কলোনিয়াল ৩৫৬ ধারা, কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আসন্ন

কলোনিয়াল ৩৫৬ ধারা, কলকাতায় রাষ্ট্রপতির শাসন’ আসন্ন

গৌতম দাস

১৭ জুন ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Bb

 

 

ARTICLE 356, The Colonial Legacy & the deep Love to Colonial Power of NEHRU &…

রিভিউ বা ফিরে দেখা মানুষের জীবনের এক গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায়। জওহরলাল নেহেরু কেবল ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী নন; তিনি ১৯৪৭ সালের আগষ্টে স্বাধীন দুই রাষ্ট্র ভারত-পাকিস্তানের জন্মের সময়ের রাজনীতির এক মুখ্য চরিত্র। ইতিবাচক বা নেতিবাচক দিক থেকে বহু ঘটনার নির্ধারক নির্ণায়ক ছিলেন তিনি। আমাদের রাজনীতির বহুকিছুর হাল ‘এমন বা ওমন’ কেন এর জবাব পেতে আমাদেরকে বারবার সেসব পুরান দিনের ঘটনা রিভিউ বা ফিরে দেখায় যেতে হয়। সেকাজে বলাই বাহুল্য নেহেরু এক বড় চরিত্র হয়ে হাজির থাকে।

সেখানে বহুবার আমরা দেখেছি, নেহেরুর চিন্তায় “গণপ্রজাতন্ত্রী” রাষ্ট্র ও ক্ষমতা  এই ধারণাটা যতটা না ‘মর্ডান রিপাবলিক’ প্রসুত তার চেয়ে অনেক বেশি নিজেকে কলোনিয়াল মাস্টার মনে করা প্রসুত।  বারবার তিনি উপনিবেশ বা কলোনিয়াল সম্পর্ক ও সংশ্লিষ্ট ক্ষমতা ধারণা দিয়ে আপ্লুত হয়ে থেকেছেন, তা দেখতে পাই। যেমন নেপাল বা ভুটানের সাথে, ১৯৪৭ সালের পরবর্তি স্বাধীন ভারতের তথাকথিত ‘শান্তি ও বন্ধুত্ব চুক্তির’ ধারাগুলোতে আমরা তা দেখতে পাই। অথচ ভারত তখন ইতোমধ্যেই এক স্বাধীন রিপাবলিক হওয়া সত্বেও নেপাল বা ভুটানের ভারতের সাথে চুক্তিতে নেহেরু একাজ পুরাটাই করেছেন আগের কলোনি বৃটিশ-ইন্ডিয়ার সাথে নেপাল বা ভুটানের যে চুক্তি ছিল ওর ধারাগুলোই কপি করে; যেন স্বাধীন ভারত পুরান বৃটিশের জায়গায় এক নতুন “কলোনিয়াল পাওয়ার” হয়ে হাজির। অর্থাৎ কলোনি-শাসনমুক্ত হয়ে যাবার পরেও স্বাধীন “গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নেহেরু তখনও নিজেকে বৃটিশ জুতা পায়ে গলানো এক “কলোনিয়াল পাওয়ার” ভাবছেন।  একালের ভারত বিশেষ করে চলতি মোদীকে ব্যাখ্যা করতে পারতে হলে, নেহেরুকেও বুঝতে হবে। আর তাতে সক্ষম হতে গেলে নেহেরুর এই বিশেষ বৈশিষ্ট পাঠ করতে পারতে হবে। আগা-পাছ-তলা এই নেহেরু আসলে কলোনিয়াল ধরণের সম্পর্ক ও ক্ষমতা প্রতি  প্রবল লোভ এবং চিন্তার ঝোঁকের এক নেহেরু; তাতে তিনি এটা “গণপ্রজাতন্ত্রী” ভারত গড়তেছেন বলে যত চিল্লাই দিয়ে থাকেন না কেন!

ভারত রাষ্ট্রগঠন বা ওর কনষ্টিটিউশন রচনাকালে, ওর বিভিন্ন আর্টিকেল বা ধারায় – নেহেরু এবং তাঁর চিন্তার বন্ধুদের নিজেদেরকে এমন “কলোনিয়াল পাওয়ার” ভাবনা-চিন্তার ছাপ অনেক স্তরেই পাওয়া যাবে। তেমনই গভীর ছাপ ফেলা এক  বিতর্কিত আর্টিকেল হল ৩৫৬; যা কোন নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে ভেঙ্গে দিয়ে ঐ রাজ্যে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির ক্ষমতা সংক্রান্ত।

গত মাসে লোকসভা নির্বাচনের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি নাকি ভীষণ বিপদে আছেন। প্রথম কথা হল, হ্যাঁ বিপদে তো তিনি আছেনই; তার কপালে শনি লেগেছে – লোকসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশ যেদিন হয়েছে সে দিন থেকেই। ভারতের কনস্টিটিউশনের ৩৫৬ হল অদ্ভুত এক আর্টিকেল,  এটাই আপাতত মমতার সেই “শনির বিপদের” নাম। এটা রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে প্রয়োগ করিয়ে মোদির কেন্দ্রীয় সরকার ছলে-বলে-কৌশলে চাইলে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার সুযোগ নিতে পারে। কনস্টিটিউশন অনুসারে এটাই “রাষ্ট্রপতির শাসন”।

ভারতে রাজ্য মানে, সেখানেও নির্বাচিত প্রাদেশিক সংসদ ও সরকার আছে। যারা স্বতন্ত্র টাক্স আরোপ করতে পারে  এবং কনষ্টিটিউশনে সুনির্দিষ্ট করে দেয়া যেসব বিষয় আছে ওর তদারকি করা ও যেসব সার্ভিস জনগণকে দেয়ার আছে , আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ইতাদি এসবই তার কাজের এক্তিয়ার। এছাড়া শহুরে নাগরিক সুবিধা দেওয়ার জন্য আলাদা মিউনিসিপাল্টি ব্যবস্থাও আছে। এখন প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে নাগরিকের কোন অভিযোগ থাকলে এর প্রতিকার পেতে প্রত্যেক রাজ্যেই সর্বোচ্চ আদালত হচ্ছে হাইকোর্ট – সেখানে কেউ নালিশ দিতে পারে। এছাড়া মিছিল মিটিং প্রতিবাদ দিয়ে প্রতিকার দাবি সে তো আছেই। আরও সর্বোচ্চ তবে পরোক্ষ এক পদক্ষেপ হল, নিয়মিত বিরতিতে পরের নির্বাচনে প্রার্থী বা তার দলকে ভোট না দিয়ে শাস্তি দেয়া – সে সুযোগ তো আছে।

