নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

নৈতিক ভিত্তি হারানো ভারতের শ্রিংলার সফর

গৌতম দাস

০৯ মার্চ ২০২০, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2Us

 

Shringla’s visit, Independent Online /UNB

ভারত-রাষ্ট্র টিকে থাকার ন্যায়ভিত্তি হেলে গেছে। যেকোনো প্রতিষ্ঠানের নুন্যতম কিছু নৈতিকতা-সম্পন্ন একটা ন্যায়ের ভিত্তি থাকতেই হয়, নইলে সে প্রতিষ্ঠান টিকে না। রাষ্ট্র বা যেকোনো প্রতিষ্ঠান ন্যূনতম একটা ন্যায়ভিত্তির উপর না দাঁড়িয়ে থাকতে পারলে সবার আগে প্রতিষ্ঠান মরাল [moral, নৈতিক শক্তি] হারায়, নৈতিক সঙ্কটে পড়ে যায়। ভারত-রাষ্ট্র সেই সঙ্কটে আটকে গেছে। রাষ্ট্রের অস্তিত্ব প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে গেছে। কারণ, মোদীর ভারত নিজের নাগরিকদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, এবারের দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী, তার সরকার ও দলই এর প্রযোজক বলে অভিযুক্ত। গত ২০০২ সালের গুজরাট ম্যাসাকারের সময় গুজরাট কোনো রাষ্ট্র ছিল না, একালের ভারতও নিছক কোনো রাজ্য নয়, এটা রাষ্ট্র। কাজেই কোনও কিছুই ২০০২ সালের মত ঘটবে না। পুনরাবৃতি ঘটবে না।  এদিকে নরেন্দ্র মোদী দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে এপর্যন্ত মুখ খোলেননি। একটা কথাও বলেন নাই। যে নৈতিক সঙ্কটে ভারত পড়েছে এই নির্বাক থাকায় সেটা আরো জটিল হবে। মোদীর সরকার ভারতের বাসিন্দাদের এই নৈতিক সঙ্কটে ফেলে দিয়ে গেছে যা ক্রমে নাগরিকদের হত্যা ও ম্যাসাকারের দায়বোধের অস্বস্তিতে বেঁধে ফেলবে। তাই সরকারি আমলা হিসেবে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা এসময় বাংলাদেশ সফরে এসে মিথ্যা প্রতিশ্রুতির কথা বলার শক্ত নার্ভ দেখিয়ে ফিরে গেলেন! এটাই তাঁর অর্জন! ওদিকে, সিল্লি ঘটনা বিস্তারিত ঠিক কী ঘটেছে এবং তা কিভাবে, এর ফ্যাক্টসের কিছু এর মধ্যে প্রকাশ পাওয়া শুরুও হয়েছে।

কেন শ্রিংলাঃ
ভারতের পররাষ্ট্র সচিব শ্রিংলা এবার তাঁর দু’দিনের (২-৩ মার্চ) সফরে ঢাকা ঘুরে গেলেন। কূটনৈতিক প্রথা অনুসারে রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের কোনও দেশ সফরের আগে সাধারণত পররাষ্ট্রমন্ত্রী সে দেশ সফরে আসেন। আর তা মূলত নির্বাহী প্রধানের সফরকে নিশ্চিত করার একটা প্রক্রিয়া। এ ছাড়াও, সফরে কেন ও কী কী ইস্যু উঠবে আর তাতে উভয়ের অবস্থান কী হবে এসব চূড়ান্ত করাও এর লক্ষ্য। যদিও এরপরেও অনেক কিছুই থেকে যায়, যাবে বা রেখে দেয়া হয় যা সফরকালে দুই শীর্ষ প্রধানের আলাপে ফাইনাল করা হবে। দেখা যাচ্ছে, মোদীর  বাংলাদেশ সফরের আগে সে উপলক্ষে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে না পাঠিয়ে সচিবকে পাঠিয়েছিলেন। সেটা কোনো দোষ বা বড় ব্যতিক্রমের বিষয় না হলেও, অনুমান করা যায় সেটা ঘটেছে এই বিবেচনায় যে, ঢাকায় শ্রিংলার ‘তাজা বন্ধু’ অনেক বা তাঁর অন্য ভারতীয় কলিগদের চেয়ে তিনি এগিয়ে। কারণ, এই তো গত বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার হিসেবে তিন বছর কাটিয়ে  তিনি এদেশ ছেড়ে গেছেন। তার সেসব তৎপরতা ও স্মৃতি এখনো তাঁর অন্য প্রতিদ্বন্দ্বি কলিগদের সবার চেয়ে বেশি ‘তাজা’ বলে আর তখন যেসব বিশেষ খাতিরের সম্পর্ক তিনি জমিয়েছিলেন, তা এখন কাজে লাগানোর বিচারে তিনি অবশ্যই ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর চেয়ে এগিয়ে।
এদিকে ভারত-বাংলাদেশ নাকি “ঘনিষ্ট বন্ধুদেশ’  গভীর ‘বন্ধুরাষ্ট্র’ অথবা কখনোবা বলা হচ্ছে এরা নাকি ‘স্বামী-স্ত্রী’ অথবা আরো কত কী যেগুলো সত্যিই ইউনিক, একেবারে তুলনা নাই। দুনিয়ার কোনো কূটনৈতিকপাড়ায় এমন অকূটনৈতিক অর্থহীন ও বোকা বোকা শব্দের ব্যবহার নেই। যদিও তা আসলে বাংলাদেশকেই গায়ে পড়ে নিচে দেখানো ছাড়া আর কিছু নয়।

পশ্চিম এখন বুঝছে ‘হিন্দুত্ব’ কেন হুমকির বাপঃ
এই পটভূমিতে, শ্রিংলাকেই বেছে পাঠানোর এই ঘটনা – মোদীর ভারত যে ভালই বিপদে আছে এর আরেকটা প্রকাশ। শ্রিংলাকে এমন একটা সফরে আসতে হয়েছে যখন দুনিয়াজুড়ে মোদীর ভারতরাষ্ট্র নাগরিকের হিউম্যান রাইট রক্ষার দিক থেকে একটা ব্যর্থ রাষ্ট্র। এদিক থেকে অকার্যকর হয়ে পড়ার সঙ্কটে পড়া এক রাষ্ট্র বলে ভারতকে দেখা হচ্ছে।  এধরণের ব্যর্থতাবিষয়ক মামলায়  জাতিসঙ্ঘ হিউম্যান রাইটস সংগঠন [UN-OHCHR] এই ব্যর্থতা নিয়ে আদালতের শুনানিতে অবজারভার হতে চেয়েছিল। আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে এমিকাস কিউরি (amicus curiae OR  “friend of the court”] হতে চেয়ে চিঠি দিয়েছিল। কিন্তু মোদী আগাম ভয় পেয়ে, আপাতত এটা তাঁর দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের কারণ হবে এই অজুহাত তুলে সব প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে এবং তেমন আলোকে বিবৃতি দিয়ে বাঁচতে চেয়েছেন। এছাড়া অন্যদিকে জাতিসংঘের অবজারভার হয়ে চাওয়াকে মিথ্যা করে প্রপাগান্ডা করে বলা হচ্ছে তারা নাকি মামলায় আবেদনকারি বা পিটিশনার হয়ে চেয়েছে। এনিয়ে দক্ষিণের দৈনিক দ্যা হিন্দুর নিজ লেখা সম্পাদকীয় আগ্রহীরা পরে দেখতে পারেন।

এদিকে নাগরিক অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ ভারত-রাষ্ট্রে নিয়ে আলোচনা পশ্চিমে এখন আর সংসদীয় কমিটির ছোট্ট পরিসরে আর নয়। মুসলমান হত্যার মোদীর ভারতকে সামলাতে এখন পশ্চিম সরাসরি স্ব স্ব পার্লামেন্টের সব সদস্যকে নিয়েই মোদী-অমিতের তান্ডব আর হুমকি নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে।  ব্রিটিশ পার্লামেন্টে BRUT Debate বা আমেরিকার সংসদে (প্রতিনিধি পরিষদে) দিল্লির ম্যাসাকার নিয়ে আলোচনা ও নিন্দা প্রস্তাব এখন একটা হট ইস্যু। ভারত থেকে মুসলমান উদ্বাস্তুর ঢল নামবে কি না আর সেক্ষেত্রে আগাম তা ঠেকানোর উপায় কী, আগানোর কৌশল কী, এটাই মুলত তাদের মাথাব্যথার বিষয়। ভারত ১৩৫ কোটি মানুষের ভোক্তা-বাজারের এর দেশ। কিন্তু এর প্রতি লোভের চেয়েও ওখান থেকে সম্ভাব্য উদ্বাস্তুর ঢল অনেক বেশি বিপর্যয় আনবে, এটাই এখানে মুখ্য দুঃচিন্তা আর হুমকিবোধ।

