বাংলাদেশে ‘ভারতের সমর্থনের সরকারও’ কাজ করছে না

বাংলাদেশে ভারতের সমর্থনের সরকারও কাজ করছে না

গৌতম দাস

১৮ এপ্রিল ২০১৭, মঙ্গলবার

http://wp.me/p1sCvy-2eC

 

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর শেষ হবার পর সপ্তাহ পার হতে চলছে। এই সফরকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনা এখন শেষ হয়েছে ধরে নেয়া যায়। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনকেই সবচেয়ে বড় সমালোচনার আসর ছিল বলা যায়। যেকোনো রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহীর সফরকে কেন্দ্র করে শীর্ষ সম্মেলনের আবহাওয়ায় নিজ নিজ স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়কে ঘিরে সাধারণত প্রচুর জল্পনাকল্পনা হয়ে থাকে। আর তাতে উত্থাপিত বিভিন্ন ইস্যুর সম্ভাব্য অর্থ তাৎপর্য কী তা নিয়ে মিডিয়ায় বিভিন্ন বয়ান ব্যাখ্যা শুরু হওয়া সাধারণ ঘটনা। কিন্তু শেখ হাসিনার সফরকে ঘিরে সেসব বিবেচনায় যত আলাপ-আলোচনা উঠে থাকুক না কেন তা যথেষ্ট ছিল না। যেমন তিস্তার পানি ইস্যুতে আমরা মিডিয়াতে বিস্তর আলোচনা হতে দেখছি যে – কেন পানি দিচ্ছে না, কী সমস্যা, কী হলে দিতে পারে, কবে দিতে পারে, আদৌ দিবে কি না, অথবা কী হলে সমস্যার হাল হতে পারে ইত্যাদি প্রায় সব কিছুই আলোচনায় উঠে এসেছে। এরপরও নির্দ্বিধায় বলা যায় তবু মূল একটা বিষয় কোথাও আসেনি। কী সেটা? না, শেখ হাসিনা সরকারকে ক্ষমতায় থাকতে সবচেয়ে বড় সমর্থন জুগিয়ে চলেছে ভারত, বলা যায় এই সমর্থন সরকারকে টিকিয়ে রেখেছে। বাস্তবতা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে কম বেশি সব পক্ষই তা স্বীকার করেন। “ভারতের সমর্থনের সরকার” – ভারতের দিক থেকে দেখলে এটাই কী সবচেয়ে বড় কিছু দিয়ে দেয়া নয়? তাহলে এরপরে আরও কিছু কেন দিবার কথা ভাববে?
ব্ব্র

ব্যাপারটা ভারতের দিক থেকে দেখলে, এই সমর্থনকে তারা এক বিরাট দান বলে গণ্য করে। ভারতের এই দানের অনুভব এটা কেউ আমল করেনি। আর এই দান তারা বাংলাদেশকে দিলো, নাকি তাদের পছন্দের ব্যক্তি বা দলকে দিলো সবই তাদের কাছে সমান। কিছু আসে যায় না। যদিও এর ফারাক বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিশাল হয়ত। কিন্তু ভারত গণ্য করবে দুই ক্ষেত্রেই তারা বাংলাদেশকে বিশাল কিছু দিয়েছে। আর ঠিক সে কারণেই আমরা আর যা কিছু ভারত থেকে আশা করছি তা তাদের চোখে বিবেচনায় আরো অতিরিক্ত, বাড়তি। এ কারণেই সব সময়ই ভারতের মনে প্রশ্ন উঠে কোনো বাড়তি বা অতিরিক্তগুলো সে আর কেন দেবে? বিনা নির্বাচনে একটা সরকার বসিয়ে দেয়া বা তাতে ভারতের সমর্থন দেয়া – এর একটা বড় রকমের মূল্য যে আছে সেটা ভারতকে বুঝিয়ে বলার কিছু নাই। ভারত এটা না বুঝার কথা নয়।

হাসিনার ভারত সফরকে নিয়ে বিস্তর দিকে আলোচনা উঠেছে কিন্তু ভারতের এই দৃষ্টিকোণটা সব আলোচনাতেই অনুপস্থিত। অথচ এটাই ভারতের মুখ্য দৃষ্টিভঙ্গি।
তিস্তায় বা অন্য কোনো যৌথ নদীর বেলায় পানি, এটা তো বাড়তি; এই পানি ভারত কেন দিবে? অথবা ট্রানজিটের মূল্য কেন দেবে, বিনা পয়সায় পোর্ট ব্যবহার করতে পারবে না কেন, সীমান্তে লোক মারা বন্ধ করা ইত্যাদি। আগেই তো সরকারে সমর্থন দিয়ে রেখেছে! এক কথায় বললে সমর্থন দিয়ে সরকার ক্ষমতায় রাখার মূল্য এতই অমূল্য বা তা সীমাহীন হওয়ারই কথা। ফলে সেই অমূল্যদানের পরে এরপর আবার বাংলাদেশের আর কোনো মূল্য চাওয়ার আছে এটা তারা গণ্য করতে রাজি না হওয়ারই কথা। সরকার বসিয়ে দেওয়ার পর সেই সরকারের আর কতটা বারগেন-দড়কষাকষির অবস্থা অবশিষ্ট থাকে! বাকী সব ডিমান্ড সেকেন্ডারী গুরুত্বের হয়ে যায়।
তিস্তার কথাই ধরা যাক, সবশেষ ২০১১ সালে মনমোহনের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তা ইস্যু প্রসঙ্গ সবচেয়ে জীবন্ত ছিল। ভারত তখ্নও পানি দিতে পারেনি বা চায়নি। কেবল নাম-কা ওয়াস্তে একটা চুক্তি করে রাখতে চেয়েছিল। বড় জোর যেমন গঙ্গাপানি চুক্তি। চুক্তির সাথে বাস্তবে পানি প্রাপ্যতার সম্পর্কিত নয়। সেবার তিস্তার বেলায় সেটাও হয় নাই।  এরপর থেকে ২০১৪ সালের নির্বাচনে হাসিনার দিক থেকে ভারতের সমর্থন পাওয়া স্বভাবতই এতই গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক ছিল যে ওই নির্বাচনের দুই বছর আগে এবং পরে নির্বাচনের একই  সাথে তিস্তা প্রসঙ্গ তোলা হত অসামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই তোলার বিষয়টা গুরুত্ওব যোগাড় করতে পারে নাই। নির্বাচনে সমর্থন পাওয়া ব্যাপারটা যতই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে অন্য যেকোনো ইস্যু তুলনায় ততই গুরুত্বহীন হবে, তোলা হবে না এটাই তো স্বাভাবিক; বাংলাদেশ ততই ‘লেস ডিমান্ডিং’ হবে। বাংলাদেশের এই দুর্বলতার দিকটা ভারতীয় কূটনীতিকদের টের না পাওয়ার কোনো কারণ নেই। তাই ঠিক এর পাল্লা দিয়ে যেন ভারতের অবস্থা হয়েছে তাদের স্তবার্তথের ইস্যুতে  ‘এন্ডলেস ডিমান্ডিং’।
সরকারে রাখার সমর্থনের ‘বিনিময় মূল্যও’ দাবি হয়ে পড়েছে অফুরন্ত। আবার ২০১৭ সালের হাসিনার ভারত সফর, এখানেও তিস্তা গত ছয় বছরের মতোই কোনো ইস্যু ছিল না, হতে পারেনি। কারণ এবার হাসিনার কাছে এর চেয়ে অনেক অনেক উঁচু প্রায়োরিটির একনম্বর ইস্যু ছিল ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’। অর্থাৎ ডিফেন্স প্যাক্ট না করে আপাতত শুধু একটা এমওইউর মধ্যে তা সীমাবদ্ধ রেখে যদি ফিরতে পারেন, এটাই হবে তাঁর বিরাট অর্জন। রাষ্ট্রদূত মোয়াজ্জেম আলী একবার স্পষ্ট এই ভাষাতেই কথাটা বলে ফেলেছিলেন।

