মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

মোদীর কাশ্মীর সাফাই-বয়ান দুর্বল

গৌতম দাস

১৯ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৬

https://wp.me/p1sCvy-2G8

 

Restrictions reimposed in parts of Srinagar after incidents of violence 18 Aug 2019. –  ছবি : THE HINDU

[সার সংক্ষেপঃ গায়ের জোর দেখানোর দিক থেকে মোদীর কাশ্মীর দখল সহজেই সম্পন্ন হয়েছে, তা মোদী দাবি করতেই পারেন। কিন্তু কেন করেছেন এই দখলি কাজ – সেই দখলের পক্ষে একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান পেশ? সরি, এখানে তিনি বিরাট শর্টেজ বা ঘাটতিতে আছেন। বিশেষ করে পশ্চিমের মন জয়ের ক্ষেত্রে। তাই তিনি বারবার ব্যাকফুটে যাচ্ছেন। এমনকি ইমরান খানের – হিন্দুত্বকে হিটলারির সাথে তুলনা করা বা হিটলারির সাথে এর লিঙ্ক দেখানো নিয়ে কোন জবাব দেওয়ার ধারেকাছে তিনি যান নাই। সব মিলিয়ে সাফাই-বয়ানের দুর্বলতায় পরিস্থিতি উলটা দিকে চলে যেতে পারে মানে, ব্যাকফায়ার করতে পারে একারণেই।]

ক্ষমতা ও সাফাই এর সম্পর্ক থেকে শুরু
ক্ষমতা দেখিয়ে একটা কাজ করে ফেলা তেমন কঠিন কিছু না যতটা এর পক্ষে একটা গ্রহণযোগ্য সাফাইও সাথে তুলে ধরাটা কঠিন। আমাদের অনেকের ধারণা গায়ের জোর বা শুধু সামরিক সক্ষমতা থাকলেই প্রায় সবই করে ফেলা যায়। কিন্তু না, একেবারেই না। এই অনুমান শুধু ভুল নয়, ভিত্তিহীনও। যেমন একটি ক্যু বা বিপ্লবী রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পরের পরিস্থিতিও মারাত্মক কঠিন হয়ে দাড়াতে পারে যদি ক্ষমতা দখলের সপক্ষে একটা জুতসই সাফাই হাজির করা না যায়, যা দেশের মানুষের সামনে সহজেই গ্রহণযোগ্য না হয়। আসলে ক্ষমতার প্রয়োগ আর এর সপক্ষে সাফাই – অর্থাৎ ক্ষমতা ও সাফাই, এ দুটো ঠিক আলাদা নয়। বরং এরা হাত ধরাধরি করে চলে। তাই একটা উপযুক্ত সাফাই-বয়ান, ক্ষমতার সক্ষমতার মতই সমান জরুরি এবং অনিবার্য প্রয়োজনীয়। কোন একটাকে ছাড়া কেবল আরেকটাকে দিয়ে কোনো সফলতা আনা সম্ভব না।
অভিষেক- এটা সংস্কৃতঘেঁষা একটা বাংলা শব্দ হলেও শব্দটা আমাদের অপরিচিত নয়।
যেমন বিশেষ করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ব্যবস্থায়। ওখানে শিক্ষার্থীরা নির্বাচন শেষে একটা নির্বাচিত সংসদ পেলে এবার ওর একটা “অভিষেক” অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করার রেওয়াজ দেখা যায়। সেই অভিষেক কথাটার পেছনের কনসেপ্টটা হল, কেউ নির্বাচিত হলে এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাকে প্রকাশ্য স্বীকৃতি বা গণ-অনুমোদন দেয়া হয়। অরিজিনাল আইডিয়াটা ছিল রাজ-রাজড়াদের আচারের সাথে যুক্ত এক ধারণা। যেমন কেউ নতুন রাজা হলে তার অভিষেক [Coronation] হত অথবা কোন রাজার দেশে অনেক সময় একটা নির্ধারিত বার্ষিক দিন রাখা হত অভিষেক অনুষ্ঠানের, যেদিন প্রজারা কোন না কোন উপহার-উপঢৌকন হাতে করে সেই অনুষ্ঠানে যেত। যার ভেতরের প্রচ্ছন্ন অর্থ হল – প্রজা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজাকে সেদিন বা সে বছরের জন্য স্বীকার করে নিল বা অনুমোদন দিল। আমাদের পাহাড়িদের রিচ্যুয়ালে রাজাদের মধ্যে “পুণ্যাহ” বলে এর কাছাকাছি একটা ব্যবস্থা থাকতে দেখা যায়।
তাহলে সারকথাটা হল ক্ষমতা আর ক্ষমতার-অভিষেক পাশাপাশি হাত ধরাধরিতে থাকতেই হয়। তবেই একটা ক্ষমতা সেটা প্রকৃত ক্ষমতা হয়ে ওঠে। কেউ ক্ষমতা পেল বা নিল কিন্তু ক্ষমতাটার অভিষেক হল না কোনো দিন, মানে অ-অনুমোদিত ক্ষমতা হয়েই থেকে গেল, এমন হতে পারে। যেমন আমাদের এরশাদ প্রেসিডেন্ট ছিলেন দীর্ঘ ৯ বছর, কিন্তু অ-অনুমোদিত। তিনি ক্ষমতায় ছিলেন এ কথায় কোন ভুল নেই, কেউ অস্বীকারও করেনি। কিন্তু এই ক্ষমতাটার কখনোই “অভিষেক” ঘটেনি। পাবলিক মানেনি যে, “আপনি আমাদের প্রেসিডেন্ট”। এই গণ-অনুমোদন ঘটেনি। কারণ যে সাফাই-বয়ান দিয়ে তিনি ক্ষমতা নিয়েছিলেন পাবলিক তা অনুমোদন করেনি, পছন্দ করেনি। কাশ্মীর দখলের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদীর এখন এই অবস্থা। সাফাই-বয়ান ঠিক নেই, এমন দিশা নেই অবস্থা।

শুরুতে অমিত শাহ অনেক ধরণের সাফাই-কথা বলেছিলেন, এর একটা যেমন – ৩৭০ ধারা রদ করে দেওয়াতে কাশ্মীর এখন সন্ত্রাসবাদমুক্ত হয়ে যাবে [অমিতের দাবি সন্ত্রাস মুছবে কাশ্মীরে।] যদিও অমিত শাহের কথা একেবারেই মানেন নাই বিজেপির আগের প্রধানমন্ত্রী বাজপেয়ী জমানার ‘র’[RAW] এর সাবেক প্রধান এ এস দুলাত।  অথবা বিজেপির কেন্দ্রীয় জেনারেল সেক্রেটারি ও আরএসএস-এর কোর সদস্য রাম মাধব। তিনি ৩৭০ ধারা রদ করার দিন ৫ আগষ্ট, টুইট করেছিলেন, “আজ কী এক গৌরবের দিন! অবশেষে শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি-সহ হাজারো শহীদদেরকে সাত-দশক পরে হলেও সম্মান জানানো হয়েছে। কাশ্মীরকে পুরাপুরি ভারতে ঢুকিয়ে নেয়া হয়েছে…[ What a glorious day! Finally the martyrdom of thousands starting with Dr. Shyam Prasad Mukherjee for complete integration of J&K into Indian Union]।

এককথায় বললে বিজেপি-আরএসএস এর সাফাই-বয়ানগুলো ছিল “আভ্যন্তরীণ শ্রোতা” তবে মূল কাশ্মীরিদেরকেই বাদ রেখে। অর্থাৎ কাশ্মীরী বা পশ্চিমাদেরকে এদেরকে তিনি তখন শ্রোতা গণ্যই করেন নাই। কাশ্মীর বাদে  ভারতে কেবল আভ্যন্তরীণভাবে হিন্দুত্বের জোয়ার উঠানোর মধ্যে নিজের বয়ানে জয়লাভ বুঝেছিলেন। এমনকি, গত ১৫ আগষ্ট স্বাধীনতা দিবসের বক্তৃতায় তিনি সেটা আরও স্পষ্ট করে বলেছেন, কাশ্মীরকে জবরদস্তিতে ভারতের ভিতরে ঢুকিয়ে নেয়া – এটা নাকি “ভারতবাসীর” স্বপ্ন ছিল [PM Modi says the dreams of people]। কিন্তু কোন ভারতবাসী? মোদীর বয়ান অনুসারে, যেখানে হিন্দুত্ববাদী=ভারতবাসী।

[রেসিজম বা বর্ণবাদ কী? কেন মোদীর হিন্দুত্ববাদ একটা রেসিস্ট মতবাদ]
কোন বয়ান হিটলারের মত বর্ণবাদী বা ঘৃণিত রেসিজম[racism] কী না তা বুঝবার একটা সহজ শব্দ-চিহ্ন আছে। সে শব্দটা হল “শ্রেষ্ঠত্ব” [Supremacy]।  যেমন আমার জাতটা শ্রেষ্ঠ [আর্য শ্রেষ্ঠত্ব] অথবা আমার ধর্মটা শ্রেষ্ঠ [Hindu Supremacy] বলে দাবি করা। যেমন হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ [Nazi Aryan Supremacy]।
অনেকে অনুভব করতেই পারে যে তার ধর্মে অনেক ভাল কিছু আইডিয়া আছে, সে সেটা তুলে ধরতে চায়। এতে কোন সমস্যাই নাই। সে সেটা বলতেই পারে। এটা এক জিনিষ যা শ্রেষ্টত্ববাদ নয়। কিন্তু আপনি যখন দাবি করবেন আমার ধর্মই শ্রেষ্ঠ সেকারণে  অন্য সবাইকেও এটা মানতে হবে – তবে এটা হবে অপরাধ – এটা রেসিজম বক্তব্য হবে।

এক ফারাকটা স্পষ্ট করে বুঝতে হবে। যেমন অনুমান করা যাক, একটা বিশ্বসভা বলে কোন একটার আসর আছে যেখানে সব জনগোষ্ঠিই ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট যার যা ভাল কিছু আছে বলে সে মনে করে তা সবাইকে দেখাতে সেখানে হাজির হয়ে৩ যেতে পারে। সেখানে আপনি আপনার ধর্মসহ যেকোন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট বিশেষ দিক যা অন্যান্যদের কাছেও স্বীকৃত বা কদর হবে বলে মনে করেন তা তুলে ধরতে হাজির হতে পারেন। এতে কোনই সমস্যা নাই। কিন্তু আপনি যদি সেই সভায় হাজির হয়ে দাবি করতে থাকেন “আপনিই শ্রেষ্ঠ” তাই সবাইকে আপনার দাবি মেনে নিতে হবে – তাহলে এটা হবে রেসিজম, বর্ণবাদিতা। কারণ আপনি অন্যান্যদের স্বীকৃতি পাওয়া, আমলে আসা ও অন্যান্যদের আপনার কদর বুঝা ইত্যাদি – এসব কোন কিছুর ধার ধারতে, পরোয়া করতে রাজি হতে হবে তো। আপনাকে তো আপনার জিনিষ  অন্যের দ্বারা আমল করা, কদরবুঝা পর্যন্ত  এবং গ্রহণ হওয়া বা না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে! আপনি নিজে নিজেকে ভাল বলা ত কোন একক মাপকাঠিই না, যতক্ষণ না গুণের কদর জানা অন্যেরা আপনার কদর করছে। আবার ভাল জিনিষগুলো পাশাপাশি থাকতেও ত পারে। কিন্তু না। হিটলার যেমন ছড়ালেন তারা জর্মান জাতি – দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ। জর্মান্দের চোখের মনি নীল, শরীরে প্রবাহিত বিশুদ্ধ আর্য রক্ত  – কাজেই তারা দুনিয়াই সবার চেয়ে শ্রেষ্ঠ [The Germanic peoples were considered by the Nazis to be the master race, the purest branch of the Aryan race. ]। আর এখন থেকেই এটাকেই ইহুদি  বা রোমানিকসহ জর্মানিতে আর যারা আছে এদের সবাইকে মেরে ফেলা গণহত্যার সাফাই-বয়ানের ভিত্তি হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
হিন্দুত্ব – মানে আরএসএস এর হিন্দুত্বের বয়ান যেমন প্রচার করে আগে একদিন নাকি সারা দুনিয়ার সবাই হিন্দু ছিল,  সকলে হিন্দু কালচারের অন্তর্গত ছিল। অন্য ধর্ম ও সংস্কৃতির জনগোষ্ঠিরা ষড়যন্ত্র করে, বিশেষ করে ইসলাম  সব কনভার্ট বা ধর্মান্তর করে ফেলেছে। তাই আরএসএস বা হিন্দুত্বের কাজ হল “ঘর ওয়াপাস” বা সবাইকে ঘরে ফেরত আনা।  যেমন মুসলমানদেরকে এখনকার “জয় শ্রীরাম” বলানো বা বাধ্য করা। এই ততপরতার পিছনের হিন্দুত্বের বয়ান ও সাফাই যুক্তিটা হল, যেহেতু হিন্দুত্ব বিশ্বাস করে সকলেই আগে হিন্দু ছিল তাই মুসলমানদেরকে এখন এটা বলানো তো যেতেই পারে, এতে তাদের অসুবিধা কী?  [কিছুদিন আগে উত্তর প্রদেশের প্রাদেশিক দুই এমএলএ এর তর্কটা যেটার ক্লিপ ভাইরাল হয়েছিল সেটা খেয়াল করে ব্যাপারটা বুঝা যেতে পারে।] অতএব তাদেরকে এখন “জয় শ্রীরাম” বলতে হবে। এটা বলাতে হবে। এই হিন্দুত্ব মনেই করে না এমন বলানো বা বাধ্য করা এটা আইনত অপরাধ বা অন্যায়। এতে যে সহ-নাগরিকের অধিকারের চরম লঙ্ঘন করা হচ্ছে – এটা তাদের বুঝাবুঝি থেকে অনেক দূরে। তাই তাদের চোখে এটা কোন ক্রিমিনাল অফেন্স নয়। সেটা আবার তারা আরেক সাফাই থেকে মনে করে যে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ট দেশে এটা আবার অপরাধ কী? একইভাবে একই ভাবনার বয়ানের উপর চলে “ইসকন” এর খিচুরি “প্রসাদ” খাওয়ানোর কর্মসুচী। কথিত খিচুরি “প্রসাদ” খাইয়ে ছলে বলে “কৃষ্ণ নাম গাওয়ানো” – তাই একই চিন্তার ফসল বা আউটকাম। এক ধরণের  হিন্দু শ্রেষ্ঠবাদ।

