“দ্য কাশ্মির ফাইলস” – হিন্দুত্ববাদই যেখানে প্রগতিবাদ


“দ্য কাশ্মির ফাইলস” – হিন্দুত্ববাদই যেখানে প্রগতিবাদ

গৌতম দাস

০৪ এপ্রিল ২০২২, ০০:০৮ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-40v

 

–        ‘The Kashmir Files’ Makers

দ্য কাশ্মির ফাইলস – একটা ভারতীয় সিনেমার নাম। আসলে বলা উচিত, মুসলমানের প্রতি ঘৃণাবিদ্বেষের বিষ উগড়ে দিয়ে বিজেপির পক্ষে নিজ বাক্সে হিন্দুভোট জোগাড়ের নতুন এক উপায় হল, এই কথিত সিনেমা। ‘কথিত’ বললাম এ জন্য যে, কোন নির্বাচনী প্রপাগান্ডা বা প্রচারমূলক কাজে প্যারোডি গান লিখে গেয়ে তা ক্যাম্পেইনের যেমন রেওয়াজ দেখা যায় এটাও তেমনি যেন; তবে এটা অনেক বড় ধরনের বাজেটের প্রপাগান্ডা। তাই পয়সা খরচ করে গানের বদলে একেবারে সিনেমা বানিয়ে এক বড় প্রপাগান্ডার কাজ। প্রপাগান্ডা মানে যেখানে সত্য-মিথ্যা ভুলে, কেয়ার না করে তা কেবল প্রচার আর প্রচার! তাই এটা সিনেমা নয়; না সৌন্দর্যগুণ বিচারে না বিনোদনের বিচারে। এটা একটা প্রপাগান্ডার বস্তু মাত্র।

আর খরচের বিচারে শোনা যায়, এটা প্রায় সাত কোটি রুপিতে বানানো, যেটা ইতোমধ্যে ৩০০ কোটির বেশি অর্থ আয় করেছে। সত্যি হিন্দুত্ববাদ কী না পারে যার মূল কারণ বলা যায়, বিজেপি শাসিত রাজ্যে এর টিকিট করমুক্ত করা হয়েছে, এভাবে হাইপ-জোশ তোলার কারণে আর দলীয় প্রপাগান্ডা যেমন সারা ভারতে নাকি মুসলমানরা হিন্দুদের ওপর হত্যা ও অত্যাচার করছে -ফলে হিন্দুরাই ভিকটিম, তাই ত্রাতা মোদিকে ভোট দিয়ে তার পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান, এটাই এই ছবির মাহাত্ম্য!

কাশ্মির ফাইলস-কে চ্যালেঞ্জ করে এর মিথ্যা ধরতে ফ্যাক্ট চেকঃ 
‘কাশ্মির ফাইলস’-কে চ্যালেঞ্জ করে এর মিথ্যা ও অপততপরতাগুলোকে উন্মোচন করতে বিভিন্ন “ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট” প্রকাশ হতে শুরু করেছে।
আবার ইতোমধ্যে ভারতেই এই সিনেমাকে কেন্দ্র করে আরো যেসব প্রপাগান্ডা শুরু হয়েছে এর বিরুদ্ধে পাল্টা ‘ফ্যাক্ট চেক’ (অর্থাৎ বর্ণিত কোন ঘটনার পিছনের আসল ঘটনাটা কী তা পরীক্ষা ও প্রমাণসহ সেই ফ্যাক্টস তুলে ধরা) রিপোর্টও মিডিয়ায় প্রকাশ করা শুরু হয়েছে। এরই একটা রিপোর্ট দেখা গেল, গত পয়লা এপ্রিলের দক্ষিণী পত্রিকা ‘দ্য হিন্দু’তে [Fact Check: ‘The Kashmir Files’ and the disinformation surrounding it]।

A girl walks past a poster of the Bollywood movie “ The Kashmir Files” inside a cinema in Mumbai, on March 17, 2022. Credit: Reuters

ওখানে পাঁচটা বিভিন্ন প্রপাগান্ডার ঘটনা তুলে আনা হয়েছে, যার পাঁচটাই ভুয়া বা মিথ্যা বলে প্রমাণ দেখানো হয়েছে। এখানে ওর একটা তুলে আনছি। যেমন, কাশ্মিরে কতজন হিন্দু কাশ্মিরি পণ্ডিত এ পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে? এতে কোনো এক কথিত আরটিআই (RTI বা, রাইট টু ইনফরমেশন) তথ্যে বলা হয়েছে, তা ১৬৩৫ জন। কিন্তু এই ফ্যাক্ট চেক মোতাবেক, তা মাত্র ৮৯ জন আর বাকিরা ‘অন্য কেউ’। এই রিপোর্টের সিদ্ধান্ত হল, এই তথ্যা মিসলিডিং। মানে এটা শ্রোতা-দর্শককে ইচ্ছা করে ভুল ধারণা দিয়ে বিপথে নেয়া।

ছবির পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রা, তিনিই আসলে মোদির মুল পুতুল! যেমন তিনি ২০১৭ সালেও মোদির হয়ে ফিল্ম সেন্সর বোর্ডের মেম্বার ছিলেন এবং  কাশ্মির নিয়ে অন্যান্যদের ফিল্ম রিলিজে বাধা দিয়েছেন। তিনিই এখন আবার কাশ্মিরি প্রপাগান্ডা সিনেমা বানানোর পরে আনুষ্ঠানিকভাবে মোদির সাথে দেখা করতে গেছেন যেন তারা এক মহত-কাজ করেছেন। আর ঐ দেখা করার অনুষ্ঠানে মোদি বলেছেন মুক্ত ভারতে সবাই ছবি বানাতে পারে।