ভারতের সাথে চীনের বিভিন্ন স্বার্থবিরোধ আছে, থাকাই স্বাভাবিক। সব রাষ্ট্রের সাথেই যেমন সবার থাকে। আর মূলত যে কারণে প্রত্যেকে আলাদা আলাদা রাষ্ট্র বলে নিজেকে গণ্য রাখে, টিকিয়ে রাখে মিলে যায় না। যেকোনো বড় দুই ঘনিষ্ঠ রাষ্ট্রেরও স্ট্র্যাটেজিক ইন্টারেস্ট আলাদাই হয়, সঙ্ঘাতমুখর হতে পারে। আবার সব রাষ্ট্র একই কূটনৈতিক পথে নিজের স্বার্থবিরোধ নিয়ে লড়ে আর, আদায় ও মোকাবেলা করে না। নানান কায়দা সেখানে থাকে, নরম-গরম, গিভ অ্যান্ড টেক, কোনো ইস্যুতে নরম হলেও আবার একই সময়ে আর এক ইস্যুতে গরম ইত্যাদি সব কিছুর মিশাল, এটাই এই শতকের কূটনীতির বৈশিষ্ট্য। কিন্তু শুধু এই স্বাভাবিক বিষয়টাই ভারত-বাংলাদেশ এখানে কার্যকর নয়। কিছু সীমিত কার্যকর দিক থাকলেও তা মুখ্য নয়।  এখানে ব্যতিক্রম বা বাড়তি বিষয়টা হল, ভারতের এই দৃষ্টিভঙ্গি যে, ‘বাংলাদেশ’ সেটা তো আমাদেরই সরকার। তাই ভারতের দাবি ও আকাঙ্খা হল, তাহলে চীন-ভারত স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থ যেসব জায়গায় সঙ্ঘাতপূর্ণ সেখানে বাংলাদেশ মানে হাসিনা সরকার নিজের সব কিছু ভুলে ভারতের স্বার্থে অবস্থান নেবে না কেন?  বাংলাদেশে যেকোন অবকাঠামো প্রজেক্ট থেকে চীনকে বাংলাদেশ দূরে রাখুক – এটা ভারতের কাম্য।  ভারতের সব ডিম্যান্ডের-আর্গুমেন্ট, দৃষ্টিভঙ্গি এবং আকাঙ্খা এখান থেকেই। এটাকে বলা যায় হাসিনা ভারতের ‘দাবির জবরদস্তির’ ভেতর পড়ে গেছে। কারণ ভারত এমন পেতে পেতে এভাবে নিতে ও পেতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কেন এমন হলো?
একটা উদাহরণ নেয়া যাক। ডিপ সি পোর্ট বা গভীর সমুদ্রবন্দর। কক্সবাজারের  সোনাদিয়ায় টেকনিক্যাল স্টাডি করে লোকেশন পছন্দ করা, ফিজিবিলিটি ভায়াবিলিটি নিরীক্ষা সব শেষ হওয়ার পরও ২০০৯ সালে এই সরকার আসার পর ঐ প্রজেক্ট ঠেলতে ঠেলতে এখন সোনাদিয়া একেবারেই বাদ করে দেয়া হয়েছে। আবার ভারত এর বদলে পোর্ট অন্য কোথাও  কিছুই না করার পক্ষে ছিল। কিন্তু শেষে ‘পায়রায়’ বিকল্প বন্দর পছন্দ করেছে। যেন এটা খামখিয়ালের বিষয়। আর তবুও এই প্রজেক্টে ভারতকে অযাচিত অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অযাচিত এই অর্থে যে অর্থনৈতিক মুরোদ না থাকা সত্ত্বেও ভারতকে ছোট অনুসঙ্গী করে প্রজেক্টে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। তবু প্রজেক্টে মূল পোর্ট গড়ার কাজ চীনকে দিতেই হয়েছে। কারণ অন্য কারও কোন অর্থ বিনিয়োগের সংস্থান মুরোদ নেই, কেবল ভারতের ইচ্ছাকে জায়গা দেয়া এটা বাংলাদেশ দিতে চাইলেও তো দিতে পারা সম্ভব নয়, সম্ভব নয়। মূল প্রশ্ন বিনিয়োগ কে দেবে? আর এই মারাত্মক কাণ্ড ঘটানো হয়েছে। পিপিপি বা ব্যক্তি উদ্যোগ ঢুকানো হয়েছে। অবকাঠামো প্রকল্প আর বাণিজ্যিক প্রকল্পের ফারাক আর বজায় রাখা হয়নি। যেন যমুনা সেতু নামমাত্র সুদের অবকাঠামো প্রকল্প হিসেবে করে বাংলাদেশ ভুল করেছে। এতে ট্রাকপিছু এর টোল এখনো এক হাজার টাকা। এর বদলে ওই সেতু যদি (২-৬% সুদের) বাণিজ্যিক প্রকল্প অথবা পিপিপি করতাম তাহলে টোল পড়ত ট্রাকপিছু তিন হাজার টাকা, এটাই ভালো হত। তাই কী? এমন এক বেলজিয়াম কোম্পানিকে ঢুকানো হয়েছে মূল চ্যানেল খননের কাজে। আর পুরো প্রজেক্টটাই জি-টু-জি তে চীনকে। যার সোজা অর্থ বাংলাদেশ থেকে টেন্ডার আহ্বান উঠে গেছে। যদিও এখনো বিনা সিক্রি টকশোতে বলে বেড়াচ্ছেন মূল প্রজেক্ট নাকি চীনকে না, ডাচদেরকে দেয়া হয়েছে।
আচ্ছা সোনাদিয়ায় ভারতের আপত্তির মূল বক্তব্য কী? ভারতের বক্তব্যকে কোনো যুক্তি হিসেবে মেনে নেয়া মুশকিল। ভারতের একটা সুপ্ত স্বপ্ন-আকাঙ্খা আছে, তা হলো চীন বাংলাদেশে কিছুই করতে পারবে না। মুরোদের খবরহীন ফালতু এসব স্বপ্ন নিয়ে কথা বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। ওবামার আমেরিকার একটা লক্ষ্য ছিল চীন ঠেকানো; চায়না কনটেইনমেন্ট। বুশ ও ওবামার আমেরিকা এটা ভারতকে সামনে রেখে ভারতকে দিয়ে যতদূর সম্ভব করাতে চাইত। ট্রাম্পের আমলেও ‘চীন ঠেকানো’ এখনও ট্রাম্পের আমেরিকার এজেন্ডা কিনা এখনও আমরা এর রিনিউয়াল কিছুই শুনিনি। কিন্তু ভারত তার পুরনো অবস্থানেই আছে, ‘চীন নাকি ভারতকে মুক্তমালার মতো ঘিরে ফেলল’, আমেরিকার এই শিখানো বুলি সে কপচে চলছে।