একটা মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্রে এই ধরণের চিন্তা-চর্চাকারী ব্যক্তিদের কাজ-ততপরতা মারাত্মক অপরাধ বলেই গণ্য হবে। কারণ আপনি নাগরিক ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রধান বলে মানছেন না, আমল করছেন না। দ্বিতীয়ত আপনি নাগরিক ব্যক্তিকে ফোর্স করছেন। এ’দুটাই অপরাধ।  আসলে ব্যাপারটা হল, আপনি আপনার ধর্মীয় বক্তব্য বয়ান সব প্রচার করতে পারেন কিন্তু তা গ্রহণ করা না করার ব্যাপারটা সহ-নাগরিকের হাতে পুরাপুরি ছেড়ে দিয়ে রাখতে হবে, আর এমনটা করতেই আপনি বাধ্য। কারণ এটাই আপনার সীমা। আপনি এই সীমা ক্রস করে, আপনি খাবারসহ কোন সুযোগ সুবিধা দেওয়ার লোভ দেখাতে পারবেন না, ফুসলাতে পারবেন না। অন্যের উপর জোর খাটানোর মত কোন বাধ্যবাধকতা আরোপ তো করতেই পারবেন না। অর্থাৎ সীমা পার হলেই এবার আপনি ক্রাইম জোনে ঢুকে গেলেন।
যেমন আর এক ভাল উদাহরণ,  বাংলাদেশের হিন্দু মহাজোটের নেতা, আরএসএস এর সদস্য গোবিন্দ প্রামাণিক ভিডিও বক্তৃতায় দাবি করছেন সমাজে হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে যেগুলো হচ্ছে সেগুলো “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে নাকি বিয়ে করানো হচ্ছে। তিনি উস্কানি দিচ্ছেন এই বলে যে, হিন্দুদের এটা দলবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ করতে হবে, মেয়েটাকে ফিরিয়ে এনে আবার হিন্দু করে নিতে হবে।
প্রথমত আপনাকে যেটা মানতে হবে হিন্দু মেয়েটার নিজের ইচ্ছাটা কী? সেটা সবার আগে অবশ্যই আমল করে নিতে হবে। আর এর ভিত্তিতেই বিচার, করণীয় ঠিক হবে। তাই আপনার সাবালক মেয়ে স্ব-ইচ্ছায় বিয়ে করতে গেছে কিনা – সেই কেসগুলোকে আলাদা করতে হবে আর এই কেসগুলোর ব্যাপারে আপনাকে মুখে কুলুপ দিতে হবে। মেয়েটা কোন গোবিন্দ প্রামাণিকের মেয়ে হতে পারে। কিন্তু তবুও আদালতের চোখে সাবালোক মেয়ের ইচ্ছাটাই মুখ্য ও একমাত্র, এটাই মানতে হবে। কারণ আপনার নিজের সাবালোক মেয়ের “মালিক” আপনি নন। বরং ঐ মেয়েটা নিজে এবং একমাত্র সে নিজের সিদ্ধান্তদাতা। আর যদি আপনার মেয়ে নাবালোক না হয় তো “নাবালোক অপহরণের” মামলা করেন। এবার আপনি সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। কিন্তু তবু এটা তো হিন্দু-মুসলমানের ক্যাচাল নয়।  আসলে প্রায় সব হিন্দু-মুসলমানের বিয়ে আসলে প্রেম সংক্রান্ত। আপনি সাবালোক মেয়ের প্রেমের টান বা সিদ্ধান্তের দিকটাকে আমল না করে, উলটা মেয়েকে আপনার সম্পত্তি মনে করতে পারেন না। আর তা থেকে  এটাকে “হিন্দু মেয়েদের উঠিয়ে এনে” ধর্মান্তরিত করে বিয়ে বলে উস্কানি উত্তেজনা তৈরি করতে পারেন না। তবে বলাই বাহুল্য আমি অবশ্যই একালে লীগের গৌরব সন্তানদের রেপসহ মেয়ে উঠিয়ে আনা, মোবাইলে ছবি তুলে ভয় দেখানে ইত্যাদির যেসব ল-লেস-নেস এর কেসগুলো আছে তা এখানে আমল করা হয় নাই। এব্যাপারে লীগ তো খুবই নিরপেক্ষ, হিন্দু-মুসলমান দেখে না। দেখে সামাজিক বা রাজনৈতিক শক্তিতে কে দুর্বল – সেই তার শিকার।  তাই, আমাদেরকে কঠোরভাবে সাবধান থাকতে হবে সমাজের এসব অন্যায় ও ল-লেস-নেস এর কেসগুলোকে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” প্রচারের হাতিয়ার বানানোর বিরুদ্ধে।

আমাদের মনে রাখতে হবে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। মূলত আরএসএসের হিন্দুত্ব এরা রিপাবলিক রাষ্ট্র বিশ্বাস করে না। মানে, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্রে বা  নাগরিক অধিকারে নুন্যতম বিশ্বাস রাখে না। একারণেই সে অবলীলায় কোন মুসলমান নাগরিককে জোর করে জয় শ্রীরাম বলাতে পারে, অকথ্য নির্যাতন করতে পারে, পাবলিক লিঞ্চিং করতে পারে, মেরে ফেলতে পারে। কারণ ভারতে কেউ মুসলমান হলে হিন্দুত্ববাদ মনে করে তার কোন নাগরিক অধিকার নাই। একারণে, শেষ বিচারে “হিন্দুত্বের রাজনীতি” সোজাসাপ্টা এক হিটলারি রেসিজম, বর্ণবাদিতা। আর অমিত-মোদীর সরকার এই হিন্দুত্বের জোয়ার তুলে  উস্কানি ও উন্মাদনা তৈরি করছে। কাশ্মীর দখলের পক্ষে সাফাই-বয়ান তৈরি করছে। যেটা এখন, এই “হিন্দুত্বের হিটলারিজম” আমাদের এই অঞ্চলকে তছনছ করে ফেলতে উদ্যত হয়েছে।]

বয়ান অনুমোদন-অননুমোদনঃ
ভারতের বাইরের হিসাবে বললে অন্তত দু’টি পত্রিকা মোদীর কাশ্মীর দখলের ঘটনা সরাসরি অনুমোদন করেনি। লন্ডনের গার্ডিয়ান ত এটাকে “আগ্রাসন”[India’s aggression over Kashmir] বলে ব্যাখ্যা করছে।  আর এদিকে এশিয়ায় সম্প্রতিকালের সবচেয়ে প্রভাবশালী হয়ে উঠে হংকং থেকে প্রকাশিত সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট,[SCMP] সেও কাশ্মীর দখল অনুমোদন করে নাই। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, (বা সংক্ষেপে পোস্ট) এই পত্রিকা সম্প্রতি আগের ব্রিটিশ মালিক থেকে চীনা জ্যাক মা এর “আলীবাবা গ্রুপ” কিনে নিয়েছে। না, এটা চীনা নীতির কোনো অন্ধ সমর্থক পত্রিকা নয়। এটা মালিকানা বদলের আগেও চীনের সমালোচনা করত, এখনো করে। পোস্ট পত্রিকা একেবারে নিজস্ব এডিটোরিয়াল লিখে [India is playing with fire in Kashmir] মোদীর কাশ্মীর দখলের সমালোচনা করেছে।

এছাড়া ভারতের ভেতরেরই অনেক মিডিয়া নিজ সম্পাদকীয় লিখে [The BJP’s Kashmir move is bold, but has risks | HT Editorial] সমালোচনা করেছে বা তাদের অ-অনুমোদন জানিয়েছে। অথবা সাফাই-বয়ান দুর্বল, একে সবল করার পরামর্শ দিয়েছে। তবে সবচেয়ে সবল সমালোচনা বা প্রশ্ন তোলা আর সাথে পালটা গত ১২ আগষ্ট পরামর্শ দিয়ে কলাম লিখেছেন সি রাজামোহন।  তিনি আসলে একজন ভারতে ‘আমেরিকান থিঙ্কট্যাঙ্ক’ পরিচালনা কর্তা। তবে আমেরিকান-বেজড থিঙ্কট্যাঙ্ক, বিশেষ করে যারা চীনবিরোধী আমেরিকান প্রপাগান্ডা বয়ান তৈরি করে।  এভাবে বলা যায় তিনি আসলে ভারতের জন্য কেমন আমেরিকান বিদেশনীতি ভাল, এ নিয়ে কাজ করেন, এমন প্রো-আমেরিকান লবির ব্যক্তিত্ব। যদিও তা সময়ে উলটো হয়ে গিয়ে আমেরিকান বিদেশনীতির পক্ষে ভারতকে সাজানো হয়ে যায়। অবশ্যই তিনি ভারতে আমেরিকার বন্ধু। ওয়ার অন টেররসহ প্রায় সব ইস্যুতে ভারত-আমেরিকা একসাথে কাজ করার পরামর্শক, গত ১২ বছরেরও বেশি সময় ধরে। তিনি এখন নিয়মিত কলাম লেখেন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়। ঐ রিপোর্টের সাথে তারা কিছু পরিচিতি দেয়া আছে।

মোদি গত টার্মের শুরু থেকেই উগ্র জাতীয়তাবাদ আর হিন্দুত্ব এমন মাখামাখি করে হাজির করে চলেছেন যে, দুটিকে এখন আলাদা করে আর চেনা যায় না। তাই মোদীর কাশ্মীর দখল এখন হিন্দুত্বের বিজয় বা তারা কত বড় বীর এর সঠিকতার প্রমাণ যেন। এটাই এখনকার পরিকল্পিত উন্মাদনায়  “হিন্দুত্বের জ্বর”। এটা এত তীব্র যে সংসদে অমিত শাহ কংগ্রেসসহ বিরোধীদের চ্যালেঞ্জ করে কয়েকবার সংসদে বলেছেন, আমরা তো ৩৭০ ধারা বাতিল চাই। এখন আপনারা তাহলে প্রকাশ্যে বলেন যে, “আপনারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে”। অর্থাৎ “হিন্দুত্বের জ্বরে” অবস্থা এখন এমন সঙ্গিন যে বিরোধীরা কেউই “তারা ৩৭০ ধারা রাখার পক্ষে” তা বলতেই পারেননি। হিন্দুত্বের জোয়ার এখন এমনই যে, এমন বললে আগামী যে কোন নির্বাচনে হিন্দুদের ভোট পাওয়া মুশকিল হয়ে যেতে পারে বলে তারা ভীত। তাই তারা একটা আড়াল নিয়েছেন। কৌশল করে বলতে চাইছেন তারা আসলে বিজেপির মতোই ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার পক্ষে। কিন্তু বিজেপির ৩৭০ ধারা উঠিয়ে দেয়ার “পদ্ধতিগত ভুলের” বিরোধিতা করছেন। তো এ হল কাশ্মীর ইস্যুতে ভারতের অভ্যন্তরীণ সাফাই-বয়ানের শ্রোতা যারা, তাদের খবর। যারা সাঙ্ঘাতিকভাবেই মোদীর পক্ষে এবং উন্মাদের জোশে আছে।

সাফাই-বয়ান সবল করার পরামর্শঃ
সি রাজামোহন [ C. Raja Mohan] মোদীকে সাবধান করছেন এখানেই। এ সপ্তাহে, তাঁর ঐ লেখার শিরোনাম, “জম্মু-কাশ্মীর ও বিশ্ব ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের প্রতিরক্ষা আর কূটনীতি বিষয়ে ভারতের স্ট্রাটেজিগুলোকে একতালে কাজ করতে হবে” [J&K and the world: India’s strategies for internal security, territorial defence and diplomacy will have to act in unison]”। অর্থাৎ এগুলো এখন একতালে নেই। কেন?

তিনি মোদীকে মূলত বলতে চাইছেন, সাফাই-বয়ানের অভ্যন্তরীণ খাতক আর ফরেন খাতক – এই দু’পক্ষকে একই বয়ান খাওয়ানো যাবে না। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ শ্রোতারা “হিন্দুত্বের বয়ান” অবশ্যই খুব খাবে, আর তারা এ জন্য বুঁদ হয়েই আছে। কিন্তু ভারতের বাইরে যারা জাতিসঙ্ঘ বা আমেরিকাসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রের নেতা ও সেদেশের মিডিয়া ও পাবলিক, এছাড়া গ্লোবাল ফোরামগুলোতে আছেই – এরা মোদীর হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ান খাবে না। বরং উলটো কাজ করবে। রাজামোহনের কথা সত্য। কারণ সারা দুনিয়ার বেশির ভাগ রাষ্ট্র আসলে অধিকারভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র; এমনকি জাতিসঙ্ঘের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি (ফলে নীতিও) অধিকারভিত্তিক রিপাবলিক রাষ্ট্রই।

“যেকোনো জনগোষ্ঠীকে কে শাসন করতে পারে তা নির্ধারণ, একমাত্র ওই জনগোষ্ঠীরই এখতিয়ার- এই অধিকার-নীতির ওপর দাঁড়ানো”।

এককথায় এদের কেউই হিন্দুত্বের সাফাই-বয়ানের কথা খাবে না তো বটেই এরা বরং কোনো হিন্দুত্ব-ভিত্তির রাষ্ট্রচিন্তারই চরম বিরোধী। তারা বরং কাশ্মীরীদের ভাগ্য কাশ্মীরীরাই ঠিক করবে – এমন পক্ষে চলে যাবে। না এ জন্য নয় যে, তারা হয়তো বেশির ভাগই খ্রিষ্টান দেশের লোক তাই। তারা বিরোধী এ জন্য যে হিন্দুত্ব আবার একটা মেজরিটিয়ান-ইজমে চলা ধারণা, তা বহুত্ববাদী নয়। এরা অহিন্দু (মুসলমানদের) সহ্য করে না। তাই এরা প্রকাশ্য ততপরতাতেই জানান দেয় যে, মুসলমানেরা তাদের সহ-নাগরিক অথবা হিন্দুদের মতই মুসলমানেরা সমান নাগরিক বলে স্বীকার করে না। কাজেই বলাই বাহুল্য হিন্দুত্বের এমন সাফাই-বয়ান আন্তর্জাতিক ফোরামের যেকোনো শ্রোতার কাছে অগ্রহণযোগ্য হবেই। রাজামোহনের কথা অনুবাদ করলে এটাই দাঁড়ায়। তাই এ নিয়ে রাজামোহন মোদীকে সাবধান করছেন।