          সৎ যুধিষ্ঠির নরেন্দ্র মোদির “দেশের স্বার্থে” হিন্দুত্ববাদের সৎ ও সত্য কথা তুলে ধরার প্রজেক্ট এই সিনেমা; “….to portay the truth correctly”। বলেছেন                    সত্যের অনেক  রূপ আছে, যে চায় অন্য একটা ফিল্ম বানাক”। আগ্রহিরা দেখতে পারেন এখানে ।

সার কথায় সব ফ্যাক্ট চেক রিপোর্টই পাল্টা কথায় বলছে যে, এটা একটা বিজেপি দলীয় প্রপাগান্ডা সিনেমা; ফলে নানান উসকানিমূলক তথ্য, ভুয়া তথ্য (অনেক মিডিয়ায় এই সিনেমাটাকে ধান্ধাবাজি বা ম্যানিপুলেটেড তথ্য বলতেও দ্বিধা করা হয়নি) সাথে দিয়ে দলীয় প্রপাগান্ডায় সবটা অসৎ সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

 

সিনেমা তৈরি পরে পরিচালক অগ্নিহোত্রী ও অভিনেত্রী পল্লবী জোশি  যেন এক মহৎ কিছু অর্জন করেছেন – যেখানে প্রপাগান্ডার গ্লানিটুকুও নাই –  এই মনে করে মোদি ও অমিতের সাথে দেখা করে এসে এরপর সেই মধুর সাক্ষাতের উচ্ছসিত বর্ণনা পাবেন – এই লিঙ্কে এখানে।  

হিন্দুত্ববাদের প্রপাগান্ডার জ্বর বাংলাদেশেও, দ্য ডেইলি স্টারঃ
এই প্রপাগান্ডার জ্বর বাংলাদেশেও লেগেছে মানে লাগিয়েছে ইংরাজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার। বাংলাদেশে অনেক ব্যক্তি বা তাদের পরিচালিত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে, যেমন কোনো ইংরাজি পত্রিকা এদের মধ্যে তারা সেকুলার হয়ে থাকবে ও দেখাবেই এমন ব্রত নিয়ে থাকতে দেখা যায়। কারো মধ্যে কোন কিছু ব্রত বা প্রতিজ্ঞা হিসেবে থাকা তা হয়ত খারাপ নয়; কিন্তু যখন ফলাফল দেখা যায় উল্টা!! কারণ এতে মূল সমস্যা আমরা যখন দেখি, ঠিক কী করলে তাদের আকাঙ্খার সেকুলার অবস্থান সেটা কী বা কী হতে পারে এটা নিয়ে তাদের কোনো স্পষ্ট ধারণাই নাই। যেমন অনেককেই ভেবে বসতে দেখা যায় যে, ধর্ম বিশেষত ইসলামকে যদি কষে গালাগাল  কেউ করে দিতে পারে বা ইসলামের নিকুচি করে দিতে পারে তাহলে সে বা ঐ আচরণ নিশ্চয় সেকুলার; অর্থাৎ এটা একটা তাদের কাছে এক অদ্ভুত মাপকাঠি!!!  এমন উদ্ভট সব ফ্যান্টাসী ধারণা বা গোপন খায়েশ আমাদের অনেকের মধ্যেই থাকতে দেখা যায়। এতে পরিণতি দেখা দেয় যে, কখন কথিত প্রগতিবাদ আর হিন্দুত্ববাদ এক হয়ে গেছে এরা কেউ তারা টের পায়নি বা খেয়ালই করেনি! তেমনই অবস্থা হয়েছে ডেইলি স্টারের!

ফেসবুকে ডেইলি স্টারের এক সিনেমা রিভিউ পেজ আছে যার নাম “স্টার মুভি রিভিউ”। সেখানে দেখা গেল, দ্য কাশ্মির ফাইলস এই সিনেমা নিয়ে প্রায়  দশ মিনিটের এক সিনেমা রিভিউ বা পর্যালোচনার ভিডিও বক্তব্য [যে সিনেমা নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত ভারত] সাঁটা আছে। অনুষ্ঠান সঞ্চালকের নাম সৈয়দ নাজমুস সাকিব। তিনি কথা শুরু করেছেন ওই সিনেমার পরিচালক বিবেক অগ্নিহোত্রীকে সাধুবাদ দিয়ে। কী কারণে? তিনি নাকি “এমন একটা ঘটনাকে এই প্রথমবারের মত বিগ স্ক্রিনে তুলে এনেছেন যা এপর্যন্ত কেউ তুলে আনেনি; গত ত্রিশ বছর ধরে ঘটনাটা নিয়ে কেউ কথাবার্তা বলেনি। অথচ এটা একটা সত্যি ঘটনা। এই ঘটনাটিতে কোনো মিথ্যার কিছু নেই”।