দিল্লি ম্যাসাকারে মোদী সরকারের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় দিল্লিতে ৫৮ জনেরও বেশি মানুষ, মুসলমান বলে তাদের হত্যা করা হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত এই বিষয় নিয়ে তিনি কোনো কথা, বিবৃতি বা প্রতিক্রিয়া কোনো কিছুই দেননি। প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারের পক্ষ থেকে কোন আশ্বাস, ভিকটিমদের পক্ষে দাঁড়ানো, কোন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বসানো, হামলাকারিদেরকে আইনের আওতায় আনা ইত্যাদি যেগুলো এমন পরিস্থিতিতে সব রাষ্ট্রই নুন্যতম রুটিন কাজ হিসাবে করে থাকে – এমন কোন পদক্ষেপ মোদী নেন নাই।

মোদী-অমিত এখন এতই নিলাজ আর বেপরোয়া যে তাঁরা খোলাখুলিই ভারতের পার্লামেন্টেও কোনো আলোচনা হতে দেয়া হয়নি। অর্থাৎ এতে প্রকারন্তরে ম্যাসাকারের দায় তাদের উপর সরাসরি এলেও তারা বেপরোয়া। অর্থাৎ মোদী তবু মূলত প্রতিক্রিয়া শুন্য। এই প্রতিক্রিয়াহীনতা অ-প্রধানমন্ত্রীসুলভ, তাই অগ্রহণযোগ্য; এমনকি মারাত্মক অস্বাভাবিক। আর এটাই মোদীর আর তাঁর সরকারের এতে গভীরভাবে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগকে তীব্র করছে। এছাড়া এটাই  তাঁর সরকারকে মূল্যবোধ, নৈতিকতার এক বিরাট সঙ্কট তৈরি করেছে।  আরও বড় কারণ হল, আপনি মুসলমান হলেই আপনাকে দেশদ্রোহী ট্যাগ লাগানোর পর এবার তাই আপনাকে নিপীড়ন করে হত্যা করা জায়েজ – এই হল এখনকার নয়া নরমাল রাষ্ট্রীয় নৈতিকতা। এটা ভয়ঙ্কর!

অর্থাৎ মোদীর সরকার এখন নাগরিক বৈষম্যহীনতা কায়েম করা দূরে থাক,  ন্যূনতম ন্যায়নীতি পালন ও রক্ষারও অযোগ্য – এমন এক পরিচয় তুলে ধরতে বেপরোয়া হয়েছে। অথচ শ্রিংলার বিপদ হল, এই নৈতিকতার সঙ্কটে থাকা সরকারকেই প্রতিনিধিত্ব করতে তাকেীই সময় বাংলাদেশে আসতে হয়েছে। তাও আবার যেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ লোক মুসলমান।

এসব বিচারে ভারতের হর্ষবর্ধন শ্রিংলাকে আমরা দেখছি তিনি ব্যাকফুটে ও নিষ্প্রভ। তা না হয়ে তার উপায় কী? এমনকি শ্রিংলার ঢাকায় থাকা অবস্থায় ৩ মার্চ আনন্দবাজারের এক রিপোর্টও তার সঙ্কটকে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ পত্রিকা শিরোনাম করেছে বেসুরো ঢাকায় সফর শ্রিংলার“- আর তাতেই শ্রিংলার দফা-রফা। লিখেছে, “সিএএ-এনআরসি বিতর্কের প্রভাব পড়েছে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে। দিল্লির হিংসা, সেই ক্ষোভে ইন্ধন জুগিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। সে দেশের মন্ত্রী-পর্যায়ের একাধিক জনের ভারত সফর বাতিল করেছিল হাসিনা সরকার। আজ সেই তালিকায় নতুন সংযোজন, বাংলাদেশের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর নয়াদিল্লি সফর”। এই খবর মোদী ও শ্রিংলার জন্য বিরাট অস্বস্তির সন্দেহ নেই। অবশ্য যদি তারা সেন্সে থাকে!

বাংলাদেশের স্পিকারের ভারত সফর ছিল গত ২-৫ মার্চ। তিনি সফর বাতিলের ঘোষণা দেন মাত্র একদিন আগে, ১ মার্চ; যেনবা শ্রিংলার বাংলাদেশ সফরে আসা নিশ্চিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করছিলেন তিনি। নিশ্চিত হতেই তিনি শেষ বেলায় এসে ঘোষণা দিয়ে দেন। শ্রিংলা ঢাকা আসেন পরের দিন ২ মার্চ। অর্থাৎ শ্রিংলা বাংলাদেশের স্পিকারের সফর বাতিলের কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাননি বা তা পারেননি। মানে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারত “বড়ভাই” সুলভ ডাট দেখাবেন এমন অবস্থা – না ভারতের না শ্রিংলার সে মুরোদ আর অবশিষ্ট আছে মনে হচ্ছে না। এমনই করুণ অবস্থা! অর্থাৎ এটা মেনে নিয়ে হলেও ব্যাকফুটে থাকাতেই স্বস্তিবোধ করছেন শ্রিংলা।

শ্রিংলার সেমিনারঃ
শ্রিংলা ২ মার্চ সকালে বাংলাদেশে নেমেই ভারতীয় হাইকমিশনের সহ-আয়োজক হয়ে আয়োজিত এক সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠক হয়েছিলেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস-বিস) ও ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন যৌথভাবে এই সেমিনার আয়োজন করেছিল। এটা ছিল ‘”বাংলাদেশ ও ভারত : একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ” এই শীর্ষক এক সেমিনার।   কিন্তু এবারের সফরে শ্রিংলার দুর্ভাগ্য যে, তাকে সরাসরি ডাহা অসত্য বলেই পার পেতে হবে, অন্য রাস্তা নেই। তাই তিনি আসলে ঐ সেমিনারে  ভান করলেন যে, এনআরসি ইস্যুটা যেন এখনো কেবল আসামেই সীমাবদ্ধ বা  সেখনেই কেবল আটকে আছে।  তাই শ্রিংলা বললেন, “ভারতের জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) একান্তই অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা প্রতিবেশী দেশে প্রভাব ফেলবে না। ভারতের আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ীই এনআরসি হচ্ছে” – এমন ডাহা মিথ্যা চোখ বুঝে বললেন। অথচ  তাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ যেন সংসদে দাঁড়িয়ে বলেননি যে, তিনি এবার “ভারতজুড়ে এনআরসি করবেন”। অথচ অমিত এটা কোনো জনসভায় বলেননি,  খোদ সংসদে এবং মন্ত্রী হিসেবেই বলেছেন। কাজেই এটা কোনো দলের নয়, ভারতের সরকারি অবস্থান। এছাড়া এটা তো ভারতের কোন বিরোধী দল, এমনকি কোন মিডিয়া মানে নাই। এছাড়া মোদী এমনকি দিল্লিতে নির্বাচনে হারের পরেও বলেছেন, আপাতত এনআরসি বন্ধ রাখা হচ্ছে। আর ভারতজুড়ে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন বা সিএএর বাস্তবায়নে মেতে উঠবেন তিনি।

তাহলে শ্রিংলা কেন এখনও এনআরসিকে ‘আসামের ঘটনা’ বলছেন? ভারতের কোনো রাজনীতিবিদ বা মিডিয়াও তো তার কথা মেনে নেয় না। এযুগে ভারতের সরকারের কে কী প্রতিদিন বলেন তা বাংলাদেশে বসে জানা কি খুবই কঠিন! এনআরসি এখন ভারতজুড়ে বাস্তবায়নের ইস্যু আর এটা এখন এনআরসি-সিএএ ইস্যু। অথচ শ্রিংলা সেমিনারে বলে গেলেন এনআরসি ‘প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায়’ চলছে। তাই তিনি দাবি করলেন, ” … সুতরাং বাংলাদেশের জনগণের ওপর এর কোনো প্রভাব থাকবে না। আমরা এ ব্যাপারে আপনাদের আশ্বস্ত করছি”।  আসলে তিনি জানতেন কেউ তার এ কথা এ দেশে বিশ্বাস করেনি। কিন্তু তবু এই চাতুরী ছাড়া কিইবা তিনি করতে পারতেন? সম্ভবত এত অসহায় অবস্থায় হয়ত তিনি এর আগে নিজেকে দেখেননি!