আমরা এখানে স্মরণ করতে পারি এখনকার পাকিস্তানকে। ঠিক যেমন পশ্চিমের মন বুঝে, এই প্রথম একজন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান, মোদীর হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে ঠিক কামড়টা বসিয়েছেন। ইমরান তার শ্রোতা যে সারা পশ্চিম মানে আমেরিকা ও জাতিসঙ্ঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামের সবাই, এ বিষয়ে তিনি আগেই পরিষ্কার। তাই তিনি টার্গেট রেজাল্ট অরিয়েন্টেড কাজ করেছেন। ফলে তিনি – ইসলাম কত ভালো কিংবা মহান কি না – এ্মন কোন প্রচলিত বয়ান (শ্রোতা কে তা আমল না করে দেয়া বয়ান) ধরে হাঁটেননি। ইমরান তাই পশ্চিমের শ্রোতাদের বলছেন, মো্দী ও তাদের আরএসএস এরা – হিটলারের আদর্শের অনুসারী, তাই সেই আদর্শের অনুযায়ী এরা কাশ্মীর ইস্যুতে কাজ ততপরতা করেছে। কথা তো সত্য। অভ্যন্তরীণভাবে ইতিবাচকরূপে হিটলার আরএসএস’র সিলেবাসে পাঠ্য।  উভয়ের চিন্তা ও আইডিয়ার মূল মিলের জায়গাটা আরিয়ান বা আর্য শ্রেষ্ঠত্ব [হিটলারের নাৎসি আর্য শ্রেষ্ঠত্ববাদ]।  এ’হিসেবে বিচার করলে তাই, বিজেপি তো দল হিসেবে কোনো আধুনিক রিপাবলিকে তৎপরতা চালানোর অনুমোদনই পাওয়ার যোগ্য নয়। এদিকটা তুলেই ইমরান পশ্চিমা মনের কাছে আবেদন রেখেছেন। ইমরানের সুবিধা হল, তার কথা তো কোন প্রপাগান্ডা নয় বা কথার কথা নয়। তাই পশ্চিমকে মোদী ও তার হিন্দুত্বকে চেনানোর জন্য ইউরোপের পরিচিত ও অভিজ্ঞতায় থাকা হিটলারের বৈশিষ্ট্য দিয়ে মনে করিয়ে দেয়া খুবই কার্যকর [Kashmir were unfolding “exactly according to RSS ideology inspired by Nazi ideology”]। ইমরানের এই বক্তব্য মোদিকে পশ্চিমা দুনিয়ায় খুবই বিব্রত করবে। যেমন আমেরিকান সিএনএন ইমরানকে এনিয়ে বিরাট কাভারেজ দিয়েছে যেটা মোদী ও তার দল ও আইডিওলজিকে বিরাট ক্ষতিগ্রস্থ করবে। [ দেখেন Pakistan’s Imran Khan likens India’s actions in Kashmir to Nazism। পশ্চিমা নেতাদেরও এসব মারাত্মক অভিযোগকে পাশ কাটিয়ে ভারতকে কোন কোল দেয়া সহজ হবে না। এমনকি যারা ব্যবসা-বাণিজ্য পাবার লোভে বা মোদীর কোন বিনিয়োগের অফারের লোভে ভারতকে সমর্থন করতে যাবে, তাদের জন্যও কাজটা কঠিন করে দিয়েছেন ইমরান খান।

যদিও এমনটাই হয়ে আছে অন্য এক দিক থেকেও। ‘ব্লুমবার্গ’ মিডিয়া গ্রুপ, পশ্চিমাদেশের মূলত বিনিয়োগকারীদের কাছে খুবই নির্ভরযোগ্য টিভি ও ওয়েবের এক গ্লোবাল মিডিয়া বলে বিবেচিত। বিশেষ করে এর নির্ভরযোগ্য বিশ্লেষণ আর বিনিয়োগকারী-মনের কোণে জমে থাকা বিভিন্ন প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব পাওয়ার দিক থেকে। মোদীর কাশ্মীর দখলের দিনে (৫ আগষ্ট) এই মিডিয়ার রিপোর্টের শিরোনাম হল, “ভারত নিজেই নিজের পশ্চিম তীরের (প্যালেস্টাইন) জন্ম দিচ্ছে কাশ্মীরে”[India Is Creating Its Own West Bank in Kashmir]।  ভারতীয় লেখক কলামিস্ট মিহির শর্মা সেখানে তাঁর লেখায় দাবি করেছে যে মোদীর কাশ্মীর দখলের সিদ্ধান্ত ব্যাকফায়ার করবে [india’s elimination of kashmir’s autonomy will backfire]।  আবার এর দু’দিন পরে ৭ আগস্ট ব্লুমবার্গের আরো কড়া নিজস্ব এক সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হল, ‘ভারত কাশ্মিরে ভুল করছে’ [India Is Making a Mistake in Kashmir]। বলা বাহুল্য, এই রিপোর্টগুলো আসলে বিনিয়োগকারীদেরকে দেয়া ম্যাসেজ যে, ভারত ‘সেফ প্লেস’ নয়। “বিকল্প খুঁজো, পেলেই সরে যাও। জন-অসন্তোষের অস্থির শহরে বিনিয়োগ নিয়ে ঢুকে আটকে যেও না”।

কাশ্মীরীদের মুক্তির লড়াই

ভারতের জন্মলগ্ন থেকে কাশ্মীরকে দেয়া বিশেষ স্টাটাস কেড়ে নিয়ে জবরদস্তিতে কাশ্মীরকে ভারতের অংশ বলে দাবি করা ইতোমধ্যে তের দিন পার হয়ে গেছে। গত ১৫ আগস্ট ছিল ভারতের স্বাধীনতা দিবস। এই উপলক্ষে সেদিন ছিল মোদীর জন্য পাবলিক অ্যাড্রেসের সুযোগ নিতে হাজির হওয়ার দিন। তাই কাশ্মীর ইস্যুতে এটা ছিল মোদীর দ্বিতীয়বার সাফাই তুলে ধরার সুযোগ। কিন্তু লক্ষণীয়, ইতোমধ্যেই কাশ্মীর জবরদস্তির পক্ষে মোদীর সাফাইয়ের ভারকেন্দ্র বদলে গেছে। এর একটা মানে হতেও পারে মোদি বুঝে গেছেন আগের সাফাই-বয়ান কাজ করছে না। সেটা যাই হোক, গতকালের নতুন আর বয়ান হল “বিকাশ বা ডেভেলপমেন্ট” [“The happiness of Jammu and Kashmir and Ladakh can become a motivator for India for prosperity and peace and can become a big motivator in India’s development journey…]।

এছাড়া মোদি নিজেও বলছেন, ৩৭০ ধারা উঠে যাওয়াতে কাশ্মীর এখন বিকাশের সব সুযোগের আওতায় আসবে, অন্যসব রাজ্যের মতোই এক কাতারে। ভারতের প্রেসিডেন্টকে দিয়েও প্রায় একই লাইনে বক্তৃতা দেয়ানো হয়েছে [৩৭০ রদে লাভ হবে কাশ্মীরের: রাষ্ট্রপতি]। এটা হল তাদের নতুন সাফাই-বয়ানের ফোকাস, কিন্তু এটাও মূলত আভ্যন্তরীণ। যার সার কথাটা হচ্ছে, কাশ্মিরের ‘উন্নয়নের’ জন্যই যেন ৩৭০ ধারা তুলে দেয়া হয়েছে। আগে ৩৭০ ধারা থাকাতে কাশ্মিরে উন্নয়ন হচ্ছিল না। অর্থাৎ এরা ধরেই নিয়েছেন কাশ্মীর “উন্নয়নে” পিছিয়ে পড়া এক রাজ্যের নাম। কিন্তু তাই কী?

মোদী কাশ্মীরকে উন্নয়ন শিখাবে কিভাবেঃ
মোদী ও তার সাগরেদদের কপালই খারাপ। গত ৯ আগস্ট ভারতের সরকারি পরিসংখ্যান দেখিয়েছে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা মডেল রাজ্য গুজরাট বনাম কাশ্মিরের তুলনা নিয়ে একটা রিপোর্ট বের হয়েছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাশ্মীর এগিয়ে আছে।

Compare: Who is less developed

তাহলে কে কাকে উন্নয়ন বা বিকাশ শিখাবে? বুঝা গেল মোদীর হোম-ওয়ার্কও নেই। ক্লাসের হোম-ওয়ার্ক না করে আসা ছাত্র! পুরাই চাপাবাজি! তাহলে দুর্বল সাফাই-বয়ানের কী হবে? মোদী কাশ্মীরকে কী উন্নয়ন শিখাবে?

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ১৭ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “মোদির দুর্বল সাফাই এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

Advertisements

হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

গৌতম দাস

২৭ মে ২০১৯, ০০:০৬,  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2AB

 

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। তাতে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি আবার বিজয়ী হয়েছে, তারা ক্ষমতায় ফিরে আসছে এবং গত ২০১৪ সালের লোকসভার নির্বাচনের চেয়েও এবার আরও বেশি আসন নিয়ে। বিজেপির জোটের নাম এনডিএ [National Democratic Alliance (NDA)]। গত এমন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তবুও সে সরকার, এনডিএ জোট সরকার হিসেবেই ক্ষমতায় ছিল। আর এবার বিজেপি একাই পেয়েছে ৩০৩ আসন। আর জোট হিসেবে এটা মোট ৩৫২ আসন। গত ২০১৪ সালে এই সংখ্যাগুলো ছিল যথাক্রমে ২৮২ ও ৩৩৬।

এক কথায় বললে এবার ‘হিন্দুত্ব’ [Hindutto]- এই মুখ্য ইস্যুর ভিত্তিতে নির্বাচনটা হয়ে গেল। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি হিন্দুত্বকে প্রধান ইস্যু করে নির্বাচন করতে চাইলে বাকি সব দলকে যে তাতে শামিল হতে বাধ্য করা যায় আর ভোটারদেরও আর সব ইস্যু ফেলে হিন্দুত্বকে প্রধান বানিয়ে নির্বাচনে সে ভিত্তিতে ভোট দিতে বাধ্য করা যায়- এরই জলজ্যান্ত প্রমাণ হল ভারতের এবারের লোকসভা নির্বাচন।

এর মূল কারণ, ভারত-রাষ্ট্র গঠনই হয়েছে হিন্দুত্বকে কেন্দ্র করে। এই নির্বাচনে সে কথাই আবার মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশেষত ভারত-রাষ্ট্রের জন্মের সময় রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নেহরুর কাছে এক প্রধান প্রশ্ন ছিল যে অসংখ্য ভিন্নতার বিভিন্ন লোক-জনগোষ্ঠীকে এক রাষ্ট্রে রাখার উপায় কী? অর্থাৎ বৃটিশ-ভারত নামেই বাইরে থেকে একে এককাট্টা ভারত মনে হয়। কিন্তু আসলে তা অসংখ্য রেসিয়াল বৈশিষ্ঠের জনগোষ্ঠির ভারত। এছাড়া বৃটিশ্বরা এই ভারতকে শাসন করে গেছে আলাদা আলাদা প্রশাসনিক পদ্ধতিতে। ফলে ভারত বলতে বিভিন্ন ধরণের জনগোষ্ঠির ভিন্নতাগুলো আবার যেমন তেমন না। যেমন ভারতে এখনও ২৯টা রাজ্য। মানে অন্তত ২৯ রকমের বড় বড় বিভক্তি এখানে আছে। এরকম আর কত কত ধরণের আইডেনটিটিতে এখনও বিভক্ত হয়ে আছে ভারতের নাগরিকেরা।  এই ভিন্নতাগুলো সত্বেও তাদের একটা রাষ্ট্রে ধরে রাখার উপায় কী? এই ছিল নেহেরুর কাছে মুখ্য প্রশ্ন। সে  কোন বন্ধন, যা দিয়ে তাদের আটকে এক রাষ্ট্রে ধরে রাখা যায়?

এই কঠিন জটিলতার সবচেয়ে সহজ জবাব নেহেরু খুজে নিয়েছিলেন যেটা তা হল “হিন্দুত্ব”। মানে হিন্দুত্ব হল সেই আঠা বা গ্লু [glue] যার ভিত্তিতে নাগরিকেরা জোটে বেধে একতায় তাদের এক থাকার উপায়। সেই থেকে নব গঠিত ভারত হিন্দুত্ব হল নাগরিক ঐক্যে এভাবে গড়ে উঠেছে।বলাই বাহুল্য এটাই ছিল উপমহাদেশের সবচেয়ে একক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত, the biggest disasterous decision.