সোনাদিয়া গভীর সমুদ্র বন্দর একটা বাণিজ্যিক প্রজেক্ট। কোনো ডিপ সি পোর্ট প্রজেক্ট যেটা নাকি আসলে ছুপা  স্ট্র্যাটেজিক বা সামরিক প্রজেক্ট হয়েছে বা হতে পারে এটা শোনা যায়নি। এর কারণ মূল প্রজেক্টটাই কমপক্ষে চার বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক বিনিয়োগের। আর বাংলাদেশের অর্থনীতি একমাত্র এটা বাণিজ্যিক হলেই এই বিনিয়োগ ঋণের বোঝার দায় নিতে সে সক্ষম। কারণ স্ট্র্যাটেজিক বা সামরিক প্রজেক্ট হলে ওর বাণিজ্যিক রিটার্ন নেই। সারকথায় বাংলাদেশের কাছে অবকাঠামো প্রজেক্ট মানেই তা অবশ্যই বাণিজ্যিক  প্রজেক্ট হতে হবে। নইলে ঋণ শোধ করতে পারবে না। তাই  নিঃসন্দেহে সোনাদিয়া আসলেই ছিল এক বাণিজ্যিক প্রজেক্ট এবং বাংলাদেশকেও নিজে থেকেই যেটা নিশ্চিত করতে হবে –  চীনের সাথে কথা বলতে হতে পারে যে এটা মাত্র বাণিজ্যিক প্রজেক্টই হবে। এ জন্য যে এই বন্দর ব্যবহার করে চীনের সাউথ-ইস্ট, ভারতের নর্থ-ইস্ট এবং বার্মা সবাই মূলত নিজের নিজের ল্যান্ডলকড অঞ্চল বা এলাকাগুলোকে সমুদ্র যোগাযোগের আওতায় নাগালে আনবে। এটাই সবার মুখ্য আর বার্ণিং স্বার্থ। ফলে এর যেন শুধু বাণিজ্যিক ব্যবহার নিশ্চিত হয় এটা বাংলাদেশ নিজেই দায়িত্ব ও লিড নিয়ে সম্ভব করে তুলতে পারে ও চায়। ভারত এটাই বাংলাদেশের কাছে আশা করতে পারত। আর চীনের এতে আপত্তিরও কোনো কারণ থাকত না। নিজের ল্যান্ডলকড দশা ছুটানোটাই চীনের বিরাট ও মূল স্বার্থ। বাংলাদেশের গভীর স্বার্থ হল, এটা যদি ব্যবহারকারীদের সব পক্ষকে আস্থায় নিয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থ শক্তভাবে রক্ষা করা যায় তবে সবার ব্যবহারে ব্যবহারকারী বেশি হওয়ায় পোর্টের বিনিয়োগ খরচ তুলে আনা সহজ ও দ্রুত সম্ভব। কিন্তু ভারত সে পথে না গিয়ে আমাদের সরকারের ওপর আবদারের চাপ তৈরি করে সোনাদিয়া বন্ধ করে দিল। যদিও অন্য কোন ডিপ সি পোর্ট না করার পক্ষে থেকে চুপ থাকতে পারেনি। সরকারের ওপর চাপ দিয়ে পায়রাতে রাজি করিয়েছে। কিন্তু কেন? এতে ভারতের কী লাভ হয়েছে? একমাত্র ঈর্ষা হাসিল করা ছাড়া? আচ্ছা চীনের অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং এর সাথে পাল্লা দিয়ে রাজনৈতিক সামরিক প্রভাবও বাড়বেই। সেটাকে   ঠেকানো – ভারতের এই চিন্তা বড় জোর এক খড়কুটো নয় কী? আর এটা কি সেই পথ?  আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ভারতের সেই মুরোদ কৈ? আর বাংলাদেশ সেটা ভারতের ইচ্ছায় কেন ঠেকাবে? বাংলাদেশের কী লাভ হয়েছে এতে? ভারতেরই যেখানে মুরোদ নাই সেখানে বাংলাদেশের মুরোদ কোথায়? উলটা বাংলাদেশের বৈষয়িক সুবিধা আছে এখানে।  হাসিনা সরকারকে কেন, ভারতের যেকোনো বসানো সরকারকে তারা নিজের ব্যক্তিগত গোলাম বানিয়ে রেখেও তো বাংলাদেশের কোনো ডিপ সি পোর্টের চাহিদা ঠেকানো সম্ভব নয়। এটা অবজেকটিভিটি, এক বাস্তবতা।
কিন্তু পায়রাতে সরিয়ে নেওয়াতে এখন ফলাফল কী হয়েছে? ভারতকে বাংলাদেশে চীনের সংশ্লিষ্টতাতেই একটা ডিপ সি পোর্ট তৈরি মানতেই হয়েছে। কিন্তু লোকেশন বদলে ভারতের কী লাভ হয়েছে? আমাদের অর্জন কী? সর্বশেষটা শোনা যাক। পায়রায় লোকেশন পছন্দ-পরিকল্পনার ভিতরে শুরু থেকেই ড্রাফটের সমস্যা ছিলই। ড্রাফট মানে গভীরতা বা নাব্যতার সমস্যা ছিল। তাই শুরু থেকেই নাব্প্রযতা ধরে রাখতে প্রবেশমুখ ও আশপাশের ১০-১৫ কিমি নিয়মিত ড্রেজিং করে যাওয়ার পরিকল্পনা রাখা হয়েছিল।  এটাই সে পরিকল্পনাতে ত্রুটির  প্রমাণ। এরপরেও এর ড্রাফট সোনাদিয়ার সমপর্যায়ের লেভেলে পৌঁছাবে না, সমান হবে না এটা সবাই জানত। এখন সেই দায়ভার আগেই ঝেড়ে ফেলতে অর্থমন্ত্রী মুহিত বলে বসেছেন, ‘পায়রা বন্দরের স্থান নির্বাচন সঠিক হয় নাই’, গত ১০ এপ্রিলের দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের বরাতে আমরা এ কথা জানছি। এখন একনম্বর প্রশ্ন হল, তাহলে সোনাদিয়া বাদ দেয়া আর পায়রায় নতুন স্থান নির্বাচন  কিসের ভিত্তিতে করা হয়েছিল? বাণিজ্যিক ঋণ নিয়ে বড় অবকাঠামো প্রজেক্টে এসব খামখেয়ালিপনা করা হচ্ছে কেন? আমরা চাইলেই কি ভারতের খামখেয়ালি আপত্তি বা ঈর্ষা আমল করতে পারব? করা উচিত হচ্ছে? এর অর্থনৈতিক দায় কে নিবে?