তিনি আরো বানিয়ে বলেছেন, সিএএ বা “নাগরিকত্ব বিল কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে নয়”।  বলেছেন দ্বিতীয়ত, ‘নির্যাতনের শিকার হয়ে এসে যারা ভারতে আছেন, তাদেরকে দ্রুততার সাথে নাগরিকত্ব দেয়াই এর উদ্দেশ্য এবং তৃতীয়ত, এটা (বাংলাদেশের) বর্তমান সরকারের সময়ের জন্য কার্যকর হবে না। কার্যকর হবে ১৯৭৫-পরবর্তী সামরিক শাসক ও অন্য সরকারগুলোর সময়ে, যারা এখানে সংখ্যালঘুদের সাংবিধানিক অধিকার দেয়নি”। এ কথাগুলো একেবারেই সত্য নয়। কারণ সিএএ আইন প্রযোজ্য হবে বা এর কাট অফ ডেট হল ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪। মানে এর আগে যারা ভারতে প্রবেশ করবে তাদের সবার উপরে প্রযোজ্য হবে। কাজেই কেবল ‘১৯৭৫-পরবর্তী’ সময়টার ক্ষেত্রে  এই আইন প্রযোজ্য হবে এই কথাটাই পুরা ভুয়া, ভিত্তিহীন। বুঝাই যায় হাসিনা সরকারের মন পাওয়া, তাদের খুশি করার জন্য এ কথাগুলো বলা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, সিএএ আইনের মধ্যে তিন দেশে থেকে আসা সম্ভাব্য হিন্দুদের কথা বলার সময় বাংলাদেশের নাম সরাসরি আইনে উল্লেখ করা আছে এবং তা আছে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ বাংলাদেশ সরকার হিসাবে।  কাজেই এটা সরাসরি হাসিনা সরকারকেও ‘নির্যাতনকারী হিসেবে’ অভিযুক্ত করেই আইনটা লেখা হয়েছে।  অথচ, ভারত এখন বাংলাদেশকে অমুসলিমদের ‘নির্যাতনকারী দেশ হিসেবে’ আনুষ্ঠানিক প্রমাণ পেশের আগে না দিয়ে আবার উলটা  আইনের ভাষ্যটা শ্রিংলা বা ভারত সেকথা লুকাতেছেন।  মূলত বাংলাদেশের নাম না উল্লেখ করলে  বিজেপি দলের লাভ হয় না। কারণ  আইনের মধ্যে বিজেপি সরাসরি বাংলাদেশ উল্লেখ করে দিয়েছে এজন্য যে – পশ্চিমবঙ্গে মেরুকরণ করতে বা হিন্দু ভোট সব নিজের রাজনৈতিক ঝুলিতে পেতে এমনটাই বিজেপির দরকার; সেক্ষেত্রে সত্য-মিথ্যাটা যাই হোক।

অভিন্ন ৫৪ নদীর পানি বন্টনের মুলাঃ
বাংলাদেশে এই সফরে শ্রিংলা আরেক বিরাট মুলা ঝুলিয়েছেন – তিস্তার পানি তো বটেই, ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে প্রবাহিত মোট ৫৪ যৌথ নদীর মধ্যে আরো নাকি ছয়টি নদীর পানি ভারত দিবে এই চুক্তি নাকি প্রায় হয়ে যাচ্ছে। এটা শ্রিংলার দাবি। এটা অবিশ্বাস্য আর ভারতকে বিশ্বাস করার মত আমাদের আস্থা তারা অনেক আগেই হারিয়েছে। আসলে ঐ সেমিনারে শ্রিংলা এমন সব কথা বলেছেন, যা দেখেই বুঝা যায় বানানো কথা বলছেন। আর মিথ্যা বলে  মন জয়ের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেছেন, “এটা প্রমাণিত যে, ৫৪টি অভিন্ন নদ-নদীর পানি পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন করার মধ্যেই আমাদের বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থ নিহিত”। এটা কোনভাবেই ভারতের মনের কথা না কারণ এটা ভারত অনুসরণ করে আসছে অথবা এখনও করছে এমন নীতি পলিসিই নয়। এককথায় এখন এটা ভারতের অবস্থানই নয়, এ’পর্যন্ত ভারতের অনুসৃত নীতিই নয়। কার্যত তাদের অবস্থানটাই উল্টা।

আমরা দেখছি ‘পরিবেশের’ কথা তিনি বলেছেন। যৌথ নদীর ক্ষেত্রে পরিবেশ বিবেচনায় টেকনিক্যাল নিয়ম হল, নদীর “অবাধ” প্রবাহ বজায় রাখতে হবে। অথচ এ বিষয়ে ভারতের পরিবেশবোধ শূন্য এবং তাদের ভূমিকা পরিবেশবিরোধী। ভারত বহু আগে থেকেই হয় নদীতে সরাসরি বাঁধ দিয়েছে, না হলে আন্তঃনদী যুক্ত করার মতো চরম পরিবেশবিরোধী প্রকল্প নিয়েছে। আর তাও না হলে নদীর মূল প্রবাহ থেকে বড় খাল কেটে পানি বহু দূরে টেনে নিয়ে গেছে। এই হলো ভারতের কথিত পরিবেশবোধের বাস্তব অবস্থা।
আর টেকসই? নদীর উপর যথেচ্ছাচার যেসব বাড়াবাড়ি ভারতে হচ্ছে তাতে নদীর “অবাধ” প্রবাহ ধ্বংস করে যা কিছু করা হয়েছে সেগুলো একটাও টিকবে না, বরং মূল নদীই শুকিয়ে যাবে ক্রমেই। ফারাক্কা ইতোমধ্যেই এ অবস্থায়। এ ছাড়া ফারাক্কা বাঁধ ভারতের বিহারে প্রতি বছর বন্যার কারণ বলে অভিযোগ উঠছে এখন লাগাতর প্রতিবছর।
আর ন্যায়সঙ্গত বণ্টন? মানে যৌথ নদীর ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনটা কী ? যেকোন যৌথ নদীর ক্ষেত্রে ভাটির দেশের প্রাপ্য, সমান হিস্যা বাংলাদেশকে দিতে ভারত আইনত বাধ্য। এছাড়া আমাদের সম্মতি ছাড়া বাঁধসহ নদীর প্রবাহকে যেকোনভাবে বাধাগ্রস্ত করাটাই বেআইনি। অথচ ভারতের সাথে নদীর পানি বণ্টনের যেকোন আলোচনায় তাদের দাবি অনুযায়ী বণ্টনের ভিত্তি হতে হবে – “ভারতের প্রয়োজন মিটানোর পরে পানি থাকলে তবেই তা বাংলাদেশ পাবে”। মানে তারা হল জমিদার – এই নীতিতেই ভারত চলে। একারণে  প্রায় সব সময়ের বাড়তি যুক্তি হল ‘এবার বৃষ্টি কম হয়েছে। তাই আরো কম পানি পাবে বাংলাদেশ’। অর্থাৎ ভাটির দেশ হিসেবে পানি আমাদের প্রাপ্য এই আন্তর্জাতিক আইনি ভিত্তি তারা কখনও মানে নাই। কথা হল, ভারতের পানির প্রয়োজনের কী কোনো শেষ  থাকবে?
সোজা কথা ‘পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও ন্যায্য বণ্টন’ এই শব্দগুলো শ্রিংলা তুলেছেন- কথার কথা হিসেবে এবং মন ভুলাতে। অথচ না পরিবেশ রক্ষা, না আন্তর্জাতিক নদী আইন – কোনটাই ভারতের চলার ভিত্তি বা সরকারের নীতি নয়। মিথ্যা বলাটা সবাই পারে না, বুক কাঁপে। আসলে শ্রিংলা দেখালেন, পুরো মিথ্যা বানোয়াট কথা বলার মত শক্ত নার্ভ তার আছে। আর সম্ভবত তিনি ভেবেছেন, বাংলাদেশ তবুও তাকে বিশ্বাস করবে বা আস্থা রাখবে – সেটা যাক তাকে মিথ্যাই বলতে হবে!

দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?
আবার ফিরে যাই, এবার দিল্লি জ্বালিয়েছে কারা?  বাংলাদেশে এসে হর্ষবর্ধন শ্রিংলা দিল্লি ম্যাসাকার নিয়ে একটা কথাও বলেননি। এক্ষেত্রে তাঁর অজুহাত সম্ভবত, এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু তাই। কিন্তু বাস্তবতা হল – লাগাতার তিন দিন ধরে এ হত্যাযজ্ঞ বা ম্যাসাকার চলেছে; দিল্লি জ্বলেছে, কমপক্ষে ৫৮ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে। মুসলমানদের বাড়িঘর যতটুকু যা যা বাড়িঘর সম্পদ সব কিছু পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু দিন সবার একভাবে যায় না। এই প্রথম কারা সুনির্দিষ্টভাবে দিল্লি ম্যাসাকার করেছে তার কিছু তথ্য সামনে আসা শুরু হয়েছে।

দিল্লি ভারতের বিশেষ মর্যাদার টেরিটরি, তা সত্ত্বেও ওর ভিতরেই দিল্লি একটা রাজ্য। তাই রাজ্যের ‘বিধানসভা’ নামের একটা সংসদ (প্রাদেশিক পার্লামেন্ট) আছে। সেখানে রাজ্য নিজের জন্য প্রয়োজনীয় আইনও প্রণয়ন করতে পারে, যা কেবল নিজ রাজ্যের ওপর প্রযোজ্য। দিল্লির বিধানসভায় ১৯৯৯ সালে এমনই একটা আইন পাস করা হয়েছিল, যার নাম ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট ১৯৯৯’। ব্যাপারটা তুলনা করে বললে এদিকে বাংলাদেশে একটা ‘মানবাধিকার কমিশন’ আছে। আর তা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট’ অর্থে নির্বাহী বিভাগ থেকে কার্যত স্বাধীন নয়। আইনের মারপ্যাঁচ ও দুর্বলতায় এটা আমাদের নির্বাহী ক্ষমতার মুখাপেক্ষী হয়েই চলে। সে তুলনায় ভারতের অধিকারবিষয়ক বিভিন্ন কমিশনগুলো এত ঠুঁটো নয়। বরং এরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে এবং ভারতের আদালতের পর্যায়ে স্বাধীন। যেমন ভারতের “জাতীয় নারী কমিশন” যথেষ্ট প্রভাবশালী ও কর্তৃত্ব রাখে। তেমনি ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন অ্যাক্ট’-এর অধীনে দিল্লি রাজ্য সরকার এক ‘দিল্লি মাইনরিটি কমিশন’ (ডিএমসি) গঠন করে রেখেছে। এখানে ঘোষিত মাইনরিটি হল, – The notified Minority Communities, as per the Act, are Muslims, Christians, Sikhs, Buddhists and Parsis.। আর এর মূল কাজ হল, ‘সংখ্যালঘু বা মাইনরিটিদের অধিকার ও স্বার্থ সুরক্ষা’ [To safeguard the rights and interests], যা যা ভারতের কনষ্টিটিউশন মাইনরিটিদেরও নাগরিক অধিকারে সমতা-সাম্য বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই DMC কমিশনের ক্ষমতা পুরোটাই আদালতের পর্যায়ের না হলেও তারা অনেক ক্ষমতাই রাখেন। যেমন গত ২৫ ফেব্র“য়ারি রাত থেকে নর্থ দিল্লিতে কার্ফু জারি করতে তারাই  অনুমোদন দিয়ে চিঠি দেওয়াতে পুলিশ তা বাস্তবায়নে বাধ্য হয়েছিল।

