০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা  দেয়েছে .[..to mitigate the economic impact of the coronavirus crisis] – করোনায় অর্থনৈতিক চাপ সামলাতে। ওদিকে ভয়ে অব আমেরিকা জানিয়েছে এমন মোট পাঁচ দাতা প্রতিষ্ঠানের কাছে ঋণ চাওয়ার মোট পরিমাণ প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলার।

তবে আমাদের ক্ষেত্রে ঘরে একমাসের বিনা পয়সার রেশন পৌছানো – এটাই অভিজিতের মত করে বলা প্রস্তাব। অভিজিতের মত করে এই প্রস্তাবের সারকথাটা হল, আমাদের সমাজের যেসব চাহিদা প্রবল তাকে কাজে লাগানো, হারিয়ে যেতে না দেয়া। সম্ভাব্য অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বাঁচতে বা উদ্ধার পেতে চাইলে কোনো স্বাভাবিক অর্থনৈতিক চাহিদাকে আমরা মেরে ফেলতে বা মরে যেতে দিতে পারি না। কারণ বিপুল জনসংখ্যার দেশে এটাই আমাদের অ্যাসেট।

তবে অভিজিতের প্রস্তাবে আইএমএফ খুশি হয়নি, যদিও সেটা তাদের আলাদা বিবেচ্য বিষয়ের কারণে। আর কলকাতায় ওদিকে সেটা ছিল ব্যবসায়ী উৎপাদকদের চেম্বার সমিতির আয়োজিত কর্মসূচি, ফলে তারাও তেমন খুশি হয়েছে অথবা গা-করেছে মনে হয়নি। তবে আইএমএফের পক্ষে অভিজিতকে সমর্থন না দেয়ার কারণ একেবারেই ভিন্ন। মূলত তাদের অন্য সমস্যা আছে সেকারণে।

চলতি পরিস্থিতিতে আমাদের গ্লোবাল মহামন্দায় প্রবেশ যেটা এখন ঘটে গিয়েছে, অভিজিত-এস্থারসহ অনেকেই মনে করেন সেটা ব্যাপকতার দিক থেকে ১৯৩০ সালের মহামন্দার সাথে  তুলনীয়। সেই সময় ইউরোপের প্রায় সব রাষ্ট্র আয়ের চেয়ে যুদ্ধে ব্যয় বেশি করাতে তা মিটানোর অক্ষমতায় যার যার মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছিল। মানে, তারা বিস্তর টাকা ছাপিয়েছিল তখন। আর সবাই মিলে একসাথে মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটানোয় – এই মূল কারণেই গ্লোবাল মহামন্দা হাজির হয়েছিল বলে মনে করা হয়। আর এই মূল্যায়নের ওপরে দাঁড়িয়েই বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৪ সালে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের জন্ম হয়েছিল। তাই ‘সম্মিলিত মুদ্রা অবমূল্যায়ন’ ঘটানো আইএমএফের চোখে লিখিত জন্মনীতি হিসাবে হারাম ধরনের কাজ মনে করা হয় সেই থেকে।

ফলে আইএমএফ  অভিজিতকে বলতে চাইবে- অবমূল্যায়ন নয়, সে বরং ঋণ দিতে চায়। তবে সেটা যা হোক, অভিজিতের কথা আমরা আক্ষরিকভাবে না নিয়ে তার মূলকথা গরিব মানুষের হাতে অর্থ পৌঁছানো; এর বাস্তবায়ন করতে পারি। এটাকে একটা সাহসী ও কার্যকর পদক্ষেপ মনে করতে পারি আমরা। বাংলাদেশের লকডাউনে অভুক্ত গরিবদের জন্য এটা কি আমরা করতে পারি না? দায়িত্ববানদের ভেবে দেখা উচিত।

ওদিকে চরম ক্রাইসিসে টাকা ছাপানো জায়েজ আছে – উদাহরণও আছে – একথা বলে লন্ডনের ফাইন্যান্সিয়াল টাইম রীতিমত এক নিজ সম্পাদকীয় ছাপিয়েছে গত ০৬ এপ্রিল ২০২০। যা বলা যায় পরোক্ষে নোবেল বিজয়ী অভিজিতের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। লিখেছে “Printing money is valid response to coronavirus crisis”।

“Printing money is valid response to coronavirus crisis” – London Financial Times

তাদের দাবি ব্যাঙ্ক অব ইংল্যান্ডও জন্ম থেকেই এমন অর্থ ছাপিয়ে নিয়ে সরকারকে সাহায্য করে আসছেই। কানাডার এক স্থানীয় পত্রিকা দাবি করেছে প্রধানমন্ত্রী ট্রুডোও নাকি তাই করেছে।