প্রশ্নটা আসলে অরিজিনালি ছিল মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করার ক্ষেত্রে এক মৌলিক বুঝাবুঝির বা বলা যায় বুঝাবুঝিতে ঘাটতি থাকলে সেই অভাব থেকে উত্থিত এবং বিপথগামী প্রশ্ন। যেমন রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে বা করার কালে আদৌ এমন ভিত্তি খুজে ফেরা  জরুরি কিনা? সরাসরি উত্তর হল যে – একেবারেই না। কিন্তু তবু নেহেরুর এই বিপথগামী পথই ধরেছিলেন। এবং মনে রাখতে হবে এটা ১৯৪৭ সালের আগষ্টের পরে উদয় হওয়া প্রশ্ন নয়। এটা এর আগের পুরা উনিশ শতক (১৮১৫-১৮৯৯) এই সারাটা সময় চিন্তার বিপথগামী গমণ বজায় ছিল।  সেদিকে একটু পরে আবার আসছি।

নেহেরুর কাছে ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু উপযুক্ত হতে পারে না – এটাই ছিল তাঁর চোখে সদুত্তর। তাই ভারত-রাষ্ট্রের গঠন ভিত্তি হয়ে যায় হিন্দুত্ব। এ কারণেই আবার কোনো কিছুকে অ-হিন্দুত্ব মনে হলে তাকে চাপিয়ে, মারজিনাল করে রাখার অবস্থান নেন তারা। হিন্দুত্বকে এক নতুন মানের দিকে সরিয়ে দেয়ারও চেষ্টা করা হয়। তা হল, হিন্দুত্ব একটা কালচার বা সিভিলাইজেশনের নাম ইত্যাদি বলে হিন্দুত্ব শব্দের দগদগে ধর্মীয় দিকটি আবছা করার চেষ্টাও দেখা যায়। আবার হিন্দুত্ব শুনতে ভালো লাগে না বলে একে ‘সেকুলারিজমের জামা’ পরিয়ে আড়ালে ঢেকে রাখার চেষ্টা হয়ে থাকে সব সময়। এরই প্রতিভূ বা সব বৈশিষ্ট-চিহ্ন নিজেই হাজির হয় রাজনৈতিক দল ‘কংগ্রেস’।

কিন্তু এই প্রচেষ্টাকে আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি ভারতের জন্মকাল থেকে কখনোই মানেনি, বরং প্রকাশ্যে তর্ক তুলেছে। প্রকাশ্যেই সরাসরি হিন্দুত্বের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে দাবি তুলছে, হিন্দুত্বকে আঁকড়ে ধরে এরই আধিপত্য চেয়েছে এবং প্রকাশ্যে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে। অভিযোগ এনেছে কংগ্রেসিরা মুসলমান-তোষামোদকারী হওয়ার কারণে দেশ ভাগ হয়ে পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই অভিযোগে আরএসএসের নাথুরাম গডসে ১৯৪৮ সালে কংগ্রেস নেতা গান্ধীকে খুন করেছে। দক্ষিণ ভারতের কমল হাসানকে অনেকে চিনে থাকতে পারেন যারা ভারতীয় সিনেমার খবর রাখেন। তিনি সিনেমার খ্যত নায়ক। তিনি সম্প্রতি রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু নাথুরাম সম্পর্কে মন্তব্য করে তিনি মামলা খেয়েছেন। পরে মাদ্রাজ হাইকোর্টে জামিন চেয়ে যে যুক্তি দিয়েছেন সেখানে তিনি দাবি করে বলেছেন,  “Godse himself, in his book Why I killed Gandhi, had categorically stated that Mahatma Gandhi had acted against the interest of Hindus, and had blamed him for partition, Mr. Haasan said.”। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, কংগ্রেস-বিজপি দুপক্ষই ইস্যুটা কার্পেটের নিচে ফেলে চেপে যেতে চান। আরএসএস তাদের আভ্যন্তরীণ ডকুমেন্ট বা কর্মিসভায় নাথুরামকে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে তাদের হিরো বলে তুলে ধরে। যদিও বাইরে খুব বেশি এই ভাবনা প্রচারে আনতে চায় না। আর যে মোদী যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন তিনি নাথুরাম তর্কে ঢুকতেই চান না।

যে যাই হোক, ১৯৭৭ সাল থেকে কংগ্রেস দলের দুর্বল হওয়া শুরু হতে থাকে। ১৯৮৯ সালে এসে ক্ষমতায় ‘কংগ্রেস কোয়ালিশন’ গড়ার ট্রেন্ড শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে প্রথম পূর্ণ পাঁচ বছরের বিজেপি সরকারই কায়েম হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই আবার প্রকাশ্যে হিন্দুত্বের স্পষ্ট বয়ান, ব্যাখ্যা ও দাবি নিয়ে বা বাবরি মসজিদ ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে মাঠে হাজির হয়েছিলেন আরএসএস-বিজেপির নেতা একালের নেতা এলকে আদভানি। এবার নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পরের দিন সকালে মোদি-অমিত আদভানির বাসায় গিয়ে সেকালে হিন্দুত্বের বয়ান ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হওয়ার কারণে আদভানিকে [… providing a fresh ideological narrative to the people,” ] বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছেন। আসলে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে এসে তিনি প্রমাণ করলেন, সবচেয়ে সফলভাবে হিন্দুত্বকে নির্বাচনে মুখ্য রাজনৈতিক ইস্যু করা সম্ভব, নির্বাচনে জেতাও সম্ভব।

কেন কেবল হিন্দুত্বকে ভরসা করে মোদী নির্বাচনে নেমেছিলেন?  ছোট্ট করে এনিয়ে কিছু কথা বলে রাখা যাক। বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে আমরা তুলনা করলে বুঝব, ২০১৪ সালে মোদীর মুখ্য (catchy) ইস্যু ছিল মূলত “অর্থনৈতিক”। অথচ এবার অর্থনৈতিক শব্দটাই তিনি কোথাও উচ্চারণই করেন নাই। গ্লোবাল অর্থনীতিতে “রাইজিং ইকোনমির” দেশ বলে এক নতুন টার্মের ব্যবহার শুরু হয়েছিল চলতি শতকের প্রথম দশক (২০০১-০৯) থেকে। যেখান থেকে ব্রিকস (BRICS) ব্যাংকের ধারণা উঠে এসেছে। তো “রাইজিং অর্থনীতির” ইন্ডিয়া এর একটা। মোদীর আগের কংগ্রেস (২০০৪-১৪) সরকারের দ্বিতীয় টার্মে মাঝপথে (২০১১) এসে এর অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। মানুষের আশাআকাঙ্খাও চরমভাবে ভাঙতে শুরু করেছিল। সেদিকটা খেয়াল করে মোদী ২০১৪ সালের নির্বাচনে, ডুবে যাওয়া ঐ অর্থনৈতিক ইস্যু সেটাকেই আবার উস্কে চাঙ্গা করে তুলে ধরে দাবি করেছিলেন তিনি এটা আবার তুলে সচল করতে পারবেন, কারণ গুজরাটের অর্থনৈতিক সাফল্যের তিনবারের মুখমন্ত্রী তিনি। তিনি তখনও থার্ড টার্মের মুখ্যমন্ত্রী। তাই সেই খাতিরে যেন তাঁকে ২০১৪ নির্বাচনে ভোট দেয়া হয়। এর সাথে হিন্দুত্ব ইস্যুও ছিল কিন্তু তা সেকেন্ডারি। কিন্তু এবার? তিনি জানেন এবার অর্থনৈতিক সাফল্য তাঁর নাই, ডিমনিটাইজেশন আর জিএসটি [demonitization & GST]  ইস্যুতে তার কপাল খুলে নাই, তা যতই ভাল প্রোগ্রাম হোক বা না হোক। ডিমনিটাইজেশন মানে নোট বাতিল আর জিএসটি মানে ভারতের এক রাজ্যের পণ্য আর রাজ্যে ঢুকলে টাক্স আরোপ করা হয়, এসব পাল্টাপাল্টি ট্যাক্সকে উঠিয়ে নেয়া, সরল নিয়ম করা আর আদায়কৃত ট্যাক্স শেয়ার করার ফর্মুলা চালু – এককথায় বিশেষ করে পরেরটা খুবই ভাল কাজ কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন, প্রথম তিন বছরের সাফারিং এর কারণে নগদ অর্থনীতিক পারফরমেন্সের বিচারে তিনি ফেল করেছেন। সুনির্দিষ্ট করে বললে, কাজ সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাতে তিনি একেবারেই ফেল করেছেন।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, মোদীই ভারতের এক ব্যতিক্রমি রাজনীতিবিদ। সেটা এই অর্থে যে তিনি নিজের দল এবং বিশেষ করে নিজ সরকার চালানোর ক্ষেত্রে আমরা দেখতে অভ্যস্ত যেটা যে, দলীয় নেতাকর্মিদের নিয়ে একটা দল -অর্থনীতিবিদ, রাজনীতি বা প্রশাসন বিষয়ক একাদেমিক যারা দলের খাতায় নাম লেখানো – এমন  এদেরকে নিয়ে গঠিত কোন টিমের পরামর্শের দিয়ে সরকার চলছে। না মোদী এসব এমেচার করতে রাজী না।  বরং তিনি তা করে থাকেন ও ভরসা করেন তা হল প্রফেশনাল ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং কোম্পানী নিয়োগ দিয়ে। যারা গবেষণাও করে থাকেন। মোদী-অমিতের বিশেষ “রাজনৈতিক ব্রান্ড” এটাই। এজন্য তারা বিজেপির মত দল করলেও খুবই স্মার্ট। এমনকি নির্বাচনও তিনি করেন এমন কোম্পানীকে পরামর্শক রেখে। এই জায়গায় মোদীর বিজেপিকে ধর্মতাত্বিক নেতা বা মফস্বলী কোন নেতা জ্ঞান করা খুবই ভুল হবে ও খাটো করে দেখা হবে।

আর সেই কন্সাল্টেন্টদের পরামর্শেই এবার তিনি একক – কেবল “হিন্দুত্ব” ইস্যুতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেখালেন। তবে এটা অবশ্যই গুরুত্বপুর্ণ যেটা উপরে বলেছি যে, এটা সম্ভব হল কারণ ভিত্তি হিসাবে ভারত-রাষ্ট্র হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠিত। কিন্তু যে উত্তর এখনও অমীমাংসিত তা হল – বিভিন্ন আত্ম-পরিচয় বা বৈশিষ্টের মানুষ একটা রাষ্ট্রে কেন কিসের ভিত্তিতে জড়ো হয়ে থাকে, কী তাদের এক জায়গায় ধরে রাখে – আটকে ধরে রাখার কোন আঠা বা গ্লু যেমন একটা হিন্দুত্ব – এর প্রয়োজন আদৌও কী অনিবার্য, এসেনসিয়াল? না কী অপ্রয়োজনীয় এবং বিকল্প আছে?  এছাড়া কবে থেকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়টাকে “এসেনশিয়াল” মানে হিন্দুত্বকে এসেনশিয়াল বলে বুঝে এসেছেন, সেটাও খুজে দেখা ও লক্ষ্য করা খুবই জরুরি।

এই প্রশ্নটা ভারতে তো বটেই,উপমহাদেশেই মীমাংসিত নয়, তাই স্পষ্ট উত্তর নাই। এবং এক ভারতের কারণেই উপমহাদেশের সবখানেই এটা অমীমাংসিত ও সব অসন্তোষের উতস এটা।

আধুনিকতা আইডিয়ার প্রথম ও প্রাথমিক রূপ বৈশিষ্ট হল “রেনেসাঁ” [Renaissance] চিন্তা। ইউরোপের এই রেনেসাঁকে ভারতে বিশেষ করে সেকালের বৃটিশ-ভারতের রাজধানী, বাংলায় নিয়ে এসেছিল বৃটিশ-শাসকেরা। রাজা রামমোহন রায়কে বাংলায় রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করে থাকেন সকল রেনেসাঁবাদীরা। তার সক্রিয়তার প্রধান সময়কালটা হল (১৮১৫-৩৩)। তিনিই প্রথম এবং তিনিও রেনেসাঁ চিন্তার পিছনে পুরা ভারতজুড়ে একটাই ধর্ম, একটা “হিন্দুত্ব” থাকা জরুরি মনে করতেন। তিনিই একেশ্বরবাদী ব্রাক্ষ্ম ধর্ম-এর প্রবর্তক যা আসলে একটু রিফর্মড হিন্দুত্বই – এক হিন্দু নাশনালিজম। তবে তাঁর মৃত্যুর পরবর্তি সময়গুলোতে এটার কার্যকারিতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন মুখ্য হয়ে উঠেছিল। ফলে পরবর্তিতে বঙ্কিমচন্দ্র, অরবিন্দ ঘোষ, বিবেকানন্দের ইত্যাদি্র মত কিছু ব্যক্তিত্বের হাত ঘুরে আরও রিফর্মড হয়ে উনিশ শতকের শেষের দিকে তা কংগ্রেস দলের জন্মের সময় (১৮৮৫) থেকেই এর  হাতে পৌছাতে শুরু করেছিল। আরও পরে এটাই বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) রদ করা ও পরবর্তিতে তথাকথিত স্বদেশী আন্দোলন – এসবের মূলমন্ত্র ও প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল। আর সবশেষে দেশভাগের পরে নেহেরুর হাতে সেই একই “হিন্দুত্ব” কিন্তু এবার নতুন প্রয়োজনে – এরই ব্যবহার হয় রাষ্ট্র গঠনে। আর  সেই থেকে আগে কংগ্রেসের উত্থানের পর থেকেই পুরা সময়ে  হিন্দুত্ব চিন্তার কারণেই আমাদের উপমহাদেশে সমস্ত বিভক্তির উতস এখানেই। এটাকে একটা অন্ধের হাতড়ানোও বলতে পারি! কারণ লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, ভারত যদি একটা মর্ডান রিপাবলিকই হতে চেয়েছিল বা চেয়ে থেকে থাকে তবে তার আবার “হিন্দুত্ব” এর, হিন্দু নাশনালিজমের দরকার কেন? কিভাবে তা হয়? এর জবাব কংগ্রেস বা আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি কখনো দেয় নাই, দিবে না – খুঁজবে না। অথচ অনিবার্য এসেনশিয়াল মনে করে রাখবে।  এতেই তারা এর সাহায্যে অন্যান্য ধর্মীয় জনগোষ্ঠির উপরে আধিপত্য কায়েম করতে পারার সুবিধার দিকটা মুখ্য – এই সুবিধার দিকটাই তাদের জন্য সব চেয়ে লোভণীয় ছিল বলে। যদিও মর্ডান রিপাবলিক বলতে একে ধর্মীয় নাশনালিজম বলে মানে করা – এই সুবিধাবাদি ভুল বুঝার ঝোঁক ইউরোপেও ছিল।

সবচেয়ে বড় তামাশার দিকটা হল, হবু  “মর্ডান রিপাবলিক” ভারত বলতে একে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম বলে বুঝা ও মানে দেওয়া কিন্তু একে “ভারতীয় জাতীয়তাবাদ” বা “স্বদেশি আন্দোলন” বলে নাম দেয়া আর ওদিকে এভাবে এর আসল পরিচয় হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম লুকিয়ে রাখা ফেলা হয়েছে। শুধু তাই না। এর প্রভাব এখানেই শেষ না। এভাবে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম এর রাজনীতি করা এটাই মুসলমানদের জবরদস্তি ঠেলে দেয়া হয়েছে যেন তাঁরাও ইসলামি নাশনালিজমই করে – মুসলিম লীগ করে আবির্ভুত হয়। আর এইবার সেই কঠিন তামাশাটা! এই মুসলমান আর মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ লটকে দেয় যে এরা ধর্মীয় রাজনীতি করে, এরা সাম্প্রদায়িক, এরা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ চায় ইত্যাদি। ফ্যাক্টস হল, হিন্দুরা যদি হিন্দু নাশনালিজমের রাস্তা ধরে  তাহলে এরপর মুসলমানেরা যাই করবে তা এক ইসলামি নাশনালিজমই তো হবেই!