গত ২৬ ফেব্রুয়ারির পরে ম্যাসাকার, তান্ডব কমে আসলে পরে, সেই ডিএমসি সরেজমিন দিল্লির ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা সফর শেষে তাদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। এছাড়া অচিরেই একটা “ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি” গড়ে তারা মাঠে কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন, যে কমিটিতে আইনজ্ঞ, সাংবাদিক ও সিভিল সোসাইটির সদস্যরা যুক্ত থাকবেন বলে জানিয়েছে। এই কমিশন বা ডিএমসির চেয়ারম্যান হলেন জাফরুল ইসলাম খান [Zafarul-Islam Khan] ও অন্য সদস্য হলেন কারতার সিং কোচ্চার [Kartar Singh Kochhar]। এরাই প্রথম সরেজমিন রিপোর্ট মিডিয়ায় প্রকাশ করেছেন। ভয়াবহ বর্ণনা আছে সেই রিপোর্টে। তাদের প্রথম কথা হল, এই হামলা ‘একপক্ষীয়’ এবং ‘পূর্বপরিকল্পিত’ [‘one-sided, well-planned’]। অর্থাৎ এটা কোনধরণের দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে মারামারি বা রায়ট নয়। অথবা এটা হঠাৎ উত্তেজনায় ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা নয়। বরং আগেই পরিকল্পনা করে ঘটানো এক ম্যাসাকার-সন্ত্রাস। এছাড়া এই প্রত্যক্ষ মাঠ-সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ার সাথে তাদের কথা বলার সময় জাফরুল ইসলাম খান সাহেবের করা আরও কিছু মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য।

তাঁর ফাইন্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় মন্তব্য হল, প্রায় দুই হাজার বহিরাগতকে পরিকল্পিতভাবে নর্থ-ইস্ট দিল্লিতে এনে, কয়েকটা স্কুলে রেখে তাদের দিয়ে এই ম্যাসাকার, হত্যা ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটানো হয়েছে। [“There were approximately 1,500 to 2,000 people who had come to these areas from outside to create trouble,” ]। এর প্রমাণ হিসেবে এক প্রত্যক্ষ সাক্ষীর বয়ান তারা সংগ্রহ করেছেন। তার নাম রাজকুমার। তিনি রাজধানী স্কুলের এক গাড়ির ড্রাইভার। তিনি বলেছেন, এরকম ৫০০ বহিরাগত যাদের মুখে মুখোশ ছিল। এরা প্রায় ২৪ ঘণ্টা ওই স্কুলে অবস্থান করেছিল। তারা সাথে পিস্তল নিয়ে সশস্ত্র ছিল আর এক ধরনের ‘বড় গুলতি’ ব্যবহার করেছিল উঁচু দালান থেকে পেট্রলবোমা ছুড়ে মারার জন্য। কমিশনও বলেছে, তারা এমন কিছু ব্যক্তির ফুটেজও সংগ্রহ করেছেন।

“Mr. Kumar told us that some 500 persons barged into his school around 6.30 p.m. on February 24. They wore helmets and hid their faces. They remained there for the next 24 hours and went away next evening after the arrival of police force in the area. They were young people who had arms and giant catapults which they used to throw petrol bombs from the school rooftops,”

এ ছাড়া জাফরুল ইসলামের দাবি, তারা জেনেছেন প্রত্যেক গলি থেকেই স্থানীয় অন্তত দু-একজন সহযোগী ছিল যারা মুসলমানদের বাড়ি , দোকান, গুদাম বা সম্পদ কোনগুলো, তা দেখিয়ে দিয়েছে। যাতে কেবল সেগুলোতেই আগুন লাগিয়ে দেয়া যায়। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, এভাবেই ‘যমুনা বিহার’ এলাকা ছাড়া সব জায়গাতেই কেবল বেছে বেছে মুসলমানদের বাড়িঘর ও সম্পদ পোড়ানো হয়েছে।

Muslim-owned shops like a travel agency and motorcycle showroom were looted and torched while Hindu-owned shops were left untouched.

এই প্রাথমিক রিপোর্ট প্রকাশ করা নিয়ে আবার লুকোচুরি শুরু হয়েছে। বেশির ভাগ ‘মেনস্ট্রিম মিডিয়া’ এটা ছাপেইনি। সবচেয়ে বিস্তারিত ও সাহসী ভাবে ছেপেছে দক্ষিণের ব্রিটিশ আমলের প্রাচীন দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’। এ ছাড়া ওয়েব পত্রিকা ওয়াইর (wire) আর নিউ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস এটা ছেপেছে। আরো কিছু পত্রিকা ছেপেছে, তারা কেবল সরকারি সংবাদ সংস্থা পিটিআইয়ের শর্ট ভার্সনটা ছেপেছে। তবে একটা ইউটিউব ভার্সন পাওয়া যায় এমন এক সংশ্লিষ্ট মিডিয়া ‘এইচডব্লিউ নিউজ নেটওয়ার্ক (HW News Network) থেকে। সেখানে এ নিয়ে নিউজ ছাড়াও চেয়ারম্যান জাফরুল ইসলাম খানের সাক্ষাৎকারও প্রচারিত করেছে।

দেখা যাচ্ছে, ফ্যাক্টস বাইরে আসা শুরু হয়েছে। এসবের বিরুদ্ধেও মোদী-অমিত কোনো কৌশল গ্রহণ করবেন, ধামাচাপা দিবার চেষ্টা করবেন সন্দেহ নেই।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

এই লেখাটা গত ০৭ মার্চ ২০২০ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার ওয়েবে ও পরের দিন প্রিন্টে নৈতিক ভিত্তি হারানো একটি সফর – এই শিরোনামে উপ-সম্পাদকীয়তে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে আজ ছাপা হল। ]

আমরা কী এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছি?

আমরা কী এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছি?

গৌতম দাস

২২ জুলাই ২০১৯, ০০:০৬ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2D0

 

ভারতের এনআরসি মানে ‘ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেন্স’ (National Register of Citizens (NRC))। কিন্তু এটা কেবল আসামের এক ইস্যু। ভারতের নর্থ-ইস্টে সাত রাজ্যের বড়টা হল আসাম। আসলে উল্টাটা। বড় আসামকে ভেঙ্গেই পরে সাত রাজ্য (ত্রিপুরাকেও সাথে ধরে) বানানো। নানান জনগোষ্ঠীর ট্রাইবাল পরিচয়ের ভিত্তিতে আগের আসাম রাজ্যকে বিভক্ত করার কাজটা হয়েছিল মূলত ১৯৭২ সালে, ভাগ করে মোট সাতটি আলাদা রাজ্য করা হয়েছিল। এরপরের যে আলাদা নতুন আসাম কেবল তারই এনআরসির সোজা মানে হল, কেবল আসামের নাগরিকদের জাতীয় তালিকার রেজিস্টার। তাই, ‘জাতীয়’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও এটা দিয়ে সারা ভারতের নাগরিক তালিকা বুঝানো হয়নি, কেবল ‘আসামের নাগরিকদের তালিকা’ বুঝতে হবে। কিন্তু কেবল আসামে কেন?