কিন্তু এসব সত্বেও আর্টিকেল ৩৫৬ তে রাষ্ট্রপতিকে রাজ্য সরকার ভেঙ্গে দিয়ে রাষ্ট্রপতির শাসন কায়েমের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।এখানে নির্বাহী রাষ্ট্রপতির এই ভুমিকা কার্যত ব্যবহার ও প্রয়োগ হবে কেন্দ্রীয় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীসভার মাধ্যমে। যদিও রাষ্ট্রপতির নিজের ক্ষমতা প্রয়োগ হবে তার প্রতিনিধি রাজ্যপালের মাধ্যমে কিন্তু তা আবার কাজ করবে কেন্দ্রীয় সরকারের পরামর্শে। তাই সোজা সাপ্টা বললে, এটা রাজ্য সরকার ভেঙ্গে দিয়ে এর উপর কেন্দ্রীয় সরকারের দখল নেয়া।

তবে এই আর্টিকেলে এখন কিছু সংশোধনী আনার পর, ছয় মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারকে রাষ্ট্রপতির শাসন জারির সিদ্ধান্তকে কেন্দ্রীয় সংসদে অনুমোদন করিয়ে আনতে হয়। অর্থাৎ এই আর্টিকেল অনুসারে মোদীর সরকার মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দিতে পারে।  আর এখন কেন্দ্রীয় সংসদে মোদীর নিজ দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে বলে এটা কোনো ব্যাপারই নয়। এই চর্চা ভারত-রাষ্ট্রের জন্মের, নেহরুর আমল থেকেই এভাবে চলে আসছে। দেখা গিয়েছে যখনই মোদী-মমতার মত রাজ্যসরকার আর কেন্দ্রীয় সরকার একই দলের থাকে না, তখনই এই অসুস্থ চর্চা শুরু হতে দেখা যায়। ১৯৪৯ সালে ভারতে কনষ্টিটিউশন কার্যকর হওয়ার পর থেকে এপর্যন্ত মোট ১১৫ বার এভাবে এই আইন প্রয়োগ করে নানান রাজ্যে সরকার ভেঙ্গে দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে ১৯৭৫-৭৯ সালের মধ্যে ২১ বার, আর ১৯৮০-৮৭ সালের মধ্যে ১৮ বার। এর বেশির ভাগটাই নেহেরু বা কংগ্রেস ব্যবহার করেছে। যেটা এখন করছে বিজেপির মোদী।

একবার ক্ষমতা নিলে পরে এটা ছয়মাস করে করে বাড়িয়ে তিন বছর পর্যন্ত রাখা যায়। যদিও পাঞ্জাবে এরচেয়েও বেশি বছর প্রয়োগের “বিশেষ” উদাহরণ আছে। এতে কেন্দ্রের সরকারি দলের আসল সুবিধাটা হল, একবার বিরোধী রাজ্য সরকার ও প্রাদেশিক সংসদ ভেঙ্গে দেওয়ার পর ক্ষমতাসীন দল রাজ্যে নিজস্ব এক অনির্বাচিত সরকার কায়েম করে নিতে পারে। আর পরবর্তিতে ঐ তিনবছর সময়ের মধ্যে কেন্দ্রে্র রাজনৈতিক দল  নিজ ‘সুবিধাজনক’ সময়ে – মানে রাজ্যে যখন নির্বাচন দিলে নিজে জিতে আসবে বলে আস্থা পায় – তখন নির্বাচন করিয়ে নিজ দলের রাজ্যসরকার কায়েমের সবচেয়ে সহজ উপায় হয় এটা। তাই, সদ্য লোকসভা নির্বাচন শেষে ফলাফল প্রকাশের আগেই ২০ মে সুবীর ভৌমিক লিখেছিলেন, “পশ্চিমবঙ্গে প্রেসিডেন্টের শাসন জারির অজুহাত তৈরি করছে বিজেপি!”।

কিন্তু ভারতের কনস্টিটিউশনে কেন এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল, এর পক্ষে যুক্তি কী? যেখানে আমেরিকায় এর কোনো নির্বাহী প্রেসিডেন্ট  ৫০ রাজ্যের আমেরিকার কোন একটায় ক্ষমতা দখল করেছেন, এটা কেউ কল্পনাও করে না। কিন্তু ভারতে ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ জারি খুব কমন অভ্যাস বা চর্চা। এককথায় বললে, সংবিধানের আর্টিকেল ৩৫৬ একটা ব্যাপক ‘অপব্যবহারযোগ্য’ এক দাগী-ক্ষমতা।

প্রথমত এই আর্টিকেল-৩৫৬ ভারতের কনস্টিটিউশনে এল কীভাবে? গত ২০০১ সালে আর্টিকেল-৩৫৬ নিয়ে – বিচারক ও একাদেমিকদের  সমন্বয়ে এক ‘রিভিউ কমিশন’ বসেছিল। ঐ স্টাডির শেষে কিছু সুপারিশ রাখা হয়েছিল। কিন্তু আদৌও আর্টিকেল-৩৫৬ একটা মর্ডান রিপাবলিকের সাথে সামঞ্জস্যপুর্ণ পুর্ণ কী না, ফলে ভারতের কনষ্টিটিউশনে এই আর্টিকেল থাকতে পারে না – অতএব বাতিলের সুপারিশ – এসব প্রশ্নের দিকে তারা যান নাই। [আইন পেশায় একাদেমিক আগ্রহ যাদের তারা এই রিভিউ রিপোর্ট এখানে পেতে পারেন।]  তবে ঐ রিভিউ রিপোর্টে এক জব্বর স্বীকারোক্তি আছে – এই আর্টিকেল-৩৫৬ কেন, কীভাবে এসেছিল সেই জন্ম ইতিহাস প্রসঙ্গে।

সোজা কথাটা হল বৃটিশ-ভারতে বৃটিশেরা ভারতের ঠিক নাগরিক নয় বরং ছিল এক “কলোনি দখলদার শক্তি”। আর কিভাবে বৃটিশ-ভারতকে তারা শাসন করা হবে এনিয়ে ই্ংল্যান্ডের বৃটিশ সরকার অধ্যদেশ জারি করত – সাধারণভাবে এটা “ভারত শাসন আইন [Govt of India Act] নামে পরিচিত, যা বহুবার সংশোধিত হয়েছে। এটার প্রথম ভাষ্য শুরু হয়েছিল “Govt of India Act 1858” দিয়ে। আর অনেকবার সংশোধিত হবার পর শেষেরটা সম্ভবত “Govt of India Act 1935″। এই শেষের (১৯৩৫ সালের) সংশোধনীতেই তারা প্রথম ভারতীয় নেটিভ নিজেরা বড়জোর নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকার গড়তে পারবে, এই অধিকার দিয়েছিল। কিন্তু কঠিন বাস্তব কথাটা হল, কলোনিমুক্ত স্বাধীন ভারত-পাকিস্তান (বাংলাদেশ) এর পটভুমিতে দাঁড়িয়ে দেখলে Govt of India Act মূলত এক দাগী কালো আইন। কারণ এই আইন দিয়ে বৃটিশেরা বৃটিশ-ইন্ডিয়া চালালেও, এই শাসকেরা আসলে তো “কলোনি দখলদার শক্তি”। ফলে অবৈধ। ভারতের নাগরিকেরা তাদেরকে শাসন ক্ষমতার কোন অনুমতি দেয় নাই। ক্ষমতা বৃটিশেরা জবরদস্তিতে নিয়েছে। তাই এই ক্ষমতা অবৈধ।