অতএব সেই হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম – এটাই একালে মোদীর হাতে স্বরূপে হাজির হতে চাইছে।
এমন কী মোদীর গত পাঁচ বছরে গরু নিয়ে সামাজিক বিভাজন তো বটেই যেভাবে সংগঠিতভাবে  সামাজিক আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছিল,  “মুসলমানকে ধরে জয় শ্রীরাম বলাতে হবে” এর নৈরাজ্য তৈরি করা হয়েছে, [এই মাত্র দ্য হিন্দু পত্রিকার খবর এটা এবারও শুরু হয়র গেছে – মুসলমান তরুণ দর্জি বাসায় ফিরছিল, তাঁকে ঘিরে ধরে বলা হয়েছে, মাথার টুপি খুলে ফেলতে, এরপর জবরদস্তিতে জয় শ্রীরাম বলতে বলে পিটানো হয়েছে।] গরু ব্যবসায়ীকে পাবলিক লিঞ্চিং করা হয়েছে বিজেপি-আরএসএসের নামে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নামে তারা নাজেহাল “সামাজিক ন্যুইসেন্স” তৈরি করতে নেমে পড়েছে। ফ্রিজে গরুর মাংস রেখেছে এই অভিযোগে বাসায় ঢুকে একইভাবে বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরা ঐ মুসলমান গৃহস্থকে খুন করেছে। আর প্রধানমন্ত্রী মোদী এসব নৈরাজ্য চলতে দিয়েছেন। মুসলমানদেরকে নিয়ে এই চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ এরপরেও ভারত রিপাবলিক থাকে কেমন করে? কেঁউ মাথা ঘামায় নাই। কংগ্রেসের নেতাকর্মি অথবা কোন কমিউনিস্ট এনিয়ে প্রশ্ন করার মুরোদ আছে দেখি নাই আমরা।  মর্ডান রিপাবলিকের অর্থ তাতপর্য তারা নুন্যতম কিছু বুঝে অথবা চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ হচ্ছে এটা – এই বুঝ থেকে তারা কখনও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে পারে নাই। এটাই একটা বিরাট প্রমাণ যে ভারত আসলেই এবং বরাবরই একটা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র। এর বাইরে রাষ্ট্র কী, অন্য কোন রাষ্ট্রের রূপ কী – এনিয়ে ভারতের কংগ্রেস, কমিউনিস্ট বা কোন প্রগতিবাদীদের কোন বুঝ, কোন স্টাডি কোন বুঝাপড়া কিচ্চু নাই।

এই কথার আরও প্রমাণ পেতে চাইলে  আরও লক্ষ্যণীয় হল, যেমন এখনকার কংগ্রেস বা এর সভাপতি রাহুল গান্ধী – এদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করার মত। মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে কোথাও কংগ্রেস নুন্যতম অন্তত প্রতীকী প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না। কংগ্রেসে তা না হয়ে, আমরা দেখছি বরং কংগ্রেস নিজেই তথাকথিত সেকুলারিজমের জামাখুলে প্রকাশ্যেই নিজেও হিন্দুত্ববাদী হয়ে গেছে। আবার দাবিও করছে এটা নাকি মোদীর মত হার্ড হিন্দুত্ববাদ না,”সফট হিন্দুত্ববাদ”। এই দাড়িয়েছে এখন কংগ্রেসের ‘সেকুলারিজম’। অর্থাৎ  তথাকথিত সেকুলারিস্ট কংগ্রেস এখন আর হিন্দুত্বকে ঠেকাতে চাওয়া ছেড়ে সরাসরি মোদীর হিন্দুত্বের ভাগ চাইতে নেমেছে। ওদিকে কলকাতার কমিউনিস্টরা এই নির্বাচনে তারাও সব আসন হারিয়েছে শুধু তাই না, নিজেদের ভাগের ২২% ভোট কমিয়ে সেটাও দিয়ে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদের নির্বাচনে, মোদীর দলকে। তাতে ব্যাপারটা এখন দাড়িয়েছে এই যে, হিন্দুত্ববাদ ঠেকানোর বোলচালের দলগুলাকে মোদী এবার তাদেরকে আসল চেহারায় এনে ছেড়েছে, এটাই আসলের মোদীর ক্ষমতার আসল সাফল্য!

আবার লক্ষ্য করা যাক, এই নির্বাচন প্রচারণা বন্ধ হয়ে হলে, পরদিন (২০ মে) মোদী হিন্দু তীর্থস্থান উত্তরপ্রদেশের পাহাড়ে প্রাচীন কেদারনাথের মন্দির গিয়ে ধ্যান করার শো-অফ করতে বসে গেলে তা দেখে কংগ্রেসীদের জবাব হল আমাদের রাহুল তো সেখানে কেদারনাথের মন্দিরে পায়ে হেঁটে গেছিলেন আর মোদী গেছেন বিশেষ হেলিকপ্টারে, কাজেই আমরা শ্রেষ্ট।  আসলে এইখানেই মোদীর হিন্দুত্ব অনেক আগেই বিজয় লাভ করে গেছে। তাই ভোটের ফলাফলে না, মোদী আসলে এখানেই বহু আগেই কংগ্রেস, সিপিএমদের হারিয়ে দিয়েছেন।

হিন্দুত্ব কত ভারী এর লক্ষ্যণীয় ও উল্লেখযোগ্য অসংখ্য ঘটনায় ভরা ছিল এই নির্বাচন। মোদীর হিন্দুত্ব কত পাওয়ারফুল,বাকি সব ইস্যুকে চাপা দিয়ে, পিছনে ফেলে নিজে সবার উপরে উঠে যেতে পারে এরই প্রাণ এগুলো।

যেমন, সবপর্বের নির্বাচনই শেষ হয়েছিল ১৯ মে। এদিন সন্ধ্যায় মোদী-অমিত সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছিলেন তাদের জোট ৩০০ এর আশেপাশের আসনে বিজয়ী হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বাস্তব ফলাফল বিজেপির অনুমানকেও ভালমত ছাড়িয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ শুরু বিরোধীদেরই সব অনুমান ফেল করেছে তা নয়, খোদ বিজেপির অনুমানও কাজ করে নাই, এটা এমনই ফলাফল।

আবার, সাধারণত রাজ্য সরকারে (যেমন রাজস্থানে কংগ্রেস ) কোন দল সরকারে আছে এটা লোকসভা নির্বাচনের সময় একটা ফ্যাক্টর হয়ে থাকে, রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল  সাধারণত আসন বেশি পেয়ে থাকে, প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কিন্তু এই নির্বাচনে দুই-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া কোথায় এমন ফ্যক্টর এবার কাজ করে নাই। এমনকি যেখানে গত মাত্র পাঁচ মাসে আগে রাজ্য সরকারের নির্বাচনে কংগ্রেস বা কোন বিজেপি বিরোধী দল জিতেছে সেখানেও মাত্র পাঁচ মাস পরেই এবার বিজেপি আবার ফিরে ঐ রাজ্যের প্রায় সব (বা একটা বাদে) লোকসভা আসনে জিতেছে। এই অবস্থা দেখা গিয়েছে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড় বা কর্ণাটক এমন রাজ্যে। এসব রাজ্যের ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময় রাজ্য নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী রাজ্য সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। খুব ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি ছাড়া ভারতের লোকসভা নির্বাচনের সময় এমন দেখা যায় না। অথচ বিজেপি এবার এমন হিন্দুত্বের জোয়ার তুলেই জিতেছে।

আবার,নর্থ-ইষ্ট মানে আসাম-ত্রিপুরাসহ ছোট ছোট ট্রাইবাল সাত রাজ্য। আসামে এনআরসি [National Register of Citizens (NRC) ] অথবা নাগরিকত্ব প্রমাণের আইন চালু করার পর সর্বশেষ চল্লিশ লাখ হিন্দু-মুসলমান লোক নানান কারণে নাগরিকত্ব প্রমাণ জোগাড় করতে ফেল করেছে। এদের অনেকেই এখন ক্যাম্পে কাতরাচ্ছে। গতবছর জুড়ে এর বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। কারণ নাগরিকত্ব বিল পাশ হয়েছিল। মিজোরামে “বাই বাই ইন্ডিয়া” বলে প্লাকার্ড হাতে মিছিল হতে দেখেছিলাম আমরা। কিন্তু কয়েক মাস পর চলতি হিন্দুত্বের নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে এজাতীয় সব “কথিত নাগরিক আপত্তি” হাওয়া হয়ে গেছে। বিজেপি সাত রাজ্যেই বেশিরভাগ আসন নিয়েছে, কোন রাজ্যে সবগুলোই।

আবার, কলকাতার মানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের মুখ্যমন্ত্রী মমতা প্রচন্ড রকমভাবে চ্যালেঞ্জড হয়েছেন। এই প্রথম তাঁর তৃণমুল দলের লোকসভার ৩৪ আসন এবার নেমে হয়ে গেছে মাত্র ২২টা। আর বিজেপি দুইটা থেকে এক লাফে ১৮ আসন  পেয়ে গেছে। তৃণমুল বা মমতা রাজনীতি ও তাঁর সরকারের অনেক দোষ বা অভিযোগ থাকতে পারে, অনেকের অপছন্দ থাকতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবাংলা ও নর্থ-ইস্ট জোনে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রধান বাধা এখনো এই মমতাই। বিশেষ করে বিজেপির এনআরসি বা নাগরিকত্বের হুজুগ তুলে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বলে ইসলামবিদ্বেষ জাগানো ও দাঙ্গা বাধানোর রাজনীতি করে বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করার বিরুদ্ধে। কাজেই বিজেপিকে আরও সফল হতে গেলে মোদীর প্রথম কাজ হবে সবার আগে মমতাকে সরানোর ব্যবস্থা করা – তা বলাই বাহুল্য।

ফলাফল প্রকাশের দিন, নিজের বিজয় নিশ্চিতের পর ২৩ মে সন্ধ্যায় মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছেন। এখনও করছেন। কিন্তু এসব জায়গায় সেখানে তিনি আগে নির্বাচনি প্রচারের সময়ে কত কী বলেছেন ঘৃণা ছড়িয়েছেন সব ভুলে এমনকি হিন্দুত্বের রাজনীতি ভুলে যাওয়ার ভান ধরে নির্বাচনের পরে এখন “তিনি সবার নেতা” বলে দাবি করেছেন। তিনি নিজেই  গত ২০১৪ নির্বাচনে তার শ্লোগান ছিল “সবকা বিকাশ সবকা সাথ” – সেই শ্লোগান ওদিন তিনি এবারের নির্বাচন শেষ হবার পরে প্রথম এবার উচ্চারণ করলেন। এবার নির্বাচনের পর ভোল পাল্টায়ে তিনি নিজেই “সংখ্যালঘুদের” সহানুভুতি নিয়ে হাজির হয়েছেন, বলছেন”He said if his first term was about “Sabka sath, sabka vikas (Alongside all, development for all)”, his second would stand for “Sabka sath, sabka vikas, sabka vishwas (Alongside all, development for all, trust of all)”।  এই নির্বাচনি বিজয়ে পুরা সময় তিনি কাটিয়েছেন পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বিমান হামলার সাফল্য গাথা দিয়ে। “পাকিস্তান” = “মুসলমানের” বিরুদ্ধে তিনিই একমাত্র “ভারত-রক্ষক” – এই ছিল তার বয়ানের পাঞ্চ লাইন। আর দ্যা হিন্দু পত্রিকা তাদের নির্বাচন উত্তর গবেষণার ভিত্তিতে বলছে এই বক্তব্যের প্রভাব এমন ছিল যে এক্সিট পোলে অংশ নেয়া মানুষ  বলেছে অর্থনীতি মোদীর ঘাটতি আছে, সাফল্য নাই কিন্তু তবুও তারা মনে করে বালাকোট ইস্যুটাও গুরুত্বপুর্ণ – তাই মোদীকে ভোট দিয়েছেন। দা হিন্দু Balakot plank বলে উপশিরোনামে বলছে, বালাকোটকে ইস্যু করে মোদী রাজস্থান, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ আর উত্তরাখন্ডের সব আসনের দখল পেয়েছে [all seats in Rajasthan, Gujarat, Madhya Pradesh, Haryana, Himachal Pradesh and Uttarakhand.]

আমাদের মনে রাখতে হবে, একথাটাও সঠিক যে বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতির মুখ্য টার্গেট – প্রধান উদ্দেশ্য পাবলিক বা ভোটার মেরুকরণ করে সব হিন্দু ভোট কাউকে শেয়ার না দিয়ে নিজের বাক্সে আনা। সে হিসাবে অনেকে এখন সুশীল হয়ে বলছে  নির্বাচনের সময় “মোদী একটু হিন্দুত্বের নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। কিন্তু এখন সে এসব ছেড়ে সব ঠিক হয়ে যাবে, ভাল হয়ে যাবে” ভাবতে পারেন, একথা বলেছেনও। ইতোমধ্যে অনেকের মধ্যেই এই মনোভাব দেখেছি। যেমন কলকাতার টেলিগ্রাফ লিখছে Narendra Modi tried to shake off his divisive image and reach out to the minorities on Saturday। এছাড়া মানুষ আসলে ক্ষমতা বা শক্তের ভক্ত হয় তাড়াতাড়ি, একথাও ঠিক। কিন্তু একটা জিনিষ এখনই সবাই নিশ্চিত হয়ে থাকতে পারে। তা হল – হিন্দুত্বের রাজনীতিকে মোদীর পক্ষে আর সামনে আগিয়ে না নিয়ে; থেমে যাওয়া বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি রাজনীতিতে – এটা আর সম্ভব নয়।

অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির “আগানোর” প্রধান কর্মসুচী হতে যাচ্ছে এনআরসি; মানে আসামের মত “নাগরিকত্বের তালিকা তৈরি” করার দাবি তুলবে তারা। ইতোমধ্যেই দিল্লিতে এনিয়ে কাজ শুরু হয়ে গেছে বলে অনেকে দাবি করছে। কিন্তু তাতে কী হতে পারে?