আসলে এই কথা বলেই সঞ্চালক যে হিন্দুত্ববাদের কবলে পড়ে গেলেন তাই-ই তার হুঁশে নাই।
ওদিকে ঐ হত্যা-অত্যাচারের ঘটার আগে-পরের সময়কালে  কংগ্রেস তো বটেই খোদ বিজেপি ও বাজপেয়িও এই ঘটনা ঢেকে রাখার ক্ষেত্রে সহযোগী ভুমিকা ছিল অর্থাৎ ঢেকে রাখা কর্তাদের দলে তারাও ছিলেন তাহলে তারা কেন ও কিভাবে এ ঘটনা নিয়ে কথা তুলবেন?  ফলে এটা তো ঢাকাই থাকবে, নাকি? এটাই ঢাকা থাকার মূল কারণ। তো পরিচালক অথবা  এখনকার সঞ্চালকের নাম সৈয়দ নাজমুস সাকিব ইত্যাদি এদের উচিত হবে কেন তারা ঢাকা দিয়ে রেখেছিলেন সে দিকে যাওয়া। কেবল কংগ্রেস খারাপ অথবা যেন কাশ্মীরের মুসলমানেরাই এটা প্রকাশ হতে না দিবার জন্য দায়ী এমন ইঙ্গিত তোলা অসততা  হবে।

আসলে প্রথমত, এটা মুম্বাইয়ের কোনো বাণিজ্যিক সিনেমা বলতে যা বুঝায় তা নয়। এটা হিন্দুত্ববাদের পক্ষে দলীয় ভোট জোগাড়ের এক প্রপাগান্ডামূলক সিনেমা। অথচ এটাতে ভান করা হয়েছে যেন এটা একটা সাধারণ বাণিজ্যিক সিনেমাই। আবার এটা হিন্দুত্বের রাজনীতি এর স্বার্থে করা সিনেমা; অতএব এটা নিশ্চয় ভারতীয় উগ্র চরম জাতিবাদের স্বার্থের সিনেমা। কাজেই বিজেপি সরকার এ ছবির প্রদর্শন ট্যাক্স ফ্রি করে দিয়ে  কথিত দেশপ্রেমী জাতি-বোধের জজবা ও জোয়ার তুলুক,  তবু আমাদের একে প্রশংসা করতে হবে? এখন লক্ষণীয় কথিত হিন্দুস্বার্থ কিভাবে কোন ফাঁকে ভারতীয় জাতিবাদের স্বার্থ হয়ে গেছে কেউ তা খেয়াল করছে না। হিন্দুস্বার্থ মানেই তা ভারত রাষ্ট্রের স্বার্থ না-ও হতে পারে, এটাই হলো বটম লাইন। মুসলমান কোপানোকে যদি কেউ হিন্দুস্বার্থ বলে মনে করে তাহলে এটাও কী ভারতের স্বার্থ হবেই?

দ্বিতীয় সবচেয়ে বড় ঘটনা বা সঞ্চালকের চাতুরী এবং বোকামিটা হল, তিনি সাধুবাদ দিয়ে যাচ্ছেন পরিচালককে। কেন? তিনি মনে করছেন এর আগে কেউ কাশ্মিরের হিন্দু পণ্ডিতদের দেশত্যাগ মানে, তাদের ভারতের অন্য শহরে চলে যাওয়া – এই চাপা পড়ে থাকা ঘটনার দিকটা সামনে নিয়ে আসেনি। অতএব পরিচালক অগ্নিহোত্রী নিশ্চয় অনেক মহান মানুষ। তাই কি?

এথেকে দর্শক ভুল ধারণা পেতে পারে যে, তাহলে কাশ্মির সমস্যা মানে হল, মুসলমানদের হাতে হিন্দু দলন ও নিপীড়নের ঘটনা। বিজেপির ভাষায় ‘জাস্টিস’- দেশত্যাগী হিন্দু পণ্ডিতদের জাস্টিস দেয়ার কথা কেউ বলেনি। যেন সে জন্যই এটা এক সিনেমা! নাজমুস সাকিব জেনে না জেনে এই অসত্য ধারণা তৈরি করছেন।

ধরা যাক যদি আপনি আপনার কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিকে প্রথমে আগ বাড়িয়ে খুবই নির্দয়ভাবে পিটিয়েছেন। পরে ওই প্রতিদ্বন্দ্বি আপনার চেয়ে দল ভারী করে আপনাকে আরো নির্দয়ভাবে পিটিয়ে আরো বেশি সংখ্যায় আহত-নিহত করে দিয়ে গেছে। কিন্তু আপনি খুবই বুদ্ধিমান বলে আগে আপনার ওদেরকে পেটানোর অংশ আড়ালে বা বাদ রেখে কেবল আপনাকে কিভাবে কত খারাপভাবে পিটিয়েছে এনিয়ে এক লোমহর্ষক সিনেমা বানিয়ে ছেড়ে দিলেন, যাতে কেউ এটা দেখলে আপনাকেই খুবই ও একমাত্র ভিকটিম মনে হতে থাকে। আর এর ফলে তা দেখে এক নাজমুস সাকিব বলা শুরু করেন, পরিচালককে ধন্যবাদ যে, তিনি ভিকটিমকে জাস্টিস দেয়ার পথ খুলেছেন, কেউ যা নিয়ে কখনো কথা বলেনি, সে চাপা পড়া বিষয়টাই তিনি সামনে এনেছেন। ব্যাপারটা অনেক সুইট আর প্রগতিবাদী হবে তাহলে তাই না? আর এতে আমরা নিশ্চয় আপনাকে ‘খুবই বুদ্ধিমান’ বলব, কী বলেন?