এখন, এই অবৈধ ক্ষমতা জানত যে সে অবৈধ, বাপ-মায়ের ঠিকানা নাই, ভারতীয় নাগরিকেরা কখনও তাকে শাসন ক্ষমতা দেয় নাই। তাই ১৯৩৫ সালের সংশোধনিতে কেবল তিন প্রেসিডেন্সি ও প্রদেশগগুলোতে, তাই সেই সুত্রে  প্রথম বাংলা প্রেসিডেন্সিতে, ভোটে নির্বাচিত প্রাদেশিক সরকারের আইনগত স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রাদেশিক পর্যায়ে এভাবে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত হতে দিয়ে বৃটিশ শাসকেরা না কোন বিপদে পড়ে এই ভয়ও তাদের মনে উদয় হয়েছিল। কারণ, এই সরকার প্রাদেশিক হলেও কখনও যদি কলোনি দখলদার শক্তি খোদ বৃটিশ কর্তৃত্বকে মানতে অস্বীকার করে বসে – তাহলে কী হবে? অতএব সম্ভাব্য সেটা ঠেকাতে, নিজেরা আশঙ্কা মুক্ত হতে বৃটিশ ভাইসরয়-এর হাতে এক নতুন আইনি ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল যে প্রাদেশিক সরকার নির্বাচিত হলেও তিনি যেকোন সময় নির্বাচিত ঐ সরকার ভেঙ্গে দিতে পারবেন। Govt of India Act 1935 এর আইনে এটাই ৯৩ ধারা।

শুরুতে বলেছি নেহেরু আর তার বন্ধুরা  কলোনিয়াল “দাগী ক্ষমতা” খুবই পছন্দ করত, বৃটিশেরা কলোনি ত্যাগ করে চলে গেলেও এরা নিজেদের  “ভাইসরয়” ভাবতে চাইত। তাই তাঁরা Govt of India Act 1935 এই আইনের ৯৩ ধারাটাকে ভারতের নতুন কনষ্টিটিউশনে কপি করে তুলে এনে ঢুকিয়ে ফেলেছিল। এটাই নতুন নামে, আর্টিকেল ৩৫৬। আমাদেরকে পরিস্কার থাকতে হবে আগের ৯৩ ধারা ছিল কলোনি দখলদার শক্তির পক্ষে শাসিত নেটিভেরা যেন স্বাধীন হয়ে যায় তা ঠেকানোর জন্য তাদের উপর বৃটিশদের অবৈধ দখলদারি জারি রাখার আইন। অথচ ১৯৪৯ সালের ভারত সে তো তখন স্বাধীন মর্ডান রিপাবলিক মানে গণপ্রজাতন্ত্রী ভারত রাষ্ট্র। তাই কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক কোন কলোনি দখলদার শক্তির, ক্ষমতা-সম্পর্ক আর নয়। কিন্তু তবু আমাদের নেহেরু ও অম্বেদকারের মত তাঁর বন্ধুদের কলোনিক্ষমতার প্রতি প্রীতিভালবাদা ও লোভ এতই তীব্র যে পুরানা অবৈধ দখলদারি জারি রাখার আইন স্বাধীন ভারত রিপাবলিক রাষ্ট্রের কনষ্টিটিউশনে ঢুকিয়ে রেখেছেন অবলীলায়। ঐ রিভিউ রিপোর্টে তাই সোজা স্বীকার ও ছোটখাট কিছু বর্ণনা দিয়ে লিখেছে, “Article 356 is inspired by sections 93 of the Government of India Act, 1935অর্থাত এর সোজাসাপ্টা মানে দাঁড়াল, নেহেরু ও অম্বেদকারেরা কলোনি শাসন ক্ষমতার অনুরাগী ছিলেন। ভারতীয় নাগরিকদের সাথে তাঁরা নিজেদের সম্পর্ককে তারা তাহলে নিজেরা “কলোনি দখলদার শক্তি” ভেবে নিয়েছিলেন। তাই একটা “কলোনি শাসিত রাষ্ট্র” আর একটা “স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র” এদুইয়ের কোন ফারাক তারা দেখতে পান নাই, ফারাক করেন নাই। স্বাধীন রিপাবলিক ভারতে অবলীলায় আর্টিকেল ৩৫৬ ঢুকিয়ে রেখেছেন। যে আর্টিকেল কেন্দ্রীয় সরকার যেকোন রাজ্য সরকারকে উলটে দিতে পারে এই “উপনিবেশী ক্ষমতা” জারি রেখেছে।

এখানে মজার দিক হল, রাষ্ট্রপতি কী অজুহাতে রাজ্য সরকার ভাঙতে পারবেন – সেই ভাষাটাই দখলদারের ভাষা। এর সাধারণ লক্ষণ হল, এই ক্ষমতা প্রয়োগের অজুহাতের কথাগুলো দেখা যাবে অস্পষ্ট, আবছা রেখে দেওয়া হয়ে থাকে। যেমন আর্টিকেল-৩৫৬ তে বলা হয়েছে, রাজ্যে “সরকার চালাতে পারেনি” বা “সরকার কনষ্টিটিউশন অনুসারে পরিচালিত হয়নি” বলে রাষ্ট্রপতির মনে হলেই হবে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট কী দেখতে পেলে রাষ্ট্রপতি এমন মনে করবেন তা উহ্য রেখে দেখা হয়েছে। এভাবে ‘আবছা’ রেখে দেয়াতেই ইচ্ছামতো রাষ্ট্রপতির (কার্যত কেন্দ্রীয় সরকারের) পদক্ষেপকে ব্যাখ্যার সুযোগ রেখে দেয়া থাকছে। বলা হয়ে থাকে নেহরু রাজ্য সরকারগুলোকে নিজের, মানে কেন্দ্রের ‘নিয়ন্ত্রণে রাখতেই’ এভাবে বৃটিশ শাসকের মত ক্ষমতা পেতে আর্টিকেল-৩৫৬ লিখিয়েছিলেন। আর এখান থেকেই ভারতে ‘কেন্দ্র বনাম রাজ্য’ যে গভীর দ্বন্দ্ব আছে, এর এক অন্যতম উৎস হয়ে আছে আর্টিকেল-৩৫৬।