কলকাতায় যদি আসামের মত এনআরসি-ততপরতা শুরু করতে পারে, আর তাতে কোন হিন্দু নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হলে তাকে মোদী সরকার নতুন করে নাগরিকত্ব দিবার ব্যবস্থা নিবে। আর মুসলমান হলে তাকে নাজেহালে শেষ করা হবে। মুসলমানদের বেলায় কথিত পুশব্যাক যদি নাও হয় অন্তত ক্যাম্পে নিয়ে ফেলে রাখবে। কপাল ভাল থাকলে তাকে আগের ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদায় পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দিতেও পারে। আবার কখন কোন দাঙ্গার খোরাক বানিয়ে নিজেদের ক্ষমতায় যাবার সিড়ি বানিয়ে ফেলবে, কে জানে! এতদিন এককথায় গরীবী হালে হলেও মানুষ যতটুকু সুস্থ জীবনে ছিল সেসব ছিনে এখন  সকলের জীবনে এক প্রবল অশান্তি হাজির করবে।

ওদিকে লক্ষ্যণীয় আর এক বিষয় হল, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ভারতের বাংলায় নতুন করে এনআরসি-ততপরতা বা বাংলাদেশি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে ডেকে আনার রাজনীতিটা ঠিক পছন্দ করছে, তাদের অস্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। হতে পারে এটা কাজ বেড়ে যাবে অনেক, অথবা অজানা বহু অভিমুখ গতিমুখ তৈরি হয়ে যাবে তা কোথায় গিয়ে না ঠেকে সে আশঙ্কায়, হতে পারে। অথবা হতে পারে ভান করা। যাতে এর প্রতিক্রিয়া কোথায় কোন পর্যায়ে হচ্ছে আগামিও হতে পারে তা জেনেবুঝে নেওয়ার সুযোগ নেয়ার কারণ। সারকথা তারা স্বস্তিদায়ক ঘটনা হিসাবে দেখছে না।

(ত্রিপুরাসহ) নর্থ-ইস্ট আর পশ্চিম বাংলা মিলে এই জোনে মোট লোকসভা আসন প্রায় ৬৫ টা। এখানে মোদীর টার্গেট হবে [উত্তর প্রদেশের মত এটা আশিটা না হলেও] এই ৬৫ আসন এটার গুরুত্ব কম হবে না – এগুলো বিজেপির পক্ষে হাসিল করা। এক এনআরসি ইস্যু দিয়েই স্থায়ীভাবেই এই আসন গুলো নিজের পক্ষে নিশ্চিত করা মোদীর আশু লক্ষ্য।

মতুয়াঃ
বাংলাদেশে ট্রাইবাল বলতে পাহাড়ি বা সাঁওতালদের মত বিক্ষিপ্ত নানান পকেট আছে এগুলাই। এছাড়া সমতলিদের মধ্যে কোন ট্রাইবাল জনগোষ্ঠি  এখনও টিকে বা বজায় থাকার কথা এখন আর জানা যায় না। বুঝা যায় তারা বিভিন্ন মানুষ মিলেমিশে এখন একই সমা্জে অন্তর্ভুক্ত হয়ে তা গড়ে পুরান ট্রাইবাল পরিচয়্টা ঘুটা দিয়ে গুলিয়ে দিয়েছে। তবু আমাদের গোপালগঞ্জের জেলার “মতুয়া” বলে এক হিন্দু জনগোষ্ঠির কথা জানা যায়। বাংলাপিডিয়া “মতুয়া”দের কথা বলছে। বলেছে, “গোপালগঞ্জ জেলার ওড়াকান্দি নিবাসী  হরিচাঁদ ঠাকুর প্রেমভক্তিরূপ সাধনধারা” বলে এদের চিনিয়েছে। বলেছে ,“গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মতুয়াদের প্রধান মন্দির অবস্থিত”। এই জনগোষ্ঠিরই প্রধান বা বড় অংশ কালক্রমে পশ্চিমবঙ্গের বণগাঁও মহুকমাতে সদলে মাইগ্রেটেড হয়ে গিয়েছে।

গুরুভিত্তিক এই জনগোষ্ঠি বর্তমানে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। আগের দীর্ঘদিনের এমপি ছিল মমতা ঠাকুর। সে তৃণমুল দলের এমপি ছিল, কিন্তু সে এবার হেরে গেছে। আর সে জায়গায় বিজেপির টিকিটে শান্তনু ঠাকুর জিতেছেন [তৃণমূল থেকে মুখ ফেরাল মতুয়া, বনগাঁয় জয়ী শান্তনু]। এই দুই প্রার্থীই যদিও মুল গুরু মৃত হরিচাঁদ ঠাকুরেরই বংশধর। কিন্তু কেন মুখ ফেরাল? আনন্দবাজার লিখেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এসে এখানে সভা করে গেছেন। “মোদীজি ঠাকুরনগরের সভায় এসে বলে গিয়েছিলেন, যেসব হিন্দু বাংলাদেশ থেকে এ দেশে এসেছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে”। আর সেই থেকে এতে হিন্দুদের মধ্যে একটা উথালপাতাল শুরু হয়েছে। পুরা ব্যাপারটাই ইঙ্গিত দেয় যে মোদী এনআরসি আন্দোলন নিয়ে কিভাবে আগাতে চাইছেন। শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরাও একারণেই এবার দুহাত তুলে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। মতুয়াদের নড়াচড়াটা হিন্দুদের অবস্থা বুঝার জন্য প্রতীকী।

আসামের এনআরসি ততপরতা শুরু করার সময় মোদী সরকার বাংলাদেশকে নাকি আশ্বস্ত করেছিল। বলেছিল এটা “ভারতের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” হয়ে থাকবে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাক্ষ্য দিয়ে সেকথার অনুরণন করে বিবিসিকে বলছেন, “নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের কাজটিকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বর্ণনা করেন মি: মোমেন”। কিন্তু তাঁর পরচুলার মতই একথাও আসলে নকল, কোন ভরসা নাই। অন্তত নির্বাচন পরবর্তি নড়াচড়াগুলা তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সবচেয়ে বিরক্তিকর হল তার কথায়, “বিষয়টি নিয়ে এখনো বাংলাদেশের চিন্তার কোন কারণ নেই” । আচ্ছা মোদীর মুখপাত্র হয়ে তাঁর এই সাফাই দেয়াটা কেন প্রয়োজনীয়? কিছু না বলে “দেখছি” বলে থাকা যেত না?  সত্যি অদ্ভুত!

কিন্তু আর একটা দিক যখন আগে ভারত “আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” বলেছিল তখন “বাংলাদেশি হিন্দুরা ভারতে গেলে নাগরিকত্ব দেয়া হবে” এমন কোন আইন বা ইস্যু ছিল না। এখন আছে। রাজ্যসভায় পাস না হওয়া, পেশ না করা এই আইন এখন আছে। যা এখন নড়াচড়া করে উঠবে, সচল হবে অনুমান করা যায়। এটা নিয়ে বাংলাদেশেও একটা ব্যাপক প্রভাব পড়বে অনুমান করা যায়। তবে দুই তরফে। এক, একদল হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি ততপরতা শুরু হলে সেখানে গিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারে। আবার এই ততপরতা যদি শুরু হয় আর তাতে সেখানকার মুসলমানেরা কোন খারাপ আচরণ বা দুর্দশার মুখোমুখি হলে এর খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে, তা বলাই বাহুল্য। তারা খুবই ক্ষুব্ধ হবে অনুমান করতে পারি। তাই পুরা বিষয়টা নিয়ে মোদী সরকার ঠিক কী কী করতে চায় তা জানা আমাদের সরকারের জন্য খুবই জরুরি। আর তাতে বাংলাদেশে কী কী প্রভাব পড়তে পারে এর একটা এসেসমেন্ট করে বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে আগেই এতে আমাদের উদ্বেগগুলো কোথায় এবং কী কী তা নিয়ে কথা বলা, সম্ভাব্য স্বার্থবিঘ্ন কী হতে পারে তা নিয়ে আপত্তি উদ্বেগ জানানো ও ততপর হওয়া জরুরি। আমাদের সকলেরই সুস্থ শরীর ব্যস্ত হয়ে উঠার, অস্থির হয়ে উঠার দিন কী সামনে! সত্যি কী ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য কে জানে! আমরা সবাই কী বলি হয়ে যাব এই হিন্দুত্বের রাজনীতিতে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২৫ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)হিন্দুত্বের রাজনীতির বলি! এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

 

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও এর সম্ভাব্য ইস্যু

গৌতম দাস

০৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০০:০৩

https://wp.me/p1sCvy-2we

 

 

ভারতের কেন্দ্রীয় বা লোকসভার নির্বাচন আসন্ন। সম্ভাব্য সেই নির্বাচন আগামী বছর ২০১৯ সালের মে মাসের মধ্যে, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ মাসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে। গতবার মানে ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে তুলনায় এবারের বিজেপির মোদী একেবারেই উল্টা – এবার অর্থনীতি নিয়ে মাঠে কোনো আলাপ না উঠলেই কেবল তিনি ভাল বোধ করছেন। [ভারতের নির্বাচনে অর্থনীতির ইস্যু মানে মূলত “কাজ বা চাকরি সৃষ্টি করতে পারার মত” অর্থনীতি বুঝায়।] অথচ গতবার ‘কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি’ একমাত্র তিনিই দিতে পারবেন। অথবা সেই মন ভোলানো শব্দ “মোদী মডেল” বা “গুজরাট মডেলের” অর্থনীতি তিনি গড়বেন – এসব প্রতিশ্রুতি ছিল গতবার মোদীর নির্বাচনে জিতার মূল স্লোগান। এখন বাস্তব মোদী জমানার গত প্রায় পাঁচ বছরের বাস্তবতা হল পুরো উল্টা। সোজাসাপ্টা আঙুলে গুণে বলা কথাটা হল, মোদীকে তাঁর দেয়া গত নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হলে অর্থনীতিতে জিডিপি নিরন্তর ৮.২ শতাংশের ওপরে নিতে হত এবং সেখানেই ধরে রাখতে হত। অথচ বাস্তবতা হল, মোদী জমানায় কেবল এক কোয়ার্টারে (তিন মাসে) তা অর্জন সম্ভব হয়েছিল। আর এই সপ্তাহে প্রকাশিত রয়টার্সের রিপোর্ট হল, এটা আর সম্ভব নয়, আগামীতে এটা নিম্নগামী অভিমুখে ৭ শতাংশের আশপাশেই যাবে। [India’s economy grew a lower-than-expected 7.1 percent in the July-September quarter …..]

অর্থনীতি চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারছে কতটুকু – এই প্রেক্ষিত থেকে ভারতে অর্থনীতিকে বিচারে ধারা একেবারেই একালের ২০০৪ সালের পর থেকে। মূলত ১৯৯১ সালের আগের ভারতের সরকারগুলোর এ ব্যাপারে পারফরম্যান্স ন্যূনতম আমলযোগ্যই নয়। তা প্রায় সবাই মানেন। ১৯৯১ সালের আগে সেটাকে আজকাল অনেকে ‘কোটা-লাইসেন্স-ইন্সপেক্টরদের’ রাজরাজত্বের যুগ বলছেন। [Administrative controls were set up over industries by the introduction of quota-license-inspector raj.] সুবিধা ছিল সেকালে কোনো সরকারের অর্থনীতিক নীতি-পলিসি “কাজ সৃষ্টি করতে পারার সক্ষমতার” দিক থেকে বিচার করাই হতো না। কারণ তখন সবকিছুর ওপরে “সমাজতন্ত্রের মুলা আর বোলচালের” আধিপত্য করে টিকে ছিল বা টিকে থাকতে পারত। কিন্তু ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনীতি চরমতম ক্রাইসিসে পড়ে সব ফাঁপা বোলচাল উদোম ভেঙে পড়ে। সে মূল কারণ বা ঘটনাটা ছিল – ভারতের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রায় আয়ব্যয়ের (যেটাকে ব্যালেন্স অব পেমেন্টে বলে ) অ্যাকাউন্ট ঘাটতির মুখে পড়েছিল।  এটা – India’s 1991 BOP (balance of payment ) crisis – নামে বেশি পরিচিত। এটা হল একটা রাষ্ট্র তার অর্থনীতিতে যত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে তা যথেষ্ট নয় কারণ এর চেয়ে ব্যয়ের চাহিদা বেশি হয়ে যাওয়ার। ফলে একাউন্টের খাতায় ভারসাম্যহীনতা দেখা দেওয়া। আর এই অবস্থায় ঘাটতি মেটাতে একমাত্র ভাল অপশন থাকে আইএমএফের ঋণ নিয়ে তা মোকাবেলা করা। স্কবভাবতই তা করতে গিয়ে এই প্রথম সকলে বাস্তবে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। সমাজতন্ত্রের ভূত আর ভুয়া বোলচাল এমনিতেই ছেড়ে চলে যায়। আর বাস্তবে অর্থনীতিতে সংস্কার করতেই হয়। ভারত সেটাই করেছিল। ১৯৯১ সালের জুন মাসে নতুন নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী  নরসীমা রাওয়ের সরকারের অর্থমন্ত্রী হয়ে মনমোহন সিং সেই প্রথম সংস্কারে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

কিন্তু কংগ্রেস সরকার পরেরবার (১৯৯৬ বা ’৯৮ অথবা ‘৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে) তবু জিততে পারেনি। আরো পরের ২০০৪ সালের নির্বাচনের বিজয়ী কংগ্রেস-কোয়ালিশন সরকার প্রথম অর্থনৈতিক সফলতার মুখ দেখাতে সক্ষম হয়। সেই সফলতাকে দেখিয়ে তাই ওর পরের ২০০৯ সালের নির্বাচন কংগ্রেস করেছিল অর্থনীতির এ সাফল্যের স্লোগানের ওপর। তাতে প্রবল উৎসাহ তুলে কংগ্রেস-কোয়ালিশন দ্বিতীয়বার ২০০৯ সালেও নির্বাচনে জিতে যায়। কিন্তু পরবর্তিতে সেই নির্বাচিত সরকার এবার আর অর্থনীতিতে সফলতার বদলে আবার পরাজিত হবার পুরানা পথ ধরেছিল। এর মূল কারণ বলা হয় – বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) এর আগে যা এসেছিল তা আবার ফিরে যাওয়া শুরু হয়। পুরানা তারিখ থেকে ট্যাক্স দাবি করা শুরু করাতে। ফলে অর্থনীতিতে হতাশা দেখা দেয়। আর সেই হতাশার সময়ে পরের নির্বাচনে নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর সুযোগটা নরেন্দ্র মোদী ঠিকঠাক নিতে পেরেছিলেন। মানুষ আবার আশার বুক বেঁধেছিল মোদীর পেছনে; ফলে মোদী নির্বাচনে (২০১৪) জিতে এসেছিলেন।