কাশ্মির ফাইলস-এর সবচেয়ে বড় শঠতাঃ
দ্য কাশ্মির ফাইলস-এর সবচেয়ে বড় শঠতা এটাই। কারণ এর উদ্দেশ্য হিন্দু-মুসলমানকে প্রথমে বিভক্ত ও মেরুকরণ করা। পরে হিন্দুরা ভালো, মুসলমানরা খারাপ এভাবে এক তৈরি বয়ানে ঘটনাকে তুলে ধরা, যাতে এবার বিজেপি বা মোদিকে ত্রাণকর্তা মনে হয়। আর তাতে সব হিন্দু ভোট বিজেপির বাক্সে ঢোকে। এ জন্য সে কাশ্মিরের ঘটনা ইতিহাসের আগে-পিছে দেখাবেই না। যেন কাশ্মীর মানেই মুসলমানের হাতে হিন্দু নিপীড়ন অত্যাচারিত হওয়া, এটাই তুলে ধরবে…।
অথচ এই শঠতাকারিরা কাশ্মিরের ঘটনা মানেই তা ১৯৪৭ সালে ভারতের জন্ম অথবা ১৯৫০ সালে রচিত ভারতের কনস্টিটিউশন থেকেও শুরু করবে না। তাঁরা এর শুরু ধরবে জানুয়ারি ১৯৯০ সালে  হিন্দু পণ্ডিতদের দেশত্যাগের ঘটনা থেকে। আবার এর শেষও তাঁরা টেনে দিবে ১৯৯০ সালের দু-এক বছর পরেই। আর প্রচার চালাবেন, এখনো কাশ্মিরের একমাত্র সমস্যা হলো ইনজাস্টিস; দেশত্যাগী হিন্দু পণ্ডিতদের প্রতি ইনজাস্টিস। আর এতে নিশ্চয় আপনার প্রাপ্য হবে সাধুবাদ! তাই কি?

কাশ্মির ফাইলস-এর শঠতাকে বিচার বা ওর শঠতাকে উদাম করতে চাইলে দুটা প্রশ্ন করেন আর তা বুঝার চেষ্টা করেন। এক, কাশীরে সশস্ত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিল কবে থেকে এবং কেন?  আর দুই, কাশ্মীর শুরু থেকে মানে ১৯৪৭ সাল থেকে কখনই এটা হিন্দু-মুসলমানের সংঘাত দাঙ্গার ইস্যু ছিল না। ছিল ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে কাশ্মীরের সংঘাত; ভারতের সাথে থাকা  ও না-থাকার সংঘাত। তাহলে কাশ্মিরে হিন্দুদের উপর আক্রমণ শুরু হয়েছিল কবে থাকে এবং কেন?

সংক্ষেপে বললে, কাশ্মীরে সশস্ত্র রাজনীতি বা তরুণদের হাতে আস্ত্র তুলে নেওয়া এটা ১৯৪৭ সালের ঘটনা নয়। বরং ১৯৮৭ সালের কাশ্মীরের নির্বাচনের আগে পর্যন্ত কাশ্মীরের রাজনীতি মানেই সেটা নির্বাচনি রাজনীতি ছিল। ঐ ১৯৮৭ সালের নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির পরে ১৯৮৮ সাল থেকে কাশ্মীর সশস্ত্র রাজনীতিতে প্রবেশ করে।  আত তা থেকে প্রথমে বছরে দুএকজন পরে ১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে ঐ বড় করে  হিন্দু পণ্ডিতদের হত্যা নিপীড়ন ও দেশত্যাগের ঘটনাটা ঘটেছিল।  তাহলে এই পুরা ঘটনা থেকে কেবল ১৯৯০ সালের হিন্দু পন্ডিত নিপীড়নের ঘটনাকেই আলাদা করে এই সিনেমা উঠিয়ে আনছে কেন? কেবল ১৯৯০ সালের এই ঘটনাকেই ইনজাস্টিস বলে তুলে আনছে কেন? যে এই প্রশ্ন করতে পারবে না সেই-ই এই সিনেমার মাধ্যমে মোদির হিন্দুত্ববাদের শিকার হবে।