তবে আমাদের জন্য সারকথা, বাংলাদেশেও টাকা ছাপানো নয়, চাল কিনতে  হাতে টাকা নাইদের ঘরে একমাসের চাল পৌছে দেওয়া প্রকল্প আমরা নিতেই পারি।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  গত ১২ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও প্রিন্টে  করোনায় প্রণোদনা কাকে দেবেন“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

করোনার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেখা

করোনার মধ্যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেখা

গৌতম দাস

০৬ এপ্রিল ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Wv

BBC Image, https://www.bbc.com/bengali/news-52171393

যেদিকেই যাই যেকোনো দু’জনের মধ্যে আলাপের সাবজেক্ট একটাই- করোনাভাইরাস। মনে হচ্ছে এটা চলতি এপ্রিল মাস তো বটেই, এমনকি যতটুকু দূরে অনুমান করে দেখা যায় তাতে অন্তত আগামী জুন মাসের শেষ পর্যন্ত এমনটাই চলবে। বরং ভাইরাস পরিস্থিতি আরো মারাত্মক হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

বাংলাদেশে ভাইরাস বিস্তার কেমন মাত্রায় ঘটেছে, কত দূর ঘটেছে, আমরা কোন অবস্থায় আছি, সে চিত্রটা দেখানোর ক্ষেত্রে এখনো কেউ পাবলিকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হতে পারেন নাই। মুল কারণ, আমাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য বা ডাটা সংগৃহীত নাই।  আমরা যথেষ্ট  সংখ্যক সম্ভাব্য আক্রান্তদেরকে টেস্ট করি নাই। কোন নিশ্চিত আক্রান্ত রোগী থেকে তিনি কতদুর ছড়িয়েছেন এর নিশ্চিত বিশ্বাসযোগ্য তথ্য নাই, একই কারণে।  তাই ডাটাও সংগৃহীত হয় নাই।  ডাটা নাই তো সত্য বা আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্য ধারণাও নাই।  যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিং ও ডেইলি সরকারি আপডেট দেয়া জারি আছে – যতটুকু টেস্ট করা হচ্ছে সেই ভিত্তিতে।  তবে, নতুন খবর এসেছে যে, ভাইরাসের আরো পরীক্ষা কেন্দ্র ঢাকায় এবং ঢাকার বাইরে মোট ১৪টা স্থানে স্থাপনের উদ্যোগ চলছে  বা কোনটা চালু করা হয়েছে। যেটা সবমিলিয়ে মোট ২৮টা পর্যন্ত করা হবে সম্ভবত। মনে হচ্ছে টেকনিক্যাল সক্ষমতা বা ইকুইপমেন্ট-গুলোর স্টক বাড়ার সাথে এর সম্পর্ক আছে। তবে ইকুইপমেন্ট ঘাটতি ছাড়াও ডাক্তার ও টেকনিশিয়ানের মধ্যে জড়তা বা উৎসাহ কম হবার পেছনে যদি ভয়ও একটা ফ্যাক্টর হয়ে থাকে তবে তা কাটাবার সবচেয়ে ভালো উপায় হতে পারে কিছু কার্যকর ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা।

 করোনার পিক পিরিয়ডঃ
এ পর্যন্ত অনেকের মধ্যে দেখেছি কী হতে যাচ্ছে এনিয়ে এক উদ্বিগ্নতা। বিশেষ করে, সরকার কি এগারো এপ্রিল তারিখের পরে সব অথবা আংশিক খুলে দেবে? যেমন ধরা যাক, গার্মেন্টস-সহ ছোটবড় কারখানা উৎপাদন ও যানবাহন খুলে দেয়া হবে? আর একবার যদি খুলে দেয়, মানুষ ঢাকায় ফিরে আসবে এরপর সম্ভবত তাঁরা আবার ফিরে যেতে বা ঘরে বন্ধ থাকতে চাইবে না।  তখন কী হবে? মূল কথাটা হল, বাংলাদেশের ভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে এর পিক পিরিয়ড মানে সর্বোচ্চ আক্রমণ ও ক্ষয়ক্ষতির কাল কী আমরা পেরিয়ে গেছি? মানে আমাদের নতুন আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা কি কমতে শুরু করেছে? তা জানা নেই। কারণ পিক পিরিয়ডের সময়ের পরে নতুন আক্রান্তের সংখ্যা কমতে থাকে বা হঠাৎ করে একসাথে অনেক নিচে নেমে যায়। এটাই পিক আওয়ার পেরিয়ে যাওয়ার লক্ষণ। সেক্ষেত্রে এসব দিকের স্টাডি থেকে সুবিধা পেতে গেলে উপযুক্ত, অবাধ ও প্রচুর ডাটা সংগ্রহে থাকতে হয়। কেবল তবেই এথেকে কোন অর্থপূর্ণ কোন সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব যে, করোনাভাইরাসের প্রভাব কমতে শুরু করেছে বা তা চলে যাচ্ছে। কিন্তু যারা টেস্টই কম করে করেছে তাই ডাটাই নাই তাদের পক্ষে লকডাউন তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাদের নিতে হবে স্রেফ আন্দাজে, কোন ভিত্তি ছাড়াই হয়ত তা ব্যবসার সুবিধার দিকে তাকিয়ে, স্বভাবতই যার ফল হতে পারে করুণ এবং আত্মঘাতি। সেটা এমনও হতে পারে  যে দেখা গেল লকডাউন তুলে নেওয়ার পরেপরেই সত্যিকারের পিক পিরিয়ডটা শুরু হয়েছে আর তাতে না আবার লকডাউন কায়েম বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে, না তাতে ব্যাপক সংক্রমণ শুরু হওয়াতে তা মোকাবিলার সক্ষমতা বা বাস্তবতা আছে।