নিষ্কলঙ্ক ক্ষমতা বা ডিফাইন্ড (defined) পাওয়ার
রিপাবলিক মানে, রাজতন্ত্র অথবা কলোনি দখলি শাসনের বিপরীতে এক উপযুক্ত বিকল্প ধারণা। কলোনি দখলদারি ক্ষমতার বিপরীতে এক ‘গণসম্মতির’ ক্ষমতা। রিপাবলিক রাষ্ট্রগঠনের সময়  অভিজ্ঞতালব্ধ একটা গভীর মৌলিক ধারণা মেনে চলা হয়ে থাকে। তা হল – যে কোন ক্ষমতাকে অবশ্যই “ডিফাইন” করে রাখা ক্ষমতা হতে হবে। তা না হলে এটা দাগী ডাকাতের মত “দাগী ক্ষমতা” বা ‘ডেসপটিক পাওয়ার’ [Despotic Power] তৈরি করবে বা হাজির হবে। তাই ডিফাইন করা বলতে এখানে বুঝতে হবে – কোন ক্ষমতার উৎস কী, ক্ষমতা কে তাকে দিল  মানে কোথা থেকে পেয়েছে [how the power is drawn], অথবা কিভাবে এই ক্ষমতা হাজির হয়েছে – তা স্পষ্ট ব্যাখ্যা ও যথেষ্ট বর্ণনায় পরিস্কার করে রাখা হতে হবে। নাগরিকদের যে সম্মিলিত ক্ষমতা আছে তা থেকে উৎসারিত এক গণসম্মতি প্রকাশিত হলে; এভাবে তৈরি হওয়া ক্ষমতা কাউকে অনুমোদন দিলে, সেটাই “গণসম্মতির ক্ষমতা”। এটা ডিফাইনড ক্ষমতা। নিজ ক্ষমতার উৎস নিজেই স্পষ্ট বয়ান করতে পারে এমন ক্ষমতা। এটাই রিপাবলিক রাষ্ট্র ক্ষমতা।

আর্টিকেল-৩৫৪-এর অস্পষ্টতার দিক হল – কী হলে বা কী দেখলে রাষ্ট্রপতি বুঝবেন, ওই রাজ্য সেখানকার “সরকার চালাতে পারেনি”? বলা হয়েছে, [……government of the State cannot be carried on in accordance with he provisions of this Constitution]। কিন্তু মানা যে হয়নি তা কী দেখে রাষ্ট্রপতি বুঝবেন তা সুনির্দিষ্ট করে উল্লেখ নাই। এ পর্যন্ত এই আর্টিকেল ব্যবহার করে রাজ্যসরকার ভেঙে দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে কমন অজুহাত দেখা গেছে – “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি”। কিন্তু কী দেখিয়ে বুঝা বা বুঝানো হয়েছে যে, কোনো “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি” ঘটেছে? সাধারণত এর প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়, শহরে কোনো দাঙ্গা হয়েছে কি না অথবা তাতে কতজনের মৃত্যু হয়েছে, সেই ফিগার। এই সেই কমন অজুহাত। এটা আবছা রাখা হয়েছিল কারণ বৃটিশ কলোনি শাসকদের তো এমনটাই দরকার যাতে যেকোন অজুহাত তুলে নিজেদের অবৈধ ক্ষ্মতার নিয়ন্ত্রণ জারি রাখা যায়।

এজন্য এই আর্টিকেলের সবচেয়ে নেতিবাচক দিকটা হল, যদি কোনো রাজ্যে ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি’ বলে দাবি ওঠে তবে তা যাচাইয়ের জন্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট কোনো লিগ্যাল বডি বা কনস্টিটিউশনাল আদালতকে দিয়ে তা যাচাই, এমন কোন সুযোগ ৩৫৪ আর্টিকেলে রাখা নাই। অর্থাৎ জুডিশিয়াল যাচাই না, বরং প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা কেবল নিজে “মনে করলেই” হবে, ফলে দেখাই যাচ্ছে এটা অবাধ এক খেয়ালি – আন-ডিফাইনড [un-defined] ক্ষমতা। প্রেসিডেন্টের নির্বাহী ক্ষমতা, যা কার্যত প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা – এই দলীয় ক্ষমতার (মোদী) তার বিরোধী (মমতা) রাজনীতিকে দমনের এমন সুযোগ ছেড়ে দেয়ার কারণই নেই। তাই স্বাধীন ভারতের জন্মের পর থেকে এটা অপব্যবহার করে গেছে কংগ্রেস আর এখন তা মোদীর হাতে এসেছে।

এদিকে ভারতীয় মনও এই অপব্যবহার দেখতে এতই অভ্যস্ত যে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকে অনেকেই আশঙ্কা করছিল, কবে পশ্চিমবঙ্গে কোথায় দাঙ্গা লাগানো হছে বা হয় কি না। যেকোনো সাধারণ নির্বাচনের পরে যেখানে রাজনৈতিক দলগুলো ও প্রশাসনের এক কমন প্রয়াস দেখা যায়, নির্বাচনকালে তৈরি হওয়া উত্তেজনা ও জন-বিভক্তিগুলোকে এবার বিদায় দেয়া। কিন্তু অন্তত পশ্চিমবঙ্গের বেলায় এটা ছিল অনুপস্থিত। মূল কারণ, মোদী-অমিত অস্থির হয়ে মুখিয়ে আছেন মমতাকে এখনই সরিয়ে কীভাবে রাজ্য সরকার দখল করা যায়; অথচ পরের বিধানসভা নির্বাচন ২০২১ সালে।

‘সন্দেশখালি’ ইস্যু
রাজ্যে “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি” হয়ে গেছে অথবা সরকার “রাজ্য চালাতে পারছে না” – এই অজুহাত তুলে “রাষ্ট্রপতির তা মনে হওয়ানোর” রাজনীতি চলছে এখন পশ্চিমবঙ্গে। লোকসভা নির্বাচন শেষ হওয়ার পর এভাবে অজুহাত তুলার যে মঞ্চ প্রথম তৈরি করা হয়েছিল এমন মোক্ষম কেস হল – “সন্দেশখালি” ইস্যু। উত্তর চব্বিশপরগনা জেলার এক এলাকার নাম সন্দেশখালি। সেখানে তৃণমূলের মিছিলে বিজেপির হামলাজনিত সংঘর্ষে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। বলাই বাহুল্য, ঘটনার পরস্পরবিরোধী বয়ান আমরা এখানে পাবো। এছাড়া এখানে ঠিক কতজনের মৃত্যু হয়েছে, এই ফিগার যেহেতু রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের সাফাইয়ের জন্য বড় ফ্যাক্টর – তাই ওই দাবি বেড়ে পরে হয়েছে আটজন। এর ওপর আবার বিজেপির নিখোঁজ বলে  দাবি ১৮ জন পর্যন্ত উঠেছে।