এনআরসির তৈরির কাজ শুরুর পর থেকে এর ফাইনাল তালিকা করা কবে শেষ হবে ও প্রকাশিত হবে এনিয়ে বহু মোচড়ামুচড়ির পরে ঘোষণা করার সর্বশেষ তারিখ ছিল, চলতি মাসের শেষে, ৩১ জুলাই। কিন্তু আবার গড়িমসি করা শুরু হয়ে গেছে। আবার আদালতে তারিখ পেছানোর দরখাস্ত পেশ করা হয়েছে। আর খুব সম্ভবত এবার বাংলাদেশের বিরুদ্ধে “মুসলমানেরা দায়ী”, “মুসলমান অনুপ্রবেশকারীরা দায়ী”- এ কথাগুলো প্রবল করার বিজেপি-আরএসএসের জল্পনা-পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।  তাই একটা চাপ তৈরি করার চেষতা হচ্ছে। এদিকে, আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপেশাদার আচরণও ইস্যুটাকে আরও বিপজ্জনক  করে তুলছে। এমনিতেই ভারতের কিছু মিডিয়া বলা শুরু করেছে যে, এনআরসির তালিকা তৈরি করার কাজটা শেষে ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থেকে অম্পুর্ণ ও ব্যর্থ হবে। শেষ করতে পারবে না ইত্যাদি। কেউ কেউ চার-পাঁচ সম্ভাব্য কারণও ছাপিয়ে ফেলেছে [5 reasons why NRC implementation is bound to fail] । অথবা ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের লেখা, “এনআরসি তালিকা প্রকাশের পর ভারত কি সত্যিই কাউকে ফেরত পাঠাতে পারে”। আর ভারতের এমন মিডিয়ার তালিকায় নতুন যুক্ত হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়ার নাম। এদের সর্বশেষ রিপোর্টের শিরোনাম ‘এনআরসি বিপর্যয় : প্রক্রিয়ার ত্রুটি স্বীকার করে নিয়েছে কেন্দ্র ও আসাম” [NRC Disaster: Center and Assam virtually admit flaws in the process – এটা প্রকাশিত হয়েছে দুদিন আগে ১৭ জুলাই।

কেবল আসামে কেন- সেই প্রশ্ন থেকে শুরু করতে প্রথমে একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানিয়ে রাখি। নাগরিক তালিকা তৈরির কাজটা অবশ্যই প্রশাসনিক, মানে নির্বাহী সরকার করবে। কিন্তু আসামের ক্ষেত্রে এই এনআরসি তৈরির কাজটা চলছে মোদী অথবা তার আগের কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের ইচ্ছা বা আদেশে নয়। তাহলে কী এটা রাজ্য বা প্রাদেশিক সরকারের আদেশে বা ইচ্ছায় হচ্ছে? না, তা-ও নয়। এটা আসলে চলছে বিচার বিভাগের নির্দেশে। না, এনআরসি তৈরিতে কাজে নেমে পড়ার আদেশ বলতে, একটা আদালতের রায় যেমন হয়, এটা ততটুকুই নয়। রায় তো দিয়েছেনই, সেই সাথে খোদ আদালতই এনআরসি কাজের তদারককারী, তত্ত্বাবধায়ক। তা-ও আবার “আদালত” বলতে আসাম রাজ্যের হাইকোর্ট নয়, একেবারে দিল্লির সুপ্রিম কোর্ট, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে। তবে ‘সমন্বয়কারী’ নামে পদে এক হেড বুরোক্র্যাট (প্রতীক হাজেলা, [Prateek Hajela]) আছেন বটে, কিন্তু তিনি সরাসরি সুপ্রিম কোর্টের কাছে জবাবদিহির অধীনে। অর্থাৎ তিনি কেন্দ্রের মোদীর (বা আসাম রাজ্যের) নির্বাহী সরকারের হুকুমের অধীনস্থ কেউ নন। সোজা কথায় বিচার বিভাগ, এব্যাপারে নির্বাহী বিভাগের কাজকাম নিজের দখলে নিয়েছে। যেমন ধরেন, বাংলাদেশের ন্যাশনাল আইডি তৈরির কাজ আমাদের নির্বাচন কমিশনের অধীনে সম্পন্ন হয়েছে। আর নির্বাচন কমিশন শেষ বিচারে নির্বাহী বিভাগের অন্তর্গত। কারণ এটি কনস্টিটিউশনে উল্লেখ থাকা প্রতিষ্ঠান বলে রাষ্ট্রপতির অধীনে, আর সেই সূত্রে সে রাষ্ট্রপতির অফিস ঘুরে সেই নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই। এখন বাংলাদেশে এটা যদি সুপ্রিম কোর্টের সরাসরি তদারকিতে সম্পন্ন হলে যা হত, তাই হচ্ছে আসামের এনআরসিতে।

এতে একটা অসুবিধা বললাম যে, সাধারণত রাষ্ট্রের ক্ষমতা নির্বাহী আর বিচার বিভাগের মধ্যে ভাগ করা থাকে, সে নিয়ম এখানে ভঙ্গ করা হয়েছে। ফলে, নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন নির্বাহী ক্ষমতা মানে তো সরকার, মানে রাজনীতিবিদদের কাজ বা দায়িত্বের এরিয়া। কিন্তু সেই এরিয়ায় বিচারপতিরা কেন ঢুকবেন? বা ঢুকলে কী বিপদ হবে? সমাজের রাজনৈতিক তর্ক-ঝগড়া রাজনীতির মাঠে সমাধান হতে হয় – সঙ্ঘাত, আপস ইত্যাদির মাধ্যমে। অথবা অমীমাংসিত থাকলে সেটাও রাজনীতির মাঠে-পরিসরেই পরে থাকবে; উঠবে পরবে – এভাবেই চলবে। মানে সবকিছু সেখানেই। কারণ যা রাজনীতিক স্বার্থের প্রশ্ন তা তো রাজনৈতিকভাবেই ফয়সালা হতে হবে – সংঘাতে না হয় আপোষে। রাজনৈতিক সমস্যার আইনি সমাধানই হয় না। ওর কাজ না সেটা। এ জন্য রাজনীতিকদের এরিয়ায় বিচার বিভাগ কখনো আসবে না, তার কজ এটা না তাই। আদালত তাই নিজেকে গুটিয়ে রাখবে যেন  সমাজ রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো ফয়সালা করতে দিবার জন্য এবং একে নিজের ভুমিকা ও ফাংশনগুলোকে কাজ করার সুযোগ করে দেয়ার জন্য। কিন্তু এনআরসি করাটাই আসাম সমাজের রাজনৈতিক সমাধান কি না- এ নিয়ে রায় দিয়ে দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। এটাই সবেচেয়ে বড় ব্লান্ডার। এরপর আবার তা বাস্তবায়নের কর্তৃপক্ষ হয়ে গেছেন আদালত নিজেই, যা আরেক ব্লান্ডার। এটা বিশাল অকাজ, অনধিকার চর্চা। নিজের সীমা, কাজের ধরণ না বুঝে কাজ করা হয়েছে। ধরেই নেয়া হয়েছে আদালত রাজনৈতিক বিতর্ক, স্বার্থ-দ্বন্দ্ব সমাধান দিতে পারে। বা এটা তার কাজ। এখন যদি মিডিয়ার আশঙ্কা অনুসারে এনআরসি প্রকল্প সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয় [যেমন চলতি মাসে আসাম রাজ্য ও কেন্দ্র যৌথভাবে (যার দুটোই বিজেপির দলের সরকার) সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছে, যাতে ফাইনাল তালিকা প্রকাশ করার শেষ তারিখ ৩১ জুলাই থেকে পিছিয়ে তা অনির্দিষ্টকাল করা হয়।] যার অর্থ এটা ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় কোর্টের। অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্ট নিজেই যেন একটা রাজনৈতিক পক্ষ হয়ে উঠবে, যার বিরুদ্ধে অন্য রাজনৈতিক পক্ষ বা স্বার্থগুলো সোচ্চার হবে। অথচ এটা অকল্পনীয় যে, আদালত বা বিচারকেরা নিজেই এক রাজনৈতিক পক্ষ হবেন! এ কারণেই দুনিয়ার আদালতগুলো সব সময় বুদ্ধিমানের মত [Jurisprudence বা জুরিসপ্রুডেন্সের] প্রুডেন্ট হয়ে, দূরদর্শিতা দেখিয়ে আগাম কোনো রাজনৈতিক পক্ষ বা বিপক্ষ হওয়া থেকে দূরে থাকে। তাই আদালতের কাছে কেউ মামলা নিয়ে গেলেই আদালতের তাতে আমল করে রায় দিতে ঝাপায় পড়া – এটা দুরদর্শী আদালত কখনও করে না। ওর প্রথম বিবেচনা ইস্যুটা রাজনৈতিক কিনা। যদি দেখে হা তবে একে আমল না করে  ততক্ষণাত সমাজের রাজনৈতিক পরিসরে, মাঠে ফেরত নিয়ে যেতে অনুরোধ করে। মামলা ফিরিয়ে দেয় এই যুক্তিতে। কোন সমাজের সব সমস্যা আইনি না। সমাজের নানান সমস্যার  সবকিছুর সমাধান দেওয়ার আদালতই একমাত্র প্রতিষ্ঠান নয়। আদালত সবকিছুতে নাক গলানোর মানে সবকিছুকে আইনি সমস্যার হিসাবে ও চোখে দেখে নামিয়ে এনে সেই খাপে ভরে দেয়া। আর এতে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভুমিকা রাখা ফাংশনাল হওয়ার সুযোগ নষ্ট করে দেয়া হবে। তাই আদালতকে এসব দিক বিবেচনা করে দেখার মত যোগ্য আর বুদ্ধিমান হতে হয়। আইডিয়ালি এটাই হওয়ার কথা।