এর বিপরীতে বাংলাদেশের তথ্যহীন আনাড়ি পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক ক্ষতি একটু বেশি হলেও একটা উপায় হতে পারে লকডাউন অতিরিক্ত বাড়িয়ে দিয়ে সম্ভাব্য মানুষ মারা যাওয়ার রিস্ক কমানো।  গতকাল ৪ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত মনে হচ্ছিল সরকার সম্ভবত এমন সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। কিন্তু রাত আটটার পর থেকে গার্মেন্টস মালিকদের কারখানা খোলার তোড়জোড় দেখে বুঝা যাচ্ছিল মালিকদের লোভ আর দায়িত্বজ্ঞানহীনতা চরমে [BGMEA’s cruel joke] উঠতেছে আর তাদের  লোভের কাছে সরকার হেরে যাচ্ছে।

যেখানে পরিস্থিতিটা হল, আমাদের সংক্রমণের পিক পিরিয়ড আর জানার সুযোগ নাই। কাজেই যত তাড়াহুড়া করে কারখানা খুলব ততই বেশি সম্ভাব্য লোক আক্রান্ত হয়ে মারা যাবার রিস্ক নেওয়া হবে।  এছাড়া টেস্ট করার কথিত ২৮ কেন্দ্র খুলে সজ্জিত হতে যেখানে এপ্রিলের পুরা মাসটাই লেগে যেতে পারে বলে সরকার থেকে ধারণা দেয়া হচ্ছে।

আবার গত ০৩ এপ্রিল রাতের একটা ডেভেলবমেন্ট জেনে মনে হচ্ছিল সরকার বোধহয় ভাল সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে। আমাদের লকডাউনের কাল সরকার বোধহয় বাড়াচ্ছে। এমন অনুমান হবার  কারণ, গত ০৩ এপ্রিল রাত সাড়ে দশটার বাংলাভিশন টিভির খবরে দেখা গেল ঢাকা মেডিক্যালের অধ্যক্ষ মতামত রাখছেন যে, আগামী দুই সপ্তাহ বাংলাদেশের জন্য খুবই বিপজ্জনক নির্ধারক সময়। তাই ১১ তারিখ পর্যন্ত ছুটি যেটা আছে সেটাকে এপ্রিলের চতুর্থ সপ্তাহ পর্যন্ত বৃদ্ধি করে দিতে তিনি সরকারের কাছে পরামর্শ রেখেছেন। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিবেচনা করার মতো অন্যান্য ইস্যু থাকতে পারে: সেগুলো সাথে নিয়েই তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।’ এগুলোই ছিল তার কথার সারাংশ। ফলে মনে হচ্ছিল সরকারি সিদ্ধান্ত এমনটাই হতে যাচ্ছে। এটা হলে একটা ভালো সিদ্ধান্ত হতে পারত। কিন্তু না তা হয় নাই।