হামলার ঘটনার সেই সন্ধ্যাতেই নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও বিজেপি সভাপতি অমিত শাহের কাছে কলকাতার বিজেপি নেতারা সরাসরি রিপোর্ট করেছেন, সেকথা টুইটও করেছেন। এরপর প্রায় ৭০ বছর ধরে রাষ্ট্রপতিরা যেভাবে অপেক্ষা করেছেন, সেভাবেই এবারের অপেক্ষমাণ রাষ্ট্রপতিও কলকাতার রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর কাছে রিপোর্ট চাইলে তিনি দিল্লি গিয়ে রিপোর্ট পেশ করেন এবং মোদী-অমিতের সাথে দেখা করেছেন।

মৃত্যুর ফিগার যথেষ্ট বড় নয়
তবে খুব সম্ভবত ঘটনা শুনেবুঝে বিজেপির মনে হয়েছে, রাষ্ট্রপতি শাসন কায়েমের জন্য মৃত্যুর এই ফিগার যথেষ্ট নয়। এছাড়া শুরু থেকেই সমস্যা হল, বিজেপির এখনকার ম্যাজিক্যাল নেতা মুকুল রায়, হামলার সন্ধ্যাতেই নিজ টুইটে সংখ্যা বলে ফেলেছিলেন মাত্র তিনজন, [3 BJP workers shot dead……]। এ ছাড়া তৃণমূলের ক’জন মারা গেছে সেই সংখ্যা তিনি উল্লেখ করতে পারছেন না। ওদিকে রাজ্যপাল দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে দেখা করার পর মিডিয়ায় “রাষ্ট্রপতি শাসনের পক্ষে দিল্লির আপাত নেতি” অবস্থানের ধারণা দিয়েছিলেন। ১১ জুন আনন্দবাজার লিখেছে, প্রথমে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে রাজ্যপাল কেশরী বলেছিলেন, “এটি (৩৫৬ ধারা জারি) আমার এখতিয়ারের মধ্যে পড়ে না”। কিন্তু পরে একটি বৈদ্যুতিক সংবাদমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “(৩৫৬ ধারা জারি) হতেও পারে। যখন দাবি উঠবে, তখন কেন্দ্র তা ভেবে দেখবে”।

ওদিকে মৃত্যুর ফিগার নিয়ে ঝগড়াটা ‘ন্যাংটা’ হতে চলছিল। এক সাক্ষাৎকারে রাজ্যপাল বলেন, তিনি “নির্বাচনোত্তর হিংসায় ১২ জন প্রাণ হারিয়েছে বলে অমিত শাহকে জানিয়েছেন। অথচ মমতার অফিসের তথ্য অনুযায়ী, লোকসভা ভোটের পর দিনহাটা, নিমতা, সন্দেশখালি, হাবড়া ও আরামবাগে পাঁচজন তৃণমূল কর্মী এবং সন্দেশখালিতে দু’জন বিজেপি কর্মী মারা গেছেন। তাই তৃণমূল প্রশ্ন তুলেছে, “নিয়মমাফিক রাজ্যসরকারের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতেই রাজ্যপালের রিপোর্ট পাঠানোর কথা। কিন্তু এখানে বিজেপির দেয়া সংখ্যাকে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে”। তাই ঘটনার সারাংশ হল, সন্দেশখালি যথেষ্ট নয়, আরো ইস্যু লাগবে। ফলে  দ্বিতীয় ইস্যুতে চেষ্টা, যাতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সাফাইটা এবার শক্তভাবে পাওয়া যায়।

হাসপাতাল ইস্যু
দ্বিতীয় ইস্যুকে আমরা “হাসপাতাল ইস্যু” বলতে পারি। এটা আপাতত অনেক ছোট ইস্যু, কিন্তু বিরাট করে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। এ ছাড়া ঘটনা আমাদেরও খুবই পরিচিত। কলকাতার (রাজ্য পরিচালিত) প্রাচীন সরকারি হাসপাতাল – নীল রতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। এখানে “ডাক্তারের অবহেলায় রোগীর মৃত্য” হয়েছে – এজাতীয় উত্তেজনায় ডাক্তারের মাথা ফাটিয়ে দেয়া, তা থেকে ডাক্তারদের ধর্মঘট – এই হল মোটাদাগে বলা কাহিনীটা। ঘটনা ছিল আসলে আরো ছোট। এক রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ায় জুনিয়র ডাক্তারদের পরামর্শে রোগীর আত্মীয় কোন সিনিয়র ডাক্তার খুঁজে আনতে বের হন। কিন্তু কয়েকজনকে অনুরোধ করে, অপমানিত হয়েও  আনতে না পেরে শেষে একজন সিনিয়রকে একটু জোরাজুরি করে কব্জিতে ধরে তাকে আনেন। এই হলো “মূল অপরাধ”। ইতোমধ্যে রোগীর মৃত্যু ঘটে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে লাশ আনতে গেলে এবার ডাক্তারেরা “ক্ষমা না চাইলে লাশ দেয়া হবে না” বলে জানিয়ে দেন।

এটা আনন্দবাজারের রিপোর্ট। উত্তেজনা-মারামারি যা কিছু তা কিন্তু কেবল এরপর থেকে শুরু হয়েছিল। রোগীর বাড়ি হাসপাতাল থেকে ১০ মিনিটের হাঁটা পথ। তাই ট্রাকে করে লোক জড়ো করে তাঁরা এবার ফিরে আসে। এসে সামনে পড়া দুই জুনিয়র ডাক্তারকে পিটিয়ে আত্মীয়েরা মৃতরোগীর লাশ নিয়ে ফেরত যায়। আর ঐ হামলায় ডাক্তারদের একজনের আঘাত একটু গুরুতর ছিল, তবে এখন তিনি বিপদমুক্ত, তাই হাসপাতালের সাধারণ বেডে আছেন। আর ঞ্ছোট বড় ডাক্তাররা সবাই ধর্মঘটে। কিন্তু সময়টা ‘রাষ্ট্রপতির শাসন জারি’ করার ইস্যু খোঁজার অনুকূল; তাই এখন ‘বিরাট’ ঘটনা বানাতে অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষে ধর্মঘট ডেকে দেওয়া পর্যন্ত বিজেপি ঘটনা গড়িয়ে নিতে পেরেছে।