কাশ্মীর বিরোধের ফান্ডামেন্টাল দিকঃ
কাশ্মিরের সব অশান্তির শুরু ১৯৪৭ সাল থেকেই।  ভারতের প্রায় সব রাজনীতিবিদ এখনও কাশ্মিরের প্রাক্তন রাজা হরি সিং ভারতে অন্তর্ভুক্ত ও বিলীন হয়ে যাওয়ার কাগজে সই করার উপযুক্ত অথরিটি বলে মনে করেন।  এমনকি রাজনীতিবিদদের এমন মনে করার বাইরে বিশ্ববিদ্যালয় বা একাডেমিকরা এনিয়ে ভিন্ন আর কিছু জানেন তা মনে হয় না।
বরং সারা ভারতকে এক মিথ্যা জাতিবাদী জোশে ভুগতে দেখা যায় যে, ব্রিটিশ কলোনি দখলদাররা নাকি স্বদেশী আন্দোলনের নামে জমিদার হিন্দুর সন্ত্রাসবাদ বা কংগ্রেসের আন্দোলনে মুখে টিকতে না পেরেই যেন ভারত ত্যাগ করেছিল। অথচ একথা শতভাগ মিথ্যা। ফ্যাক্টস হল, কেবল ব্রিটিশরা নয়, সারা দুনিয়া থেকে সব কলোনি শাসকই ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধ থামার পরে স্ব স্ব কলোনি ছেড়ে স্বেচ্ছায় নিজ নিজ দেশে ফিরে চলে গিয়েছিল। আর তারা ত্যাগ করে চলে গিয়েছিল যে কারণে ঠিক সেই একই কারণে, রাজা হরি সিং-সহ তার মত কোন রাজারই ভারতে অন্তর্ভুক্ত ও বিলীন হওয়ার কোনো কাগজ-দলিলে স্বাক্ষর করার অথরিটিই ছিল না, অথরিটি হারিয়েছিল। আর এসব কিছুর পেছনে মূল কারণ হল ‘আটলান্টিক চার্টার’ চুক্তি [Atlantic Charter Aug14, 1941]। এটাকে বলা যায়, আমেরিকার সাথে কলোনি দখলদার ইউরোপের একেবারে মুখ্য এক চুক্তি। এই চুক্তিতে বিশ্বযুদ্ধ শেষে ইউরোপের কলোনি দখলদার দেশেরা বিনা শর্তে দখলদারি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। আর এই শর্তেই আমেরিকা হিটলারের বদলে ব্রিটিশ-ফরাসি ইত্যাদি মিত্রশক্তির পক্ষ নিয়ে বিশ্বযুদ্ধে সেই প্রথম অংশ নিতে সম্মত হয়েছিল। আর এর সাথে এতে ফেলে যাওয়া কলোনির কোন রাজার আর কোনো অথরিটিই নেই, থাকবে না যে, সে ওই দেশকে নিয়ে নিজ খেয়ালে অন্য কোনো দেশের ভেতর যোগ দেওয়াতে পারব। কারণ ঐ চুক্তিতে বলা আছে ওই দেশ কার দ্বারা শাসিত হবে, এর একমাত্র নির্ধারক হবে ওই ভূখণ্ডের বাসিন্দা জনগণ বা পাবলিক। ফলে ঐদেশের নিজ ভাগ্য তা নিজ পাবলিকের ভোটের সম্মতিতে ঠিক হবে। ফলে তা সহজেই এক স্বাধীন রিপাবলিক রাষ্ট্র হতে পারবে। ব্রিটিশরা চলে গেলে কাশ্মিরেরও এমন হওয়ার কথা।

নেহরু কখনো এমন আটলান্টিক চার্টার চুক্তির কথা জানতেন, পড়েছেন জানা যায় নাঃ
কিন্তু নেহরু কখনো এমন আটলান্টিক চার্টার চুক্তির কথা জানতেন, এর চিহ্ন-প্রমাণ পাওয়া যায় না। এমনকি এই চুক্তি-ই যে, জাতিসঙ্ঘের জন্ম ঘোষণার ভিত্তি -দলিল বলে জাতিসংঘ মনে করে এবং সেটাও নেহরু জানতেন এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং উল্টা প্রমাণ আছে। এসবেরই ফলাফলে নেহরু কাশ্মিরকে জবরদস্তিতে ভারতের অংশ করে রাখার পক্ষে জোড়াতালি (৩৭০ বা ৩৫এ ধারা) কিছু কাজ করে যান। কাশ্মিরের সব সমস্যার শুরু এখান থেকে। এবং কোন মতেই এটা কাশ্মীরের হিন্দু-মুসলমানের বিবাদ-সংঘাত একেবারেই নয়।
আর কড়া কথাটা হল, দুনিয়ার সব ইতিহাস পাঠক বা স্টুডেন্টদের মুখস্ত থাকা উচিত আটলান্টিক চার্টার চুক্তির। কারণ এটা উপস্থিত মর্ডান ও গ্লোবাল  রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি দলিল। যারা পড়বে না তাঁরা বকোয়াজ করবে।

দ্বিতীয় বড় ফ্যাক্টস হল, জম্মু-কাশ্মির মিলে ২০১১ সালের হিসাবে মোট জনসংখ্যা প্রায় ১.৩ কোটি যার ৬৮.৩% হলো মুসলমান আর হিন্দুরা ২৮.৪; বাকিটা অন্যান্য। আর ভারত রাষ্ট্রের জন্ম থেকেই যে হিন্দু-মুসলমান সমস্যা যেটা সেটাই কাশ্মিরের ওপরেও ভর করেছিল কিন্তু অনেক ধীরে ধীরে  যদিও তা অনেক পরে ১৯৮৭ সালের আগে নয়। কেবল সেই সমসাময়িক সময়ে। তাতে কী হয়েছিল?