এনআরসি করার দাবিকে কেন আসাম সমাজের ‘রাজনৈতিক সমস্যা ও দ্বন্দ্ব’ বলেছি?
ভৌগোলিকভাবে এই নর্থ-ইস্ট এবং বাকি মুল ভারতের মাঝখানে আছে বাংলাদেশ। যদিও একেবারেই এক প্রান্তের শিলিগুড়ি করিডোরের এক “চিকন গলা” দিয়ে নর্থ-ইস্ট এবং বাকি মুল ভারত সংযুক্ত অবশ্যই।  এখন যদি বাংলাদেশের ওপর দিয়ে সরাসরি যাওয়া হয় (যদি বাংলাদেশ যেতে দেয়) তবে কলকাতা থেকে আসামের সবচেয়ে কাছের জেলার দূরত্ব ৩৫০ কিলোমিটার। কিন্তু বাংলাদেশ অনুমতি না দিলে ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ হয়ে ঘুরে কলকাতা আসতে সেই দূরত্ব বেড়ে হয়ে যায় এক হাজার ৭০০ কিলোমিটার। ১৯৪৭ সালের পর থেকে পাকিস্তান (ততকালীন পুর্ব পাকিস্তান) আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যাওয়াতে  ১৭০০ কিলোমিটার দুরত্বের ফ্যারে পরে যায় আসাম। এটাই আসামের দুঃখের মূল উৎস। আসামের সাথে বাকি ভারতের সহজ যোগাযোগ ‘নাই’ হয়ে যায়। যোগাযোগ খারাপ তো লেনদেন বিনিময় ব্যবসা খারাপ। মানে ‘মানি সার্কুলেশন’ নাই, অর্থনীতি নাই, অবকাঠামো নাই, এভাবে সব কিছু নিষ্প্রাণ হয়ে পড়েছিল। তবু ১৯৪৭ সালে স্বাধীন ভারতের নেহরু সরকার এভাবে আসামকে স্থবির ফেলেই রেখে দিয়েছিল। কেন?

কারণ তার ভয় আসাম নেহেরুর ভারতকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। আসামের আরও উত্তরের সীমান্ত হল – চীন সীমান্ত। আসামের স্বার্থে ভারত বাংলাদেশের সাথে কোনো ‘ফেয়ার ডিল’, এক “উপযুক্ত পালটা সুবিধার বিনিময়” করে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আসাম-কলকাতা যোগাযোগ সহজ করে নিতে পারে অবশ্যই।  কিন্তু জন্ম থেকেই ভারতের কেন্দ্র বা নেহেরু সরকার এতে আগ্রহ দেখায় নাই। কারণ, তাদের ভয় হল, আসামের জন্য বাংলাদেশের উপর দিয়ে নেয়া করিডোর পাওয়া গেলে এতে একই সাথে এবার বৃহত্তর আসাম সীমান্তের লাগোয়া অপর পাড়ের চীনের প্রদেশগুলোও আসামের ওপর দিয়ে, বাংলাদেশ হয়ে কোনো সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানো সহজ হয়ে যাবে। বাংলাদেশ বা চীন তখন আসামের উপর দিয়ে চীনের জন্য করিডোর পাওয়া – এই প্রবেশাধিকার, ভারতকে দেয়া বাংলাদেশের সুবিধার বিনিময়ে শর্ত হিসেবে হাজির করে ফেলতে পারে? এটা ভারত একেবারেই চায় না। এব্যাপারে আনন্দবাজার ঠিক এই প্রসঙ্গে না বিসিআইএম [BCIM] প্রকল্প নিয়ে কথা বলতে গিয়ে লিখেছে ,“বাংলাদেশ এবং মায়নমারের উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা এই প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত। অথচ (এই প্রকল্প নিয়ে)ভারতের আপত্তির প্রধান কারণটি নিরাপত্তাজনিত। বিসিআইএম রূপায়িত হলে ‘ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চল [মানে আসাম] চিনের সামনে হাট করে খুলে দিতে হবে।’ ওই এলাকার স্পর্শকাতরতার কথা মাথায় রেখে যা চায় না ভারত”।

সারকথায় চীনকে এসব আলোচনার ভিতরে ঢুকতে দিতে চায় না ভারত, কারণ আলোচনায় একবার ঢুকে পড়লে শেষে চীন আসামের ওপর দিয়ে করিডোর না পেয়ে যায়। সম্ভবত ভারতের মনে ভয়, নর্থ-ইস্ট কখনো যদি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন আলাদা রাষ্ট্র হয়ে যেতে চায়, একই ভারত রাষ্ট্রে যদি না থাকতে চায়, তাহলে কী হবে? যদি স্বাধীন হতে চায় বা চীনের সাথে যুক্ত হতে চায় তাহলে কী হবে? সারকথা বিষয়টা হল, ভারত থেকে আসামের বেরিয়ে যাওয়ার ভয়। ভারতের শাসকেরা এপর্যন্ত তাদের মনের এই ভয়কেই প্রাধান্য দিয়ে গেছে সব সময়। আর তাতে ব্যাপারটা হয়ে গেছে অনেকটা,  নিজের সন্তানকে হাত-পা ভেঙে পঙ্গু করে রাখার মত, যাতে সে পালিয়ে না যায়, তাকে দিয়ে ভিক্ষা করানো যায়। আর সে জন্য পুরো নর্থ-ইস্টকে জন্মের পর থেকেই ভারত যোগাযোগ অবকাঠামোর দিক দিয়ে প্রায় অচল করে রেখেছে।

তাই কেবল গত দশ বছরের ঘটনা হল, এবার ভারত একা সব সুবিধা হাসিল করেছে। এই সুযোগ সুবিধা মানে বিনা পয়সার বাংলাদেশের উপর দিয়ে করিডোরের একক সুবিধা ভারত এখন নিয়েছে। কারণ এটা আমেরিকার “চীন ঠেকানো” স্বার্থে ভারতের ভাড়া খাটার বিনিময়ে পাওয়া  বাংলাদেশ এখন মোস্ট ভারত-ফেভারেবল বাংলাদেশ পেয়েছে।  এখানে বাংলাদেশে করিডোরের বিনিময় চাওয়ারই কেউ নাই। এটা একপক্ষীয় করিডোরসহ সব সুবিধা। এমনকি মেজর অবকাঠামো তৈরির দায়ও বাংলাদেশের। আনন্দবাজার লিখছে, আসামে উপর দিয়ে চীন বাংলাদেশে আসুক সেটা চায় না। মানে, ভারত একপক্ষীয় করিডোর চায়।

কিন্তু এতদিন আসামের মানুষের একারনে জীবনযাপনে যে গরিবি হাল হয়ে আছে এর কারণ কাকে দেখানো হবে? এটাকে আড়াল বা দায়ী করার জন্য বয়ান তৈরি করা হয়েছে যে, আসামে বাংলাদেশের (পূর্ব পাকিস্তানের) অনুপ্রবেশকারী, এদের ( বিদেশীরা) ঢুকে পড়া সবকিছু জন্য দায়ী। কথাটা আসলে উল্টোভাবে সত্য। কারণ ব্রিটিশ আমলে ধান ফলাতে বৃহত্তর রংপুর বা টাঙ্গাইল থেকে দক্ষ বাঙালি গৃহস্থকে আসামে জমি দেয়ার লোভ দেখিয়ে নিয়েছিল ব্রিটিশরা, যাতে সেখানে ধানের উৎপাদন বাড়ে। বিশেষত চল্লিশের মহাযুদ্ধের সময়ে সেনাদের জন্য খাদ্যশস্যের খুবই বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছিল। অর্থাৎ সেই মাইগ্রেশনটা অভাবে পড়ে মাইগ্রেশনও ছিল না এই অর্থে যে, এটা একই ব্রিটিশ কলোনির মধ্যেই এক প্রদেশ থেকে অন্য আর এক প্রদেশে মাইগ্রেশন ছিল। এছাড়া বৃটিশ শাসকেরা নিজে কর্মসূচি নিয়ে এটা ঘটিয়েছিল।

কিন্তু ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে এ ব্যাপারটাকে দেখানো হল, আসামের ‘সব দুঃখের মূল কারণ’ হিসেবে – এই বলে যে বাঙালি বা মুসলমানেরাই দায়ী। আসামের মূল জনগোষ্ঠী হলো অসম (বা অহমীয়), বাঙালি (মুসলমানসহ) আর ট্রাইবাল বোড়ো। এ ছাড়া সাথে ছোট ছোট অনেক ট্রাইব বা পাহাড়ি জনগোষ্ঠীও আছে। ‘বিদেশী’ বা কথিত পূর্ব বাংলার লোক, এদেরকে বের করে দিতে হবে- এই অছিলায় সেকালে কংগ্রেস আন্দোলন করেছিল। কথা বিদেশি বলে ঘুরিয়ে দিতে সেই প্রথম ১৯৫১ সালে নাগরিক তালিকা [NRC 1951] বা প্রথম এনআরসি তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা ফাইনালি হয়েছিল আসলে আসামে বসবাসকারী সব বাসিন্দার আনুষ্ঠানিক তালিকাভুক্তি। অর্থাৎ এ থেকে কাউকে কী পদ্ধতিতে বের করে দেয়া হবে, কী করে বুঝবে সে বিদেশি ইত্যাদি সেই পর্যন্ত আর আগানো হয়নি। আর এই ক্ষোভ জমতে জমতে তা থেকেই পরে ১৯৭৯ সালে মূলত মাঠের ছাত্র আন্দোলন হিসাবে অতি উগ্র “অসমীয় জাতীয়তাবাদীরা” সাথে বোড়োদের সমর্থনে মূলত বাঙালিদের বিরুদ্ধে ‘বাঙালি খেদাও’ বলে আন্দোলন শুরু করেছিল। এটাই একপর্যায়ে চরমে উঠে, আসামেরই ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার অবস্থা তৈরি করলে তা ঠেকাতে রাজীব গান্ধীর সরকার দ্রুত আপসে ১৯৮৫ সালে ‘আসাম অ্যাকর্ড’ [Assam accord, 1985] নামে ছাত্রদের সাথে এক আপোষচুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। সেখানেই বলা ছিল, ১৯৫১ সালের এনআরসিকে বিদেশী চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে আপডেট করা হবে। তাতে কে বিদেশী তা চিহ্নিত করে ওদের বের করে দেয়া হবে। এর পর থেকে ওই ছাত্ররাই এবার রাজনৈতিক দল খুলে বসে ‘অহম গণপরিষদ’ [AGP] নামে বা ‘বোড়োল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট’ নামে।