যদিও এর আবার অন্য পরিণতি আছে। যেমন ঐ ৩ এপ্রিল পর্যন্ত অন্তত ঢাকারই নিম্ন আয়ের মানুষের যেসব নিউজ দেখা গেছে তা এক কথায় খুবই উদ্বেগজনক। রাস্তায় রাস্তায় দান-সদকা টুকিয়ে চলতে তারা রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে, এজন্য মরিয়া ভাব আছে তাদের মধ্যে, যারা কাজকাম হারা এবং দিন এনে খায়, তারা নিরুপায় – এটাই এর সার কারণ। কিন্তু দান খয়রাতে এরা দু-চার দিন চলতে পারে কিন্তু বেশি দিন চলতে পারবে না। পুরো এপ্রিল বলতে গেলে এ নিয়ে শক্ত ও কমিটেড বিনামূল্যের সরকারি রেশন ধরনের ব্যবস্থা সেক্ষেত্রে তাদের লাগবেই। ইতোমধ্যে রাজশাহী শহরের বাসিন্দাদের অবস্থা নিয়ে যে রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে [রাজশাহীতে ত্রাণের আশায় মোড়ে মোড়ে গৃহবধূরা] তা রীতিমত গভীর এলার্মিং। এটা সব জেলাগুলোর জন্যই কমবেশি এক প্রতীকী চিত্র। এটাকে সাবধান হবার এবং একশন নিবার খবর হিসাবে না নিলে চরম মূল্য দিতে হতে পারে। এব্যাপারে বিশ্বব্যাংক কী কোন কাজে আসতে পারে?

আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক সহায়তাঃ
হা অবশ্যই পারে। কারণ, আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক আগে থেকেই করোনার সম্ভাব্য ক্ষতিতে সদস্য দেশের মধ্যে বিতরণের জন্য পায় তিনশ বিলিয়ন ডলার  আলাদা করে রেডি করেছে। ইতোমধ্যেই আশিটারও বেশি দেশ এর সুবিধা নিতে আবেদল জানিয়েছে। সুনির্দিষ্ট করে বাংলাদেশের ব্যাপারে নিউজ হল, আমরা ইতোমধ্যে ১০০ মিলিয়ন ডলারের অনুমোদন পেয়েছি। তবে এই অর্থের খাতটা মুলত টেকনিক্যাল সক্ষমতা বাড়ানো বা শক্তিশালী করার কাজে ব্যয়ের জন্য […to help upgrade selected health facilities and laboratories to detect, manage and treat suspected and confirmed COVID-19 cases ] এমন ফান্ড। অর্থাৎ এটা মূলত, medical and testing facilities, and the national health system বাড়ানো ও শক্তিশালী করার জন্য। তবে এটা ছাড়াও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি বা রিকভারির জন্য যেমন,  দুস্থ ও গরীবদের [15 months to protect the poor and vulnerable] সুরক্ষার জন্য আলাদা করে মোট ১৬০ বিলিয়ন ডলারের আরেক ফান্ড আছে। কিন্তু এই ফান্ড থেকে সহায়তা চাওয়া হয়েছে কিনা তা এই রিপোর্টে স্পষ্ট নয়।

‘জীবন না জীবিকা’, কোনটার অগ্রাধিকার
গত বছর অর্থনীতিতে নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন সম্মিলিতভাবে তিনজন। এদের মধ্যে কলকাতায় জন্ম নেয়া আমেরিকান নাগরিক ‘অভিজিত ব্যানার্জি’ ও ফ্রান্সের ‘এস্থার দুফলো’ এরা দু’জন ঘটনাচক্রে সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী। আর সাথে তৃতীয় অর্থনীতিবিদের নাম মাইকেল ক্রেমার। তাদের মধ্যে প্রথমে দু’জন করোনাভাইরাস নিয়ে এক কথোপকথন বা প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে আলাপ করেছেন; যার ভিডিও ক্লিপ ও বাংলায় ট্রান্সস্ক্রিপ্ট ছাপিয়েছে কলকাতার ‘আনন্দবাজার’। সেখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ ছিল এই ভাইরাস আক্রমণের প্রেক্ষিতে কোন রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান – আজকের এই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে জীবন না জীবিকা কোনটার ওপর বেশি জোর দিবেন?  কোনটা করা ঠিক হবে? কারণ অর্থনীতির দিকে বেশি প্রায়োরিটি বা মনোযোগ দিতে পারলে ভাইরাস-পরবর্তী সময়ে মানুষের বিশেষ করে জীবিকা বাঁচানো সহজ হতে পারে। যদিও অভিজিতের শেষ কথা হল ” আমি জানি না” [ তিনি বলেছেন, “প্রাণ বাঁচানোর কাজে একটু খারাপ করলে অর্থনীতিকে বাঁচানোর কাজটা হয়তো একটু সহজ হতে পারে … আমি জানি না। বলছি না যে বেছে নেওয়া সহজ কাজ হবে”]।