ভারতের ‘আদি পাপ’ হল, সব নাগরিকদের সমান অধিকারের রাষ্ট্র হবে, সেটা তাঁরা করবে না। মানে অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্র তা হবে না; তাঁরা গড়বে না। বরং তাঁরা সাম্য নয়, হিন্দু আধিপত্যের এক রাষ্ট্র গড়বে। যা এক হিন্দু ধর্মভিত্তিক জাতি-রাষ্ট্র হতে হবে। আর যে ধর্মের লোক সংখ্যায় বেশি মানে হিন্দুরা এ রাষ্ট্রে আধিপত্য নেবে। এভাবেই ১৮৮৫ সাল থেকে জন্ম নেয়া কংগ্রেস এই লাইনে আগিয়েছে আর ১৯৪৭ সালের ভারত কায়েম করেছে।
আমার এই অসাম্যের রাষ্ট্র হিন্দু আধিপত্যের রাষ্ট্র কথাটা বুঝে নিতে এদিকে আসেন। যেমন, সাম্প্রদায়িক শব্দটাকে ভাঙেন, যে শব্দটা দুনিয়ার আর কোনো রাষ্ট্রে নাই। আর এ শব্দের আসল অর্থ হল, হিন্দু আধিপত্যের স্বার্থে ডিফাইন করা সীমার মধ্যে মুসলমানদের বসবাস, জীবন যাপন করতে হবে। তাই মুসলমানেরা ধর্মীয় চিহ্ন প্রদর্শন করে স্বাভাবিক সামাজিক জীবন যাপনও করে চলতে পারবে না। যদি তা অনুসরণ না করে তবে ওসব মুসলমানকে ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে ট্যাগ দিয়ে নিন্দা করা হবে। বিপরীতে যেসব মুসলমান তা মানবে, মানে হিন্দু আধিপত্য কর্তৃত্ব মেনে নেবে তাদের মানার শর্তেই তারা হিন্দুদের পাশে সমাজে মানে যেমন স্কুলে অফিসে পাশে বসতে দেয়া হবে। আর তাতে এসব মুসলমানরা ‘অসাম্প্রদায়িক’ বলে গণ্য হবে। তাই সাম্প্রদায়িক বা অসাম্প্রদায়িক শব্দের আসল কাজ ও রূপ হল “হিন্দু আধিপত্য” নিশ্চিত করা।
যেমন দেখেন মোগল আমলে “সাম্প্রদায়িক” বলে কোন ধারণা বা শব্দটা নাই। তখন হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গার কথাও জানা যায় না। কিন্তু ব্রিটিশ আমলে বেশির ভাগ জমিদারি হিন্দুরা নেয়াতে (যে জমিদারি মানে, ব্রিটিশ শাসকের নিচে ওই সমাজের কর্তা এক নিয়ামক শক্তি ) এবার তারা তাদের আধিপত্য (ধর্মীয় পরিচয়ে আধিপত্য) চালু করেছিল। আসলে হিন্দু জাতিবাদের ভিত্তিতে হবু ভারত গড়তে হবে – কংগ্রেসের এই নীতির ভিত্তিতে ভারতের জন্ম – এটা ক্রমেই ওই জমিদার-হিন্দু আধিপত্যের পক্ষে সাফাই হিসাবে হাজির হয়েছিল।

এখন ১৯৫০ সালে প্রণীত ভারতের কনষ্টুটিউশনে  কাশ্মিরকে ভিত্তিহীনভাবে ভারতের অঙ্গীভুত করে নিবার পরেও নেহরু শান্তিতে থাকতে পারেননি। সারা ভারতে মোট মুসলমান জনসংখ্যা মাত্র প্রায় ১৫% তবে কোথাও কোথাও মানে, কোন রাজ্যে বা শহরে তা বড়জোর ২৫-৩০%। ফলে সহজেই হিন্দু আধিপত্য মানে হিন্দু সামাজিক-রাজনৈতিক আধিপত্য কায়েম রাখা সহজ ছিল যদিও তা সমাজে সবধরনের নাগরিক অসাম্যের প্রধান উৎস হয়েই থেকে গেছিল।

কিন্তু ভারতের এই হিন্দু-আধিপত্য পছন্দের শাসকরা তাদেরই আধিপত্যের তত্ত্ব মুসলমানরা কেমন অস্বস্তি অনুভব করে তা কাশ্মিরে টের পেয়েছিল। কারণ ওই একই আধিপত্য তত্ব কাশ্মিরে তাদের বিপক্ষে কাজ করেছিল। কারণ কাশ্মিরে মুসলমানরা অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠ (৬৮%)।  আর এমন সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে কোন হাতছুট ঘটনা ক্রমন হতে পারে এর প্রথম প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৮৭ সালের কাশ্মীর (প্রাদেশিক বা অ্যাসেম্বলি) নির্বাচনে। কারণ তত দিনে কাশ্মিরের অতিষ্ঠ মুসলমানরা, তাদের ব্যক্তি বা সামাজিক-রাজনৈতিক দল বা গ্রুপগুলো একজোট হয়ে মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট (এমইউএফ MUF) গড়ে ওই নির্বাচনে লড়ে ক্ষমতা নিতে তৈরি হয়েছিল। এই এমইউএফ ছিল ১৯৮৪ সালে গড়ে তোলা প্রথম ভ্রুণ এক ছাত্রসংগঠন, যার নাম ছিল ইসলামী স্টুডেন্ট লীগ। এটাই প্রথম কাশ্মীরের রাজনীতিতে  “সবকিছু ইসলামি হতে হবে” এই আইডিয়ার রাজনীতির আবির্ভাব ঘটেছিল।   আসলে ভারতের আধিপত্য তত্ত্ব অনুসারে, কাশ্মিরে হবু মুসলমান আধিপত্য দেখে তারা প্রমাদ গুনে বিপদ বুঝতে পারে আর এটাই তারা মেনে নিতে পারেনি।
কেন কাশ্মির এমন বদলে গেল, মূল কারণ নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র হলে সেখানে ধর্মীয় বা সব ধরনের পরিচয় নির্বিশেষে সবাই সমান নাগরিক হয়ে থাকতে পারে আর নাগরিকের যদি সবাই সম-অধিকারের নাগরিক হয়, তাহলে কারো কারো আধিপত্যের আলাপ সেখানে থাকে না। কিন্তু বাস্তবের ভারত ছিল এর বিপরীত। হিন্দু-জাতিবাদী কংগ্রেসের হাতে পড়ে সেটা হিন্দু আধিপত্যের ভারত হয়ে উঠেছিল। আর তা একইভাবে কাশ্মিরের মুসলমানরা অনুসরণ করতে গেলে হিন্দুদের জন্য সব বিপদ ঘনিয়ে ওঠে।আর এতেই সবচেয়ে বড় স্টুপিডিটির বা দেশলাই মারার কাজটা করেছিলেন ফারুক আবদুল্লাহ।