এটাকেই মোদী-জ্বর বা মোদী-ঝড় বলা হতো তখন। আসলে কাজ বা চাকরির আকাঙ্খী নীচতলার মানুষদের প্রবল আর শেষ আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এটাকেই আমরা “মোদী-ঝড়” বলতে শুনেছিলাম। কিন্তু আজ সেসব আশা ভরসা আবার শেষ, হতাশা একদম তলানিতে আবার। বিশেষত গত ২০১৬ সালের নভেম্বরে মোদির ডি-মনিটাইজেশন (রুপির বড় দুই নোট, পাঁচশ ও এক হাজার রুপির; সেই নোট বাতিল ও নোট বদলে দেয়া) সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকে অর্থনীতি একেবারে এলোমেলো হয়ে যায়। রয়টার্সের জরিপের অনুমান ছিল গত সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়া কোয়ার্টারে জিডিপি ৭.৪% হবে। এখন সেটাকেও মিথ্যা প্রমাণ করে ব্যবসার মার্কেটের প্রবল আলোচনা যে সেই জিডিপি ৭.১% হতে যাচ্ছে। গত ২০১৬ সালের পর থেকে মোদী যেসব চাপা মেরে বেড়াচ্ছিল যে এই তো এরপর থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে – সেই সুযোগও হারিয়ে গেল। ফলে এখন একেবারেই পরিষ্কার যে, এবারের ২০১৯ সালের নির্বাচনে বিজেপির মো্দী তো নয়ই, অন্য কোনো দলের কাছেও আর অর্থনীতি মানে “চাকরি বা কাজ সৃষ্টি করতে পারার অর্থনীতি” – আমি দিব – এটা আর মূল ইস্যু কেন, কোন ইস্যুই হচ্ছে না। বরং অর্থনীতির ইস্যু খুব সম্ভবত সব দল এবং ভোটারের কাছেও এক চরম ‘হতাশার ইস্যু’ হয়ে দূরে লটকে থাকবে।

ব্যাপারটা মোদি আঁচ করে অন্তত ছয় মাস আগে থেকেই আসন্ন নির্বাচনের মূল ইস্যু ফোকাস সরিয়ে ফেলেছেন আর মুল ইস্যু আবার করেছেন ‘হিন্দুত্ব’কে। যা মূলত মুসলমানবিদ্বেষ বা ঘৃণা ছড়িয়ে ভোট জোগাড়ের কূটবুদ্ধি ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে এবারের ‘হিন্দুত্বের’ কিছু বাড়তি ব্যাখ্যা আছে। সেটা হল আসাম; মানে আসামের [National Register of Citizens (NRC)]। আসামের নাগরিকত্ব যাচাই কর্মসুচীকে বোঝানো হচ্ছে। আসামের প্রত্যেক নাগরিককে সরকারী যাচাই কেন্দ্রে নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণের ডকুমেন্ট দেখিয়ে সার্টফিকেট নিতে হবে। অরিজিনালি ১৮৮৫ সালে ইস্যুটা উঠেছিল যে কে আসামে বহিরাগত (মানে বাংলাদেশ থেকে [হিন্দু-মুসলমানসহ যে কেউ] ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের পরে এসেছে) তা খুঁজে দেখা। কিন্তু বিজেপির হাতে পড়ে এটা প্রপাগান্ডায় দাঁড়িয়ে গেছে এখন কে “অনুপ্রবেশকারী মুসলমান”। সেখান থেকে এখন বিজেপি অন্য রাজ্যে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে যে – ‘প্রত্যেক রাজ্যে আসামের মত গুণে গুণে  মুসলমান অনুপ্রবেশকারী (তেলাপোকা) খুঁজে বের করার কর্মসূচি নেয়া হবে”। এই মুহুর্তে  রাজস্থান বা ছত্তিশগড়ের প্রাদেশিক রাজ্য নির্বাচন চলছে। এই নির্বাচন ‘মুসলমান অনুপ্রবেশকারীর” বিরুদ্ধে কামান দাগা – নতুন স্লোগান বক্তৃতায় হাজির করা হয়েছে।

অবশ্য ওদিকে অন্য আরেক ইস্যু হাজির করার চেষ্টাও আছে সেটা হল, বাবরি মসজিদের জায়গায় রামমন্দির নির্মাণ।
বিগত ১৯৯২ সালের সেই ঘটনার মামলা এখনো আদালতে ঝুলে আছে। যদিও রামমন্দির নির্মাণের সপক্ষে আসন্ন নির্বাচনের আগে আদালতের কোনো রায় আসার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় আদালতের কোনো নির্দেশের বদলে সংসদে পাশ করে নেওয়া কোন আইনও না, একেবারে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারি করে মোদি রামমন্দির নির্বাচন করুক, এমন দাবি বিজেপি-আরএসএস এর অনেক ঘরের লোক তুলছেন – যার মানে হবে সে ক্ষেত্রে এটাই নির্বাচনের মুখ্য ইস্যু হয়ে যাবে – এমন এসব চিন্তা বাজারে আছে। কিন্তু মোদির ভাব এখনো স্পষ্ট নয়। এর চেয়ে বরং এবার বিজেপি-আরএসএস এর আরও যেসব সহযোগী সংগঠন আছে এরা কেউই এবার আগের মত মোদীর সাথে এক লাইনে সমন্বয়ে নেই – এটাই স্পষ্ট হয়েছে। ফলে শেষে মন্দির ইস্যু হবে কী না বা ঠিক কী হবে তা এখনই বলা মুশকিল।

কিন্তু এবার নতুন আর একটা বিষয় ইতোমধ্যেই দানা বেঁধে গেছে।
প্রত্যেক রাষ্ট্রেই বেশ কিছু স্টাটুটারি (statutory) স্বাধীন কনষ্টিটিউশনাল প্রতিষ্ঠান থাকে। এসব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হল, আইনি বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠান যার কথা কনষ্টিটিউশনে আগেই উল্লেখ থাকে। আর যার মূল বৈশিষ্ট হল এগুলো নির্বাহী ক্ষমতার সরকারের অধীনস্ত নয়  যেমন বাংলাদেশ ব্যাংক, পাবলিক সার্ভিস কমিশন, দুর্নীতি তদন্ত প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি; ভারতের ক্ষেত্রে তাদের সিবিআই (Central Bureau of Investigation), আরবিআই (Reserve Bank of India), গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান RAW ইত্যাদি। মূলকথা, এখানে স্টাটুটারি মানে, এটার কাজ ও কর্তৃত্ব কী হবে সেসবের ম্যান্ডেটই এর জন্মের আইনের মধ্যে লেখা থাকে। ফলে নির্বাহী ক্ষমতা ও নির্দেশের অধীনস্থ নয় এসব প্রতিষ্ঠান। সাধারণত স্বাধীন এক পরিচালনা বোর্ড থাকে, যা এই প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করে। এখানে স্বাধীন মানে নির্বাহী বিভাগ থেকে স্বাধীন থাকা, ফলে প্রভাবাধীনও নয়। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তা নির্বাহী প্রধানমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতির হয়ে থাকে। তবে মনে রাখতে হবে ভারতের রাষ্ট্রপতির যেখানে বাংলাদেশের মত “প্রধানমন্ত্রীর মুখ চাওয়া পোস্টবক্স রাষ্ট্রপতি” নয়, তার স্বতন্ত্র বেশ কিছু নিজ-ক্ষমতাও রয়েছে। তবে এমন প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে পরিচালিত হবে এর মৌলিক দিক নির্দেশনাগুলো ওই জন্ম-আইনেই স্থায়ীভাবে লেখা থাকে।

মোদীই ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী যিনি তার নির্বাহী ক্ষমতায় এমন তিনটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের সাথে বিরোধ-সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছেন। অন্যভাষায় বললে প্রধানমন্ত্রী হিশাবে মোদীর বিরুদ্ধে এসব প্রতিষ্ঠানের স্বাধীন ক্ষমতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠেছে। যাতে ভারতের মিডিয়া ও সংশ্লিষ্ট জগতে তোলপাড় চলছে। আর এক ভাষায় বলা যায় – এই প্রথম এ স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং রক্ষায় সোচ্চার। সেসব প্রতিষ্ঠান হলো,  ভারতের সেন্ট্রাল ব্যাংক মানে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই), সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (সিবিআই), আর খোদ সুপ্রিম কোর্ট। জন্মের পর থেকে ভারতের এসব প্রতিষ্ঠান কখনো রাষ্ট্রক্ষমতার নির্বাহী বিভাগ বা প্রধানমন্ত্রীর অফিসের সাথে কোনো দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাতে লিপ্ত হয়নি। স্বভাবতই, বরং হওয়াটাই যেকোন রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।

আরবিআইয়ের ক্ষেত্রে অল্প কথায় ইস্যুটা হল – যেমন আমাদের সরকারি ব্যাংকগুলো মত ভারতের রাজ্য পর্যায়ে সরকারি ব্যাংক যারা ইতোমধ্যেই অনাদায় ঋণে রুগ্ন স্বাস্থ্যের তাদেরকে সেন্ট্রাল ব্যাংক আরবিআই আরও লোন বিতরণ করতে সীমারেখা টেনে না করে দিয়েছে আর মোদী সরকার সেখানে উল্টো আরো লোন দিতে দাবি জানাচ্ছে এই হল মুল বিতর্কের জায়গা। তবে ভারতের বেলায় একটু তফাত হল, সরকারি মালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকি নজরদারি সীমিত করা হয়েছে। কেবল প্রাইভেট বাণিজ্যিক ব্যাংকের উপর তার মূল তদারকী কর্তৃত্ব। কিন্তু ভারতে ব্যাংক মাত্রই তা আরবিআই-এর কর্তৃত্বে। আসন্ন নির্বাচনের আগে মোদী চাইছেন কিছু রাজ্যের মালিকানাধীন সরকারি ব্যাংক যারা লোনে ডিফল্টার, মানে লোনআদায় পারফরমেন্স গ্রহণযোগ্য মাত্রার নিচে হয়ে গেছে তারা আরো লোন বিতরণ করুক। মোদী আসন্ন নির্বাচন পার হতে ক্ষুদ্র কুটিরশিল্পে আরো ঋণ বিতরণ চায় আর কৃষকেরা ফসলের মূল্য পাচ্ছে না বলে নিরন্তর শহর অভিমুখে যে মিছিল সমাবেশ নিয়ে আসছে তা মোকাবেলা করতে চায়।

এর ফলাফল হল, মাস খানেকেরও বেশি আগে মোদী হুমকি দিয়েছেন ব্যাংকের গভর্নরের স্বাধীন ক্ষমতা খর্ব করতে “ব্যাংক ফান্ডকে মুক্ত করতে আলাদা নিয়ন্ত্রক বোর্ড” গঠন করে নেবেন তিনি। বিপরীতে রিজার্ভ ব্যাংক গভর্নর ও ডেপুটি গভর্নর নিজেদের স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা রক্ষায় সোচ্চার হয়েছেন। শিল্পোক্তাদের এক প্রকাশ্য সভায় ডেপুটি গভর্নর সরকারকে তার সিদ্ধান্তের বিপদ সম্পর্কে হুশিয়ার করে দেন। তিনি বলেন, সরকার নির্বাচন পার হতে যেমন খুশি সেভাবে যেন ক্রিকেটের টি-২০ খেলতে চাচ্ছে। অথচ রিজার্ভ ব্যাংকের কাজ টেস্ট খেলার মত, লংটার্মে আর বহু ফ্যাক্টরকে আমলে নিয়ে চিন্তা করে তাকে কাজ করতে হয়, করা উচিত। এর ফলে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দেশের অর্থনীতি বিরাট রিস্কে পড়বে।
ভারতের অর্থনীতির বাজারে টেনশন আরো তুঙ্গে উঠে একারণে যে, রিজার্ভ ব্যাংকের আইনে “আর্টিকেল সাত” বলে এক অধ্যাদেশ আছে যা কখনো ব্যবহার করা হয়নি। সেটা সরকার চালু করতে যাচ্ছে। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এটা এখন সুপ্ত করে রাখা – নির্বাহী বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে চাইলে সবার আগে সরকারকে যেটা কোনো বিশেষ পরিস্থিতিতে চাইলে ‘সচল করা হলো’ বলে ঘোষণা দিতে নিতে হবে। আর সেক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের কথা মেনে চলা গভর্নরের জন্য বাধ্যতামূলক হয়ে যাবে। তবে ব্যাপারটা এখনও গুজব আলোচনার মধ্যে আছে।

তাই এর পালটা গুজব আলোচনাও আছে। গভর্নর উরজিত প্যাটেলও পালটা হুশিয়ারি দিয়েছেন বলে গুজব আছে। সে ক্ষেত্রে তিনিও পদত্যাগ করতে পারেন বলে পালটা গুজব ছড়িয়ে যায়। আর সকলেই জানেন গভর্নরের পদত্যাগ ভারতের অর্থনীতির জগতে বিশেষ করে সেন্সেটিভ এরিয়া শেয়ার বাজারে এইকথার মানে কী?  মানে হবে তৎক্ষণাৎ ভয় পেয়ে আস্থার সঙ্কটে শেয়ারবাজারে ধসনামাসহ এক শ’ মিলিয়নের বেশি মানুষের এক অর্থনীতির চরমতম বিশৃঙ্খলায় ডুবে যাওয়া ঘটে যাবে। যাতে আবার ঘটনা পরম্পরায় রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলায় আকস্মিক সরকার পতনের ঘটনাও ঘটে যেতে পারে। সব মিলিয়ে গত প্রায় এক মাস ধরে এই টেনশন ভারতে চলার পর এক আপাত সন্ধি ঘটেছে কিছু নিরপেক্ষ আরবিআই এর বোর্ড সদস্যের উদ্যোগে, যদিও তাতে সঙ্কটে কেটে গেছে বলা যাবে না। টানা নয় ঘন্টা ধরে চলা রিজার্ভ ব্যাংক বোর্ডের সভায় সব পক্ষ আপাত রাজি হয়েছে যে একটা স্বাধীন কমিটি করতে যারা খতিয়ে দেখবে সরকারি ব্যাংকগুলো আরো কত পরিমাণ অর্থ বাজারে লোন দেয়ার জন্য ছাড়তে পারে। অর্থনীতি ইস্যুতে গ্লোবাল প্রভাবশালী মিডিয়া ব্লমবার্গ। তাদের এক এক্সপার্ট ব্যাংক  বোর্ডের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতার উপর সরকারের হস্তক্ষেপ – এই ব্যাপারটা নিয়ে খুবই ক্ষুব্ধ। এই আপোষকে তিনি ভাল চোখে দেখেন নাই। এই আপোষ সিদ্ধান্তে সরকারও ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে। কিন্তু তবুও আন্তর্জাতিক বাজারসহ ভারতের দেশী বাজার এ আপাত সন্ধিতেও বিপদ দেখছেন এই বলে যে, এটা সাময়িক, আগামীতে ব্যাংকের ক্ষমতায় হস্তক্ষেপ করার উদ্যোগ আবার আসবে।

কিন্তু সেন্ট্রাল ব্যাংককে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে কেন? কেন তা জায়েজ? এ ব্যাপারটা বিচার করে দেখা দরকার যে, এ ক্ষেত্রে ভেতরের মৌলিক অবস্থান বা যুক্তি কী?