এসব ক্ষেত্রে  ডাক্তারেরা বা আমাদের পাবলিক মাইন্ডসহ সবাই – ঘটনাকে দেখে থাকে সাধারণত এভাবে যে, ঘটনার জন্য ‘সরকার দায়ী ’ – ঠিক তা নয়, তবে কেন সরকার মধ্যস্থতা করে বা পদক্ষেপ নিয়ে ইস্যুটা তাড়াতাড়ি মেটাচ্ছে না?  কিন্তু “হাসপাতাল ইস্যুতে” ঘটনা এখানে উল্টা। ডাক্তাররা মুখ্যমন্ত্রী মমতাকেই দায়ী করছেন। তাই আনন্দবাজারের রিপোর্টের  শিরোনাম “মুখ্যমন্ত্রী বিবৃতি দিয়ে বলুন, এই ঘটনা আর ঘটবে না, দাবি চিকিৎসক মহলের”। আসলে এই দাবি দেখে বুঝা যাচ্ছে ডাক্তারেরা কত গভীরে বিজেপির কব্জায় চলে গেছে। বিজেপির টার্গেট মমতার বেইজ্জতি, ইমেজ নষ্ট। আর সম্ভব হলে ঘটনাকে পাকিয়ে উঠাতে পারলে, এটাকেই রাষ্ট্রপতি শাসন জারির ইস্যু করা।  কিন্তু ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীকে দায়ী বা অপমান করতে হবে –  বিজেপির এমন ইচ্ছা, এদিকে যেতে পারল কেন? আর সবাই জানে বাস্তবত “এমন ঘটনা আর ঘটতেই পারবে না” এমন প্রতিশ্রুতি কেউ দিতে পারবে না। তবে যাতে না ঘটে এই লক্ষ্যে সিরিয়াস হয়ে কাজ করতে পারেন মুখ্যমন্ত্রী – এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে উত্তেজনা মিটানোর দিকে ঘটনা গেল না কেন?

মৃত রোগী ছিলেন মুসলমান, স্থানীয় মসজিদের ইমাম। আর যারা এসে মাথা ফাটিয়ে লাশ মুক্ত করে নিয়ে ফিরে গিয়েছিল, এদের এই একশনকে নিয়ে ডাক্তারদের মধ্যে একটা বিরূপ কানে-কানে বলাবলি করে এক প্রচার [whispering campaign] হয়েছিল যে, “দেখেছিস, মুসলমানদের কত্ত বড় সাহস!”। “এদের খুব বাড় বেড়েছে” – এধরণের। তবে এঘটনার বহু আগে থেকেই সাধারণভাবে “মুসলমানদের আশকারা” দেয়ার জন্য গত কয়েক বছর ধরে মমতাকে দায়ী করে থাকেন তার সব বিরোধী। কলকাতা বিজেপির ফেসবুক পেজগুলো এই ভাষ্যে ভর্তি থাকতে দেখা যায়। কলকাতাজুড়ে এর মূল প্রকাশ্য ক্যাম্পেইন করে থাকে বিজেপি। আর তৃণমূলবিরোধী সিপিএমসহ বাকি অন্যান্য বেশির ভাগ সব ব্যক্তি ও দল এর প্রতি প্রকাশ্য বা মৌন সমর্থন দিয়ে থাকে। ঠিক একারণের ডাক্তারেরা দাবি করছেন মমতাকেই [মূলত মুসলমানদের সাহস বা বাড় বাড়ানোর পক্ষে তিনি নেপথ্য ব্যক্তিত্ব বলে] মাফ চাইতে হবে। যেমন এই কথাটাই আর একটু নেপথ্যে রেখে হাসপাতালের পরিচালক কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় [মুসলমান শব্দ উচ্চারণ না করে]  বলছেন, “জুলুমবাজদের ক্ষেপিয়ে তোলা” এবং “লেলিয়ে দেওয়া” বন্ধ হবে কবে? কিন্তু তিনি কে কাকে লেলিয়ে দিবার কথা বলছেন? বলতে চাইছেন, মমতা মুসলমানদেরকে লেলিয়ে দিয়েছেন।

মমতা মুসলমানদের “সাহস” “বাড় বাড়ানো” আশকারা দেয়া ইত্যাদি করেছেন কী না – এসব খুবই ঘৃণাবিদ্বেষী ও অরাজনৈতিক বক্তব্য। মমতা কী মুসলমানেরা মুসলমান হন আর যাই হন তিনি কী কিছু নাগরিককে যারা মারজিনাল কোনায় হয়ে পড়েছিল তাদের অধিকার ফিরে পেতে সাহায্য করেছেন? আর সেটা কী কোন নতুন বৈষম্য করে, অন্যদের অধিকার কেড়ে নিয়ে? বা, বেআইনিভাবে? এগুলোই একমাত্র হতে পারে মমতার পদক্ষেপগুলোকে বিচার করার নির্ণায়ক? কিন্তু বিজেপি তা করছে না। তাদের অভিযোগ হল মুসলমানেরা সমাজে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে? কেউ কম বা বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে এটা অরাজনৈতিক বক্তব্য। বিজেপিকে বলতে পারতে হবে এটা মমতার পদক্ষেপ কেন বেআইনি? তা কি কোন অধিকার বৈষম্যের? কিভাবে? সবচেয়ে অধপতিত বিষয় হল, সিপিএম বা কংগ্রেসও বিজেপির উস্কানিতে মৌন বা প্রকাশ্য সমর্থন দিচ্ছে। একই অরাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছে। মমতার কোন পদক্ষেপ – মুসলমানদের কোনায় ফেলে রাখা থেকে বের করে আনা কী অন্য কারও অধিকার কেড়ে নেওয়া? হলে কিভাবে? যদি তাই হয়ও তা নিয়ে হাইকোর্টেও তো যাওয়া যেতে পারে। তা না। সবাই বিজেপির হিন্দুত্ব আর ধর্মীয় মেরুকরণের উস্কানিতে মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করতেই মরিয়া।

কিন্তু ঘটনাবলীর পিছনে বিজেপির সমর্থন ও ততপরতা কত তীব্র তা বুঝবার এক ব্যবস্থা  করেছে আনন্দবাজার। অবস্থা দেখে তারা মন্তব্য করেছে, “এবারই প্রথম হাসপাতালের মূলগেটে তালা দিয়ে ধর্মঘট চলছে। মূলগেটে তালা দেয়া আগে কখনও হয় নাই”। আমাদের অভিজ্ঞতা বলে এসব ক্ষেত্রে হাসপাতালের পরিচালক অথবা প্রশাসনিক স্টাফ নিজে ডাক্তার হলেও তারা কখনই ধর্মঘটে যোগ দেন না। কারণ তারা দায়িত্ববান কর্মকর্তা ফলে বিরোধ মিটাতে দুতয়ালির ভুমিকা তাদের নিতে হয় বলে।  কিন্তু কলকাতায় এসব স্টাফেরাই মূল নেতা, সক্রিয়। অর্থাৎ স্বয়ং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন সাহস যোগান তখন আর কে কাকে পরোয়া করবে!