দেশলাই জ্বালানোর ভুমিকায় ফারুক আবদুল্লাহঃ
এই “মুসলিম উত্থান” বার্তাটা কাশ্মির জাতীয় কংগ্রেসের নেতা ফারুক আবদুল্লাহ নজর করেন। কারণ তিনি এমইউএফ-এর ভেতরের কোন নেতা ও দল ছিলেন না। তিনি ততকালের বিষয়টাকে দিল্লি গিয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর কানে তোলেন; সাথে আলাপ করেন এই এমইউএফ-এর উত্থান ঠেকানো নিয়ে। তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, ব্যাপক হলেও সরাসরি নির্বাচনী কারচুপি করেই তারা এই উত্থান ঠেকাবেন। তাই ঐ নির্বাচনের ভোটদানের পরেই এমইউএফের ছোট-বড় প্রায় সব নেতাকর্মীকে (যতদুর সম্ভব) তারা গ্রেফতার করেন আর পরে প্রতিটা কেন্দ্রের ফলাফল ওই দিন দূরে থাক সপ্তাহ-দশ দিন পরে ইচ্ছামত ঘোষণা করেছিলেন। আর এখান থেকে কাশ্মিরের রাজনীতি মানে মিছিল মিটিংয়ের প্রকাশ্য রাজনীতি ও নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। পরের বছর ১৯৮৮ সাল থেকে সারা কাশ্মির সশস্ত্র রাজনীতি পথে চলে যায়। অস্ত্র আর খুনাখুনি এটাই প্রধান ধারা হয়ে যায়। তারপর থেকে কাশ্মিরে নির্বাচনের আর কোনো গুরুত্ব থাকেনি, থাকার আর কোন সুযোগও থাকে নাই। কংগ্রেস-বিজেপির ভাষায় যা ‘জঙ্গিবাদ’ হয়ে যায়। আর বিজেপির বাজপেয়ি তার নতুন ডমিনেটং বয়ানে হাজির হলেন। তিনি কাশ্মিরে কংগ্রেসের হাতে ব্যাপক নির্বাচনী কারচুপি করাতে রাজনীতিকে সশস্ত্রতার দিকে ঠেলে দেয়া্কে ভুলে গেলেন, অস্বীকার করলেন। আর এক নয়া বয়ান হাজির করলেন যে, কাশ্মিরের সব সমস্যার উৎস ‘সীমা পার কী আতঙ্কবাদ’ -মানে কাশ্মিরের সব সমস্যার উৎস নাকি পাকিস্তান থেকে আসা টেরোরিজম! কেন্দ্র ভারতের কোন ভুমিকা যেন নাই!
যারা  ১৯৮৭ সালের এই টার্নিং পয়েন্ট বিস্তারিত আরো পড়তে চান তাঁরা দেখতে পারেন ১। এখানে  ২।  এখানে The 23rd March 1987, the day that changed Kashmir as never before, ৩।  এখানে, ৪। এছাড়াও আমার এক পুরানা লেখা এখানে