ওদিকে ১৯৮৫ সালের ‘আসাম অ্যাকর্ড’ চুক্তি হলেও এর বাস্তবায়ন ২০০৯ সাল পর্যন্ত কিছু না হওয়াতে একটি স্থানীয় দাতব্য সামাজিক প্রতিষ্ঠান  – নাম ‘আসাম পাবলিক ওয়ার্কস’ – এই ইস্যুটাকে সুপ্রিম কোর্টে নিয়ে যায়, তারা রিট পিটিশন করে। ব্যাপারটা যেন খুবই গর্বের, দেশের কাজ আর বিরাট দেশপ্রেমের কাজ হয়েছে এই ভাব ধরে গত বছর কলকাতার ইংরাজি টেলিগ্রাফ এই রিপোর্ট ছাপছিল [Couple who set NRC ball rolling]।  আর ঐ রীট মামলার নিষ্পত্তি করতে গিয়ে শেষে সুপ্রিম কোর্ট নিজেই হয়ে গেছিল আসাম সমাজের রাজনৈতিক বিরোধ ও বিতর্কের নিষ্পত্তির নির্বাহী বাস্তবায়ক।  এনআরসি তৈরির কাজের নিয়মকানুন কী হবে সেটাও আদালত ঠিক করে দেয়। বিচারকদের পা-পিছলানির ঐতিহাসিক ঘটনা এটা। কিন্তু এটা কেন “রাজনৈতিক ইস্যু”, যাতে বিচারকেরা পা পিছলে ঢুকে পড়েছিল – একথা বলছি?

মাইগ্রেশন মানে কাজ বা পেশায় সুবিধা পেতে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে অন্য দেশে গিয়ে বসবাস; এর মূল কারণ বা চালিকাশক্তি হল অর্থনীতি। কেউ চাইলে এটাকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্থানীয় লোকাল ক্যাপিটালিজমের গ্লোবাল হয়ে ওঠা, এমন “গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের ফেনোমেনা” বলতে পারেন। একটা দেশে যেকোনো কারণে ব্যাপক উদ্বৃত্ত বাড়তি সঞ্চয় ঘটে গেলে আর সেই সঞ্চয় অর্থনীতিতে আবার বিনিয়োজিত হতে চাইলে তাতে এবার ওই দেশে প্রাপ্ত জনসংখ্যার (লেবার) চেয়ে লেবারের চাহিদা বেশি হয়ে গেলে কী হবে? ঐ দেশে তখন অন্য দেশ থেকে মাইগ্রেশন হবেই। আর সেই দেশের আইনকানুন ও সীমান্তও চাইবে বিদেশী লেবার মানে শ্রমিক আসুক, তারা খুবই স্বাগত। কিন্তু  পরবর্তিকালে কখনও কোন কারণে যদি ঐ অর্থনীতি ভালো না? ভুবতে থাকে, মন্দা দেখা দেয়? তাহলে এবার, সেখানে বিদেশীবিরোধী আন্দোলন শুরু হবে, মাইগ্রেশনবিরোধী দল ক্ষমতায় আসবে ইত্যাদি। শুধু তাই নয়, বিদেশীরা কত খারাপ, কত বেশি বেশি পয়দা করে বা মাইগ্রেটেড এরা তো স্থানীয় জনসংখ্যার চেয়েও বেশি হয়ে যাচ্ছে, ওরা বেশি পয়দা করে, ওরা অসভ্য, ওদের ধর্ম নৃশংসতায় ভর্তি ইত্যাদি কত কিছু খুত আবিস্কার করে এসব বয়ান বলে এদের কুপিয়ে কেটে গণহত্যা করে ভাগাও- এসবই হবে ওদের সমাজের পপুলার রাজনীতির বয়ান। সাম্প্রতিককালে নিউজিল্যান্ডের শুটিং গণহত্যা বা ফ্রান্সের উগ্রপন্থী লি-পেনের দলের কাণ্ডকারখানা অথবা আমেরিকায় ট্রাম্পের ইমিগ্রেশনবিরোধীতা ( বিদেশীবিরোধী) ও মেক্সিকো সীমান্তে দেওয়াল তোলার বয়ান  – সবকিছু এই একই কারণে।

এগুলোই আসলে বিদেশী বা মাইগ্রেশনবিরোধিতার আড়ালে চরম নোংরা বর্ণবাদ। ওমুকেরা জাতে খারাপ, এমন বয়ান। ১৯৭৯ সালের পর থেকে আসামের পুরো সমাজ এমন বাঙালি বা বিশেষত মুসলমান বিরোধি ঘৃণাতেই ভেসে চলছিল।

আবার মনে করিয়ে দেই, আসামের মূল সমস্যা বা শুরুটা কিন্তু ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে আসামের দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থার সমস্যা এবং যা থেকে তৈরি খুবই খারাপ ও অবকাঠামোহীন, বিনিয়োগহীন এক স্থবির জনজীবন। এখন ধরা যাক, আসামে যাদের কথিত বাংলাদেশী বলা হচ্ছে যদি এদের সংখ্যা একই রকম থাকে, আর কালকেই যদি কোনো জাদুতে আসামের যোগাযোগ অবকাঠামো সহজ, বিনিয়োগের অভাব নেই, অর্থনীতি প্রবল চাঙ্গা ইত্যাদি – এমন এক অবস্থা হয় যাতে প্রাপ্ত লেবার যা আছে তা-ও কম পড়েছে দেখা যায়, তবে ঐ ঘাটতি পুরণে সেই আসামই আবার আরও নতুন মুসলমান ‘বিদেশীদের’কেও দাওয়াত দিয়ে ডেকে আনবে। তাই বলছি, আসামের মূল সমস্যা আসলে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক। অথচ সবাই ভাবছে, বিশ্বাস করে বসে আছে আসামের প্রধান ইস্যু এখন এনআরসির ফাইনাল তালিকা কবে ঘোষণা হবে; যেন এটা হয়ে গেলেই অসমিয়াদের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। অথচ এটা এমনি হিংসা ঘৃণায় ঢুবে থাকা জনজীবন যে ঐ সমাজে কারও বাস্তবতায় চোখ মেলার মুরোদ নাই, কারণ এটা তো আসলে এক অলীক স্বপ্ন মাত্র। এরা অভিবাসী বা মাইগ্রেশন জিনিষটা নিয়ে কখনও বুঝে দেখেনি।  এরা আসলে চিন্তা করে দেখেনি যে, আসামের অর্থনীতি আরো খারাপ হলে তারা নিজেরাও অভিবাসী হতে ঘর ছাড়বে। যেমন ইতোমধ্যেই গুজরাত বা মুম্বাইয়ের মত শিল্প-শহরগুলোর অর্থনীতি আসামের চেয়ে প্রবল সচল। তাই ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষিত আধা শিক্ষিত অসমিয়া ওসব রাজ্যে ছুটছে, এই হার বেড়ে গেছে।

এ অবস্থায়, ৩১ জুলাই ফাইনাল তালিকা ঘোষণা হওয়ার আগে বিজেপি সভাপতি ও কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ কী চাচ্ছেন? তিনি চাচ্ছেন মূলত অনির্দিষ্টকালের জন্য ফাইনাল তালিকা ঘোষণা পিছিয়ে দিতে। এই আবেদন আদালতে করা হয়েছে যৌথভাবে, কেন্দ্র ও রাজ্য মিলে। ইতোমধ্যে মিডিয়ায় লোকজন নামানো হয়েছে যেন এই লাইনের পক্ষে কথা বলে [OPINION | Why the Deadline For Final NRC Draft Should be Extended Beyond July 31]। যার সার আর্গুমেন্ট হল, যে তারা খুবই খাটিবাদী। কোনকিছু খাটি না হলে তাদের চলেই না। তাই তারা খুবই সঠিক নির্ভুল একটা তালিকা চান।

তাই, অমিতের কথিত যুক্তি হল, ২০ শতাংশ রি-ভেরিফিকেশন। মানে তালিকায় যাদের উঠানো হয়েছে অথবা বাইরে ফেলা হয়েছে এমন সব ডাটারই ২০% আবার খুলে চেক করা। এই কাজের জন্য তিনি কেন্দ্র্রের অ্যাটর্নি জেনারেলকে (এজি) দিয়ে তিনি যুক্তি দেয়াচ্ছেন যে, এনআরসি তৈরি “আগে কল্পনা করা যায় নাই এমন জটিল কাজ” [“unprecedented large scale of complexities” involved in the NRC process]। তাই এইটা আসামের পাবলিকের ধারণা, এই তালিকা সঠিক নয়। গত বছর প্রকাশিত প্রথম ড্রাফট তালিকাতে আসামের প্রায় সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। তাই এক শুদ্ধ তালিকা পেতে.২০% ডাটা আবার খুলে চেক করতে সময় বাড়াতে হবে।