অর্থাৎ কেউ যদি সেক্ষেত্রে লকডাউন কম সময় রাখা বা শিথিল করে রাখা হতে পারে – এই লাইন ফলো করে তাতে কিন্তু বিপরীতে আবার খোদ জীবনই সঙ্কটে পড়ে যেতে পারে এবং বেশি মানুষ মারা যেতে পারে। তাহলে?
এখন পর্যন্ত্ প্রকাশিত বাংলাদেশের ঝোঁকটা হল, বিজনেসের স্বার্থকে যথেষ্ট প্রায়োরিটি দেওয়া। এমনকি সময়ে স্বাস্থ্য-ঝুঁকিতে ফেলে হলেও এর বিনিময়ে বিজনেস স্বার্থের পক্ষে থাকা। যেমন, গত দুদিন ধরে গার্মেন্টস খুলে দিবার চেষ্টা করে কর্মিদের জীবনকে দুর্বিষহ করে ফেলা হচ্ছিল। অথচ সরকার শিথিলতা দেখিয়ে এখানে নিজে কোন নির্দেশ দেয় নাই, হস্তক্ষেপ করে নাই। উলটা মালিকদের হাতে সব সিদ্ধান্ত ছেড়ে দিয়েছে। য়ার এতেই বিশৃঙ্খলা চরমে পৌচেছে। এরই মধ্যে আজ ৫ এপ্রিল কিছু কারখানা খুলে উতপাদনেও গিয়েছে। বিশেষ করে আশুলিয়া ইপিজেড। অথচ এতে গভীর স্বাস্থ্য-ঝুঁকি তৈরি করেছে, আর তা কোন কেয়ার করা হয় নাই। আবার কিছু মালিক কর্মিদের ঢাকায় ডেকে এনেও নিজেরা কারখানা না খুলেই (কেউ কেউ আবার দুপুর একটা পর্যন্ত কাজ করিয়ে) বিনা বকেয়া বেতনে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে।

এদিকে আবার সরকার  ১১ এপ্রিল পর্যন্ত বলবত লকডাউন আবার বাড়াবে কিনা সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। যদিও  [ঘোষণা না করা] একটা ঝোঁক হল, লকডাউন আর না বাড়ানো, অন্তত কারখানা ও যানবাহন খুলে দেওয়া।  শেষে এটা ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত অল্প বাড়ানো ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বাড়ানোর এই ধরণটাই সরকারের সিদ্ধান্তের ঝোঁক কোনদিকে তা নির্দেশ করে। যদিও দেশি-বিদেশি টেকনিক্যাল বা ডাক্তারদের পরামর্শ হল বাংলাদেশে  লকডাউন একমাস বাড়ানো অন্তত পুরা এপ্রিল মাস জুড়ে জারি রাখা। বিশেষ করে যখন আমরা আমাদের পিক পিরিয়ড সম্পর্কে কোন ধারণা রাখার সুযোগ নাই।

সারকথায় যত দ্রুত লকডাউন তুলে নেওয়া হবে ততই আমরা মানুষকে তত বেশি স্বাস্থ্য-ঝুঁকিতে ফেলব।  তাই যত দেরি সেটাই ভাল। এই ভিত্তিতে এরপর দরকার একটা ‘অপটিমাম’ অবস্থান। বলাই বাহুল্য তাতে সেটা অবশ্যই জীবন বাঁচানোকে প্রায়োরিটি দিতে হবে।  অভিজিতও বলছিলেন, একজন ভালো নির্বাহী প্রধানের জন্য – জীবন না জীবিকা প্রশ্নে এভাবে বিবেচনা করে একটা ভারসাম্যের সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া খুব সহজ কাজ নয়। তাই এখানে প্রুডেন্সি ও দুরদর্শিতা হতে পারে একটা ভাল গাইড। কারণ, এ ক্ষেত্রে কোনো ভুল সিদ্ধান্তের জন্য বড় খেসারত দিতে হতে পারে। [বাংলাদেশের কিছু ওয়েব পত্রিকাও আনন্দবাজারের রেফারেন্স দিয়ে লেখাটা ছেপেছে।]