ওদিকে ক্ষমতা হারিয়ে ক্রমশ শুকিয়ে যাওয়া সিপিএমের এ্মন মরিয়া দশা দেখা গেছিল সেই ২০১৪ সালের শেষে, যখন অমিত শাহ কলকাতায় ঘাঁটি গেড়েছিলেন। বর্ধমানে বোমায় কথিত  জেএমবি, জামাত, বাংলাদেশ, জঙ্গি ইত্যাদি মিলিয়ে যে প্রপাগান্ডা-গল্প যে সব কিছুর সাথে মমতা আছেন – এই প্রপাগান্ডার ঝাঁপি নিয়ে এসেছিলেন অমিত শাহ। সেকালে সিপিএম কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে যে জনসভা ডেকেছিল, তাতে অমিতের দেয়া ঐ একই বয়ানে তারা মমতার বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিলেন। পরে অবশ্য মোদি-অমিত কৌশল বদলান, এই গল্প নিয়ে আর আগাতে চান নাই। এমনকি প্রধানমন্ত্রী মোদীর অফিস থেকে এক বিবৃতি সংসদে দিয়ে বলা হয়েছিল, অমিতের দাবি আর সরকারের অবস্থান এক নয়।

আমাদের প্রথম আলোতেও এমন এক কলকাতার কমিউনিস্টের (শান্তনু দে) লেখা ছাপা হয়েছে, শিরোনাম, “বাঁকের মুখে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি”। তিনি সিপিএম কত ভাল ছিল এর দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন। কিন্তু কলকাতায় ধর্মীয় মেরুকরণ হয়ে যাবার জন্য শেষে বিজেপি না মমতাকেই দায়ী করেছেন। লিখছেন, …… দেশভাগের সময় ও পরে দাঙ্গার ক্ষত। সুপ্ত সেই সাম্প্রদায়িক অনুভূতিকেই উসকে দিয়েছে মমতার রাজনীতি। প্রতিযোগিতার সাম্প্রদায়িকতা। আর এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের আবহে পুরো ফায়দা তুলছে বিজেপি”।কিন্তু বিজেপির ঘোষিত নীতিই যেখানে ধর্মীয় মেরুকরণ সেখানে মমতা কিভাবে দোষী? কারণ সিপিএমও “মুসলমানদের সাহস” বা “বাড় বাড়ানোর” জন্য  মমতাকে দায়ী করার জন্য তৈরি, তাই বুঝা যাচ্ছে এখানে।

যা হোক, “রোগী মুসলমান” বা “মুসলমানদের সাহস!” -এভাবে তোলা ডাক্তারদের সেন্টিমেন্টের পক্ষে প্রথম ইঙ্গিত তুলে হাজির হতে ক্ষেপিয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতা মুকুল রায়। তিনি বলেছিলেন, এর ‘পেছনে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের হাত’ রয়েছে। কিন্তু বিজেপি রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ সরাসরি ঘটনা ক্যাশ করার লোভ না সামলে বলে বসেন, “হামলাকারীরা সেই সম্প্রদায়ভুক্ত, রাজ্যে যাদের ২৭ শতাংশ ভোট রয়েছে। হাসপাতালসহ রাজ্যে যেকোনো গোলমালের নেপথ্যেই ওই সম্প্রদায় রয়েছে”। মমতার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি আরো বলেন, “তৃণমূল সরকার ওদের দিয়ে অপরাধ করাচ্ছে। অনুরোধ, তৃণমূলের পাতা ফাঁদে পা দেবেন না”।

তবে ডাক্তাররা বিজেপির চেয়ে বুদ্ধিমান থাকতে চেয়েছেন। তাই এবার প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে বিজেপির অবস্থানকে ‘ধিক্কার’ জানিয়ে তারা বলেন, “যারা আক্রমণ করে তারা সমাজের দুষ্কৃত। এখানে কোনো জাতি-ধর্মের বিচার নয়”। ওদিকে কংগ্রেস-সিপিএমও এই দায় না নিয়ে বিবৃতি দিয়েছে। কলকাতার হাসপাতালে রোগী-ডাক্তার এই সঙ্ঘাত প্রায় আমাদের দেশের মতই। অথচ এর সবচেয়ে সহজ ও আসল সমাধান হতে পারত – সবপক্ষকেই যার যার আচরণ এক জবাবদিহিতার মধ্যে আনা। প্রথম কাজ, রোগী বা তার আত্মীয়দের মনে সত্য বা মিথ্যা যত ক্ষোভই থাক তাকে বের হতে ‘জানালা খুলে দেয়া” [ventilation]। এ জন্য হাসপাতালের পরিচালকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে “তদারকি ও সান্ত্বনাদান” জাতীয় উইং খোলা যেতে পারে। এর মূল কাজ হবে রোগীর আত্মীয়দের ক্ষোভ মনোযোগ দিয়ে শোনা। হাসপাতালের কারও গাফিলতি থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়া। এ ছাড়া সময় নিয়ে আর মেডিক্যাল কাউন্সিলকে সাথে নিয়ে  (সর্ট ও লং) দুই ধরনের তদন্তের ব্যবস্থা রাখা। তবে অবশ্যই কেস কিছু থাকবে, যা মূলত হাসপাতালের রিসোর্সের সীমাবদ্ধতার কারণ ঘটেছে, সে অপারগতাগুলো রোগীকে বুঝিয়ে বলার মতো প্রফেশনালদেরকে রাখতে হবে। ফলে মমতাকে দিয়ে প্রতিশ্রুতি আদায় করতে যারা চাচ্ছেন, এরা হসপিটাল ম্যানেজমেন্ট বোঝেন না, তা বলা যাচ্ছে না। কারণ তারা প্রফেশনাল ডাক্তার। বরং উলটা বিজেপির মমতাকে বেইজ্জতি করার প্রোগ্রামে তারা মিশে গেছেন বুঝে না বুঝে।আর মূলত তা ঘটেছে [whispering campaign] এর কারণে।

ডাক্তারের মাথা ফাটানো নিশ্চয়ই কোনো সমাধান নয়। কিন্তু সাবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ – “ক্ষমা না চাইলে মরদেহ দেয়া হবে না”, এটা বলার তাঁরা কে? এটাই তো মূল ক্রাইম। অথচ সরকারি/বেসরকারি কোন ডাক্তার রোগীর আত্মীয়দের এ কথা বলার অধিকার বা এখতিয়ার নেই। আর এ কথা বলে ডাক্তারেরা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া আর দায়িত্বে থাকা অবস্থায় নিজেরাই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ক্রিমিনাল অপরাধ করেছে ।