এদিকে অনেক রাজনীতিবিদ দাবি করছেন, এই ৪০ লাখের মধ্যে ২৫ লাখই হিন্দু। হতে পারে অমিত শাহের তারিখ পিছাতে চাওয়ার পিছনে এটা একটা উদ্বেগের কারণ। তবে সরকারি হিসাবে ৈ ৪০ লাখের মধ্যে ধর্মীয় ভাগের অনুপাত নিয়ে কিছুই জানানো হয়নি। এই সুযোগে অমিত শাহ এজিকে দিয়ে বলাচ্ছেন যে, ২০ পার্সেন্ট ডাটা আবার চেক করে দেখতে হবে। আর তা বিশেষ করে ঘটাতে হবে সীমান্ত জেলাগুলোতে। মানে বাংলাদেশের সীমান্তে। কারণ সেখানে নাকি (মুসলমান) জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কোন তাল-ঠিকানা নেই। এভাবে যেভাবেই হোক বিচারকদের কিছু একটা বুঝ দিয়ে হলেও তারিখ পেছাতে এজি একেবারেই মরিয়া। কিন্তু আদালত এখনো রাজি না হয়ে ২৩ জুলাই তারিখ পর্যন্ত আরও শুনানি – এটা মুলতবি রেখেছে।

ওই দিকে আরেক কাণ্ড ঘটিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। ভারতের স্ক্রোল [SCROLL] পত্রিকা বলছে, তিনি নাকি কোনো স্থানীয় টিভিতে বলেছেন, “যদিও আমাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কথা নয়, তবু পত্রিকার রিপোর্ট দেখে আমাদের কিছু উদ্বেগ রয়েছে”। এভাবে আমাদের উদ্বিগ্নতা আছে, আবার নাই – এমন মাজা শক্ত না করা হা-না করে কথা বলছি কেন আমরা? এ ছাড়া গত বছর আগস্টে তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী ইনুর এক বিবৃতির রেফারেন্স দিচ্ছে ভারতের স্ক্রোল অন লাইন মিডিয়া। ইনু বলেছিলেন, “প্রথমত এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আসামের স্থানীয় সমস্যা” [“Firstly, we see this as an internal, local political issue with Indian state of Assam, ]। আরো বলেছিলেন, “এ নিয়ে তাই বাংলাদেশের কিছু করার নেই। ভারত সরকার আমাদের সাথে কখনো এ নিয়ে কথা বলেনি। তাই আমাদের কোনো অভিপ্রায় নেই বন্ধু প্রতিবেশী রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নিয়ে তাদের সাথে কথা তোলার”[“It has nothing to do with Bangladesh. The Indian government has not discussed this issue with us, nor do we have any intention to take it up with India as it is an internal matter of India, our friendly neighbor”.] আসলে এই কথাগুলো ইনু বলেছিলেন ১ আগষ্ট ২০১৮তে মূলত কলকাতার হিন্দুস্তান টাইমস পত্রিকায়। সেটাই রেফারেন্স করা হয়েছে। ঐ বক্তব্যে আমাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা বাক্যটা হল, আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র হবার ৪৮ বছর হয়ে গেল কিন্তু ভারত কখনও এনিয়ে প্রশ্ন তুলে নাই, আমাদের সাথে কথা বলে নাই। যার সোজা পরের অর্থ হল,  তাহলে এনিয়ে এখন আসছে কেন?  এর আমরা কিছুই জানি না, সংশ্লিষ্টই নই। কাজেই এখনও যদি কখনও তুলে তাতেও আমরা এটা আমল করব না।

তাহলে ইনুর ইনুর এই কথার পর এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেনের “আমাদের কিছু উদ্বিগ্নতা রয়েছে” বলার দরকার পড়ল কেন? এর কোন ব্যাখ্যা নাই।  মোমেন বলছেন, “যারা দীর্ঘ ৭৫ বছর ধরে ওখানে আছে তারা ওদের নাগরিক, আমাদের নয়”। এই কথা থেকে পরিষ্কার, এ কথার চেয়ে আগে ইনুর- ‘এটা আমাদের ইস্যু নয়, কোনো দায়দায়িত্ব নেই’- বলা অনেক ভালো ছিল। সে তুলনায় এখন এক দুর্বল অবস্থান নেয়া হল। কারণ, ভারতে কেউ ৭৫ বা ১০০ বছর ধরে আছে কি না তাতে আমাদের কী? আর তারা কোথাকার নাগরিক তা নিয়ে আমাদের বলারও কিছু নেই। এর চেয়ে বরং “ভারতের কোনো সরকার এ নিয়ে আমাদের সাথে কখনো কথা তোলেনি’- এটাই সবচেয়ে ভালো ডিফেন্স, ভাল যুক্তি ছিল। এক কথায় বললে মোমেনের কথা ইনুর কথা থেকে সরে গেছে। এ ছাড়া বোকা কিসিমের আরেক কথা বলেছেন মোমেন। তিনি বলেছেন, “আমরা ইতোমধ্যে ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে ঝামেলায় আছি। তাই আমরা আর নিতে পারব না। বাংলাদেশ দুনিয়াতে সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ, “We are already in much difficulty with the 11 lakh [Rohingya refugees], so we can’t take anymore. Bangladesh is the most densely populated country on the planet.”]।

এত কেলাস কোন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্ভবত এর আগে দুনিয়া দেখে নাই। আমরা আগে রোহিঙ্গা শরণার্থী নিছি তাই আর নিতে পারব না- এটা কি কোনো ডিপ্লোমেটিক কথা হল? এটা কী আরও নিব কিনা সেই কথা উঠে গেছে? প্রথমত, তিনি যেচে শরণার্থী নেয়া-না নেয়ার কথা কেন তুলছেন? ভারত কি এ প্রসঙ্গ তুলেছে আমাদের সাথে? তোলেনি।  ডিপলোমেসি খাউজানি আলাপ না, যে একটু অকারণে চুলকায় নিলাম। এখানে প্রতিটা শব্দ গুরুত্বপুর্ণ ও মাপা ও প্রয়োজনীয় হতেই হয়। আর এরচেয়ে ার এক গুরুত্বের বিষয় “ডকুমেন্ট” বা রেফারেন্স’। আগে কী বলেছি এর বাইরে যাওয়া যাবে না। যখন যেমন এটা তো চলবেই না। তাই এখানে আগে কী আছে এর রেফারেন্স খুবই গুরুত্বপুর্ণ। এছাড়া মোমেনের কথায় মানে হয়েছে যেন, আমরা যদি কোনো রোহিঙ্গা শরণার্থী না নিয়ে থাকতাম তাহলে কি এখন আসামের শরণার্থী নিতাম- ব্যাপারটা কি এটাই? আবার, দুনিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ দেশ না হলে আমরা আসামের শরণার্থী নিতাম, তাই কি? সবচেয়ে বড় কথা, এ পর্যন্ত আমাদের সাথে কখনো ভারতের এ নিয়ে কথা হয়নি- এটা ছিল আমাদের জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থান। অথচ প্রশ্ন এবং প্রসঙ্গ না বুঝেই অতিরিক্ত কথা বলা ও অকূটনীতিসুলভ কথা বলা নির্বুদ্ধিতা বটে। তাঁর প্রফেশনাল যোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। সম্ভবত তিনি আমাদের আরো বড় বিপদে ফেলে দিবেন!

সর্বশেষঃ
চলতি জুলাই মাসের শুরুতে জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিলের (UN-OHCHR) স্বাধীন এক্সপার্টেরা ভারতের আসামে এনআরসির ততপরতা নিয়ে বিরাট উদ্বেগ প্রকাশ করে বিবৃতি দিয়েছে [UN experts: Risk of statelessness for millions and instability in Assam, India]। এনআরসি নিয়ে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ আপত্তির পয়েন্ট হল, আসামে নাগরিকত্ব নির্ণয়ের পদ্ধতি ঠিক নয়। কারণ কেউ নাগরিক নয় সেটা প্রমাণের দায় সবখানে হয় রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু আসামে এটা চাপানো হয়েছে নাগরিকের উপর, [“In nationality determination processes, the burden of proof should lie with the State and not with the individual,” said the experts, noting the discriminative and arbitrary nature of the current legal system.]। তাই এটা বৈষম্যমূলক ও খামখেয়ালিমূলক আইনি ব্যবস্থা বলে চিহ্নিত করেছে।

লন্ডন ইকোনমিস্ট পত্রিকা এটাকে সরাসরি মুসলমানদের টার্গেট করা এক প্রক্রিয়া বলে চিহ্নিত করেছে [India’s hunt for “illegal immigrants” is aimed at Muslims]।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২০ জুলাই  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) বাংলাদেশ কি এনআরসির শিকার হতে যাচ্ছে? এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]