প্রথমত, গভর্নর উরজিত প্যাটেল অবশ্যই স্বাভাবিকভাবেই কোন জবাবদিহিমুক্ত তিনি নন।  এই ইস্যুতে ভারতের সংসদীয় কমিটির আহ্বানে তিনি ইতোমধ্যেই গত সপ্তাহে সংসদে হাজির হয়েছিলেন। সেখানে তার বক্তব্য ছিল একেবারে ক্লাসিক্যালি মৌলিক। মূল কথায়, তিনি বলেন, ব্যাংকের আমানত যেটার ওপর ব্যাংক তার একক কর্তৃত্ব খাটাতে চায় এর ৯৯ শতাংশের মালিকানা ব্যাংক মালিকেরা কেউ নয়; তা আসলে পাবলিক মানি, ব্যাঙ্কে জনগণের রাখা সঞ্চিত অর্থ। যেটাকে আমরা আমানত বলছি। কারণ এটা বাণিজ্যিক ব্যাংককে রক্ষা করতে হবে। ব্যক্তি মালিকানার এই ব্যাংক সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে এই নিশ্চয়তা কী? আর তা যে আদৌও করছে কী না সে তদারকী অবশ্যই করা দরকার। সেকাজটা করবে কে? এরচেয়েও বড় কথা ব্যাংক যে আমানত সংগ্রহ হল এটা এক বিরাট ক্ষমতা – কাকে লোন দিবে অথবা না দিবে? সিন্ডিকেট বানিয়ে নিজেরা তা ভাগ করে নিবে কী না – তাই এই ক্ষমতাটাকে আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ করা ও মনিটরিং করার এক প্রতিষ্ঠান দরকার। অতএব অর্থের এসব নিরাপত্তা রক্ষার্থে সেন্ট্রাল ব্যাংক বলে এই প্রতিষ্টান থাকে যাকে এমন স্বাধীন নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা দেয়া থাকে। পাবলিকের আমানত রক্ষার্থে ব্যাংকিং খাতে নিয়মশৃঙ্খলা আর জবাবদিহিতা বজায় রাখাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ম্যান্ডেটের মূল কথা। এর বোর্ড তাই মূলত অভিজ্ঞ পেশাদার আর টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত, যাতে তারা স্বাধীনভাবে কথা বলতে, সিদ্ধান্ত ও দায় নিতে পারে। তবে এই বোর্ডের ক্ষমতা আগাম কনষ্টিটিউশনাল আইন দিয়ে বিধিবদ্ধ বা স্টাটুটারি আইন করে আবদ্ধ করে রাখা হয়। উরজিত “পাবলিক ইন্টারেস্ট” বা গণস্বার্থের এই দিকটাই সংসদীয় কমিটিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। আর বলেছেন ব্যাংকের এই স্বাধীনতা এটা কেবল

এদিকে প্রায় একই ধরনের মোদী সরকারের হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে শেষে আদালতে গিয়েছে ভারতের সিবিআই। এর তুল্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই, তবে এরই খুব সীমিত আর দুর্বল এক ভার্সন হল আমাদের দুদক। সিবিআইয়ের প্রধানকে বলা হয় ডিরেক্টর। এই ডিরেক্টরের নিয়োগকর্তা হলেন তিনজনের এক কমিটি – প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলের নেতা আর চিফ জাস্টিসকে নিয়ে যা গঠিত। সংক্ষেপে ঘটনা হল, ডেপুটি ডিরেক্টরকে নিয়ে। সার অভিযোগ হল, মোদির ঘনিষ্ঠ গুজরাটের সরকারি কর্তা ছিলেন এই ডেপুটি ডিরেক্টর।

তিনি মোদীর হয়ে সিবিআইয়ের কাজ ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতেন। এছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষের অভিযোগও আনেন ডিরেক্টর অলোক বার্মা। তাই তাঁর কাজ তৎপরতা তদন্ত করতে ডিরেক্টরের এক অফিসার নিয়োগ করা থেকে জটিলতা শুরু। এতে মোদী ঐ ডিরেক্টরকে সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে দেখা করতে বলেন। যিনি আসলে তাঁকে পদত্যাগপত্র দিয়ে সরে যেতে বলেন। ডিরেক্টর তা না করাতে রাতারাতি মোদী এবার ডিরেক্টর আর ডেপুটি ডিরেক্টর দু’জনকেই সরিয়ে তৃতীয় একজনকে দায়িত্ব দেন। এতে সংক্ষুব্ধ ডিরেক্টর অলোক ভার্মা আদালতে নালিশ করেন যে, তাকে অপসারণের কর্তৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর একার নয়, নিয়োগকারী তিনজনের কমিটির। এ ছাড়া তার নিয়োগ এক ফিক্সড টার্ম ন্যূনতম দুই বছরের। ফলে মাঝপথে তাঁকে সরিয়ে দিয়ে তার কাজকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। এখানে আদালতে মামলার কার্যক্রমের একটা তালিকা পাওয়া যেতে পারে।

ঐ ডেপুটি ডিরেক্টর হলেন রাকেশ আস্থানা। তাঁর ব্যাপারে যাকে তদন্ত করতে দেয়া হয়েছিল সে তদন্ত কর্তাকেই শাস্তিমূলক বদলি করে দেয়া হয়। এতে  সেই তদন্তকর্তাও এসবের বিরুদ্ধে আদালতে এসে পুরা ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনাসহ  – খোদ অজিত দোভাল, অপর এক মন্ত্রী এমনকি খোদ গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এক বড় কর্তাসহ সবার সংশ্লিষ্টতার বিরুদ্ধে তিনি তাঁর অভিযোগ দায়ের করে বসেন। গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর জড়িয়ে যাওয়া নিয়ে আর একটা মিডিয়া রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে এখানে। এখান থেকে ব্যাপারটা কতদুর মাখিয়ে গেছে এর একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। কংগ্রেসের রাহুল গান্ধীর অভিযোগ ফ্রান্স থেকে  “রাফায়েল” সামরিক বিমান কেনার সময় ঘুষ লেনদেন হয়েছে। আর সেই ঘুষের তদন্ত বন্ধ করতেই রাকেশ আস্থানা কাজ করছিলেন। ফলে মোদীর নিয়োজিত তৃতীয় যাকে এখন নতুন ডিরেক্টর নিয়োগ দেয়া হয়েছে, আদালত বলেছে এই নিয়োগকে সাময়িক মনে করতে হবে। আর তার কিছু কাজ ও সিদ্ধান্ত আদালতের নিয়োগকৃত একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের উপস্থিতিতে হতে হবে। এককথায়  পুরো সিবিআই এখন সুপ্রিম কোর্টের নজরদারি আর নির্দেশের আওতায় চলে গেছে, মামলার কার্যক্রমও চলমান। আর এনিয়ে ওদিকে মোদী বা তার লেফটেনেন্ট অমিত শাহ একেবারে নিশ্চুপ। এটা শেষ পর্যন্ত মোদী সিবিআই-এর স্বাধীন কাজে হস্তক্ষেপ করেছেন কি না এরই বিচার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে লক্ষণীয় যে ভারতে এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর এক বড় সুবিধা হল যে, তাদের কর্মকর্তারা অবৈধ নির্দেশের বিরুদ্ধে আদালতের প্রটেকশন চাইতে পারেন বা নালিশ জানাতে পারেন।

ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে হস্তক্ষেপের প্রায় একই রকম অভিযোগ আদালতের। কয়েক দুয়েক আগে ভারতের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি অবসরে যান। সেই বিচারপতির বিরুদ্ধে তার কলিগ অন্য সিনিয়র চার বিচারপতি সাংবাদিক ডেকে পাবলিকলি অভিযোগ এনেছিল যে তিনি গুরুত্বপুর্ণ কিছু মামলা সিনিয়র বিচারপতি কলিগদের বেঞ্চে দিচ্ছেন না। আজকে যিনি ভারতের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ – তিনিও ঐ চারজনের একজন ছিলেন।  আসলে ঐ চারজন, তাঁরা যে কথা উচ্চারণ করতে চান নাই তা হল, মোদী বা তাঁর দলের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট আছে এমন কিছু মামলা ঐ প্রধান বিচারপতি (এখন অবসরে) দীপক মিশ্র  প্রভাবিত করতে নিজের হাতে রেখেছেন অথবা পছন্দের জুনিয়রদের আদালতে ফেলেছেন। বিশেকরে একটা মামলা ছিল যেটাকে এক হাইকোর্টের বিচারকের রহস্যময় খুন আর যার আদালতে এমন এক মামলা চলেছিলে যেখানে বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আসামী ছিলেন। ভারতের রাষ্ট্র ও প্রাতিষ্ঠানিকতার বিবেচনায় এটা খুবই গুরুতর অভিযোগ, সন্দেহ নাই। ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত আদালত পাড়ার সিনিয়রেরা উকিলেরা সামলে নেন।

এদিকে গত সপ্তাহে ভারতের “কন্সটিটিউশন দিবস” উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায়  প্রেসিডেন্ট ও আইনমন্ত্রীর সাথে একই মঞ্চ শেয়ার করে তাতে অংশ নিয়েছিলেন চলতি প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ। তিনি সেখানে ইঙ্গিতমূলক কিছু জ্ঞানের কথা বলেন। তিনি বলেন, “হয় কন্সটিটিউশনের স্থায়ী নির্দেশগুলো অনুসরণ করেন নইলে চরম এক বিশৃঙ্খলতার মুখে পড়তে রেডি হন”। [It is in the best interests of the nation to heed to the ethics and morality of the Constitution; otherwise, our hubris will end with a plunge into chaos, …] এ কাজে তিনি জ্ঞানবুদ্ধির [wisdom] ব্যবহার আর দূরদৃষ্টিসম্পন্ন [prudence of the majority] হতে পরামর্শ রাখেন।  জ্ঞানের ভাষায় তিনিও ভারতের নির্বাহী ক্ষমতার বিরুদ্ধে আদালতের উপরে হস্তক্ষেপের হুশিয়ারি দিলেন।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থা শোচনীয় আমরা জানি। যেখানে কোন সিদ্ধান্ত, ক্ষমতা বা এক্তিয়ারটা রাষ্ট্রের, কোনটা সরকারের বা কোনটা ব্যক্তির না প্রধানমন্ত্রীর, নাকি কোন ব্যাঙ্ক গভর্ণরের, নাকি দলীয় প্রধানের অথবা কোন কাজ ও সিদ্ধান্তটা বিরোধী দলের নেতার অথবা নাকি উচ্চ বা নিম্ন আদালতের – ইত্যাদি সব কিছুতে এখানে একাকার এক ব্যক্তির। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ক্রমেই প্রধানমন্ত্রী মোদীর শিক্ষক হয়ে উঠছে বাংলাদেশ! মোদী সম্ভবত এই বাংলাদেশকে দেখে ঈর্ষান্বিত এবং উতসাহী হয়ে উঠছেন।

শেষ কথাঃ
কিন্তু এই সবকিছুর মূল প্রভাব প্রতিক্রিয়া আর তার অর্থ তাতপর্য হল অন্য খানে। সোজাসাপ্টা বললে, ভারত রাষ্ট্রের গাঠনিক মূল দুর্বলতা হল এটা কাঠামো (আমেরিকা রাষ্ট্র অর্থে) ফেডারল রাষ্ট্রের নয়। যার ফলাফলে এক রাজ্য (এব্যাপারে অভিযোগের আঙ্গুল দেখা যায় হিন্দি-বলয় বলে এক শব্দে) অন্য রাজ্যের ফসল খাচ্ছে। তাই, মুখ্যমন্ত্রী মমতা যখন হিন্দি বলয় বনাম বাংলা বলে বৈষম্যের কথা তুলে তাতে তিনি আসলে কেন্দ্র-রাজ্যের বৈষম্য ও বিবাদের কথা তুলেন। তখন সেটা এই ভারত রাষ্ট্রেরই গাঠনিক দুর্বলতা তিনি ভিন্ন ভাষায় বলেন। কিংবা দক্ষিণের সচেতনে হিন্দি-এড়ানো কেন? কেন  আঞ্চলিক দল রাজ্যের ক্ষমতায়, এমন রাজ্যের সংখ্যা ক্রমশ বেড়ে চলছে?  এগুলো কাঠামো দুর্বলতারই নানান প্রকাশ।
কিন্তু তাহলে এত দুর্বলতার ভারত যেমনেই হোক চলছে তো! সেই ভারত চলছে কী করে, সেটাও ত প্রশ্ন। হা এই প্রশ্নের উত্তর হল, ভারত চলে মূলত দক্ষ সিভিল-মিলিটারি আমলা ও গোয়েন্দা বিভাগের কারণে। যদিও এই জবাবটাও অনেকেই জানে। কিন্তু যেটা সম্ভবত বেশির ভাগই খেয়াল করেন নাই  তা হল দক্ষ সিভিল-মিলিটারির পিছনে আর একটা ফ্যাক্টর কার্যকর আছে। সেটা হল,  স্টাটুটারি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কনষ্টিটিউশনে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা। তাই এককথায় মোদীর সস্তায় হিন্দুত্বের ভোট জিতে আনার লক্ষ্য তার নির্বাহী হস্তক্ষেপে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেয়া তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিবার ক্ষমতা – কেড়ে নেয়া, এর সোজা ফলাফল হবে ভারত রাষ্ট্রটা টিকে থাকার শেষ অবলম্বনের মূলে আঘাত করা। সেটা মোদীর লক্ষ্য না হলেও মোদীর কাজের ফলাফলে বস্তুত তাই হয়ে গেছে ও যাচ্ছে। বলা বাহুল্য  আভ্যন্তরীণ দিক থেকে দেখলে এটা ভারত রাষ্ট্রের জন্য খুবই খারাপ লক্ষণ।    দক্ষিণ এশিয়ায় পড়শি যারা ভারতের দানবীয় নীতি-পলিসিতে অতিষ্ঠ তারা খুশির চোখে দেখার সুযোগ নিবে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ০১ ডিসেম্বর ২০১৮ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন) ভারতের আসন্ন নির্বাচন ও নির্বাচনী ইস্যু – এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে  আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে।  ফলে  সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]