ভারত সফরের একমাস আগে থেকে আমরা দেখলাম ভারত চলতি সরকারের বদলে অন্য কাউকে সরকারে রাখার কথা ভাবতে পারে এই সন্দেহ হাসিনার সরকারে হাজির হয়েছে। আবার ভারতেরও সন্দেহ হয়েছে চীনের স্ট্র্যাটেজিক স্বার্থের পক্ষে ‘তাদের সমর্থিত সরকার” সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সম্ভবত তাদের পক্ষে থাকছে না!
এসব মিলিয়ে এটা আজ পরিষ্কার ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ বাংলাদেশে এটা কোনো কাজের না, ফাংশনাল না, কাজ করছে না। এটা কার্যকর থাকছে না, থাকবে না। আমরা চাইলেই ভারতের খুশিতে খামখেয়ালিভাবে পায়রায় বন্দর করতে পারছি না। সম্ভব নয়।

ওদিকে ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ কথাটারই আর এক অর্থ হল, এর প্রভাবে বাংলাদেশে এখন নির্বাচন আয়োজন ঠিকঠাক মত করা না করার সাথে ক্ষমতার কোনোই সম্পর্ক নেই। নির্বাচনের বাইরে পাশ কাটিয়ে ক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব। এটাই আজকের হাসিনার সরকারের রীতি। কিন্তু তা ওয়ার্কেবল কী? হাসিনার সব মিলিয়ে আট বছর অভিজ্ঞতা বলছে না যে তা খুব সুখকর কিছু। এর চেয়ে বড় বিষয় ইতোমধ্যেই হাসিনা নিজেকে ভালনারেবল বা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছেন। জনগণের সাথে থেকে মোকাবেলা, সাথে নিয়ে থাকা, নির্বাচন ইত্যাদি সবকিছু থেকে দূরে চলে গিয়েছে দল এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। ফলে অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত ক্ষমতার বিকল্প যে ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ কোনো মতেই নয় এটা বোঝার মতো কানে পানি যাওয়ার কথা। ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’ হাসিনার জন্য আরো রিস্কি ও অনিশ্চিত এক পথ, এই বাস্তবতা ক্রমে বাইরে আসা স্পষ্ট হওয়া শুরু হয়েছে। হাসিনা কি সাহসের সাথে নিজের সে অনুভব পক্ষে কাজ করতে পারবেন? কারণ সেটা হাসিনা পারেন আর নাই পারেন এটা প্রমাণিত যে ‘আমরা চাইলেই ভারতের খামখেয়ালি আপত্তি বা ঈর্ষা আমল করতে পারব না।
হাসিনার ভারত সফর-উত্তর সংবাদ সম্মেলনে, “ভারতে গিয়ে আরো পাঁচ বছরের দাসখত দিয়ে আসলেন কিনা, অথবা আরো পাঁচ বছরের ক্ষমতা নিশ্চিত করে আসলেন কিনা” , এমন প্রশ্ন উঠেছিল। সাংবাদিকদের এমন প্রশ্ন হাসিঠাট্টা করে প্রধানমন্ত্রী জবাব দিয়েছেন। এটা কিন্তু তেমন ঠাট্টার বিষয় নয়। গত ২০০১ সালে বিএনপি ভারতের কাছে দেশ বেচছিল সেকারণে ২০০৯ অথবা ২০১৪ তে আওয়ামী লীগের বেচাটা জায়েজ বা ভালো। এটা গ্রহণ করার মতো বয়ান বক্তব্য নয়। বাংলাদেশ অথবা এর কোনো রাজনীতিকের ভবিষ্যৎও ঐ বয়ানে নেই। এই কথা তাই কাউকে ভালো লাগার মতো কথা নয়। ফলে আমরা যত ‘ভারতের সমর্থনের সরকার’  এরপরেও চেষ্টাই করতে দেখি না কেন, জনভিত্তি গড়া ও জনসমর্থন ধরে রাখা-মুখী রাজনীতি ও সরকার আবার ফিরে আসবেই। অচিরেই ফিরবে, অভিমুখ সেটাই। আমাদের কী সাহস হবে অভিমুখ চিনে সাড়া দিবার!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে ১৬ এপ্রিল ২০১৭ দৈনিক নয়াদিগন্ত অনলাইন পত্রিকায় (প্রিন্ট পত্রিকায় পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। ১৮ এপ্রিল অনলাইন দুরবীন ম্যাগাজিনেও ছাওয়া হয়েছে।  সে লেখাটাই পরবর্তিতে আরও সংযোজন ও এডিট করে নতুন ভার্সান হিসাবে আজ এখানে ছাপা হল।]

Advertisements

“দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য এই বাগাড়ম্বরার” ভিতরে কীসের ডিফেন্স প্যাক্ট

“দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য এই বাগাড়ম্বরার” ভিতরে কীসের ডিফেন্স প্যাক্ট

গৌতম দাস

০৪ মার্চ ২০১৭

http://wp.me/p1sCvy-2eb

 

দিল্লির নাকি আঞ্চলিক আধিপত্য  ছিল অথবা আছে কিংবা কায়েম করতে হবে – এধনের অনুমানের উপর অনেকেই কথা বলেন দেখা যায়। শিরোনামের “দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য” কথাটা আমার না। ভারতীয় শাখার থিঙ্কটাঙ্ক প্রতিষ্ঠান ‘কর্ণেগি ইন্ডিয়ার’ ডিরেক্টর সি রাজামোহনের থেকে ধার নেয়া। দিল্লি নাকি এতদিন তাঁর কথা শুনে নাই। তাই  হতাশ হয়ে তিনি বলছেন এটা বাগড়ম্বরা; “……দিল্লির বাগাড়ম্বর দূর করতে বেইজিংয়ের তেমন একটা বেগ পেতে হবে না”।  এখন “দিল্লির আঞ্চলিক আধিপত্য” তো  বাগড়ম্বরাই তাহলে আর আমাদের সরকারের উপর ভারতের ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ এর চাপাচাপি  – এটা তো আসলে ফালতু কথাবার্তা। হাসিনার আবার “নির্বাচিত” হবার ঠেকা আছে বলে তাকে অপব্যবহার করার সুযোগ নেয়া নয় কী? আসলে কুঁজা লোকেরও চিত হয়ে শোয়ার শখ হয়!

‘সাবমেরিন কেনা’ শব্দটা আমাদের মিডিয়ায় হারিয়ে আস্তে আস্তে যত পেছনে চলে যাচ্ছে, ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ ব্যাপারটা ততই ভাসুরের নাম নেয়ার মতো আকার-ইঙ্গিত থেকে এবার স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। এই বিচারে গত পয়লা এপ্রিল ছিল ভারতের সাথে ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’-এর পক্ষে বড় ও প্রকাশ্য উচ্চারণের দিন। সংবাদ সংস্থা বাসস জানাচ্ছে, সেদিন ‘ইনস্টিটিউট অব কনফ্লিক্ট ল অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (আইক্ল্যাডস) আয়োজনে রাজধানীতে লেকশোর হোটেলে এক গোলটেবিল বৈঠক হয়েছে। সেখানে আলোচনার শুরুতে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন এর নির্বাহী পরিচালক মেজর জেনারেল অব: মো: আবদুর রশীদ। আগ্রহীরা মো:আবদুর রশীদ এর পুরা লেখাটা পেতে পারেন, দৈনিক সমকাল পত্রিকাতে, সেখানে পুরা লেখাটাই উনার নিজের নামে ছাপা হয়েছে। (দেখুন, ‘বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক: প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা’)। লেকশোর হোটেলের ঐ গোলটেবিল বৈঠক এটাকে মূলত সরকারের পক্ষের পেশাজীবীদের সমর্থন সমাবেশ বলা যেতে পারে। সেখানে মো: আবদুর রশীদ স্পষ্ট করেই বলেছেন, “প্রতিরক্ষা সহযোগিতার অবয়ব আমরা জানি না এখনো”। অর্থাৎ ‘ডিফেন্স প্যাক্টে’ ভারত কী প্রস্তাব করেছে তা অনেকের মতো তারও জানা নেই। ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ কথাটা ভারতের মিডিয়া থেকে নিয়ে এখানে ব্যবহার করা হয়েছে। ওই ধারণাপত্রে সারকথা হলো তিনি শর্তসাপেক্ষে ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ স্বাক্ষর করার পক্ষে। তিনি বলছেন, “সার্বিক বিবেচনায় বাংলাদেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা খর্বের শর্ত না থাকলে এবং সামরিক জোটের ক্ষেত্র বাদ দিয়ে সামরিক সহযোগিতা হতে কোনো বাধা নেই। রাজনৈতিকভাবে বন্ধুকে সামরিকভাবে বৈরী ভাবার কোনো যুক্তি নেই”। যার সোজা অর্থ, ‘নিজ সার্বভৌমত্ব খর্ব’ করা যাবে না আর, ভারতের সাথে কোনো ‘সামরিক জোটে’ ঢুকে পড়া যাবে না। কিন্তু কি হলে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন বা খর্ব হবে এর ব্যাখ্যা কে দিবে। হয়ত একটা ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ হয়ে যাবার পরেও মেজর জেনারেল অব: মো: আবদুর রশীদ এর কাছে মনে হতে পারে যে সেটাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন হয় নাই। দ্বিতীয়ত  বিএসএফ গুলি করে সীমান্তে বাংলাদেশীদের নির্বিচারে হত্যা চলে । সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জনগণের নিজেদের জাতীয় প্রতিরক্ষা বা গণপ্রতিরক্ষার সুনির্দিষ্ট নীতি দাঁড় না করালে বিমূর্ত ভাবে ভারতের সঙ্গে ‘সামরিক সহযোগিতা’ কথাটা কোন অর্থ বহন করে না। সেটা কি সহযোগিতা নাকি দাসত্বের দাসখৎ তা আমরা ফাঁপা কথাবার্তা দিয়ে বুঝব না।

সামরিক সহযোগিতা নিয়ে ফিসফিসানি থেকে শুরু করে লেকশোর হোটেলের গোলটেবিল আলোচনা দেখে এখন স্পষ্ট করে বলা যায় যে, বাংলাদেশকে ভারতের দেয়া ‘কথিত’ সামরিক চুক্তি প্রস্তাব নিয়ে চোরাগোপ্তা আলোচনাটা চার মাসের শেষে আর আড়ালে আবডালে রইল না। তবে প্রথম কিঞ্চিত একে প্রকাশ্য দেখতে পাওয়া শুরু হয়েছিল ভারতের বরাতে আমাদের মিডিয়ায় বাংলা ট্রিবিউনে গত বছর ডিসেম্বরের ১ তারিখে। দেখুন, “সশস্ত্র বাহিনীর জন্য ভারতের নতুন প্রস্তাব”। আর এরপর গত ১০ ডিসেম্বর আনন্দবাজার লিখেছিল, “দিল্লিতে নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন হাসিনা। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী মনোহর গোপালকৃষ্ণ প্রভু পর্রীকর ১৯ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে ১ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সফর করেছেন”।  আগ্রহিরা এবিষয়ের আরও দেখতে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসও দেখতে পারেন (এখানে দেখুন, Bangladesh keen to forge expanded military ties with India)।  ভারতের আনন্দবাজার ৯ ডিসেম্বর রিপোর্ট করেছিল, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ডিফেন্স প্যাক্ট করতে যাবার সফর পিছিয়ে গেল।  (দেখুন, ‘পিছিয়ে গেল সফর, ফেব্রুয়ারি নাগাদ আসতে পারেন হাসিনা’)।

তবু ,এমনকি গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ভারতের পররাষ্ট্রসচিব জয়শঙ্করের ঢাকা সফরের পরেও, আমাদের মিডিয়া প্রতিরক্ষা চুক্তি বা ডিফেন্স প্যাক্টনিয়ে কোনো রিপোর্ট ছেপেছে বলে দেখা যায়নি। ফলে ভারতের কথিত ডিফেন্স প্যাক্ট’-এ কী আছে তা আমরা কেউই জানি না। তবে ভারতীয় মিডিয়ার বক্তব্য নিয়ে একধরনের কানাঘুষা উঠছিল। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রকে ব্যাশিং নিয়ে। সেটা অবশ্য প্রত্যক্ষভাবে ডিফেন্স প্যাক্টে কী আছে তা নিয়ে নয়। কিন্তু গত এক সপ্তাহে আমরা দুটো গোলটেবিল হতে দেখলাম। প্রথমটা ২৮ মার্চ প্রথম আলোর আয়োজনে ( দেখুন, ‘ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও ঘাটতি আস্থায়‘); আর পরেরটা এ লেখায় আগেই উল্লিখিত হয়েছে (যুগান্তরের রিপোর্ট দেখতে পারেন, ‘ভারত বিরোধিতা রাজনৈতিক কৌশল, ২ এপ্রিল ২০১৭) ‘। এতে একটা লাভ হয়েছে যে ডিফেন্স প্যাক্টনিয়ে ভারতের প্রস্তাব যে আছে, আমাদের মিডিয়ায় তার স্বীকৃতি মিলল। সরকারের সম্ভবত দ্বিধা ছিল বিষয়টা নিয়ে খোলা আলাপ হলে তা কোথায় গড়ায় তা নিয়ে। কিন্তু তাতে বাংলাদেশে ভারতের বাংলাদেশ নীতিরযারা সমর্থক তারাও সমস্যায় ভুগছিলেন। কারণ সরকারের পক্ষে তারা চুক্তির সমর্থনে নামুন, তাতে ভারতীয় হাইকমিশন সম্ভবত নিজের স্বার্থ দেখলেও কিছু করা যাচ্ছিল না। ফলে লেকশোর হোটেলের এই গোলটেবিলকে তাদেরই উদ্যোগ হিসাবে দেখা যায়। 

ওদিকে প্রথম আলোর ২৮ মার্চের গোলটেবিলের আগে গত ১৩ মার্চ দৈনিক প্রথম আলোর মিজানুর রহমান খানের কলামটা ছিল উল্টা অবস্থানের।  (দেখুন,  ‘প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর, তিস্তা চুক্তি ও আত্মজিজ্ঞাসা’)।  মিজানুর রহমান, তিনি ‘পাকিস্তানি মাইন্ডসেট’ বলে সব নষ্টের গোড়া এক শত্রু হাজির করেছিলেন।  অর্থাৎ মিজান প্রচ্ছন্নে ডিফেন্স প্যাক্টের পক্ষে যুক্তি সাজাচ্ছিলেন। একই কথা লেকশোর হোটেলের গোলটেবিলে আলাপেও দেখা গিয়েছিল শাহরিয়ার কবিরের বক্তব্যে; এটা মূলত ভারতীয় কূটনীতির কৌশলগত বয়ান। যাই হোক মিজানের ‘পাকিস্তানি মাইন্ডসেট’ বয়ানের পরে ২৮ মার্চ এবার প্রথম আলোর গোলটেবিলে বসে দেখতে পেয়েছে, ‘ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কটা সাম্প্রতিক ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে ঘনিষ্ঠ পর্যায়ে গেছে। তার পরও দুই নিকট প্রতিবেশীর সম্পর্কে আস্থার সঙ্কট লক্ষ করা যায়’। বাংলাদেশে  ‘ভারতের বাংলাদেশ নীতি’র কোনো সমর্থক যখন দিল্লি-ঢাকার ‘পারস্পরিক আস্থার সঙ্কট’ দেখতে পান, তখন এটা তাৎপর্যপূর্ণ মানতেই হয়। প্রথম আলোর গোলটেবিলের সার মূল্যায়ন হলো, ‘ডিফেন্স প্যাক্ট’ অপ্রয়োজনীয়। ওপরে প্রথম আলোর রেফারেন্সেই দেখুন, নিজেই লিখেছে এভাবে: “কোন প্রেক্ষাপটে, কী প্রয়োজনে প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সহযোগিতার রূপরেখা হচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে”।

এরপরেও যেটা দুঃসংবাদ হয়ে এখনো রয়ে গেছে তা হলো, যেটাকে শুধু ডিফেন্স প্যাক্টবলে এক বোঝাবুঝির মধ্যে রাখছি তা পুরো ইস্যুটার খুবই ক্ষুদ্র অংশ। মুল ইস্যুটা অনেক ব্যাপক।  পুরা ইস্যুটা আসলে কেবল বাংলাদেশ তো নয়ই, সাথে ভারতকে নিয়েও নয়; রিজিওনাল! হা, আঞ্চলিক তো বটেই, বরং আরো কিছু। এমনকি আগামীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা ভারত সমর্থন করবে কি না এতটুকুতেও সীমিত নয়।

বাংলাদেশে কে ক্ষমতায় থাকবে ভারতের কেবল এতটুকুর নির্ণায়ক হওয়াতে তা আগামি আর যথেষ্ট হচ্ছে না। এত দিন তো ভারত নির্ণায়ক হয়েই ছিল বা আছে। তা , প্রতীকীভাবে কথাটা বলা যায় এভাবে: গত বছরের অক্টোবর মাসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ভারত সরকারের সস্তা জাতীয়তাবাদে তাল দিতে ভারতের মিডিয়া সারাক্ষণ চীনা ব্যাশিং করে থাকে। ওদিকে আবার যদিও ভারতের প্রতিটা রাজ্য সরকার কিভাবে গুজরাটের মতো চীনের সাথে বিশেষ সম্পর্ক পাতিয়ে নিজ রাজ্যে বিনিয়োগ-বাণিজ্য আনবে এর জন্য উদগ্রীব আর পরস্পর প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে, তা ভারতীয় সাংবাদিক সুবীর ভৌমিক জানিয়েছেন। ভারতের সাবেক কূটনীতিক বীণা সিক্রি থেকে শুরু করে এনডিটিভির অ্যাঙ্কর-সাংবাদিক বরখা দত্ত, সবাই পাবলিক আলোচনায় এটা উল্লেখ করতে ভোলেন না যে, তাদের ফ্রেন্ডলি এক সরকার বাংলাদেশে বসানো আছে। এনডিটিভিতে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরকে মাথায় রেখে বরখার এঙ্করে এক টকশোর আয়োজন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, একটা ধাঁধার উত্তর জানা। তারা সবাই জানেন, বাংলাদেশে তাদের পছন্দের একটা “বন্ধু সরকার” আছে। প্রায় তাদের সব প্রয়োজন পুরণ করতে খেদমত করার জন্য একপায়ে খাড়া হয়ে।  কিন্তু তাহলে এখানে চীনা প্রেসিডেন্ট সফরে আসেন কেমনে? তার সঙ্গে হাসিনার এত কী খাতির? তাইলে কি তাদের ‘ফ্রেন্ডলি সরকার’ ধারণাটা ভুল? এই ধাঁধার জবাব কী? তো ইতোমধ্যে তারা ঐ টকশোতে জানিয়েছে যে প্রেসিডেন্ট শি ওই সফরে বাংলাদেশকে ২৪ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দিতে আসছেন। ফলে আলোচনা শেষে ওই টকশোর কনক্লুশন হলো, ভারত তো আসলে ‘অবকাঠামো উন্নয়নের বিনিয়োগ’ গ্রহীতা দেশ। সে নিজেও চীন থেকে ‘অবকাঠামো উন্নয়নের বিনিয়োগ’ নিচ্ছে। ফলে ২৪ বিলিয়নের তুলনায় ভারতের ২-৩ বিলিয়ন (তাও অবকাঠামো খাতে নয়, টাটার স্টিলে তৈরি বাস বা রেল পণ্য বিক্রির খাতে) বাংলাদেশে বিনিয়োগ – এদুটা ফিগার কি তুলনীয়? কোনোভাবেই না। তাই তারা বিমর্ষ হয়ে মেনে নিয়েছিল যে, এই খাতে বাংলাদেশে চীনের ভূমিকা ও প্রয়োজন অনেক বেশি আর সেটা ভারতের সাথে তুলনীয়ই নয়। এটা সেদিন অন্তত টকশোর লোকেরা বুঝেছিলেন। কথা আরো আছে; পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগকে কেন্দ্র করে এখন বড় প্রজেক্টে বিশ্বব্যাংককে বাদ রেখেই অবকাঠামোর জন্য বিকল্প বিনিয়োগ ভারতের চরম অপছন্দের হলেও হাসিনা ঐ বিনিয়োগ চীন থেকে জোগাড় করে চলেছে। আরও আছে। ভারতকে ট্রানজিট দিতে যশোর থেকে পদ্মাসেতুর উপর দিয়ে ঢাকা পর্যন্ত নতুন যে রেল যোগাযোগ তৈরি করা হচ্ছে এই বিনিয়োগও চীন দিচ্ছে। সার কথায় ভারতের খায়েশ ট্রানজিট পাওয়া,  কলকাতা-আগরতলা ট্রেন যোগাযোগ অবকাঠামো বাংলাদেশ তৈরি করে দিচ্ছে, চীন থেকে বিনিয়োগ ঋণ নিয়ে।

এদিকে আর একটা বিষয় লক্ষণীয়, ইতোমধ্যে নির্বাচন সরকার বদল করে না বা কাউকে ক্ষমতায় আনে না;  নির্বাচন আর ক্ষমতায় থাকা- এটা আর সম্পর্কিত নয়। হাসিনার সরকার নিজেই এমন নীতিচালু করেছে, সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে সরকারের নতুন স্লোগান হলো, “ভালো নির্বাচন নয়; মূল কথা হলো জনগণের দরকার মালয়েশিয়ার মতো উন্নয়ন”। আর এই সরকার নাকি উন্নয়নে চ্যাম্পিয়ন। তাই সব ঠিক আছে। একথাগুলো আমরা সবাই কমবেশি জানি। যেটা জানি না বা খেয়াল করা হয় নাই তা হল এই স্লোগান সরকার তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে এ জন্য যে, সে ভারতের কথা শুনে চীনের সাথে ঘনিষ্টতা ত্যাগ করে নাই। চীনকে হারায় নাই তাই। চীনের সাথে খাতির রেখেই বিনিয়োগ এনেছে। উল্টা বিশ্বব্যাংককে কলা দেখিয়ে বিশ্বব্যাংক ও পশ্চিমকে মামলা প্রত্যাহার করতেও বাধ্য করেছে। ফলে শেখ হাসিনার ক্ষমতার উৎস কাকাবাবু- এ কথা্টা একেবারেই সবটা সত্যি নয়। উন্নয়নেরস্লোগান চালু রাখতে গেলে কাকাবাবু না, শিং জিন পিংকেই  হাসিনার দরকার। এটা প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বেশি ভালো আর কে বুঝে? ফলে যারা ছদ্ম হাসিনাপ্রেমী সেজে ডিফেন্স প্যাক্ট করতে হাসিনাকে সমর্থন জোগাতে মাঠে নেমেছেন অথবা ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে আস্থাহীনতা দেখছেন এরা কেউ সরকারের সংকট সমস্যার গভীরতা বুঝে কথা বলছেন, এটা মনে করার কোনো কারণ নেই।

সম্প্রতি চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রী নেপাল ও শ্রীলঙ্কা সফর করে গেলেন। বাংলাদেশেও আসার কথা ছিল। তা হয়নি। চীনের গ্লোবাল টাইমস গত ২১ জুন চীনা সাংবাদিক আই জুনের লেখা চীনা প্রতিরক্ষামন্ত্রীর ওই সফর নিয়ে এক রিপোর্ট ছাপে। শিরোনাম ছিল, “সাউথ-ইস্ট এশিয়ায় বিভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে চীনের সংশ্লিষ্ট হওয়া নিয়ে ভারত অহেতুক অস্থির হয়”। দেখুন, (India over-sensitive on China’s engagement in South Asia) এই রিপোর্টে বহু কথা চাঁচাছোলা ভাষায় বলা হয়েছে। ওর কনক্লুশন বক্তব্য হলো, চীন পালটা লড়াই করবে। বলছে, ভারত বাধা সৃষ্টি করলে তাকে এমন ‘পাল্টা লড়ানি’ জবাব দিতে হবে; কারণ এটা চীনের কোর স্বার্থ। এটা মূলত চীনের সাথে এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর মৌলিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক – বিনিয়োগ বাণিজ্যের সম্পর্ক। তবে চীনের কথাটা আবার আরও বড় প্রেক্ষাপট থেকে বলা। সেটা হলো চীনের ‘এক বেল্ট, এক সড়ক’ প্রজেক্ট। সাউথ-ইস্ট এশিয়ার রাষ্ট্রগুলোর কারা এই ‘সড়ক ও গভীর সমুদ্র যোগাযোগের প্রজেক্টে’ যুক্ত হতে চায় – চীনের কাছে এখনকার সময়টা হলো, এমন সবার কাছে এই সুবিধা ফেরি করতে যাওয়া। স্বল্পসুদে লম্বা সময়ের এই অবকাঠামো ঋণ চীন সবাইকে দিতে চায়। এমনকি ভারতকেও। প্রেসিডেন্ট শিং এর বিগত বছর ঢাকা সফরের সময় এই প্রস্তাব রেখে গেছেন। গত সপ্তাহে নেপালের মাওবাদী প্রধানমন্ত্রী এই প্রজেক্টে যোগদানের ঘোষণা দিয়েছেন। শ্রীলঙ্কাও চিন্তা করছে। আর পাকিস্তান ইতোমধ্যে চীনের কাছ থেকে ৪৬ বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট নিয়েছে যা বেল্ট-সড়ক প্রজেক্টের অংশ এবং  অন্তর্ভুক্ত। বেল্ট প্রজেক্টকে চীন তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত স্বার্থ মনে করে। এই প্রজেক্ট মূলত অর্থনৈতিক। কিন্তু এত বিশাল প্রজেক্ট, বড় বিনিয়োগের বলে একে প্রতিরক্ষার একটা ব্যবস্থাও রাখতে হবে। সেই সূত্রে গ্রহীতা এই রাষ্ট্রগুলোর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়তে তাদের অর্থনীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এক প্রতিরক্ষা-সাহায্য চীনকে করতে হবে। এখন ভারত যদি ঈর্ষান্বিত হয়ে খামাখা “পুরা সাউথ-ইস্ট এশিয়াকে নিজের বাড়ির পেছনের আপন বাগানবাড়ি” মনে করে, সেভাবে আচরণ করে — যেমন দেখেন, আজ পর্যন্ত ল্যান্ডলকড ভুটানের সাথে চীনের কূটনৈতিক সম্পর্ক পর্যন্ত হতে দেয়নি ভারত, এভাবে যদি চলতে থাকে তবে চীনকে ফাইটব্যাক করতেই হবে, না করে উপায় কী? গ্লোবাল টাইমসে এই কথা গুলোই চাঁচাছোলা ভাবে বলা হয়েছে।

ভারতের অর্থনৈতিক মুরোদ না থাকলেও সবাইকে নাকি চীনের সাথে ভারসাম্য বজায় রেখে সম্পর্ক করত হবে ভারত এমন দাবি করে। “চীনের প্রতি পড়শি রাষ্ট্রগুলোর নিউট্রাল অবস্থানকেও” ভারত চীনের দিকে ঝুঁকে পড়া মনে করে। ‘বল কিন্তু ভারতের কোর্টে’, যা করার সে কী করবে সে সিদ্ধান্ত ভারতকেই নিতে হবে।

ভারতের কৌশলগত বিষয় ও নীতি নিয়ে গবেষণা করে এমন থিংকট্যাংকগুলোর বড় অংশটাই আমেরিকান ফান্ডেড। অর্থাৎ চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে সাজিয়ে খাড়া করার আমেরিকান নীতি – এরই প্রতিফলন ঘটিয়ে থাকে ভারতের নীতি নিয়ে গবেষণা করে এমন থিংকট্যাংকগুলো। এরই অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হলেন সি রাজামোহন। তিনি ‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’- ওয়াশিংটনভিত্তিক এই আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংকের ইন্ডিয়ান শাখা ‘কার্নেগি ইন্ডিয়ার’ ডিরেক্টর। তিনি এখন নিয়মিত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ কলাম লিখেন ম্যানডেলা শিরোনামে। তিনি গ্লোবাল টাইমসের ওই রিপোর্ট নিয়ে লিখেছেন নিজের কলামে। রাজামোহন খুবই হতাশা ব্যক্ত করে নিজের লেখার শিরোনাম দিয়েছেন, ‘প্রতিরক্ষা কূটনীতিতে দিল্লির প্রস্তুতি নেই।’ ওই কলামের শেষ প্যারাটা অনুবাদ করে দিচ্ছি যেখান থেকে তার কথার একটা সারবক্তব্য পাওয়া যাবে। প্রথম আলোর অনুবাদটাই এডিট করেছি এখানে।

‘… গ্লোবাল টাইমস নয়া দিল্লিকে উপদেশ দিয়েছে, ভারতের প্রতিবেশীদের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সম্পর্কের ব্যাপারটি দিল্লিকে মেনে নিতে হবে। এসব দেশে বেশি বেশি চীনা প্রতিষ্ঠান শিকড় গাড়তে শুরু করলে চীন অনিবার্যভাবেই তাদের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করবে। শুধু চীনের নয়,এই অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষার্থেও তাদের এটা করতে হবে।’

তামসার দিক হলো, রাজামোহন স্বীকার করে বলছেন, “ভারত দেরিতে হলেও এই ব্যাপারটা আমলে নিতে শুরু করেছে। দিল্লি এখন বুঝতে পারছে, প্রতিবেশীদের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক ও অবকাঠামোগত সহায়তা বাড়তে থাকলে এর কৌশলগত রূপও দেখা যাবে, যার মধ্যে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা অংশীদারিও থাকতে পারে”। অথচ তা সত্ত্বেও আমরা দেখছি, ডিফেন্স প্যাক্ট করার জন্য হুদাই ভারত হাসিনাকে চাপাচাপি করছে। যে বাস্তবতা রাজামোহন মেনে নিয়েছেন তা ভারতের মানতে কষ্ট লাগছে। 

  বেল্ট প্রজেক্টকে চীন তার সবচেয়ে বড় কৌশলগত স্বার্থ মনে করে – একথা  এবং বাস্তবতা রাজামোহনও সহজেই মানছেন। তাই আরো বলছেন , কংগ্রেস সরকার চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পকে আপত্তিসহকারে মেনে নিলেও নরেন্দ্র মোদির সরকার তা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর সম্পর্কেও সমালোচনামুখর হয়ে উঠেছে। ভারত আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা কূটনীতিও জোরদার করেছে। এতে বেইজিং ও দিল্লির মধ্যে রাজনৈতিক সঙ্ঘাত বাড়বে। ভারত যে উপমহাদেশে চীনের ক্ষমতা বিস্তারের ব্যাপারে এত দিন পরে কার্যকরভাবে সাড়া দিলো, সেটাই বরং বিস্ময়ের ব্যাপার। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের বহু দিনের সামরিক সম্পর্ক। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোতে ক্রমবর্ধমান হারে চীনের অস্ত্র বিক্রিকে ভারত এত দিন ভালোভাবে না নিলেও তারা আশপাশের দেশগুলোতে চীনের কৌশলগত প্রভাব বৃদ্ধির ব্যাপারে একেবারেই অপ্রস্তুত ছিল। দিল্লি অনেক দিন থেকেই উপমহাদেশে নিজের স্বাভাবিক শক্তি সম্পর্কে আত্মসন্তুষ্ট ছিল”।

রাজামোহন শেষ বাস্তবতা মেনে নিয়েই যেন মানতে চাচ্ছেন না। ব্যাপারটা নাকি মূলক ভারতের “আমলা গোয়েন্দাদের আলস্য” এমন ব্যাখ্যার আড়ালে যেতে চাইছেন। তিনি লিখছেন, “স্বাধীনতার পর ভারত তার আশপাশে পশ্চিমা, বিশেষ করে ইঙ্গ-মার্কিন সামরিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ১৯৮০ সালে আফগানিস্তান দখল করে নেয়, তখন সে খুবই সতর্কতার সঙ্গে ব্যাপারটা পর্যবেক্ষণ করেছে। কিন্তু বহু দূরের যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রভাব আজ ২১ শতকে ক্ষয়ে যাচ্ছে। এখন চীনের সামরিক শক্তি ভারতকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন ও রফতানির কথা বলেছেন, কিন্তু প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আলস্য দূর করাতে পারেননি”।

তিনি বলতে চাইছেন তিনি পরামর্শ দেয়া সত্ত্বেও কেউ শুনে নাই।   বলছেন, এমনকি তিনি “প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়কে প্রতিরক্ষা কূটনীতির ব্যাপারটা গ্রহণ করাতে পারেননি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনী বারবার অনুনয়-বিনয় করা সত্ত্বেও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে ব্যাপক পরিসরে সামরিক বিনিময় করতে পারেনি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় মনোভঙ্গি না বদলালে ‘ভারতীয় আঞ্চলিক আধিপত্য’ ও ‘উপমহাদেশের কৌশলগত একতা’ নিয়ে দিল্লির বাগাড়ম্বর দূর করতে বেইজিংয়ের তেমন একটা বেগ পেতে হবে না”। এখানে এসে তিনি তিনি পুরা হতাশ, দোষারোপ আর হাল ছেড়ে দেয়া অবস্থায়।

আসলে বড় বড় হামবড়া কথার বিরুদ্ধে গ্রাম দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে, “ট্যাকা লাগে চাচা! এমনি হইব না!” –  রাজামোহনের এখন সেই অবস্থা।  আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই সমগ্র দিক সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো ওয়াকিবহাল – আমরা ধরে নিতে পারি। । তাই আমাদের গোলটেবিল-ওয়ালারা তাঁকে চুক্তি করার হাওয়াই সাহস দিচ্ছেন বুঝা যাচ্ছে। রাজামোহনের মত কী আমরা বাস্তবতা মেনে নিব? কঠিন সত্যিটা হলো, চুক্তির বাস্তবতাই নেই- এটা তাদের কে বুঝাবে! আর এই বাস্তবতা বুঝেও কী প্রধানমন্ত্রী ‘ডিফেন্স প্যাক্টে’ যাবেন, শুধু আগামি নির্বাচনে ভারতের সমর্থন আবার পাবার কথা ভেবে? আর ওদিকে  ‘ডিফেন্স প্যাক্টে’র পক্ষে চীনের প্রতিক্রিয়া কী স্বাভাবিক থাকবে? নিশ্চিত বলা যায় এটাও প্রধানমন্ত্রীকে আমলে নিতে হবে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com

 

[এই লেখাটা এর আগে সর্ব প্রথম দৈনিক নয়াদিগন্ত পত্রিকার অনলাইন ০২ এপ্রিল ২০১৭ (প্রিন্টে পরের দিন) ছাপা হয়েছিল। এরপর এর আর এক ভার্সান ‘চিন্তা’ ওয়েব পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আর এক ভার্সান অনলাইন দুরবীন পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। আর সব শেষে ফাইনাল ভার্সান হিসাবে আরও সংযোজন ও এডিটের পর এখানে ছাপা হল। ]