ভালো অর্থনীতির মুলাঃ
কেউ কেউ ইতোমধ্যে ভাইরাস-উত্তর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অপেক্ষা করছে যেন এক ‘স্বর্ণযুগ’ না হলেও “ভাল সময়” আসবে বলে দেখছেন ও দেখানো শুরু করে দিয়েছেন। এ ধরনের মন্তব্যগুলো নেহায়েতই চাঙ্গা করার উদ্দেশ্যে কথার কথা হিসেবে হলে সে ক্ষেত্রে তাদের এমন কথাগুলো না বলাই ভাল হত। ধরে নিচ্ছি, এগুলো নিছক চাঙ্গা করার জন্য কথার কথা নয়। সে আলোকে : প্রথমত, ব্যাপারটা হল, উত্তর পরিস্থিতিতে ভাইরাস থেকে কে কী দশায় সার্ভাইভ করে আর তা কত কম ক্ষতিতে ইত্যাদি- সেই সার্ভাইভালের গুরুতর প্রশ্ন আছে। সেই পরিস্থিতিটা ভালো দশা হবে কি না তা নিশ্চিত না হয়ে কোনো স্বপ্ন দেখার মানে হয় না। বরং আগেই ‘স্বপ্নে পোলাও-কোরমা খাওয়া’ই মানসিক আঘাত হয়ে উঠতে পারে। কারণ, ভাইরাস-উত্তর সার্ভাইভাল বা বেঁচে থাকা যদি মারাত্মক লোকসংখ্যার হানি ঘটিয়ে হয় তবে এরপর সেই শক কাটিয়ে থিতু হওয়াই অনিশ্চয়তায় ডুবে যাওয়া অবস্থা হয়ে যেতে পারে। তাতে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা যতই আকর্ষণীয় হয়ে হাজির থাকুক তাতে কিছু আসবে যাবে না।

অতএব প্রথম টার্গেট-কাজ-সফলতা হতে হবে যত কম প্রাণহানি ও মানুষের ক্ষতি কম ঘটিয়ে সার্ভাইভ করা বা টিকে যাওয়া। এটা খুবই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর ওপর নির্ভর করছে আমাদের নিজেকে পুনর্গঠনে লিপ্ত হওয়ার যোগ্য থাকব কি না আর সেটা কতটা। এছাড়াও গ্লোবাল পরিসরকে গ্লোবাল ইকোনমি কতটা আর কত দ্রুত চাঙ্গা হতে পারবে আমরা জানি না। এর চেয়েও বড় কথা আমাদের নিয়ন্ত্রণে এটা একেবারেই নাই। বরং আমরা এরই শিয়ার। যেমন। পশ্চিমের ক্রেতা বাজার কত দ্রুত স্বাভাবিক ও থিতু হবে আর এর চেয়ে বড় কতটা ক্রয়ক্ষমতা ফিরে পেয়ে ফিরবে আমরা জানি না। অথচ এটাই আমাদের রপ্তানি, মুদ্রা আয়ের নির্ণায়ক। অর্থাৎ এর জোনটা পুরাই আমাদের নিয়ন্ত্রণহীন ও অনিশ্চিত।   কাজেই অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির দিকে বেশি মনোযোগ দেয়ার সুযোগ নেয়াতে সুফল বেশি আসার সম্ভাবনা বরং বেশি।

এদিকে দেশে বলা শুরু হয়েছে, এক-দেড় মাসের মধ্যে বোরো ধান উঠবে। গতবার ধান সংগ্রহের পারফরমেন্স ছিল খুবই খারাপ। ‘গোডাউনে জায়গা নেই’ অজুহাতে ধান প্রায় কেনাই হয়নি। পরে তা যতটুকু কেনা হয়েছে সেটাও মিলমালিক থেকে। সব মিলিয়ে সংগ্রহ মূল্য কম ছিল বলে ধান উৎপাদকদের অসন্তোষ উঠেছিল চরমে। এবারের বাস্তবতাটা হল, এক দিকে নিম্ন আয়ের মানুষকে ঘরে আটকে রাখতে হলে বিনামূল্যে এক-দু’মাসের রেশন দিতে হবে, অন্য দিকে বোরো সংগ্রহের জন্য গুদামে জায়গা থাকতে হবে, বাজার থেকে ধান সংগ্রহ করে উৎপাদকদের একটা ভালো দাম দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে ইত্যাদি। এসব দিক ছাড়াও বিবেচনার বিষয় থাকতে পারে। সব মিলিয়ে এ নিয়ে একটা ‘ভালো সিদ্ধান্ত’  সরকারকে একটা ভালো ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারে। আবার এ থেকে পাবলিকের মনে এমন ধারণা হতে পারে যে, তাদের জন্য একটা সরকার আছে।

এর উল্টোটাও আছে। পাবলিকের মনে হতে পারে- তাদের জন্য কেউ নেই। আবার ভাইরাস থেকেও পরিত্রাণ নেই। কেউ তাদের জন্য কিছু করার নাই। আবার ভাইরাসে মরব তো, পরে যদি খেয়ে বেঁচে থাকতে পারি। কাজেই ভাইরাসের কথা ভুলে আগে খাবার সংগ্রহে নামি। এ ছাড়া যাদের খাওয়ার সমস্যা নেই তারা ভাবতে পারে সরকার কিছু করতে পারবে না, কেউ কারো জন্য নয়। কাজেই সরকারের ভরসায় না থেকে অন্যের ঘাড়ে চড়ে তাঁকে মেরে হলেও নিজেই ভাইরাস থেকে আগে বাঁচার চেষ্টা করি। এর মিলিত ফলাফল হতে পারে এক বিশৃঙ্খলা; চরম আস্থাহীনতায় নিয়ম আইন সব ভেঙে পড়া। এমন অবস্থা যেন তৈরি না হয় সে জন্য আমরা কি নুন্যতম কিছু ভাল কিছু আশা করতে পারি না? সেটি কি বিরাট আশা করা হবে?