আর পুরা ঘটনায় ডাক্তারদের মধ্যে, তারা নিজেরা একটা উচ্চ এলিট শ্রেণীর (ধর্মীয় পরিচয় আর গরীব-বড়লোক শ্রেণী পরিচয় এই দুই অর্থেই)- এমন ধারণা কাজ করছে।  বিজেপির প্ররোচনায় ডাক্তারেরা এলিট ভুমিকায় অন্যদের সাথে এই বৈষম্য করে গেছে অবলীলায়। আবার বলা হচ্ছে, ২০০৯ সালে এমনই ঘটনায় এক আইন প্রচলন করা হয়েছিল যে, “হাসপাতালে এমন হাঙ্গামা করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে”। তাই ডাক্তারদের সঠিক পদক্ষেপ হত বড়জোর পুলিশের কাছে যাওয়া মামলা করা, আইনের আশ্রয় নেয়া। বাস্তবে কিন্তু  রোগীর সেই হামিলাকারি আত্মীয়ের নামে মামলা হয়েছে, এখন সে জেলে আটক আছে। এছাড়া আর এক গুরুত্বপুর্ণ তথ্য যে, রোগীর আত্মীয়রা স্থানীয় থানা থেকে পুলিশ নিয়ে এসে পুলিশকে দিয়ে লাশ ছেড়ে দিতে ডাক্তারদের অনুরোধ করিয়েছিলেন, কিন্তু ডাক্তাররা তবু লাশ আটকে রেখেছিলেন। [এন্টালি থানার পুলিশ গিয়ে চিকিৎসকেদের বোঝান। তাতেও পরিস্থিতি পাল্টায়নি। ] তাদের এই উদ্ধত্ব দেখে বুঝা যায় বিজেপি কী পরিমাণ ডাক্তারদের বেপরোয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন করে তুলেছে। খোদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি পিছনে থাকলে – যারা নিজেরাও একটা রাষ্ট্রপতির শাসন জারির জন্য বেপরোয়া – এসব মিলিয়ে সবকিছুই বেপরোয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন না হলে সেটাই অস্বাভাবিক হত।

অর্থাৎ বিজেপি ডাক্তারদের এতই প্রটেকশন দিয়ে বেপরোয়া হতে উসকানি দিয়েছিল যে, তারা তাদের আইনি সীমা ও দায় সব ভুলে গেছিলেন। ওই দিকে কলকাতার কমিউনিস্ট ভাইয়েরা, তারাও ডাক্তারের পক্ষে, মানে নির্বাচনকালের মতই বিজেপির পাশে দাঁড়িয়েছে। তারা ভাবছেন, হাসপাতাল ইস্যুতে মমতার ইমেজ ভাঙলে তাদের দিন ফিরবে।

না ফিরবে না। এবারের নির্বাচন তাদের কেটেছে নিজের দলীয় পরিচয়ে, কিন্তু বিজেপির ক্যাম্পে বসে। এই সহযোগিতায় বিজেপি এবার একলাফে ১৮ আসন পেয়েছে। আর কমিউনিস্টদের ভোট গিয়ে ঠেকেছে ৭%। এটাই তাদের শেষ কমিউনিস্ট পরিচয়। কারণ, ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচনে এই নেতাকর্মীরা নির্বাচন করবেন সরাসরি বিজেপি নাম নিয়ে, এটা দেখতে পাবার সম্ভাবনাই প্রবল। কারণ বাস্তবতা হল, কমিউনিস্ট পরিচয়ে আর না আছে আইডিয়ার ধার বা ভার, না আছে পকেটে টাকা। বরং পকেট ভরা টাকা আছে বা দিবে বিজেপি। এ ছাড়া বিজেপিতে যোগ দেয়া খারাপ, এটা বলার মত নৈতিক সাহসও কমিউনিস্ট নেতাদের আর নেই। কাজেই…।

বিজেপি কতদুর বেপরোয়া হয়ে গেছে এর এক উদাহরণ হল, মমতাকে নিয়ে বিহার রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নীতিশ কুমারের মন্তব্য। তিনি নিজের আঞ্চলিক দল জেডিইউ এর সভাপতি। তার দল গত রাজ্য নির্বাচনে (২০১৬ সালে) বিজেপিবিরোধীদের সাথে নির্বাচনি জোট করে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। পরবর্তিতে তিনি মেরু বদল করে বিজেপির জোট যোগ দিয়েছেন। আর এখন বিজেপির কোলে উঠে একেবারে সরাসরি বিজেপির মুসলমান-বিদ্বেষী রাজনীতি করছেন। তিনি মন্তব্য করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের (Mamata Banerjee) নেতৃত্বে পশ্চিমবঙ্গ “মিনি পাকিস্তানে”(mini Pakistan) পরিণত হয়েছে। শুধু তাই না, রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে  “বিহার থেকে “রোহিঙ্গারা” বিহারিদের তাড়িয়ে দিয়েছে বলে মন্তব্য” করল তার বিহারে এনডিএ-সরকারের মূল দল জেডিইউ (JDU)। মোদীর মন পেতে ইসলামবিদ্বেষের যেকোন পর্যায়ে নামতে তিনি রাজি। ভারতের রাজনীতির অভিমুখ কোনদিকে এরই এক প্রতীকী প্রকাশ এটা।

মমতারও দোষ, ভুল বা গোঁয়ার্তুমিও যে নাই তা নয়। ডাক্তারদের পিছনে বিজেপি-সিপিএমের সমর্থন আছে কিন্তু এদেরকে বহিরাগত বলে ঘটনা তার দিকে ফিরে নাই। আবার চার ঘন্টার মধ্যে ডাক্তারদের কাজে যোগ দিতে বলাও তার বিরুদ্ধে গিয়েছে। প্রশাসক আর রাজনৈতিক নেতার ভুমিকা মাখায় ফেলেছেন তিনি। উচিত ছিল কেবল মুখ্যমন্ত্রীর ভুমিকায় থাকা, তাহলে ফল পেতেন। এছাড়া গত পঞ্চায়েত ভোটে ৩৪ শতাংশ ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা’র কাফফারাও আছে। তবে হাসপাতাল ইস্যুতে মমতার আপোসী ধারার আর একটা সফট লাইন কার্যকর আছে বলেই মনে হচ্ছে – মেয়র ফিরহাদ, তার ডাক্তার মেয়ে, আর মমতার আরেক ডাক্তার ভাইপো প্রমুখের মাধ্যমে। সম্ভবত হাসপাতাল ইস্যু তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবহার করার আগেই তিনি আপসে এসব মিটিয়ে দিতে চেষ্টা করবেন। এতে বিজেপি্র হাতে তাঁকে কোণঠাসা করার সব চেষ্টা মাঠে মারা যেতেও পারে। দেখা যাক, কলকাতায় ‘রাষ্ট্রপতির শাসন’ আনতে ‘হাসপাতাল ইস্যু’ ব্যবহার হয় কি না। নাকি নতুন অন্য ইস্যুর খোজ পড়ে!

সবমিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ইসলাম-বিদ্বেষ ক্রমশ প্রবল হয়ে উঠছে। খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন এর পক্ষে তখন বিপক্ষে লোক দেখতে পাওয়া ত আসলেই কঠিনই হবে! ধর্মীয় মেরুকরণ তাতিয়ে ক্ষমতাদখলের প্রচেষ্টা – এটা সবপক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্থ করবে, এক মারাত্মক আত্মঘাতি পরিস্থিতি আনবে, যা এখন বিজেপি ও গংয়ে্রা আমল করার অবস্থায় নাই। পশ্চিমবঙ্গ ক্রমশ সেই ভয়ংকর দিকে আগাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৫ জুন  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)কলকাতায় রাষ্ট্রপতির শাসনআনার জন্য এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements