আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

 

আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ঃ জয়শঙ্কর

কাশ্মীর ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু মনে করতে পারি না, এটা অবৈধঃ

গৌতম দাস

২৬ আগস্ট ২০১৯, ০০:০৭ সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2GL

 

20 Aug 2019, Dhaka, Press Conference.

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুব্রামনিয়াম জয়শঙ্কর তাঁর দুই দিনের (২০-২১ আগস্ট) বাংলাদেশ সফর শেষ করে গেলেন। বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে গত ১১ বছরের যে উঁচা-নিচা আর একপক্ষীয় বা বাইরে থেকে ‘হাত ঢুকিয়ে দেয়া’ বৈশিষ্ট্য চলে আসছে, তা আমাদের কারও অজানা নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, ভারতের কোনো ডিগনেটরি বাংলাদেশ সফরে এলে আমাদের মিডিয়াসহ সবাইকে আগাম হতাশায় ডুবে সব ছেড়ে দিয়ে আরেকবার লুঠ হবার বা হেরে যারার জন্য মানসিকভাবে তৈরি থাকতে হবে। কারণ, এটা কোনো কাজের কথা হতে পারে না। বরং এটাকে বলা যায়, মৃত্যু আসার আগে নিজেই ভয়ে-হতাশায় মরে যাওয়া। এখানে এমন একটা স্পিরিট থাকা কঠিন ছিল না যে, যতক্ষণ শ্বাস ততক্ষণ লড়ে যেতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে- আমার দিন ফিরে আসবেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য যে আমরা হতাশা, গা ছেড়ে দেয়া দেখছি।

জয়শঙ্করের এবারের সফর মূলত ছিল খুবই রুটিনমাফিক। এই অর্থে যে, যেমন নির্বাচন করেই হোক, চলতি বছরের শুরু থেকে বাংলাদেশে নতুন এক সরকার এসেছে। একইভাবে ভারতেও চলতি বছরের মে মাস থেকে এটা নতুন করে মোদি সরকার-টু, শপথ নেয়া নতুন এক সরকার। তাই এ দুই সরকারের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের রিনিউয়াল সফর ঘটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। এই উদ্দেশ্যেই আমাদের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন গত ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালে প্রথম ভারত সফরে গিয়েছিলেন।

অপর দিকে, এটাই ছিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের জন্য বাংলাদেশে পাল্টা প্রথম পরিচিতি সফরে আসা। তবে জয়শঙ্করের মূল সফরের সাথে ইতোমধ্যে জুড়ে গিয়েছিল আরো কিছু ইস্যু। যেমন- এখন হওয়ার কথা দুই দেশের নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের সামিট, যেখানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যাবেন ভারতে। এ সফর অক্টোবরে হবে বলে ইতোমধ্যে নির্ধারিত রয়েছে। ওদিকে রেগুলার ইস্যুগুলো তো আছেই। এছাড়াও নতুন দু’টি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু বার্নিং হয়ে বলা যায় তা হল, আসামের এনআরসি [NRC] ইস্যু আর কাশ্মির ইস্যু। এ মুহূর্তের ভারত সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা ও উৎপাত তৈরি করেছে এ দুই ইস্যুতে।

এমনকি এ’ব্যাপারে খোলাখুলি হুমকি আর ঝাঁপিয়ে পড়া আচরণ দেখিয়ে চলেছেন অমিত শাহ, যিনি আগে ছিলেন কেবল বিজেপির কেন্দ্রীয় সভাপতি, এখন মোদী সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও। গত ২০১৭ সাল থেকে তিনি ভারতের প্রতিটি নির্বাচনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে নিয়মিত হুমকি দিয়ে চলেছেন। আমরা নাকি ভারতে কথিত অনুপ্রবেশকারী, তাই কথিত বাংলাদেশীদের তিনি পিষে মেরে ফেলবেন, মাটি থেকে উপড়িয়ে ফেলে দেবেন – এভাবে স্থানীয় বা কেন্দ্রীয় প্রতি নির্বাচনেই হুমকি দিয়ে চলছিলেন। সেই অমিত শাহ বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে প্রায় দুসপ্তাহ আগে ভারতে গত ৭ আগস্ট দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠকের আয়োজন করেছিলেন।

তাদের আনুষ্ঠানিক  আলোচনার এজেন্ডায় এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত ছিল না, কিন্তু তা সত্বেও ভারতের [Amit Shah to talk illegal migrants, terror with Bangladesh counterpart] কিছু মিডিয়াকে দিয়ে প্রচারণা চালানো হয়েছিল যে, আসামের কথিত অপ্রমাণিত ৪০ লাখ নাগরিককে বাংলাদেশে ফেরত নেয়ার ব্যাপারে চাপ দেয়া হবে ওই বৈঠক থেকে। কিন্তু আগে থেকেই আমরা ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা ও আমাদের সরকারকে সতর্ক [আসামের এনআরসি আলোচনার এজেন্ডাই হতে পারে না] করেছিলাম।  ফলশ্রুতিতে আমরা দেখেছিলাম দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কোনো যৌথ ঘোষণা ‘এনআরসি ইস্যু অন্তর্ভুক্ত’ করতে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একমত না হওয়ায় [‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে মতান্তর, যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়নি] কোনো যৌথ ঘোষণা প্রকাশিত হয়নি। দুই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এক বৈঠক নিয়ে আলাদা আলাদা যার যার দেশের বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া প্রেস বিবৃতিতেও এ’প্রসঙ্গে উল্লেখ নেই। এরপর ১৪ দিনের মাথায় এই পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের এই আলোচ্য বৈঠক অনুষ্ঠিত হল। মোমেন-জয়শঙ্কর বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্কর নিজেই মিডিয়াকে পরিষ্কার করে বলেন, ‘আসামের এনআরসি ভারতের আভ্যন্তরীণ ইস্যু’ [Assam NRC is India’s internal matter: Jaishankar] বলে ভারত মনে করে। তাই এই প্রসঙ্গ নিয়ে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে কোনো আলাপ হয়নি। এই এক ইস্যু আমাদের ড্রাইভিং সিটে বসিয়ে দিয়েছে। কেন?

চলতি মাসের শেষ দিন ৩১ আগস্ট, আসামের এনআরসি ইস্যুটির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন। ফলে বাংলাদেশবিরোধী ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টির সুযোগ তৈরি হতে পারে এখান থেকে। কিন্তু যতই উত্তেজনা আর উস্কানি তৈরির চেষ্টা হোক না কেন ভারতের সরকারী অবস্থান হল, এটা ভারতের আভ্যন্তরীণ বিষয়। যার মানে হল আসামের এনআরসি বা নাগরিকত্ব প্রমাণ প্রক্রিয়ায় কেউ নিজেকে নাগরিক প্রমাণে ব্যর্থ হলেও এজন্য বাংলাদেশকে দায়ী করা যাবে না, কারণ, বাংলাদেশ এব্যাপারে সংশ্লিষ্টই নয় বলে ভারত মনে করে। তাই এক্ষেত্রে এখন বাংলাদেশের নাম তুলে অভিযোগ করার চেষ্টা কমে আসবে হয়ত, এছাড়া কোন সরকার সংশ্লিষ্ট সদস্য এমন অভিযোগ তোলার কথাই না। তাও কেউ তুললে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের কাছে আমাদের আপত্তি তোলার একটা ভিত্তি এই প্রথম আমাদের হাতে এল, যা আমাদের সরকার বা যে কেউ ব্যবহার করতে পারব। একটা উপযুক্ত রেফারেন্স বা ভিত্তি হাতে পাওয়া যাওয়াতে আমরা এখন দাবি করে বলতে পারব, আসামের এনআরসি ইস্যুতে আমরা সংশ্লিষ্ট কোন পক্ষ নই।

NRC in Assam is India’s internal matter, says MEA S Jaishankar, S External Affairs Minister. File photo   –  The Hindu

দুঃখের কথা হল, গত ২০ আগস্টের যৌথ সংবাদ সম্মেলন থেকে জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” [Mr. Jaishankar said, “It’s an internal matter.” – এই ঘোষণার গুরুত্ব আমাদের মিডিয়ার প্রায় কেউই ধরতেই পারেন নাই। অথচ বাংলাদেশের স্বার্থ কী? জয়শঙ্করের এই সফরে কোন কোন ইস্যুগুলো মুখ্য হয়ে উঠবে এসব আগেই জানা না থাকার কোন কারণ নাই। বুঝা যাচ্ছে এনিয়ে মিডিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিটের কারও এব্যাপারে কোন হোমওয়ার্ক নাই।  জয়শঙ্করের এই সফরে বাংলাদেশের স্বার্থের দিক থেকে ভেসে উঠা বা উঠতে পারত এমন ইস্যুগুলো হল, ১। তিস্তা বা ৫৪ নদীর পানি,  ২। সীমান্ত হত্যা, ৩। অসম বাণিজ্য, ৪। আসাম এনআরসি ইস্যু, আর ভারতের দিক থেকে ৫। বাংলাদেশের পোর্টগুলো ব্যবহারে ভারতকে দেয়া ট্রানজিট, ৬। ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ, ৭।  কাশ্মীর ইস্যু ইত্যাদি অন্য কিছু। এসবের মধ্যে আসাম এনআরসি ইস্যু বাংলাদেশের মিডিয়ার চোখে হওয়া উচিত ছিল এক নম্বর ইস্যু। কারণ, ৩১ আগষ্ট তারিখে আসামে ফাইনাল নাগরিক তালিকা প্রকাশের পর বাংলাদেশবিরোধী প্রচার আর অনুপ্রবেশকারি অভিযোগে শ্লোগানে সব ছেয়ে ফেলার হতে পারে যে “অনুপ্রবেশকারিরা ফেরত যাও” । কিন্তু আমরা দেখলাম আমাদের মিডিয়াও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে এব্যাপারে ছিল পুরাই উদাসীন। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হল, এমনকি জয়শঙ্করের সফরে সাংবাদিক সম্মেলন কাভার করে যে মিডিয়া রিপোর্ট পরদিন ছাপা হয়েছে সেখানেও আসাম এনআরসি ইস্যু নিয়ে প্রায় কিছুই নাই বললেই চলে। অথচ জয়শঙ্করের দেয়া “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” সংলগ্ন যেকোন বক্তব্য হওয়ার কথা ছিল শিরোনাম। পারলে এই কয়েক শব্দে দেয়া জয়শঙ্করের বক্তব্যের ভিডিওসহ রিপোর্টিং হত সবচেয়ে উপযুক্ত।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতা এখন কোন জায়গায় আছে এর এক বিরাট মাপকাঠি হয়ে গেল – জয়শঙ্করের সফর বা “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” নিয়ে রিপোর্ট। কোনভাবেই এখানে হাসিনার ফ্যাসিজমের শাসন, মিডিয়ার উপর সরকারি চাপ ইত্যাদির অজুহাত তোলারও সুযোগ নাই। কারণ মিডিয়া মূলত ১. কোন ইস্যুটা এই সফরে এক নম্বরের সে ইস্যুটাই বুঝে নাই, এটা প্রমাণিত। ২. ব্যাপারটা এমন একেবারেই নয় যে আমাদের মিডিয়ায় জয়শঙ্কর বলেছেন “এনআরসি ভারতে অভ্যন্তরীণ ইস্যু” এটাকে প্রধান শিরোনাম করলে বা ভিডিওওতে দেখালে সরকারের বা ভারতের দিক থেকে আপত্তির কিছু আছে। কাজেই এটা ছিল সরকারি কোন চাপ ছাড়া ইস্যু। ৩. এটা ছিল বাংলাদেশের বার্ণিং আর জেনুইন স্বার্থের ইস্যু। ৪। এমন রিপোর্ট হাসিনার পক্ষেই যায়। কাজেই হাসিনাকে দোষ দিয়ে মিডিয়ার নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকার কোন সুযোগই নাই।
এছাড়া উলটা করেও দেখানো যায়  – আমাদের মিডিয়া বিকল্প কী বা কাকে তারা শিরোনাম করেছে? – এটা থেকেও প্রমাণ হয় যে মিডিয়া ইস্যুটা বুঝেই নাই। দেখা গিয়েছে বেশির ভাগের কাছে ইস্যু হয়েছে  – তিস্তা ইস্যু। যার সার কথা হল তিস্তা নিয়ে কিছু হল না এটা দেখিয়ে ভারতকে বেইজ্জতি করব, হাসিনা কত অযোগ্য তা দেখাব। এগুলো সম্ভবত বামপন্থি মধ্যবিত্তের চোখ ও সেই মাপের বুঝাবুঝি। যেমন দেখেন বাম গণতান্ত্রিক জোট – এদের কারবার [জয়শঙ্করের সফর : তিস্তা চুক্তির সুস্পষ্ট আশ্বাস না থাকায় বাম জোটের ক্ষোভ]। কমিউনিস্ট প্রগতিবাদীরা নিজেদের সবার উপরের নিজেদের বুঝমান মনে করে। তাই তাদের বুঝে আসাম এনআরসিতে কি হচ্ছে সেটা না, তিস্তা এই সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ।  কেউ কেউ আরও বাম বুদ্ধিমান হতে চেয়ে  – “ভারত থেকে অস্ত্র কিনবার তাগিদ” এটাকে মূল শিরোনাম করেছে। এমনকি যাকে প্রফেশনাল পত্রিকা বলে মানতে চায় অনেকে সেই প্রথম আলোও  দেখা গেছে ইস্যুটা বুঝেই নাই। তাদেরও আমলে আসে নাই। তাই  শিরোনাম, ২২ আগষ্টের –  “জয়শঙ্করের সফর: বাংলাদেশের বিষয়গুলো আসেনি, ভারত স্বস্তি পেয়েছে—বামজোট”। ২২ আগষ্টের  শিরোনাম,  “মোদির কিছু বার্তা দিয়ে গেলেন জয়শঙ্কর”

জয়শঙ্করের নিজে যেচে “এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়” বলে স্বীকার করে নিবার অর্থ হল, যে ভারত নীতিগতভাবে মানল যে ১। ভারতে কেউ নিজের ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণে করতে না পারলেও – এর পরের বাক্য হবে – সেটাও ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়।  ২। ভারত অফিসিয়ালি বলতে পারবে না যে ঐ লোক তাহলে বাংলাদেশের; অথবা বাংলাদেশের থেকে আসা গোপনে প্রবেশকারি বা অনুপ্রবেশকারি। ৩। বাংলাদেশকে বলতে পারবে না যে আসেন ব্যাপারটা নিয়ে আলাপ করি।

তাহলে দাড়াঁলো কী? যেটা সবচেয়ে স্বাভাবিক ছিল যে, জয়শঙ্করের যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনের পরের দিনে বাংলাদেশের প্রায় সব পত্রিকার লীড হেডলাইন হত – আসাম এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : জয়শঙ্কর। সেটা হয় নাই। এতে আমাদের মিডিয়া সেন্সের করুন হাল আমরা দেখলাম। এমনকি পুরা জয়শঙ্করের সফর কাভার ছাড়াও আলাদা করে আর একটা রিপোর্ট দেখতে পাওয়ার কথা ছিল। আমার কথাটা বুঝা যাবে শুধু Jaishankar bangladesh NRC – এই তিনটা শব্দ লিখে গুগুলে সার্চ দেন দেখবেন সার্চের ফলাফলে প্রথম দুই পাতা জুড়ে ভারতীয় পত্রিকার নাম আসবে যাদের রিপোর্টের শিরোনাম হল, “NRC in Assam India’s internal matter: Jaishankar”। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে ভারতের মিডিয়া কিন্তু ঠিকই বুঝেছে তাদের রিপোর্টের শিরোনাম কী করতে হবে।  এমনকি জয়শঙ্করের এই বক্তব্য আরও কী নতুন অর্থ-তাতপর্য তৈরি করছে সেটা নিয়ে দ্যা হিন্দু পত্রিকা লিখেছে,   His statement is significant as it indicates India’s official position just days before the final NRC list is to be published on August 31. In July, Mr. Momen had expressed concern about the possible fallout of the final list on Bangladesh.

তাহলে দাঁড়ালো যা তা হল, আমরা কমিউনিস্ট প্রগতিশীল ধরণের বুঝমান খেতাব পেতে যত আগ্রহী, সাধারণ কান্ডজ্ঞান দেখাতে ততটাই বেখবর। কি আর করা – কাজেই এখন আসেন আমরা আপাতত দোয়া-কামনা করি যাতে কান্ডজ্ঞান জাগে। আর এখনও সবকিছু শেষ হয়ে যায় নাই। এখনও বিরাট এক কাজ রয়ে গেছে। আগেই বলেছি, আসামের এনআরসি ইস্যুতে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হওয়ার দিন আগামী ৩১ আগস্ট। কাজেই ভারতের সরকারী অবস্থান বাংলাদেশকে জড়ানো বা দায়ী করার না হলেও বাংলাদেশবিরোধী বা মুসলমানবিরোধী পিছন থেকে সংগঠিত তথাকথিত “অসমিয়া স্বার্থের” দাবি তোলা হতে পারে।  তাই আগে থেকেই এর পাল্টা আমাদের বয়ান অবস্থান প্রচার তথা, বাংলাদেশের বক্তব্য দেয়া খুবই দরকার হবে। এছাড়া জয়শঙ্করের বক্তব্যকে সম্ভাব্য কেমন গুরুত্ব দিতে হবে সেখানে এব্যাপারটা বুঝার জন্য এবারের বিবিসির রিপোর্ট একটা ভালো উদাহরণ। তাই এর আলোকে কোন মিডিয়া রিপোর্ট তৈরি ও প্রকাশ করা খুবই কাজের হতে পারে।
যেমন বিবিসির রিপোর্টের শিরোনাম ছিল, “আসামের নাগরিকত্ব ইস্যু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় : ঢাকায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী”। ভিতরে লিখেছিল – “সংবাদ সম্মেলনে তাঁকে [জয়শঙ্করকে] প্রশ্ন করা হয়েছিল আসামে যে ৪০ লাখ মানুষ নাগরিকত্ব হারানোর ঝুঁকিতে আছে, সেটি বাংলাদেশকে প্রভাবিত করবে কি না। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান, এই প্রশ্নের জবাবে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘এটা ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’। এ সময় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও তার সাথে ছিলেন, তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি”।
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, বলা হয়েছে – ‘সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিবিসির সংবাদদাতা আকবর হোসেন। তিনি জানান …’। এই বাক্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ; কারণ বুঝানো হচ্ছে যে, আকবর হোসেন এখানে চাক্ষুষ সাক্ষী। তাই কেউ এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমাদের মিডিয়ার উচিত, ৩১ আগস্টের পরের দিনগুলোর জন্য তৈরি থাকা, যাতে আমরা বাংলাদেশের পাল্টা ন্যারেটিভ বা বয়ান প্রচার করতে এবং বাংলাদেশের বক্তব্য শক্ত ও পরিষ্কার করে তুলে ধরতে পারি।

জয়শঙ্কর কেন এত সহজে ‘এনআরসি অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে মানলেন?
জয়শঙ্কর এত সহজে ‘এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বক্তব্য দিলেন কেন? এর জবাব হল, ‘দুটি কারণে’। এক. এনআরসি ইস্যুতে বিজেপির একটা ‘প্ল্যান বি’ আছে। সেটা হল, এই তথাকথিত অপ্রমাণিত নাগরিকদের প্রাথমিকভাবে শহরের বাইরের ক্যাম্পে রাখবে তারা; এসব ক্যাম্প ইতোমধ্যেই তৈরি করা হয়েছে; আর যদিও অনেক পরে এদের সমাজে ফেরত নেয়া হবে। কিন্তু তারা আর ভোটার হবে না, তবে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে যার যার বসবাসের এলাকায় ফিরে যেতে দেয়া হবে, এমন জায়গায় ফিরে গিয়ে কাজকাম করতে দেয়া হবে। কিন্তু ভোট দেয়ার মত নাগরিক অধিকার তাদের দেয়া হবে না। আর সম্ভবত অ-মুসলমানদের বেলায় এটা ঘটবে না। বিজেপির এক নেতার ভাষায় ‘মানবাধিকার রক্ষা করে তারা কাজটা’ এমনভাবে  করতে চান।
দুই. সামনে ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের বিশাল কাজ, দম ফেলার সময় নাই। কারণ কাশ্মীর ইস্যুতে এবার আন্তর্জাতিক জবাবদিহিতা বা নিজের অবস্থানের পক্ষে রাষ্ট্রগুলোকে আনার কাজে – মুখোমুখি হবার সময় তাদের। তাই  অনেকেই মনে করেন ভারত বা জয়শঙ্করের রাজি হওয়ার মূল কারণ হল ভারতের কাছে এখনকার আসাম এনআরসির চেয়েও আরেক বড় ইস্যু হল কাশ্মীর, সেটাকে আন্তর্জাতিক সমালোচনা থেকে বাঁচানো। বিশেষ করে  এখন থেকেই আগামী মাস মানে, পুরো সেপ্টেম্বর মাস হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ,  ২৪-২৬ আগষ্টে জি৭ গ্রুপের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর বৈঠক চলছে। ভারত অর্থনীতিতে অগ্রসর, সে এমন সাত রাষ্ট্রের কেউ নয়। তবু প্যারিসে ওই সভায় মোদী দাওয়াত পেয়েছেন কাশ্মির ইস্যু নিয়ে পশ্চিমা নেতারা কথা বলতে চায়। মোদী সেখানে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন, এখন অলরেডি তিনি প্যারিসে, যেখানে এবারের জি৭ সম্মেলন ডাকা হয়েছে।

India’s risky Kashmir power grab, VOX

এর এক সোজা অর্থ কাশ্মীর আর বাস্তবে ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু একেবারেই নয়, তা প্রকারান্তরে এখানে মেনে নেয়া হয়েছে। এমনকি তা পাকিস্তানের সাথের এক দ্বিপক্ষীয় ইস্যুও নয়। এটা বরং অন্তত আরো সাত রাষ্ট্রেরও ইস্যু। কাজেই সেপ্টেম্বরের শুরু থেকেই আরও রাষ্ট্রকে পক্ষে আনতে ব্যস্ত থাকতে হবে ভারতকে। সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে জাতিসঙ্ঘের বার্ষিক সাধারণ পরিষদের ধারাবাহিক সভাগুলো শুরু হয়ে যাবে; যেখানে বলাই বাহুল্য কাশ্মীর সবচেয়ে বড় ইস্যু হয়ে যাবার সম্ভাবনা। তাই ভারতের বিদেশনীতির এখনকার প্রধান কাজ হবে সেপ্টেম্বরজুড়ে নিজের পক্ষে দ্রুত বন্ধু-সমর্থক জোগাড় করা, তাদের সংখ্যা বাড়ানো। অনুমান করা হচ্ছে, সাধারণ পরিষদের নানা ফোরামে বাংলাদেশের ভারতকে সমর্থনের বিনিময়ে – ‘আসামের এনআরসি ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে দ্রুত মেনে নিয়ে ঘোষণা দিয়েছেন জয়শঙ্কর। এছাড়া আর একটা দিক আছে। ভারতের হিন্দু-মনের চোখে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান আসলে পুরান একক পাকিস্তান – “মুসলমানের” পাকিস্তান। তাই বাংলাদেশের কাশ্মীরকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু বলে মেনে নেওয়া – এর অর্থ বাংলাদেশ যতটা ভাল দেশ ইমরানের পাকিস্তান ততই খারাপ, সহি না – এমন ইঙ্গিত তৈরি হয় এখানে। এটাকে ভারত তার বড় পাওয়া মনে করে, আর যেখানে কাজে লাগবে সেখানে ব্যবহার করতে পারবে।

কিন্তু কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি।

কিন্তু কাশ্মির ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ’ ইস্যু, এটা আমাদের মেনে নেয়া কি সঠিক হয়েছে? না, একেবারেই না। সঠিক তো নয়ই, বরং এটা আত্মঘাতী। বরং সেটা আমাদের শুধু নয়, ভারতের জন্যও, কাশ্মিরের জনগোষ্ঠীর জন্য, পাকিস্তানের জন্য সংশ্লিষ্ট এমন সব রাষ্ট্রের জন্য এবং যে কোন জনগোষ্ঠীর জন্যও আত্মঘাতী। জাতিসংঘের সদস্য যে কোন রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতি। কেন?

কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণইস্যু আমরা মনে করতে পারি না, কারণ জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী এটা অবৈধঃ
কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয়। মুল কারণ, কাশ্মীর সমস্যা আসলে জাতিসংঘের চার্টারের [Charter of the United Nations] আলোকে মিটাতে আমরা বাধ্য। আর কাশ্মীর শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলা মানেই, এই চার্টারের বাইরে এই সমস্যা মেটানোর কথা বলা। জাতিসংঘ চার্টার মেনে চলা- এর মানে হল, কোনো জনগোষ্ঠী বা তাদের ভূখণ্ডের মালিকানা দখল কোন রাজাগিরি অথবা উপনিবেশগিরি দিয়ে নির্ধারিত হয়েছে এটা মেনে নেওয়া অবৈধ ও নিষিদ্ধ। অতএব ব্যাপারটা দাঁড়াবে, মহারাজা হরি সিং কাশ্মীরের কেউ নয়। বরং কাশ্মীরের জনগণই সব কিছু নির্ধারণ করার মালিক। কাজেই হরি সিং কাশ্মীরকে ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে, কোন চুক্তি করে দিয়েছে – এই তুলে দেওয়া বা চুক্তি আইনত অকেজো, মুল্যহীন। কারণ জাতিসংঘের দৃষ্টিতে কোন রাজা অথবা উপনিবেশ মালিকপ্রভু কোন ভুখন্ডের মালিক হতে পারে না। ঐ ভুখন্ডের মালিক, শাসক কে তা নির্ধারণের একমাত্র হকদার ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দারা।
অর্থাৎ, কাশ্মির কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু বলে স্বীকার করে নেয়া মানে, একটি স্বাধীন দেশের ওপর কারো ঔপনিবেশিক কর্তৃত্ব কায়েম করাকে বৈধ বলে স্বীকৃতি দেয়ার মত হয়ে যাবে। এর ফলশ্রুতিতে ঐ দখলকারি দেশের জাতিসংঘ সদস্যপদ স্থগিত অথবা বাতিল হয়ে যেতেও পারে। সাদ্দামের ইরাকের কুয়েত দখল করা যেভাবে অবৈধ গণ্য হয়েছিল।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র। নিজ ভুখন্ডের শাসক নাগরিক নিজে অথবা তার সম্মতি নেয়া এক নির্বাচিত প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।

জাতিসঙ্ঘ গঠনের ভিত্তি হল, নাগরিক অধিকার। নিজ ভুখন্ডের শাসক হল নাগরিক নিজে বা তার সম্মতি নেয়া প্রতিনিধি শাসক। আর এই অধিকারভিত্তিক নাগরিক রাষ্ট্রগুলোর এসোসিয়েশন হল জাতিসংঘ।  তাই কোন ভুখন্ডের উপরে ওর বাসিন্দাদের বাইরে অন্য কোন রাজতন্ত্রী (Monarchy) অথবা কলোনিয়াল (Colonial) মালিকানা শাসক দাবি করাকে জাতিসংঘ অবৈধ মনে করে। অবৈধ দখলদার মনে করে।

UN Declaration 1942

জাতিসংঘের জন্ম দলিল ও ভিত্তি

  • ১৯৪১ সালের ১৪ আগষ্ট বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল আর আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট এই নীতি মেনে ‘আটলান্টিক চার্টার’ নামে এক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন।
  • পরে ঐ বছর শেষে ১৯৪২ সালের ০১ জানুয়ারি এতে প্রতিস্বাক্ষর করেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন। অর্থাৎ ঐদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীন এবং আগের চার্চিল ও রুজভেল্ট এভাবে মোট চার রাষ্ট্র আর এক ছোট দলিলে লেখেন ও স্বাক্ষর করেন এই বলে যে তারা আগের  Atlantic Charter  এর যৌথ ঘোষণার সাথে একমত হয়ে এই স্বাক্ষর করছেন।
    পরবর্তিতে এই চার রাষ্ট্রের স্বাক্ষরিত দলিল এটাই জাতিসংঘ গঠনের ঘোষণা [1942: Declaration of The United Nations] মানা হয়।
  • পরের দিন ০২ জানুয়ারি ১৯৪২, আরও ২২ রাষ্ট্র এতে স্বাক্ষর করেছিল। জাতিসংঘের জন্ম ঘোষণা করা হয় এভাবে।
  • পরবর্তিতে ১৯৪৫ সালে পুর্ণ গঠন দলিল লেখা শেষ হলে যেটাকে জাতিসংঘের চার্টারের [UN Charter]  বলা হয়, ওর ১১০ নম্বর ধারা মতে ঐ গঠন দলিলে অন্যান্য রাষ্ট্গুলো স্বাক্ষর করাতে জাতিসংঘের জন্ম হয়েছে

এই ভিত্তিতেই পরবর্তিতে অসংখ্য গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর জন্ম হয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন রাষ্ট্রস্বার্থগত বিবাদ মিটিয়ে দেয়ার ভিত্তি। একালে সেসব কনভেনশন, আইন ইত্যাদির হেফাজতকারি ও তদারককারি হল জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কাউন্সিল (UNHRC)। কাজেই জাতিসংঘ চার্টারকে উপেক্ষা করা বা জাতিসঙ্ঘের সদস্য পদ হারানোর ঝুঁকি নেয়া, এসবই আত্মঘাতী।

এছাড়া আর সুনির্দিষ্ট করে কাশ্মীর প্রসঙ্গে কিছু কথাঃ
১। জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,  রাজা হরি সিং ভারতের নেহেরুর সাথে চুক্তি করার ক্ষেত্রে  কাশ্মীরের বৈধ প্রতিনিধি না।
কাশ্মীরের জনগণের কোন রায় নিয়ে তিনি নেহেরুর কাছে যান নাই।
২। গিয়েছিলেন রাজা হিসাবে, একসেশন চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেছিলেন রাজা হিসাবে।
তাই জাতিসংঘ চার্টার অনুযায়ী,এই চুক্তি অবৈধ, অকেজো মুল্যহীন।
৩। যদি ধরেও নেই এই দলিল বৈধ তাতেও সমস্যা হল এটা ঠিক কোন একসেশন চুক্তি নয়। এটা আসলে করদ রাজ্য চুক্তি। ঠিক যেমন বৃটিশ ইন্ডিয়ার সাথে হরি সিংয়ের প্রিন্সলি স্টেট চুক্তি ছিল – হরি সিং নেহেরুর সাথে তেমনই এক চুক্তি করেছিলেন।
কিন্তু জাতিসংঘের চোখে করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি সেটা আরও অগ্রহণযোগ্য, তাই অবৈধ। কারণ এর ভিত্তি কলোনি বা কলোনিয়ালিজম। নেহেরুর রিপাবলিক ভারত কী করে কাশ্মীরের জনগণকে এক কলোনিয়ান করদ রাজ্য ধরণের চুক্তি করতে পারেন?
৪। আটল্যান্টা চুক্তি বা জাতিসংঘ ঘোষণার সারকথা ও মূখ্য ভিত্তি হল “কলোনিয়ালিজম অবৈধ, তাই বাতিল”। ভুখন্ডের শাসক বা মালিক ঐ ভুখন্ডের বাসিন্দা। বিদেশি কলোনি মাস্টার ভুখন্ডের কেউ নয়।  মনে রাখতে হবে আটল্যান্টিক চার্টারের কথা। কলোনি মাস্টার চার্চিল সেখানে তৃতীয় ধারায় স্বীকার করে নিচ্ছেন যে – ” Third, they respect the right of all peoples to choose the form of government under which they will live; and they wish to see sovereign rights and self government restored to those who have been forcibly deprived of them; । অর্থাৎ কোন ভুখন্ডের মালিক সেই ভুখন্ডের বাসিন্দা এই নীতি মেনেই ঐ চার্টার চুক্তিতে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিলকে দাসখতের স্বাক্ষর করতে বাধ্য করে নিয়েছিলেন রুজভেল্ট। আর এই শর্তেই তিনি হিটলারের হাতে থেকে বৃটিশসহ ইউরোপকে বাচিয়ে ছিলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যারাই ১৯৪২ সালের জাতিসংঘ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছিলেন কেবল তাদের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। তাদেরককে অর্থ ও অস্ত্রসহ সবরকম সহায়তা করেছিলেন।

অতএব ভারতের কনষ্টিটিউশনে বা ৩৭০ ধারাতে যাই লেখা থাক, অথবা এই মাসে এখন ৩৭০ ধারা রদ -বাতিল করে ভারতের রাষ্ট্রপতির যে ঘোষণাই দেয়া হোক কাশ্মীর নিয়ে অন্তর্ভুক্তি চুক্তিসহ সবই অবৈধ। মূল কারণ, কোথাও কাশ্মীরের জনগণ – সেই মুল বাসিন্দাদের – কোন ম্যান্ডেট বা রায় নেয়া হয় নাই কোথাও।

তাই কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু হতে পারে না; বরং এটাকে অভ্যন্তরীণ ইস্যু নয় বলে এরপর এর সাথে বলতে হবে যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘ চার্টার, জাতিসংঘের নানান গ্লোবাল কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক আইনগুলোর ভিত্তিতেই এর সমাধান করতে হবে। জাতিসংঘকে বাইপাস করে আমরা কিছু করতে পারি না। অন্তত জাতিসংঘের সদস্যপদ বজায় রেখে। কারণ, এই উদাহরণ ভবিষ্যতে আমাদের বেলায় প্রয়োগেরও সুযোগ আমরাই তৈরি করতে পারি না।

আবার ভারত নিজের জাতিসঙ্ঘের সদস্যপদ ধরে রেখে এটা বলার সুযোগই নেই যে, কাশ্মীর সমস্যা জাতিসংঘকে বাইপাস করে মেটানো যাবে বা মিটাতে হবে।

সুতরাং জাতিসংঘ চার্টার অমান্য করে বাংলাদেশেরও – কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ ইস্যু মনে করা, ঘোষণা করা ভিত্তিহীন। শুধু তাই না এটা আত্মঘাতি। এটা যেকোন পর্যায়ে বাংলাদেশেরই সদস্যপদকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত ২৪ আগষ্ট  ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার প্রিন্টে ও ওয়েবে   “জয়শঙ্করের সফরের লাভ-ক্ষতি এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল।  পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]

Advertisements

হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

হিন্দুত্বের রাজনৈতিক বলি হব, আমরা সকলে

গৌতম দাস

২৭ মে ২০১৯, ০০:০৬,  সোমবার

https://wp.me/p1sCvy-2AB

 

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। তাতে নরেন্দ্র মোদীর বিজেপি আবার বিজয়ী হয়েছে, তারা ক্ষমতায় ফিরে আসছে এবং গত ২০১৪ সালের লোকসভার নির্বাচনের চেয়েও এবার আরও বেশি আসন নিয়ে। বিজেপির জোটের নাম এনডিএ [National Democratic Alliance (NDA)]। গত এমন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তবুও সে সরকার, এনডিএ জোট সরকার হিসেবেই ক্ষমতায় ছিল। আর এবার বিজেপি একাই পেয়েছে ৩০৩ আসন। আর জোট হিসেবে এটা মোট ৩৫২ আসন। গত ২০১৪ সালে এই সংখ্যাগুলো ছিল যথাক্রমে ২৮২ ও ৩৩৬।

এক কথায় বললে এবার ‘হিন্দুত্ব’ [Hindutto]- এই মুখ্য ইস্যুর ভিত্তিতে নির্বাচনটা হয়ে গেল। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি হিন্দুত্বকে প্রধান ইস্যু করে নির্বাচন করতে চাইলে বাকি সব দলকে যে তাতে শামিল হতে বাধ্য করা যায় আর ভোটারদেরও আর সব ইস্যু ফেলে হিন্দুত্বকে প্রধান বানিয়ে নির্বাচনে সে ভিত্তিতে ভোট দিতে বাধ্য করা যায়- এরই জলজ্যান্ত প্রমাণ হল ভারতের এবারের লোকসভা নির্বাচন।

এর মূল কারণ, ভারত-রাষ্ট্র গঠনই হয়েছে হিন্দুত্বকে কেন্দ্র করে। এই নির্বাচনে সে কথাই আবার মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশেষত ভারত-রাষ্ট্রের জন্মের সময় রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী হিসেবে নেহরুর কাছে এক প্রধান প্রশ্ন ছিল যে অসংখ্য ভিন্নতার বিভিন্ন লোক-জনগোষ্ঠীকে এক রাষ্ট্রে রাখার উপায় কী? অর্থাৎ বৃটিশ-ভারত নামেই বাইরে থেকে একে এককাট্টা ভারত মনে হয়। কিন্তু আসলে তা অসংখ্য রেসিয়াল বৈশিষ্ঠের জনগোষ্ঠির ভারত। এছাড়া বৃটিশ্বরা এই ভারতকে শাসন করে গেছে আলাদা আলাদা প্রশাসনিক পদ্ধতিতে। ফলে ভারত বলতে বিভিন্ন ধরণের জনগোষ্ঠির ভিন্নতাগুলো আবার যেমন তেমন না। যেমন ভারতে এখনও ২৯টা রাজ্য। মানে অন্তত ২৯ রকমের বড় বড় বিভক্তি এখানে আছে। এরকম আর কত কত ধরণের আইডেনটিটিতে এখনও বিভক্ত হয়ে আছে ভারতের নাগরিকেরা।  এই ভিন্নতাগুলো সত্বেও তাদের একটা রাষ্ট্রে ধরে রাখার উপায় কী? এই ছিল নেহেরুর কাছে মুখ্য প্রশ্ন। সে  কোন বন্ধন, যা দিয়ে তাদের আটকে এক রাষ্ট্রে ধরে রাখা যায়?

এই কঠিন জটিলতার সবচেয়ে সহজ জবাব নেহেরু খুজে নিয়েছিলেন যেটা তা হল “হিন্দুত্ব”। মানে হিন্দুত্ব হল সেই আঠা বা গ্লু [glue] যার ভিত্তিতে নাগরিকেরা জোটে বেধে একতায় তাদের এক থাকার উপায়। সেই থেকে নব গঠিত ভারত হিন্দুত্ব হল নাগরিক ঐক্যে এভাবে গড়ে উঠেছে।বলাই বাহুল্য এটাই ছিল উপমহাদেশের সবচেয়ে একক ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্ত, the biggest disasterous decision.

প্রশ্নটা আসলে অরিজিনালি ছিল মর্ডান রিপাবলিক রাষ্ট্র গঠন করার ক্ষেত্রে এক মৌলিক বুঝাবুঝির বা বলা যায় বুঝাবুঝিতে ঘাটতি থাকলে সেই অভাব থেকে উত্থিত এবং বিপথগামী প্রশ্ন। যেমন রাষ্ট্র গঠন করতে গেলে বা করার কালে আদৌ এমন ভিত্তি খুজে ফেরা  জরুরি কিনা? সরাসরি উত্তর হল যে – একেবারেই না। কিন্তু তবু নেহেরুর এই বিপথগামী পথই ধরেছিলেন। এবং মনে রাখতে হবে এটা ১৯৪৭ সালের আগষ্টের পরে উদয় হওয়া প্রশ্ন নয়। এটা এর আগের পুরা উনিশ শতক (১৮১৫-১৮৯৯) এই সারাটা সময় চিন্তার বিপথগামী গমণ বজায় ছিল।  সেদিকে একটু পরে আবার আসছি।

নেহেরুর কাছে ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু উপযুক্ত হতে পারে না – এটাই ছিল তাঁর চোখে সদুত্তর। তাই ভারত-রাষ্ট্রের গঠন ভিত্তি হয়ে যায় হিন্দুত্ব। এ কারণেই আবার কোনো কিছুকে অ-হিন্দুত্ব মনে হলে তাকে চাপিয়ে, মারজিনাল করে রাখার অবস্থান নেন তারা। হিন্দুত্বকে এক নতুন মানের দিকে সরিয়ে দেয়ারও চেষ্টা করা হয়। তা হল, হিন্দুত্ব একটা কালচার বা সিভিলাইজেশনের নাম ইত্যাদি বলে হিন্দুত্ব শব্দের দগদগে ধর্মীয় দিকটি আবছা করার চেষ্টাও দেখা যায়। আবার হিন্দুত্ব শুনতে ভালো লাগে না বলে একে ‘সেকুলারিজমের জামা’ পরিয়ে আড়ালে ঢেকে রাখার চেষ্টা হয়ে থাকে সব সময়। এরই প্রতিভূ বা সব বৈশিষ্ট-চিহ্ন নিজেই হাজির হয় রাজনৈতিক দল ‘কংগ্রেস’।

কিন্তু এই প্রচেষ্টাকে আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি ভারতের জন্মকাল থেকে কখনোই মানেনি, বরং প্রকাশ্যে তর্ক তুলেছে। প্রকাশ্যেই সরাসরি হিন্দুত্বের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে দাবি তুলছে, হিন্দুত্বকে আঁকড়ে ধরে এরই আধিপত্য চেয়েছে এবং প্রকাশ্যে সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে। অভিযোগ এনেছে কংগ্রেসিরা মুসলমান-তোষামোদকারী হওয়ার কারণে দেশ ভাগ হয়ে পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই অভিযোগে আরএসএসের নাথুরাম গডসে ১৯৪৮ সালে কংগ্রেস নেতা গান্ধীকে খুন করেছে। দক্ষিণ ভারতের কমল হাসানকে অনেকে চিনে থাকতে পারেন যারা ভারতীয় সিনেমার খবর রাখেন। তিনি সিনেমার খ্যত নায়ক। তিনি সম্প্রতি রাজনীতিতে এসেছেন। কিন্তু নাথুরাম সম্পর্কে মন্তব্য করে তিনি মামলা খেয়েছেন। পরে মাদ্রাজ হাইকোর্টে জামিন চেয়ে যে যুক্তি দিয়েছেন সেখানে তিনি দাবি করে বলেছেন,  “Godse himself, in his book Why I killed Gandhi, had categorically stated that Mahatma Gandhi had acted against the interest of Hindus, and had blamed him for partition, Mr. Haasan said.”। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, কংগ্রেস-বিজপি দুপক্ষই ইস্যুটা কার্পেটের নিচে ফেলে চেপে যেতে চান। আরএসএস তাদের আভ্যন্তরীণ ডকুমেন্ট বা কর্মিসভায় নাথুরামকে হিন্দুত্বের রাজনীতিতে তাদের হিরো বলে তুলে ধরে। যদিও বাইরে খুব বেশি এই ভাবনা প্রচারে আনতে চায় না। আর যে মোদী যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী তখন তিনি নাথুরাম তর্কে ঢুকতেই চান না।

যে যাই হোক, ১৯৭৭ সাল থেকে কংগ্রেস দলের দুর্বল হওয়া শুরু হতে থাকে। ১৯৮৯ সালে এসে ক্ষমতায় ‘কংগ্রেস কোয়ালিশন’ গড়ার ট্রেন্ড শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে প্রথম পূর্ণ পাঁচ বছরের বিজেপি সরকারই কায়েম হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই আবার প্রকাশ্যে হিন্দুত্বের স্পষ্ট বয়ান, ব্যাখ্যা ও দাবি নিয়ে বা বাবরি মসজিদ ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে মাঠে হাজির হয়েছিলেন আরএসএস-বিজেপির নেতা একালের নেতা এলকে আদভানি। এবার নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পরের দিন সকালে মোদি-অমিত আদভানির বাসায় গিয়ে সেকালে হিন্দুত্বের বয়ান ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হওয়ার কারণে আদভানিকে [… providing a fresh ideological narrative to the people,” ] বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছেন। আসলে মোদীর শাসনের দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে এসে তিনি প্রমাণ করলেন, সবচেয়ে সফলভাবে হিন্দুত্বকে নির্বাচনে মুখ্য রাজনৈতিক ইস্যু করা সম্ভব, নির্বাচনে জেতাও সম্ভব।

কেন কেবল হিন্দুত্বকে ভরসা করে মোদী নির্বাচনে নেমেছিলেন?  ছোট্ট করে এনিয়ে কিছু কথা বলে রাখা যাক। বিগত ২০১৪ সালের নির্বাচনের সাথে আমরা তুলনা করলে বুঝব, ২০১৪ সালে মোদীর মুখ্য (catchy) ইস্যু ছিল মূলত “অর্থনৈতিক”। অথচ এবার অর্থনৈতিক শব্দটাই তিনি কোথাও উচ্চারণই করেন নাই। গ্লোবাল অর্থনীতিতে “রাইজিং ইকোনমির” দেশ বলে এক নতুন টার্মের ব্যবহার শুরু হয়েছিল চলতি শতকের প্রথম দশক (২০০১-০৯) থেকে। যেখান থেকে ব্রিকস (BRICS) ব্যাংকের ধারণা উঠে এসেছে। তো “রাইজিং অর্থনীতির” ইন্ডিয়া এর একটা। মোদীর আগের কংগ্রেস (২০০৪-১৪) সরকারের দ্বিতীয় টার্মে মাঝপথে (২০১১) এসে এর অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েছিল। মানুষের আশাআকাঙ্খাও চরমভাবে ভাঙতে শুরু করেছিল। সেদিকটা খেয়াল করে মোদী ২০১৪ সালের নির্বাচনে, ডুবে যাওয়া ঐ অর্থনৈতিক ইস্যু সেটাকেই আবার উস্কে চাঙ্গা করে তুলে ধরে দাবি করেছিলেন তিনি এটা আবার তুলে সচল করতে পারবেন, কারণ গুজরাটের অর্থনৈতিক সাফল্যের তিনবারের মুখমন্ত্রী তিনি। তিনি তখনও থার্ড টার্মের মুখ্যমন্ত্রী। তাই সেই খাতিরে যেন তাঁকে ২০১৪ নির্বাচনে ভোট দেয়া হয়। এর সাথে হিন্দুত্ব ইস্যুও ছিল কিন্তু তা সেকেন্ডারি। কিন্তু এবার? তিনি জানেন এবার অর্থনৈতিক সাফল্য তাঁর নাই, ডিমনিটাইজেশন আর জিএসটি [demonitization & GST]  ইস্যুতে তার কপাল খুলে নাই, তা যতই ভাল প্রোগ্রাম হোক বা না হোক। ডিমনিটাইজেশন মানে নোট বাতিল আর জিএসটি মানে ভারতের এক রাজ্যের পণ্য আর রাজ্যে ঢুকলে টাক্স আরোপ করা হয়, এসব পাল্টাপাল্টি ট্যাক্সকে উঠিয়ে নেয়া, সরল নিয়ম করা আর আদায়কৃত ট্যাক্স শেয়ার করার ফর্মুলা চালু – এককথায় বিশেষ করে পরেরটা খুবই ভাল কাজ কিন্তু বাস্তবায়ন কঠিন, প্রথম তিন বছরের সাফারিং এর কারণে নগদ অর্থনীতিক পারফরমেন্সের বিচারে তিনি ফেল করেছেন। সুনির্দিষ্ট করে বললে, কাজ সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাতে তিনি একেবারেই ফেল করেছেন।

কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপুর্ণ দিকটা হল, মোদীই ভারতের এক ব্যতিক্রমি রাজনীতিবিদ। সেটা এই অর্থে যে তিনি নিজের দল এবং বিশেষ করে নিজ সরকার চালানোর ক্ষেত্রে আমরা দেখতে অভ্যস্ত যেটা যে, দলীয় নেতাকর্মিদের নিয়ে একটা দল -অর্থনীতিবিদ, রাজনীতি বা প্রশাসন বিষয়ক একাদেমিক যারা দলের খাতায় নাম লেখানো – এমন  এদেরকে নিয়ে গঠিত কোন টিমের পরামর্শের দিয়ে সরকার চলছে। না মোদী এসব এমেচার করতে রাজী না।  বরং তিনি তা করে থাকেন ও ভরসা করেন তা হল প্রফেশনাল ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং কোম্পানী নিয়োগ দিয়ে। যারা গবেষণাও করে থাকেন। মোদী-অমিতের বিশেষ “রাজনৈতিক ব্রান্ড” এটাই। এজন্য তারা বিজেপির মত দল করলেও খুবই স্মার্ট। এমনকি নির্বাচনও তিনি করেন এমন কোম্পানীকে পরামর্শক রেখে। এই জায়গায় মোদীর বিজেপিকে ধর্মতাত্বিক নেতা বা মফস্বলী কোন নেতা জ্ঞান করা খুবই ভুল হবে ও খাটো করে দেখা হবে।

আর সেই কন্সাল্টেন্টদের পরামর্শেই এবার তিনি একক – কেবল “হিন্দুত্ব” ইস্যুতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেখালেন। তবে এটা অবশ্যই গুরুত্বপুর্ণ যেটা উপরে বলেছি যে, এটা সম্ভব হল কারণ ভিত্তি হিসাবে ভারত-রাষ্ট্র হিন্দুত্বের ভিত্তিতে গঠিত। কিন্তু যে উত্তর এখনও অমীমাংসিত তা হল – বিভিন্ন আত্ম-পরিচয় বা বৈশিষ্টের মানুষ একটা রাষ্ট্রে কেন কিসের ভিত্তিতে জড়ো হয়ে থাকে, কী তাদের এক জায়গায় ধরে রাখে – আটকে ধরে রাখার কোন আঠা বা গ্লু যেমন একটা হিন্দুত্ব – এর প্রয়োজন আদৌও কী অনিবার্য, এসেনসিয়াল? না কী অপ্রয়োজনীয় এবং বিকল্প আছে?  এছাড়া কবে থেকে ভারতের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিষয়টাকে “এসেনশিয়াল” মানে হিন্দুত্বকে এসেনশিয়াল বলে বুঝে এসেছেন, সেটাও খুজে দেখা ও লক্ষ্য করা খুবই জরুরি।

এই প্রশ্নটা ভারতে তো বটেই,উপমহাদেশেই মীমাংসিত নয়, তাই স্পষ্ট উত্তর নাই। এবং এক ভারতের কারণেই উপমহাদেশের সবখানেই এটা অমীমাংসিত ও সব অসন্তোষের উতস এটা।

আধুনিকতা আইডিয়ার প্রথম ও প্রাথমিক রূপ বৈশিষ্ট হল “রেনেসাঁ” [Renaissance] চিন্তা। ইউরোপের এই রেনেসাঁকে ভারতে বিশেষ করে সেকালের বৃটিশ-ভারতের রাজধানী, বাংলায় নিয়ে এসেছিল বৃটিশ-শাসকেরা। রাজা রামমোহন রায়কে বাংলায় রেনেসাঁর আদিগুরু মনে করে থাকেন সকল রেনেসাঁবাদীরা। তার সক্রিয়তার প্রধান সময়কালটা হল (১৮১৫-৩৩)। তিনিই প্রথম এবং তিনিও রেনেসাঁ চিন্তার পিছনে পুরা ভারতজুড়ে একটাই ধর্ম, একটা “হিন্দুত্ব” থাকা জরুরি মনে করতেন। তিনিই একেশ্বরবাদী ব্রাক্ষ্ম ধর্ম-এর প্রবর্তক যা আসলে একটু রিফর্মড হিন্দুত্বই – এক হিন্দু নাশনালিজম। তবে তাঁর মৃত্যুর পরবর্তি সময়গুলোতে এটার কার্যকারিতার অভাব নিয়ে প্রশ্ন মুখ্য হয়ে উঠেছিল। ফলে পরবর্তিতে বঙ্কিমচন্দ্র, অরবিন্দ ঘোষ, বিবেকানন্দের ইত্যাদি্র মত কিছু ব্যক্তিত্বের হাত ঘুরে আরও রিফর্মড হয়ে উনিশ শতকের শেষের দিকে তা কংগ্রেস দলের জন্মের সময় (১৮৮৫) থেকেই এর  হাতে পৌছাতে শুরু করেছিল। আরও পরে এটাই বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) রদ করা ও পরবর্তিতে তথাকথিত স্বদেশী আন্দোলন – এসবের মূলমন্ত্র ও প্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল। আর সবশেষে দেশভাগের পরে নেহেরুর হাতে সেই একই “হিন্দুত্ব” কিন্তু এবার নতুন প্রয়োজনে – এরই ব্যবহার হয় রাষ্ট্র গঠনে। আর  সেই থেকে আগে কংগ্রেসের উত্থানের পর থেকেই পুরা সময়ে  হিন্দুত্ব চিন্তার কারণেই আমাদের উপমহাদেশে সমস্ত বিভক্তির উতস এখানেই। এটাকে একটা অন্ধের হাতড়ানোও বলতে পারি! কারণ লক্ষ্যণীয় বিষয় হল যে, ভারত যদি একটা মর্ডান রিপাবলিকই হতে চেয়েছিল বা চেয়ে থেকে থাকে তবে তার আবার “হিন্দুত্ব” এর, হিন্দু নাশনালিজমের দরকার কেন? কিভাবে তা হয়? এর জবাব কংগ্রেস বা আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি কখনো দেয় নাই, দিবে না – খুঁজবে না। অথচ অনিবার্য এসেনশিয়াল মনে করে রাখবে।  এতেই তারা এর সাহায্যে অন্যান্য ধর্মীয় জনগোষ্ঠির উপরে আধিপত্য কায়েম করতে পারার সুবিধার দিকটা মুখ্য – এই সুবিধার দিকটাই তাদের জন্য সব চেয়ে লোভণীয় ছিল বলে। যদিও মর্ডান রিপাবলিক বলতে একে ধর্মীয় নাশনালিজম বলে মানে করা – এই সুবিধাবাদি ভুল বুঝার ঝোঁক ইউরোপেও ছিল।

সবচেয়ে বড় তামাশার দিকটা হল, হবু  “মর্ডান রিপাবলিক” ভারত বলতে একে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম বলে বুঝা ও মানে দেওয়া কিন্তু একে “ভারতীয় জাতীয়তাবাদ” বা “স্বদেশি আন্দোলন” বলে নাম দেয়া আর ওদিকে এভাবে এর আসল পরিচয় হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম লুকিয়ে রাখা ফেলা হয়েছে। শুধু তাই না। এর প্রভাব এখানেই শেষ না। এভাবে হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম এর রাজনীতি করা এটাই মুসলমানদের জবরদস্তি ঠেলে দেয়া হয়েছে যেন তাঁরাও ইসলামি নাশনালিজমই করে – মুসলিম লীগ করে আবির্ভুত হয়। আর এইবার সেই কঠিন তামাশাটা! এই মুসলমান আর মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ লটকে দেয় যে এরা ধর্মীয় রাজনীতি করে, এরা সাম্প্রদায়িক, এরা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ চায় ইত্যাদি। ফ্যাক্টস হল, হিন্দুরা যদি হিন্দু নাশনালিজমের রাস্তা ধরে  তাহলে এরপর মুসলমানেরা যাই করবে তা এক ইসলামি নাশনালিজমই তো হবেই!

অতএব সেই হিন্দুত্ব বা হিন্দু নাশনালিজম – এটাই একালে মোদীর হাতে স্বরূপে হাজির হতে চাইছে।
এমন কী মোদীর গত পাঁচ বছরে গরু নিয়ে সামাজিক বিভাজন তো বটেই যেভাবে সংগঠিতভাবে  সামাজিক আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছিল,  “মুসলমানকে ধরে জয় শ্রীরাম বলাতে হবে” এর নৈরাজ্য তৈরি করা হয়েছে, [এই মাত্র দ্য হিন্দু পত্রিকার খবর এটা এবারও শুরু হয়র গেছে – মুসলমান তরুণ দর্জি বাসায় ফিরছিল, তাঁকে ঘিরে ধরে বলা হয়েছে, মাথার টুপি খুলে ফেলতে, এরপর জবরদস্তিতে জয় শ্রীরাম বলতে বলে পিটানো হয়েছে।] গরু ব্যবসায়ীকে পাবলিক লিঞ্চিং করা হয়েছে বিজেপি-আরএসএসের নামে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নামে তারা নাজেহাল “সামাজিক ন্যুইসেন্স” তৈরি করতে নেমে পড়েছে। ফ্রিজে গরুর মাংস রেখেছে এই অভিযোগে বাসায় ঢুকে একইভাবে বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরা ঐ মুসলমান গৃহস্থকে খুন করেছে। আর প্রধানমন্ত্রী মোদী এসব নৈরাজ্য চলতে দিয়েছেন। মুসলমানদেরকে নিয়ে এই চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ এরপরেও ভারত রিপাবলিক থাকে কেমন করে? কেঁউ মাথা ঘামায় নাই। কংগ্রেসের নেতাকর্মি অথবা কোন কমিউনিস্ট এনিয়ে প্রশ্ন করার মুরোদ আছে দেখি নাই আমরা।  মর্ডান রিপাবলিকের অর্থ তাতপর্য তারা নুন্যতম কিছু বুঝে অথবা চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণ হচ্ছে এটা – এই বুঝ থেকে তারা কখনও মোদী সরকারের বিরুদ্ধে আঙুল তুলতে পারে নাই। এটাই একটা বিরাট প্রমাণ যে ভারত আসলেই এবং বরাবরই একটা হিন্দুত্বের রাষ্ট্র। এর বাইরে রাষ্ট্র কী, অন্য কোন রাষ্ট্রের রূপ কী – এনিয়ে ভারতের কংগ্রেস, কমিউনিস্ট বা কোন প্রগতিবাদীদের কোন বুঝ, কোন স্টাডি কোন বুঝাপড়া কিচ্চু নাই।

এই কথার আরও প্রমাণ পেতে চাইলে  আরও লক্ষ্যণীয় হল, যেমন এখনকার কংগ্রেস বা এর সভাপতি রাহুল গান্ধী – এদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করার মত। মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে কোথাও কংগ্রেস নুন্যতম অন্তত প্রতীকী প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া দেখাবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না। কংগ্রেসে তা না হয়ে, আমরা দেখছি বরং কংগ্রেস নিজেই তথাকথিত সেকুলারিজমের জামাখুলে প্রকাশ্যেই নিজেও হিন্দুত্ববাদী হয়ে গেছে। আবার দাবিও করছে এটা নাকি মোদীর মত হার্ড হিন্দুত্ববাদ না,”সফট হিন্দুত্ববাদ”। এই দাড়িয়েছে এখন কংগ্রেসের ‘সেকুলারিজম’। অর্থাৎ  তথাকথিত সেকুলারিস্ট কংগ্রেস এখন আর হিন্দুত্বকে ঠেকাতে চাওয়া ছেড়ে সরাসরি মোদীর হিন্দুত্বের ভাগ চাইতে নেমেছে। ওদিকে কলকাতার কমিউনিস্টরা এই নির্বাচনে তারাও সব আসন হারিয়েছে শুধু তাই না, নিজেদের ভাগের ২২% ভোট কমিয়ে সেটাও দিয়ে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদের নির্বাচনে, মোদীর দলকে। তাতে ব্যাপারটা এখন দাড়িয়েছে এই যে, হিন্দুত্ববাদ ঠেকানোর বোলচালের দলগুলাকে মোদী এবার তাদেরকে আসল চেহারায় এনে ছেড়েছে, এটাই আসলের মোদীর ক্ষমতার আসল সাফল্য!

আবার লক্ষ্য করা যাক, এই নির্বাচন প্রচারণা বন্ধ হয়ে হলে, পরদিন (২০ মে) মোদী হিন্দু তীর্থস্থান উত্তরপ্রদেশের পাহাড়ে প্রাচীন কেদারনাথের মন্দির গিয়ে ধ্যান করার শো-অফ করতে বসে গেলে তা দেখে কংগ্রেসীদের জবাব হল আমাদের রাহুল তো সেখানে কেদারনাথের মন্দিরে পায়ে হেঁটে গেছিলেন আর মোদী গেছেন বিশেষ হেলিকপ্টারে, কাজেই আমরা শ্রেষ্ট।  আসলে এইখানেই মোদীর হিন্দুত্ব অনেক আগেই বিজয় লাভ করে গেছে। তাই ভোটের ফলাফলে না, মোদী আসলে এখানেই বহু আগেই কংগ্রেস, সিপিএমদের হারিয়ে দিয়েছেন।

হিন্দুত্ব কত ভারী এর লক্ষ্যণীয় ও উল্লেখযোগ্য অসংখ্য ঘটনায় ভরা ছিল এই নির্বাচন। মোদীর হিন্দুত্ব কত পাওয়ারফুল,বাকি সব ইস্যুকে চাপা দিয়ে, পিছনে ফেলে নিজে সবার উপরে উঠে যেতে পারে এরই প্রাণ এগুলো।

যেমন, সবপর্বের নির্বাচনই শেষ হয়েছিল ১৯ মে। এদিন সন্ধ্যায় মোদী-অমিত সাংবাদিক সম্মেলনে জানিয়েছিলেন তাদের জোট ৩০০ এর আশেপাশের আসনে বিজয়ী হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বাস্তব ফলাফল বিজেপির অনুমানকেও ভালমত ছাড়িয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ শুরু বিরোধীদেরই সব অনুমান ফেল করেছে তা নয়, খোদ বিজেপির অনুমানও কাজ করে নাই, এটা এমনই ফলাফল।

আবার, সাধারণত রাজ্য সরকারে (যেমন রাজস্থানে কংগ্রেস ) কোন দল সরকারে আছে এটা লোকসভা নির্বাচনের সময় একটা ফ্যাক্টর হয়ে থাকে, রাজ্যে ক্ষমতাসীন দল  সাধারণত আসন বেশি পেয়ে থাকে, প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কিন্তু এই নির্বাচনে দুই-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া কোথায় এমন ফ্যক্টর এবার কাজ করে নাই। এমনকি যেখানে গত মাত্র পাঁচ মাসে আগে রাজ্য সরকারের নির্বাচনে কংগ্রেস বা কোন বিজেপি বিরোধী দল জিতেছে সেখানেও মাত্র পাঁচ মাস পরেই এবার বিজেপি আবার ফিরে ঐ রাজ্যের প্রায় সব (বা একটা বাদে) লোকসভা আসনে জিতেছে। এই অবস্থা দেখা গিয়েছে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্রিশগড় বা কর্ণাটক এমন রাজ্যে। এসব রাজ্যের ২০১৮ সালের বিভিন্ন সময় রাজ্য নির্বাচনে বিজেপিবিরোধী রাজ্য সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। খুব ব্যতিক্রমি পরিস্থিতি ছাড়া ভারতের লোকসভা নির্বাচনের সময় এমন দেখা যায় না। অথচ বিজেপি এবার এমন হিন্দুত্বের জোয়ার তুলেই জিতেছে।

আবার,নর্থ-ইষ্ট মানে আসাম-ত্রিপুরাসহ ছোট ছোট ট্রাইবাল সাত রাজ্য। আসামে এনআরসি [National Register of Citizens (NRC) ] অথবা নাগরিকত্ব প্রমাণের আইন চালু করার পর সর্বশেষ চল্লিশ লাখ হিন্দু-মুসলমান লোক নানান কারণে নাগরিকত্ব প্রমাণ জোগাড় করতে ফেল করেছে। এদের অনেকেই এখন ক্যাম্পে কাতরাচ্ছে। গতবছর জুড়ে এর বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। কারণ নাগরিকত্ব বিল পাশ হয়েছিল। মিজোরামে “বাই বাই ইন্ডিয়া” বলে প্লাকার্ড হাতে মিছিল হতে দেখেছিলাম আমরা। কিন্তু কয়েক মাস পর চলতি হিন্দুত্বের নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে এজাতীয় সব “কথিত নাগরিক আপত্তি” হাওয়া হয়ে গেছে। বিজেপি সাত রাজ্যেই বেশিরভাগ আসন নিয়েছে, কোন রাজ্যে সবগুলোই।

আবার, কলকাতার মানে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের মুখ্যমন্ত্রী মমতা প্রচন্ড রকমভাবে চ্যালেঞ্জড হয়েছেন। এই প্রথম তাঁর তৃণমুল দলের লোকসভার ৩৪ আসন এবার নেমে হয়ে গেছে মাত্র ২২টা। আর বিজেপি দুইটা থেকে এক লাফে ১৮ আসন  পেয়ে গেছে। তৃণমুল বা মমতা রাজনীতি ও তাঁর সরকারের অনেক দোষ বা অভিযোগ থাকতে পারে, অনেকের অপছন্দ থাকতে পারে। কিন্তু পশ্চিমবাংলা ও নর্থ-ইস্ট জোনে মোদীর হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রধান বাধা এখনো এই মমতাই। বিশেষ করে বিজেপির এনআরসি বা নাগরিকত্বের হুজুগ তুলে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বলে ইসলামবিদ্বেষ জাগানো ও দাঙ্গা বাধানোর রাজনীতি করে বিভিন্ন রাজ্যে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করার বিরুদ্ধে। কাজেই বিজেপিকে আরও সফল হতে গেলে মোদীর প্রথম কাজ হবে সবার আগে মমতাকে সরানোর ব্যবস্থা করা – তা বলাই বাহুল্য।

ফলাফল প্রকাশের দিন, নিজের বিজয় নিশ্চিতের পর ২৩ মে সন্ধ্যায় মোদী এক পাবলিক মিটিং করেছেন। এখনও করছেন। কিন্তু এসব জায়গায় সেখানে তিনি আগে নির্বাচনি প্রচারের সময়ে কত কী বলেছেন ঘৃণা ছড়িয়েছেন সব ভুলে এমনকি হিন্দুত্বের রাজনীতি ভুলে যাওয়ার ভান ধরে নির্বাচনের পরে এখন “তিনি সবার নেতা” বলে দাবি করেছেন। তিনি নিজেই  গত ২০১৪ নির্বাচনে তার শ্লোগান ছিল “সবকা বিকাশ সবকা সাথ” – সেই শ্লোগান ওদিন তিনি এবারের নির্বাচন শেষ হবার পরে প্রথম এবার উচ্চারণ করলেন। এবার নির্বাচনের পর ভোল পাল্টায়ে তিনি নিজেই “সংখ্যালঘুদের” সহানুভুতি নিয়ে হাজির হয়েছেন, বলছেন”He said if his first term was about “Sabka sath, sabka vikas (Alongside all, development for all)”, his second would stand for “Sabka sath, sabka vikas, sabka vishwas (Alongside all, development for all, trust of all)”।  এই নির্বাচনি বিজয়ে পুরা সময় তিনি কাটিয়েছেন পাকিস্তানের বালাকোটে কথিত বিমান হামলার সাফল্য গাথা দিয়ে। “পাকিস্তান” = “মুসলমানের” বিরুদ্ধে তিনিই একমাত্র “ভারত-রক্ষক” – এই ছিল তার বয়ানের পাঞ্চ লাইন। আর দ্যা হিন্দু পত্রিকা তাদের নির্বাচন উত্তর গবেষণার ভিত্তিতে বলছে এই বক্তব্যের প্রভাব এমন ছিল যে এক্সিট পোলে অংশ নেয়া মানুষ  বলেছে অর্থনীতি মোদীর ঘাটতি আছে, সাফল্য নাই কিন্তু তবুও তারা মনে করে বালাকোট ইস্যুটাও গুরুত্বপুর্ণ – তাই মোদীকে ভোট দিয়েছেন। দা হিন্দু Balakot plank বলে উপশিরোনামে বলছে, বালাকোটকে ইস্যু করে মোদী রাজস্থান, গুজরাট, মধ্যপ্রদেশ, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ আর উত্তরাখন্ডের সব আসনের দখল পেয়েছে [all seats in Rajasthan, Gujarat, Madhya Pradesh, Haryana, Himachal Pradesh and Uttarakhand.]

আমাদের মনে রাখতে হবে, একথাটাও সঠিক যে বিজেপির হিন্দুত্বের রাজনীতির মুখ্য টার্গেট – প্রধান উদ্দেশ্য পাবলিক বা ভোটার মেরুকরণ করে সব হিন্দু ভোট কাউকে শেয়ার না দিয়ে নিজের বাক্সে আনা। সে হিসাবে অনেকে এখন সুশীল হয়ে বলছে  নির্বাচনের সময় “মোদী একটু হিন্দুত্বের নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে। কিন্তু এখন সে এসব ছেড়ে সব ঠিক হয়ে যাবে, ভাল হয়ে যাবে” ভাবতে পারেন, একথা বলেছেনও। ইতোমধ্যে অনেকের মধ্যেই এই মনোভাব দেখেছি। যেমন কলকাতার টেলিগ্রাফ লিখছে Narendra Modi tried to shake off his divisive image and reach out to the minorities on Saturday। এছাড়া মানুষ আসলে ক্ষমতা বা শক্তের ভক্ত হয় তাড়াতাড়ি, একথাও ঠিক। কিন্তু একটা জিনিষ এখনই সবাই নিশ্চিত হয়ে থাকতে পারে। তা হল – হিন্দুত্বের রাজনীতিকে মোদীর পক্ষে আর সামনে আগিয়ে না নিয়ে; থেমে যাওয়া বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি রাজনীতিতে – এটা আর সম্ভব নয়।

অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির “আগানোর” প্রধান কর্মসুচী হতে যাচ্ছে এনআরসি; মানে আসামের মত “নাগরিকত্বের তালিকা তৈরি” করার দাবি তুলবে তারা। ইতোমধ্যেই দিল্লিতে এনিয়ে কাজ শুরু হয়ে গেছে বলে অনেকে দাবি করছে। কিন্তু তাতে কী হতে পারে?

কলকাতায় যদি আসামের মত এনআরসি-ততপরতা শুরু করতে পারে, আর তাতে কোন হিন্দু নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হলে তাকে মোদী সরকার নতুন করে নাগরিকত্ব দিবার ব্যবস্থা নিবে। আর মুসলমান হলে তাকে নাজেহালে শেষ করা হবে। মুসলমানদের বেলায় কথিত পুশব্যাক যদি নাও হয় অন্তত ক্যাম্পে নিয়ে ফেলে রাখবে। কপাল ভাল থাকলে তাকে আগের ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদায় পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দিতেও পারে। আবার কখন কোন দাঙ্গার খোরাক বানিয়ে নিজেদের ক্ষমতায় যাবার সিড়ি বানিয়ে ফেলবে, কে জানে! এতদিন এককথায় গরীবী হালে হলেও মানুষ যতটুকু সুস্থ জীবনে ছিল সেসব ছিনে এখন  সকলের জীবনে এক প্রবল অশান্তি হাজির করবে।

ওদিকে লক্ষ্যণীয় আর এক বিষয় হল, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ভারতের বাংলায় নতুন করে এনআরসি-ততপরতা বা বাংলাদেশি হিন্দুদের নাগরিকত্ব দিয়ে ডেকে আনার রাজনীতিটা ঠিক পছন্দ করছে, তাদের অস্বস্তির ইঙ্গিত দিচ্ছে। হতে পারে এটা কাজ বেড়ে যাবে অনেক, অথবা অজানা বহু অভিমুখ গতিমুখ তৈরি হয়ে যাবে তা কোথায় গিয়ে না ঠেকে সে আশঙ্কায়, হতে পারে। অথবা হতে পারে ভান করা। যাতে এর প্রতিক্রিয়া কোথায় কোন পর্যায়ে হচ্ছে আগামিও হতে পারে তা জেনেবুঝে নেওয়ার সুযোগ নেয়ার কারণ। সারকথা তারা স্বস্তিদায়ক ঘটনা হিসাবে দেখছে না।

(ত্রিপুরাসহ) নর্থ-ইস্ট আর পশ্চিম বাংলা মিলে এই জোনে মোট লোকসভা আসন প্রায় ৬৫ টা। এখানে মোদীর টার্গেট হবে [উত্তর প্রদেশের মত এটা আশিটা না হলেও] এই ৬৫ আসন এটার গুরুত্ব কম হবে না – এগুলো বিজেপির পক্ষে হাসিল করা। এক এনআরসি ইস্যু দিয়েই স্থায়ীভাবেই এই আসন গুলো নিজের পক্ষে নিশ্চিত করা মোদীর আশু লক্ষ্য।

মতুয়াঃ
বাংলাদেশে ট্রাইবাল বলতে পাহাড়ি বা সাঁওতালদের মত বিক্ষিপ্ত নানান পকেট আছে এগুলাই। এছাড়া সমতলিদের মধ্যে কোন ট্রাইবাল জনগোষ্ঠি  এখনও টিকে বা বজায় থাকার কথা এখন আর জানা যায় না। বুঝা যায় তারা বিভিন্ন মানুষ মিলেমিশে এখন একই সমা্জে অন্তর্ভুক্ত হয়ে তা গড়ে পুরান ট্রাইবাল পরিচয়্টা ঘুটা দিয়ে গুলিয়ে দিয়েছে। তবু আমাদের গোপালগঞ্জের জেলার “মতুয়া” বলে এক হিন্দু জনগোষ্ঠির কথা জানা যায়। বাংলাপিডিয়া “মতুয়া”দের কথা বলছে। বলেছে, “গোপালগঞ্জ জেলার ওড়াকান্দি নিবাসী  হরিচাঁদ ঠাকুর প্রেমভক্তিরূপ সাধনধারা” বলে এদের চিনিয়েছে। বলেছে ,“গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দিতে মতুয়াদের প্রধান মন্দির অবস্থিত”। এই জনগোষ্ঠিরই প্রধান বা বড় অংশ কালক্রমে পশ্চিমবঙ্গের বণগাঁও মহুকমাতে সদলে মাইগ্রেটেড হয়ে গিয়েছে।

গুরুভিত্তিক এই জনগোষ্ঠি বর্তমানে এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। আগের দীর্ঘদিনের এমপি ছিল মমতা ঠাকুর। সে তৃণমুল দলের এমপি ছিল, কিন্তু সে এবার হেরে গেছে। আর সে জায়গায় বিজেপির টিকিটে শান্তনু ঠাকুর জিতেছেন [তৃণমূল থেকে মুখ ফেরাল মতুয়া, বনগাঁয় জয়ী শান্তনু]। এই দুই প্রার্থীই যদিও মুল গুরু মৃত হরিচাঁদ ঠাকুরেরই বংশধর। কিন্তু কেন মুখ ফেরাল? আনন্দবাজার লিখেছে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এসে এখানে সভা করে গেছেন। “মোদীজি ঠাকুরনগরের সভায় এসে বলে গিয়েছিলেন, যেসব হিন্দু বাংলাদেশ থেকে এ দেশে এসেছেন, তাঁদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে”। আর সেই থেকে এতে হিন্দুদের মধ্যে একটা উথালপাতাল শুরু হয়েছে। পুরা ব্যাপারটাই ইঙ্গিত দেয় যে মোদী এনআরসি আন্দোলন নিয়ে কিভাবে আগাতে চাইছেন। শোনা যাচ্ছে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরাও একারণেই এবার দুহাত তুলে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। মতুয়াদের নড়াচড়াটা হিন্দুদের অবস্থা বুঝার জন্য প্রতীকী।

আসামের এনআরসি ততপরতা শুরু করার সময় মোদী সরকার বাংলাদেশকে নাকি আশ্বস্ত করেছিল। বলেছিল এটা “ভারতের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” হয়ে থাকবে। আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাক্ষ্য দিয়ে সেকথার অনুরণন করে বিবিসিকে বলছেন, “নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাইয়ের কাজটিকে ভারতের ‘অভ্যন্তরীণ বিষয়’ বলে বর্ণনা করেন মি: মোমেন”। কিন্তু তাঁর পরচুলার মতই একথাও আসলে নকল, কোন ভরসা নাই। অন্তত নির্বাচন পরবর্তি নড়াচড়াগুলা তাই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সবচেয়ে বিরক্তিকর হল তার কথায়, “বিষয়টি নিয়ে এখনো বাংলাদেশের চিন্তার কোন কারণ নেই” । আচ্ছা মোদীর মুখপাত্র হয়ে তাঁর এই সাফাই দেয়াটা কেন প্রয়োজনীয়? কিছু না বলে “দেখছি” বলে থাকা যেত না?  সত্যি অদ্ভুত!

কিন্তু আর একটা দিক যখন আগে ভারত “আভ্যন্তরীণ ব্যাপার” বলেছিল তখন “বাংলাদেশি হিন্দুরা ভারতে গেলে নাগরিকত্ব দেয়া হবে” এমন কোন আইন বা ইস্যু ছিল না। এখন আছে। রাজ্যসভায় পাস না হওয়া, পেশ না করা এই আইন এখন আছে। যা এখন নড়াচড়া করে উঠবে, সচল হবে অনুমান করা যায়। এটা নিয়ে বাংলাদেশেও একটা ব্যাপক প্রভাব পড়বে অনুমান করা যায়। তবে দুই তরফে। এক, একদল হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি ততপরতা শুরু হলে সেখানে গিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারে। আবার এই ততপরতা যদি শুরু হয় আর তাতে সেখানকার মুসলমানেরা কোন খারাপ আচরণ বা দুর্দশার মুখোমুখি হলে এর খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে, তা বলাই বাহুল্য। তারা খুবই ক্ষুব্ধ হবে অনুমান করতে পারি। তাই পুরা বিষয়টা নিয়ে মোদী সরকার ঠিক কী কী করতে চায় তা জানা আমাদের সরকারের জন্য খুবই জরুরি। আর তাতে বাংলাদেশে কী কী প্রভাব পড়তে পারে এর একটা এসেসমেন্ট করে বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে আগেই এতে আমাদের উদ্বেগগুলো কোথায় এবং কী কী তা নিয়ে কথা বলা, সম্ভাব্য স্বার্থবিঘ্ন কী হতে পারে তা নিয়ে আপত্তি উদ্বেগ জানানো ও ততপর হওয়া জরুরি। আমাদের সকলেরই সুস্থ শরীর ব্যস্ত হয়ে উঠার, অস্থির হয়ে উঠার দিন কী সামনে! সত্যি কী ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য কে জানে! আমরা সবাই কী বলি হয়ে যাব এই হিন্দুত্বের রাজনীতিতে!

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে গত  ২৫ মে ২০১৯ দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইনে (প্রিন্টে পরের দিন)হিন্দুত্বের রাজনীতির বলি! এই শিরোনামে ছাপা হয়েছিল। পরবর্তিতে সে লেখাটাই এখানে আরও নতুন তথ্যসহ বহু আপডেট করা হয়েছে। ফলে সেটা নতুন করে সংযোজিত ও এডিটেড এক সম্পুর্ণ নতুন ভার্সান হিসাবে এখানে ছাপা হল। ]