তেল সর্বনিম্ন মূল্যেঃ
জ্বালানি তেলের মূল্য নেমে তলানিতে ঠেকেছে। গ্লোবালি কলকারখানা মেশিন যান সব স্থবির হয়ে যাওয়ার আরেক বড় চিহ্ন এটা। অতএব তেলের বিক্রি নেই, দাম সর্বনিম্ন তাই। কিন্তু কত নিচে?

অ্যামেরিকান ওয়েষ্টার্ণ টেক্সাস (বেঞ্চমার্ক) মার্কা জ্বালানি তেল যেটা – এটাই ভাইরাসের প্রকোপের আগে ৫৩ ডলারে ছিল, যেখান থেকে নেমে তা মাত্র ২১ ডলারেও পৌঁছেছিল। তবে আজ তা ২৭ ডলার। গত দু-তিন বছরে তেলের দামের প্রধান নিয়ামক হয়ে আছে সৌদি আরব যার পলিসি হল, টেক্সাস ক্রুডকে চাপে রাখা। পঞ্চাশ ডলারের আশপাশে দাম রাখলেই টেক্সাস চাপে থাকে। এ ক্ষেত্রে আরেক প্লেয়ার, পুতিনের রাশিয়া এতে খুশি যা আবার কিছু দুঃখ মিশানোও। কারণ এক দিকে আমেরিকা চাপে থাকলে সে খুশি। এটাই সে লবি করার চেষ্টা করে সৌদিদের সাথে। আবার অখুশি, কারণ সে নিজেও তেল বেচে বেশি দাম পায় না। গত ২০০৮ সালের দিকে ১৭৩ ডলারের তেল- মনে হয় না সে দিন দুনিয়াতে আর কোনো দিন ফিরবে।

এক কথায় এখন গ্লোবাল সব উৎপাদন প্রায় একসাথে সব খানে স্থবির হয়ে আছে অর্থাৎ চাহিদা পড়ে গেছে। কিন্তু আগামিতে অর্থনীতি আবার চলতে শুরু করলে দাম আবার বেড়ে আগের জায়গায় যাবে। ৫০-৫৩ ডলারের আশপাশে ফিরে আসবে, অবশ্যই। অতএব, যারা এখন তেলের কম দাম এটা দেখিয়ে ভাইরাস-উত্তর আসছে দিন ভাল হবে বলে আশার বাতি দেখাচ্ছেন এটা বাস্তবত তেমন আশার কিছু নয়। এটা অপ্রয়োজনীয় ও মিথ্যা আশা। কারণ, এমনিতেও ৫০-৫৩ ডলারের তেল গ্লোবাল অর্থনীতির জন্য তেমন বেশি মনে করা হয় না। তেলের দাম নয়, আসলে মূল ফোকাস হতে হবে গ্লোবাল অর্থনীতির ভালো চলতে দেখা। যেমন ভারত। তেলের দাম যখন ৫০-৫৩ ডলারের মধ্যে ছিল, তা সত্ত্বেও এর সুবিধা ভারত তখন তেমন নিতে পারেনি। কারণ অন্য নানা কারণে ভারতের খোদ অর্থনীতিই স্থবির হয়ে আছে। অতএব, সারকথা গ্লোবাল ইকোনমি একটু ভালো হতেই (ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে আসতেই) তেলের দামও আবার ৫০-৫৩ ডলারের স্তরে উঠে যাবে। কাজেই এখন তেলের দাম কম থাকা নিয়ে লোভ দেখানোর কিছু নেই। আর তেলের দাম কম থাকার চেয়েও গ্লোবাল অর্থনীতি চাঙ্গা থাকা এটা বরং আমাদের মতো অর্থনীতির জন্য একটা ভালো সময়ের নির্ণায়ক। অবশ্য সৌদি কোয়ালিটির (ব্রেন্ট) তেল সব সময় ৬-১০ ডলার বেশি থাকে, মানে সেটাও ৬০-৬৩ ডলারে চলে যাবে।