আর ওদিকে কাশ্মিরের সশস্ত্র রাজনীতির শুরুতে এই প্রথম প্রথম প্রতিহিংসাবশত দু-একজন হিন্দু পণ্ডিতকে হত্যা করা হয়েছিল। পরে যেটার সবচেয়ে বড় আর ব্যাপক হত্যার ঘটনাটা ছিল ১৯৯০ সালের ১৯ জানুয়ারি। আর এবারও কংগ্রেস, বিজেপি, ফারুক আবদুল্লাহ আর মুফতি সাঈদ সবাই কমবেশি যার যার অবদান-দায় রেখে পণ্ডিতদের জম্মু ছেড়ে চলে যেতে উৎসাহিত করেছিলেন। ভেবেছিলেন পন্ডিতেরা দেশত্যাগ করলে সেটা সশস্ত্রতার বিরুদ্ধে পাল্টা বয়ান তৈরিতে একটা চাপ হবে। কাশ্মিরের গভর্নর জগমোহন বা কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুফতি সাঈদ বা বিজেপি সমর্থিত কোয়ালিশনে ভিপি সিং-এর সরকারের আমলে এই জম্মুত্যাগের ঘটনাটা ঘটানো হয়েছিল। তাই সকলের দায় ছিল। যদিও কেউ এথেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। কিন্তু শিক্ষাটা হলো, কেউ কোনো একটা নিজধর্মীয় আধিপত্যের জাতিরাষ্ট্র গড়বেন নাকি অধিকারভিত্তিক সাম্যের নাগরিক রাষ্ট্র? যেমন গড়বেন তেমন ফল পাবেন। ফলে সেটা সারা ভারতে কায়েম করবেন অথবা কেবল কাশ্মিরে কোনো একটি ধর্মীয় আধিপত্যের রাষ্ট্র গড়বেন – যেখানেই গড়েন, এই কাজ কোথাও কারো জন্য ফলদায়ক হয়নি। আর আপনি যদি হিন্দু আধিপত্যের জাতিরাষ্ট্র চান তবে নিশ্চিত থাকতে পারেন, আপনি তার মানে সে দেশে মুসলমান আধিপত্যের আরেক জাতিরাষ্ট্রের চিন্তার জন্ম হতে দাওয়াত দিচ্ছেন!!!
ঠিক যেমন এখন ভারতে শুরু হয়েছে হিন্দু-জাতিবাদের আরও ভয়াবহ সেকেন্ড ফেজ। এবার হিন্দুত্ববাদের আধিপত্যের রাষ্ট্র গড়ার খায়েশ। এতে আরেকবার মুসলিম লীগের মতোই মুসলিম জাতিরাষ্ট্র চিন্তার জন্মকে (এবার তা সম্ভবত গ্লোবাল) দাওয়াত দেয়া হচ্ছে। যেমন গুড় ঢালবেন তেমনই মিস্টি হবে!

তাহলে কাশ্মির ফাইল কী দাঁড়াল? সেটা হচ্ছে কাশ্মিরের সব ইতিহাস ফেলে কেবল ১৯৯০ সালে কাশ্মির পণ্ডিতদের জম্মু ছেড়ে চলে যাওয়াটা – কেবল এই অংশটা ইতিহাস থেকে তুলে এনে একে সামনে এনে বিজেপির পক্ষে সহানুভ‚তি জোগাড়, এই হিন্দুত্ব উত্থানের চেষ্টা করা হচ্ছে। আবার ১৯৪৭ সাল থেকে কত কাশ্মিরি মরেছে – কত ইনজাস্টিস সেটা নয়; কেবল ১৯৯০ সালে্র মধ্যে সব বুঝাবুঝি সীমাবদ্ধ করতে রাখতে চাইছেন। সঞ্চালক নাজমুস সাকিবের মত বলতে থাকেন কাশ্মির ফাইল সিনেমা  “এটা একটা সত্যি ঘটনা। এই ঘটনাটিতে কোনো মিথ্যার কিছু নেই”। আর সাথে মুখরোচক দাবি – জাস্টিস।  তবে কেবল “১৯৯০ সালকে” জাস্টিস দিতে চাইছেন!

কাশ্মিরের ইতিহাস জেনে পরে প্রতিবাদঃ 
ডেইলি স্টারের ওই সঞ্চালক তার অনুষ্ঠানের শেষের দিকে বারবার অনুরোধ করছিলেন কাশ্মিরের ইতিহাস জেনে যেন তাঁর কথার প্রতিবাদ বা ভিন্নমত নিয়ে কেউ আসেন। অথচ তিনি নিজেই আসলে কাশ্মিরের ইতিহাস কতটুকু জানেন? কাশ্মির মানে কী কেবল ১৯৯০ সাল??? না। অবু তার কাছে কাশ্মিরের ইতিহাস মানেই কেবল ওই ১৯৯০ সাল ও কাশ্মির পণ্ডিতদের জম্মু-ত্যাগ এটুকুই মাত্র। তামাশার আসলে কোনো শেষ নেই।
তিনি টেরই পেলেন না যে, তিনি পরিচালক অগ্নিহোত্রীর হিন্দুত্ববাদের পাল্লায় পড়ে অন্ধ হয়ে গেছেন বা হতে চেয়ে হয়েছেন। অথচ তিনি মনে করছেন, নির্যাতিত হিন্দুদের পক্ষ নিয়েছেন; তাহলে এটা নিশ্চয় প্রগতিবাদী অবস্থান।  কিন্তু কে তাকে বুঝাবে ঠিক এখানেই প্রগতিবাদ=হিন্দুত্ববাদ এরা এমন এক হয়ে গেছে! তাই তিনি হিন্দুত্ববাদকেই প্রগতিবাদ ঠাওরাচ্ছেন!! বেচারা ডেইলি স্টার!!!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা  দৈনিক  “নয়াদিগন্ত” পত্রিকার  ২ এপ্রিল ২০২২ ওয়েবে আর পরদিন প্রিন্টে   ‘দ্য কাশ্মির ফাইলস’; যেখানে হিন্দুত্ববাদই প্রগতিবাদ– এই শিরোনামে  ছাপা হয়েছিল।   ঐ ছাপা হওয়া লেখাগুলোকে আমার লেখার ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ বলা যায়।  আর আমার এই নিজস্ব সাইটের লেখাটাকে সেকেন্ড ভার্সান হিসাবে এবং  থিতু ভাষ্য বলে পাঠক গণ্য করতে পারেন।  আসলে পরবর্তিতে ‘ফার্স্ট ড্রাফট’ লেখাটাকেই এখানে আরও অনেক নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে ও নতুন শিরোনামে এখানে আজ ছাপা হল। ]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s