টাকার অবমূল্যায়নঃ
অনেকে করোনাভাইরাস-উত্তর পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের টাকার অবমূল্যায়নের জন্য পরামর্শ রাখছেন। এটা কোন ভালো পরামর্শ না এমন মনে করার কারণ আছে। সাধারণত কোন একটা রাষ্ট্রের অর্থনীতি ধসে গেলে বা ডুবে গেলে কেবল সেই পরিস্থিতিতেই অবমূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিলে তা কার্যকর হতে পারে। অবমূল্যায়ন কথাটার খাড়া মানে হল, যেন নদীতে ডুবে যাওয়ার পরিস্থিতির মধ্যে নিজেকে ফেলে দেয়া। উদ্দেশ্য, বাজারের সবার ক্রেতাকে আমার ক্রেতা বানানো, কাছে আনা। কারণ সবাই (ধরাযাক) এক ডলারে একটা শার্ট দিলে আমি বেশি, (ধরাযাক) দুটো দেই। এটাই টাকার ‘অবমূল্যায়ন’।

এটা কাজ করে কেন? কারণ য়ামার অবমুল্যায়নে আমাকে অন্যরা তুলতে এলে আমি অন্যদের কিছু কিছু করে ডুবিয়ে বিনিময়ে অনেক দূর পর্যন্ত ভেসে উঠতে পারার সুবিধা নিতে পারি। টার্কিশ লিরা (২০০৯ সালে) ডুবে গেছিল; সেই লিরা অবমূল্যায়ন করেই নিজেকে বাচিয়েছিল। অর্থাৎ একটা রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে সমস্যা হলে এটা কার্যকর হবে। একইভাবে ১৯৯৮ সালে মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে ধ্বস নামিয়েছিল জর্জ সোরেসের হেজ ফান্ড কোম্পানী। সেখানেও রিংগিতের অবমূল্যায়নে পরিত্রাণ পাওয়া গিয়েছিল। মূল কারণ, একটাই রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল তাই।

কিন্তু অবমূল্যায়ন পুরোটাই অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। কখন? যখন সময়টা গ্লোবাল রিসেশন বা মহামন্দায় আছে বা সম্ভাবনা আছে এমন সময়ে। অর্থাৎ একসাথে অনেক রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্থ এমন এক গ্লোবাল পরিস্থিতি।  দেখা গেছে, এমন সময়ে একটা রাষ্ট্র নিজের মুদ্রার অবমূল্যায়নে গেলে তার লেজ ধরে অন্য সবাই অবমূল্যায়নে চলে যেতে পারে। এতে সামগ্রিক এফেক্ট বা ফলাফল হবে শূন্য। এই অবমূল্যায়নে কোনো একটা রাষ্ট্র বা কেউ বেশি ক্রেতা পেয়ে যাবে না। কিন্তু সব পণ্যের মূল্যই পড়ে যাবে। আজ পর্যন্ত সব গ্লোবাল মহামন্দার কালেই এমন গণ-অবমূল্যায়ন ঘটানো হয়েছিল। ফলে সকলেই আরও ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল। তাই একালের একটা চোস্ত প্রমাণ হল, গ্লোবাল রিসেশন বা মহামন্দার বিপদের গন্ধ পেলেই আইএমএফ দ্রুত জি৭ গ্রুপের মিটিং ডাকার জন্য লবিং শুরু করে। আর সেই মিটিং থেকে প্রস্তাব পাস করিয়ে নেয় যে, কেউ অবমূল্যায়নের পথে যাবে না। কারণ এক রাষ্ট্র অবমূল্যায়নে গেলে বাকি সবাই একই পথে গিয়ে ফলাফল শূন্য করতে চাইবে। তাতে এই প্রতিযোগিতাই গ্লোবাল মহামন্দাকে নিশ্চিত করে ফেলে।

তাই, গ্লোবাল মহামন্দার আমলে আমাদের টাকার অবমূল্যায়ন করতে যাওয়া বিপজ্জনক হতে পারে। সার কথায়, যখন শান্ত নদী তখন ডুবে যাওয়ার চেষ্টা বা অবমূল্যায়নের চেষ্টা করা যেতে পারে এবং তা কার্যকর করা যাবে। কিন্তু যখন নদী অশান্ত, তখন ডুবে যাওয়ার চেষ্টা করলে অন্যরা সবাই আমাকে তোলার বদলে অন্যকে ডুবিয়ে নিজে উঠতে চেয়ে পরিণতিতে সবাই ডুবে যায় বলে এটা অকার্যকর এবং এর পরিণতি গ্লোবাল রিসেশন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা গত ০৫ এপ্রিল ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে  ভাইরাসের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্ভাবনা“ – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]